preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স: পর্ব ৯
ধারাবাহিক

মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স: পর্ব ৯

সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ও ‘হীরক রাজার দেশে’কে নতুন দার্শনিক আলোয় পাঠ করেছেন অয়ন মুখোপাধ্যায়। লোককথা, সুর, ক্ষমতা ও মুক্তির রূপক মিলিয়ে এই লেখায় উঠে এসেছে লোকায়ত পরাবিদ্যার এক গভীর জগৎ, যেখানে শিল্প হয়ে ওঠে মানুষের আত্মমুক্তির ভাষা। হাইডেগার, সার্ত্র, স্পিনোজা থেকে রবীন্দ্রনাথ—দর্শনের বহুস্বরের মধ্য দিয়ে মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স-এর এই পর্ব সত্যজিতের রূপকথাকে অনন্য মেটাফিজিক্যাল উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করে।

লোকায়ত পরাবিদ্যা এবং শব্দের জ্যামিতি: গুপি-বাঘার রূপকে মানুষের মুক্তি

প্রাক-কথন: রূপকের আড়ালে দর্শনের পুনর্জন্ম
অপুর শেকড়সন্ধান, বিশ্বম্ভর রায়ের সামন্ততান্ত্রিক অহংকারের পতন কিংবা অরণ্যের দিনরাত্রির নাগরিক মুখোশ খুলে পড়া—সত্যজিৎ রায়ের মেটাফিজিক্যাল পরিক্রমার এই ধাপগুলো যদি হয় বাস্তব ও মনস্তত্ত্বের টানাপড়েন, তবে এর পরের ধাপটি আরও বেশি চমকপ্রদ ও বুদ্ধিদীপ্ত। তা হল ‘লোকাচারের মেটাফিজিক্স’ বা লোকায়ত পরাবিদ্যা (Folk Metaphysics)। যেখানে সত্যজিৎ রূপকথা, ফ্যান্টাসি এবং সুরের এক মায়াবী জ্যামিতি তৈরি করে অতি সাধারণ মানুষের মুক্তি আর দর্শনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ কিংবা ‘হীরক রাজার দেশে’র মতো চলচ্চিত্রগুলোকে আমরা সাধারণত শিশুদের সিনেমা বা রূপকধর্মী রাজনৈতিক সিনেমা হিসেবে দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে মাটির মানুষের অস্তিত্বের এক পরম দার্শনিক সত্য।

জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের (Martin Heidegger) দর্শনে একটি কথা আছে—মানুষ এই পৃথিবীতে ‘নিক্ষিপ্ত’ (Thrownness)। সে তার পরিস্থিতি বেছে নিতে পারে না, কিন্তু তার যাপন দিয়ে সে নিজের অস্তিত্বকে গড়ে তোলে। সত্যজিৎ তাঁর এই রূপকধর্মী সৃষ্টিতে দেখিয়েছেন, কীভাবে মাটির কাছাকাছি থাকা প্রান্তিক মানুষ এই নিক্ষিপ্ত সত্তাকে অতিক্রম করে এক বৃহত্তর আধ্যাত্মিক ও যুক্তিবাদী মুক্তির দিকে এগিয়ে যায়।

এই পর্বে আমরা অনুসন্ধান করব, কীভাবে সত্যজিৎ বাস্তব পৃথিবীর খিদে, অবদমন আর ক্ষমতার আস্ফালনকে সুরের, শব্দে এবং অলৌকিক বরের মেলবন্ধনে এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক ও যুক্তিবাদী উত্তরণের দিকে নিয়ে গেছেন।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

ভূতের রাজা এবং আধ্যাত্মিক ইশতেহার
‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবির শুরুতেই গুপি ও বাঘার নির্বাসন কেবল সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া নয়, তা হল তাদের চেনা ও লৌকিক অস্তিত্বের অবসান। শুষ্ক, রুক্ষ বনের ভেতর যখন তারা বাঘের ভয়ে কাঁপছে, ঠিক তখনই এক পরাবাস্তব আবহে আবির্ভাব ঘটে ‘ভূতের রাজা’র। এই ভূতের রাজা এবং তার দেওয়া তিন বর কেবল রূপকথার সস্তা কল্পনা নয়; তা হল ক্ষুধার্ত, অবদমিত মাটির মানুষের অনন্ত মুক্তির এক মেটাফিজিক্যাল ইশতেহার।

ভূতের রাজার দেওয়া প্রথম দুই বর—‘যখন খুশি যা ইচ্ছা খাওয়ার’ এবং ‘পোশাকের’ স্বাধীনতা—আসলে মানুষের মৌলিক ও আদিম জাগতিক চাহিদার চিরতরে অবসান ঘটায়। ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদে যে অভাব, অনটন ও বেঁচে থাকার গ্লানি মানুষকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে, সত্যজিৎ এক লহমায় তাঁর অলৌকিক রূপক দিয়ে সেই জাগতিক বাধ্যবাধকতা থেকে গুপি-বাঘাকে মুক্ত করে দেন। অভাব চলে যাওয়ার পর যে পরম স্বাধীনতা অবশিষ্ট থাকে, তা-ই মানুষকে তার সৃজনশীল সত্তার মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবনের সমস্ত ক্লান্তি ও অন্ধকার দূর হয়ে যাওয়ার এই অতীন্দ্রিয় মুহূর্তটিতে আমাদের মধ্যে অণুর অনুরণন ঘটে।

খিদ আর পোশাকের বৈষম্য মুছে যাওয়ার পর গুপি-বাঘা আর কেবল দুই গ্রামীণ সাধারণ মানুষ হয়ে থাকে না, তারা হয়ে ওঠে এক মুক্ত চেতনার প্রতীক, তারা তখন সুরের জাদুতে বিশ্বকে জয় করতে বেরিয়ে পড়ে। তাদের এই যাত্রা আসলে চেতনার এক আদিম স্তর থেকে বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক স্তরে উত্তরণ।

সুরের জ্যামিতি এবং অহিংসার মেটাফিজিক্স
ভূতের রাজার দেওয়া তৃতীয় বরটি ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ—সুরের বর। সত্যজিতের দর্শনে সুর বা সংগীত কেবল বিনোদন নয়, তা হল ব্রহ্মাণ্ডের এক অখণ্ড নিয়ম বা হারমনি। গ্রিক দার্শনিক পাইথাগোরাস যেমন মনে করতেন যে এই মহাবিশ্বের মূল ভিত্তি হল সংখ্যার এক নিখুঁত সুর (Music of the Spheres), সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরাও সুরকে সেই মহাজাগতিক শক্তিরূপে দেখায়। শুন্ডী ও শুন্ডীর রাজা হলেন সেই নৈঃশব্দ্য ও শান্তির প্রতীক, যেখানে কোনো কৃত্রিম ভাষা নেই, সংলাপ নেই, আছে কেবল এক পরম নীরবতা। এর বিপরীতে হাল্লা হল ক্ষমতার লোভ, যুদ্ধ আর কোলাহলের প্রতীক।

হাল্লা যখন শুন্ডী আক্রমণ করতে আসে, তখন গুপি ও বাঘা কোনো অস্ত্র হাতে তুলে নেয় না। তারা গান গায়। সত্যজিতের ক্যামেরায় সেই বিখ্যাত দৃশ্যের কথা মনে করুন—যুদ্ধের ময়দানে দুই সৈন্যদল তরবারি উঁচিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে, আকাশে ঝুলতে থাকা মিষ্টির হাঁড়ি আর গুপি-বাঘার সুরের মূর্ছনা। এটি কেবল কৌতুক নয়, এটি হল সুরের মেটাফিজিক্যাল শক্তি দিয়ে মানুষের ভেতরের পাশবিকতাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক পরম দার্শনিক মুহূর্ত। সুর এখানে মানুষের অহংকার ও হিংসার কায়াটিকে গলিয়ে দিয়ে তার ভেতরের মাটির মানুষকে জাগিয়ে তোলে। সত্যজিৎ দেখান যে, মানুষের আদিম হিংসাকে পরাস্ত করতে পারে কেবল শিল্পের অন্তহীন ক্যালিগ্রাফি এবং হৃদয়ের শুদ্ধতম সুর। এই সুরই মানুষের আত্মাকে তার জাগতিক পাশবিকতা থেকে মুক্ত করে এক ঐশ্বরিক শান্তিতে উন্নীত করে।

‘হীরক রাজার দেশে’: মগজ ধোলাই এবং চেতনার অবদমন
এই লোকায়ত পরাবিদ্যার দ্বিতীয় স্তরে সত্যজিৎ আমাদের নিয়ে যান ‘হীরক রাজার দেশে’র সেই কুখ্যাত ‘যন্তরমন্তর’ ঘরে। গায়ক, কৃষক আর খনি শ্রমিকদের মগজ ধোলাই করার এই যে রাজনৈতিক অপচেষ্টা, তা আসলে মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে স্তব্ধ করার এক মেটাফিজিক্যাল সংকট। হীরক রাজা যখন বলেন, “বাকি রাখা খাজনা, মোটে ভালো কাজ না,” কিংবা যন্তরমন্তর ঘরের দেয়ালে যখন লেখা হয় “লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে”—তখন তা কেবল স্বৈরাচারের রূপক থাকে না, তা হয়ে ওঠে মানুষের মৌলিক চেতনা ও সত্যকে বিকৃত করার এক অশুভ জ্যামিতি।

এখানে যুক্তিবাদকে সত্যজিৎ প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষক উদয়ন পণ্ডিতের চরিত্রের মাধ্যমে। উদয়ন পণ্ডিত হলেন সেই প্রখর আলো, যিনি হীরক রাজার তৈরি করা অন্ধকারের কুয়াশাকে ভেদ করতে চান। যখন সব স্তব্ধ, যখন দেশের সমস্ত মানুষ মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে চাটুকারিতায় লিপ্ত, তখন উদয়ন পণ্ডিতের সংলাপ আমাদের অস্তিত্বকে নাড়া দেয়। তিনি কেবল পুঁথিগত বিদ্যার কথা বলেন না, তিনি বলেন মানুষের অন্তরের সেই সহজাত যুক্তিবোধের কথা, যা কোনো অত্যাচারী শাসক কেড়ে নিতে পারে না। উদয়ন পণ্ডিতের সেই দৃঢ় চরিত্রের অন্তরালে যেন ধ্বনিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের সেই অমোঘ ও শাশ্বত উচ্চারণ:

“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।”

উদয়ন পণ্ডিত যখন রাজকোষের চাবি গুপি-বাঘার হাতে তুলে দেন এবং বলেন যে, আসল শক্তি রাজার হাতে নয়, মানুষের মেধার মধ্যে—তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যুক্তির চরম বিজয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় দার্শনিক বারুখ স্পিনোজার (Baruch Spinoza) সেই উক্তি—কোনো বাহ্যিক শক্তি মানুষের অন্তরের স্বাধীনতাকে পুরোপুরি খর্ব করতে পারে না, যদি মানুষ তার বিচারবুদ্ধির আলো ধরে রাখে।

দড়ি ধরে মারো টান: লৌকিক দেবতার বিসর্জন
ছবির অন্তিমলগ্নে হীরক রাজার নিজের বিশাল মূর্তি নিজের হাতেই দড়ি ধরে টেনে ভেঙে ফেলার যে দৃশ্য, তা এক অসামান্য এবং গভীর মেটাফিজিক্যাল রূপক। যে রাজাকে মানুষ ঈশ্বরের সমকক্ষ মনে করত, মগজ ধোলাইয়ের মন্ত্র উলটে যাওয়ার পর সেই রাজা নিজেই নিজের ভ্রম বুঝতে পারেন।

মূর্তি ভেঙে পড়ার এই মুহূর্তটি আসলে মানুষের তৈরি সমস্ত অলীক ক্ষমতা ও অন্ধবিশ্বাসের বিসর্জন। জঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের সেই চরম সত্যটি এখানে আবার ফিরে আসে—মানুষ যখন বুঝতে পারে সে নিজেই নিজের নিয়ন্তা, কোনো অলীক রাজা বা স্বৈরাচারী শাসক তার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না, তখনই তার প্রকৃত মুক্তি ঘটে। গুপি, বাঘা, উদয়ন পণ্ডিত আর সমস্ত খনি শ্রমিকরা যখন একসঙ্গে দড়ি ধরে টান মারে, তখন কেবল পাথরের মূর্তি মাটি ছুঁয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয় না; বরং মানুষের চেতনার ওপর চেপে বসা শত বছরের অন্ধকারের অবসান ঘটে। মাটির মানুষ তার নিজের মাটির অধিকার ফিরে পায়।

লোকায়তের আলোয় মহাজাগতিক মুক্তি
এই দীর্ঘ ও ধারাবাহিক পরিক্রমায় আমরা এসে পৌঁছেছি এমন এক ঘাটে, যেখানে সত্যজিৎ রায় রূপকথাকে দর্শনের এক সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছেন। নিশ্চিন্দিপুরের মাটি থেকে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা পালামৌর অরণ্য ও মনমোহন মিত্রের ড্রয়িংরুম পেরিয়ে এবার মিশে গেল শুন্ডী আর হাল্লার সেই জাদুকরি প্রান্তরে।

সত্যজিৎ আমাদের দেখালেন যে, মেটাফিজিক্স কেবল গূঢ় মনস্তত্ত্বে বা বিষণ্ণ একাকিত্বে থাকে না; তা থাকতে পারে সাধারণ মানুষের হাসিতে, তাদের লোকসংগীতে আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দড়ি ধরে টান মারার সম্মিলিত সাহসের মধ্যে।

এই লোকায়ত পরাবিদ্যাই সত্যজিতের শিল্পের শেষ কথা। তিনি আমাদের শেখান যে, যুক্তিবাদ আর সুরের ডানা থাকলে অতি সাধারণ মাটির মানুষও আকাশ ছুঁতে পারে, ভাঙতে পারে স্বৈরাচারের লৌহকপাট। ধুলোবালি থেকে সুরের এই মহাজাগতিক মুক্তিই হল সত্যজিৎ রায়ের সেলুলয়েডের ফিতের মধ্যে রেখে যাওয়া আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ ইশতেহার।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অয়ন মুখোপাধ্যায় একজন কবি, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। পেশাগতভাবে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।

অন্যান্য লেখা