অন্ধকার, স্মৃতি, গ্রাম, বিচ্ছেদ ও ক্ষমার নীরব রূপকগুলো এই কবিতাগুলিকে এক গভীর মায়াবী আবহ দেয়। বটগাছ, ডাকবাক্স, রাজপথ কিংবা পাখির ডানায় ভর করে এখানে জীবন ফিরে তাকায়—হারানো সময়, অন্তর্গত শূন্যতা এবং পুনরাবিষ্কৃত মানবিকতার দিকে। ‘জেলার সাহিত্য’ প্রকল্পে এই মাসের নির্বাচিত জেলাগুলি হল বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া। আজ প্রকাশিত হল পুরুলিয়ার শক্তিশালী কবি সুকুমার মণ্ডলের কবিতা।
জাদুকর
মনে হয়েছিল, আমাদের মাঝখানে বরং অন্ধকারই ভালো। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকব কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাব না। ঝিঁঝি ডাকবে, আমাদের ক্লান্ত চোখ দীর্ঘ নিদ্রায় ডুবে স্বপ্নজলে ভাসমান হবে। নতুন দেশ, নতুন সমুদ্র, নতুন মহাকাশের খোঁজ নিয়ে ফিরে আসবে আবার। আর আমাদের মাঝখানে যে চিরায়ত অন্ধকার, সেখানে সারি সারি মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে পড়বে এক জাদুকর।
বটগাছ
গ্রামের মুখে ওই যে অনন্ত বটগাছ সযত্নে ঝুরি নামিয়েছে, পাখিরা ঠোঁটে কিচিরমিচির নিয়ে তার কোটরে ঢুকছে, বেরোচ্ছে। এইমতো ছায়ার নিচে আজ শুয়ে পড়ি, ঢুলে যাই। পাশের পুকুরে পাতা ও ফল পড়ছে টুপটাপ। চোখের সম্মুখে ভেসে আসছে কৈশোর, যৌবন, যাবতীয় জরা। এত ভার বইতে হলে শিকড় কতদূর ছড়িয়ে দিতে হয়, ভাবি। ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা নেমে এলে গ্রাম থেকে মা ও কাকিমারা গাছের সম্মুখে প্রদীপ জ্বালাতে আসে।
ডাকবাক্স
ডাকঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময় সহসা ঝড় উঠেছে। দুমদাম জানালা দিয়ে তীব্রগতিতে বেরিয়ে আসছে কাগজপত্র। বৃষ্টি নেই, চারদিকে শুধু ধুলোবালি উড়ছে। পাগলের মতো অসহায় ছটফট করছে গেরুয়া রঙের ডাকবাক্স, মাথা ঝাঁকাচ্ছে। আমার জন্য ভুল ঠিকানায় কেউ তার যাবতীয় চিঠি রেখে গেছে, হায়! ঝড় শুধু কোলাহল তোলে, এমনকি ডাকবাক্সের তালাও ভাঙে না; ঝড় জানে কোথায় লুকোনো আছে জাদুপিয়োনের চাবি।
আহুতি
এত পুজো, এত পুঁথি; বেলা পড়ে আসে, সন্ধ্যা হয়। তোমার সাক্ষাৎ দূরস্থ, সামান্য দেখা পাওয়াও এক অবিকল্প তিথি। সেও আবার সোজা রাস্তায় নয়, কখনও পথের বাঁকে একঝকল, অতর্কিতে। কুয়াশায় চোখ ভরে আসে, সে-চোখ মুছেছি ভেজা গামছায়। ভাবি গানের দেবতা যিনি, তার কাছে সামান্য প্রাণ শিখে, সুর শিখে ফিরে যাব জন্মপ্রদেশে। আমার সব লেখা আগুনে আহুতি দিতে আবার সাজাব পুজোটির থালা।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
রাজপথ
পিচঢালা রাস্তায় দ্রুত গতিতে পেরিয়ে যাচ্ছে বাস। কোনো কোনো যাত্রী জানালা দিয়ে দূরে আচমকা তাকাল। আমার চারপাশে তুমি সরষেবীজের মতো ছড়িয়ে দিয়েছিলে শূন্যতা। সে-সব আজ ফুল হয়ে ফুটে উঠল বলেই, মুগ্ধ যাত্রীর চোখে আমিও ক্ষণিক দৃশ্যমান হলাম। কত কত মানুষের সাথে দেখা হয় মুহুর্মুহু, সাক্ষাৎ হয় কদাচিৎ। আমাদের মাঝখানে আর কোনো শূন্যতা নেই; অজস্র মানুষের যাতায়াত আছে।
পাখিটির জন্য কবিতা
বিচ্ছেদ ভাবলে বিচ্ছেদ! আর যদি যতিচিহ্ন ভাবো, কথার পিঠে কথা দিয়ে সাজানো পাহাড়, তবে সেখান থেকেই ঝরনা নামবে নিশ্চিত। শরীরের সানুদেশে ধন্বন্তরি জল খেলেধুলে যাবে। সাঁতার শিখেছ তুমি, হে মুগ্ধডানার পাখি, ভেসে যাবে যাও, সেরে যাক জমে-থাকা প্রাচীন অসুখ! পৃথিবীর তিন ভাগ জল, যে-কোনো জলের ঢেউয়ে যদি কেউ সামান্য পালক ঝরিয়ে আমার কাছে আসে, হাত দিয়ে ছোঁব না তাকে, মুগ্ধ চোখে জলের সঙ্গেই ভেসে যেতে দেব।
ক্ষমা
এতদিন গভীর জঙ্গলে তোমাকেই ঈশ্বরবিশ্বাসে পূজা করেছি। অথচ সমস্ত ছায়া সরিয়ে, হে কাঠুরিয়া, একদিন নিজের অজান্তেই তুমি হয়ে উঠলে বৃক্ষ-হন্তারক। এই অজ্ঞতার জন্য সম্ভবত তোমাকে ক্ষমা করা যায়, কিন্তু তোমার মতো আমার ঠাকুরঘরে কোনো ঈশ্বর রাখা নেই। ক্ষমা করে যেতে হবে স্বয়ং বৃক্ষকেই, এখানে মৃতপ্রায় বৃক্ষই আমার কাছে ঈশ্বর। জানি, তোমার একটুও দুঃখ নেই, তুমি দেখতে পাচ্ছ না, গাছ থেকে উড়ে যাচ্ছে অজস্র পাখিরা।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।