শতাব্দী চক্রবর্তীর কবিতাগুচ্ছ ভ্রমণ, ইতিহাস, মানবিক ধর্ম, প্রেম ও মৃত্যুচিন্তার এক অন্তর্মুখী যাত্রা। সারনাথের স্তূপ, হলুদ প্রজাপতি, কুয়াশার কবিতা থেকে শুরু করে সহিংস সময়ের ক্ষত—সব মিলিয়ে এখানে মানুষের ভেতরের পথিক কথা বলে। স্মৃতি, বেদনা ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের মধ্যে কবিতা হয়ে ওঠে আশ্রয় ও প্রত্যাবর্তনের পথ।
চরণিক
ভ্রমণের জন্য জীবন না কি জীবনের জন্যই ভ্রমণ,
এই ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যাওয়া যাক সেইসব পথে
যেখানে হলুদ প্রজাপতি ফুটে আছে
অজানা ফুলের রঙে মিশে।
আমরা বিস্ময় হাতে করে আশ্রয় খুঁজি
পরমান্নের বাটিতে সুজাতার হেঁসেল সেজে ওঠে।
বুদ্ধের “ধম্মং শরণং গচ্ছামি” জপ করতে করতে
বুদ্ধের ছায়া খুঁজে বেড়াই
দেখি সারনাথের স্তূপের ওপর হাজার বছর ধরে
বাস করছে ধূসর চড়াই আর সবুজ টিয়ার দল।
তারাই তো বুদ্ধের ধম্মকে রক্ষা করে চলেছে
প্রত্নতত্ত্ব, অতীত আর হলদে ঘাসে মায়া লেগে আছে।
দেখতে দেখতে বুদ্ধ, শুনতে শুনতে শিষ্য হয়ে উঠি।
সম্মুখে উপদেষ্টা বুদ্ধ আর আমরা তাঁর পদতলে বসে
এই ভাবতে ভাবতে জীবনের পাঠ শিখছি
পৃথিবীর কাছে ছড়িয়ে পড়া কী দুঃসহ কাজ!
পলাতক নই। চরণিক মাত্র। ফেরাটা নিশ্চিত।
তাই গায়ে প্রাচীন গন্ধ নিয়ে ফিরতেই হয়।
সারনাথ, বুদ্ধ, চড়াই, টিয়া, প্রত্নতত্ত্ব, অশোকচক্র
সব ফিরে আসে হলুদ বনে বাঘের ছায়ার মতো
একদা সত্যি অথচ স্বপ্নঘোর হয়ে।
কবিতার জন্য
মৃত্যুহীন কবিতাগুলি ভেসে আসে ভোরের কুয়াশা হয়ে
যার ভেতর ঘুমিয়ে থাকি বুদ্ধের মতো
নশ্বর জীবনের ছাইটুকু ফেলে রেখে।
প্রিয় কবির অদেখা মুখে পাক খায় চাঁদের পিপাসা
আমি কি তার প্রথম পাঠিকা!—এই কল্পনায়
চোখের কোটরে ভরে যায় কত না ঘুমহীন খেলা।
আমার অপ্রতিহত দুঃখ বাসরে বারংবার
কবিতাই হয়ে ওঠে পথ্য আর কবি বৈদ্য।
না-দেখা স্পর্শহীন সেই কবির হৃদয়সঞ্জাত সুর
চেতনাময় রাতে সম্মোহন রেখে দেয় দুই চোখ জুড়ে।
পাতায় ফুটে থাকা কবির জখমে যখন হাত বুলিয়ে দিই
সে-জখম কি আমারও জখম হয়ে ওঠে না!
কবি আমার দিদার মতো শীতের ছাদে অক্ষরে অক্ষরে
নরম বুকে এঁকে দেয় যখন নকশিকাঁথার ফুল পাখি
পচে যাওয়া সময়ের পুতিগন্ধ দূরে রেখে
বিশুদ্ধ মৌতাত কি এনে দেয় না?
কবির কখনও মৃত্যু নেই, কবিতাও তুলসীতলার প্রদীপ
তাই মৃত্যুদাগ না-লাগা কবিতাগুলি এভাবেই
বসত করে যায় শূন্যের ভেতর অসংখ্য ঢেউ নিয়ে
একটা জীবন যার কাছে ধার করেই কাটিয়ে ফেলা যায়।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
মরণের ওপার হতে
একটি দৃশ্যই বারবার দৃশ্যমান ওই হাওয়ায়
চমৎকার ছবির মতো ফুটে উঠবে আমাদের ভ্রমণ।
এমন তো কথা ছিল না শ্যাম
ভ্রমণক্ষেত্র বধ্যভূমি হয়ে যাবে?
হাত থেকে খসে পড়বে কামড়ে খাওয়া শেষ আপেল
চোখ থেকে মুছে যাবে সবুজ দৃষ্টি!
আমাদের বয়ে নিয়ে যাওয়া হবে পরিজনের কাছে
আর একটি সুখের ছবিই উলটেপালটে দেখে যাবে
একমাত্র জীবিত সন্তানেরা।
দূরের পাইন ফরেস্টের বুনো গন্ধ তখনও ছড়াবে
তখনও জলের প্রপাত হাহাকার করে
ডেকে যাবে আমাদের অস্থিতে,
মজ্জায় রেখে যাবে শেষ হাসির খেয়া।
ওরা মারল আমরা বেঘোরে মরলাম
আমরা শহিদ নই, আমরা যুদ্ধ করিনি
আমরা ভ্রমণে বেরিয়ে বুলেট খেয়েছি দামামায়
তার পরেও নীতিহীন পেশাদারিত্ব দিয়ে কী সুন্দর
আমরা মুড়ে ফেলতে পেরেছি নগর জীবনকে!
আহা দুঃখ!
সিঁদুরের খেলা রূপে এস , ছিন্ন করো শরীর।
একটিই দৃশ্য দেখে যাবে দেশ
আমাদের ভ্রমণ সাঙ্গ হবে না কোনোদিন
মুখে বরফ জমা হতে থাকবে
অতৃপ্ত শেষ চুম্বনে।
যাজ্ঞসেনী
কীভাবে দুঃখ মোছাব তোমার!
শুধু চিত হয়ে ভেসে থেকেছি তোমার বুকে
সেখানে দুঃখ দেখিনি কোনোদিন,
কেবল প্রেম থইথই করেছে বৃষ্টির।
সাঁকো ভেঙে দিল আমাদের ধর্ম
ভাষার দোহাই দিয়ে ঢেকে দিল সংস্কৃতি।
বিবেক ধ্বংস হয়ে গেলে
ধ্বজা ভেঙে যায় চৈতন্যের
কাদা পাঁক আর নর্দমায় কীট হয়ে আয়ু খায়
একজন ঈশ্বরকে স্বর্গ থেকে পেড়ে এনে বিধান দেয়,
আর তোমার প্রেম মুছিয়ে দিয়ে দুঃখের ভার বসায়।
কীভাবে আবার দুঃখ মোছাব বলো
তোমার অশ্রু যে আমারই রক্ত
আমার বুক তো তোমারই যাবতীয় সঞ্চয়
ওরা ভেঙে দিল সেই বুক, সেই আমানত
কীভাবে দুঃখ মোছাব বলো?
যে দুঃখ আমাকেও ভেঙে দেয় কৌরব সভায়
দুই হাত দিয়ে শরীর ঢেকে রাখি একবস্ত্র রজঃস্বলা।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।