প্রবল বন্যার মুখে এক দরিদ্র পরিবারের টিকে থাকার লড়াই, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের দিনরাতের গল্প ‘বান’। এই গল্পে উঠে আসে গ্রামীণ জীবনের কঠিন বাস্তব, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর বেঁচে থাকার মরিয়া সংগ্রামের হৃদয়স্পর্শী ছবি। কেতাব-ই ব্লগজিনে ‘জেলার সাহিত্য’ বিভাগে আজ প্রকাশিত হল আলিপুরদুয়ার জেলার গদ্যকার ওয়াহিদার হোসেন-এর গল্প।
তাহালে কোঠে পাওয়া যাবে স্টোভ?
আছে কুনোঠে।
কোঠে?
রেজ্জাকের বাড়িত্।
রেজ্জাকের স্টোভ চলে না।
চলে? না চললে কী হোবে?
কি হোবে নাহয়? মানে চলের নাগিবে না চালালে। ময়নারঠে আছে আনো?
ঝড়িত যাম্?
ঝড়ি ছাড়া উপায় নাই। মাটি ভুসরিয়া পড়েছে। আর পানি উঠিলে মুশকিল। রাতিত কী হোবে? চুলাগিলা সব শেষ।
দাঁড়া। আনেছো।
মাই তুই বইস।
বিছানায় সাত বছরের শিশুটি খেলা দিচ্ছে তার তিন বছরের ছোটো ভাইকে। এদিকে পানি অনেকটাই উঠেছে। সারারাত ধরে নাগাড়ে বৃষ্টি হওয়ায় জাম্পোইয়ের পানি ঘরে ঢুকে পড়েছে। এদিকে বেলা হচ্ছে। ভাত চড়াতে হবে। রান্নাঘরে চেরা ঢুকে পড়েছে। নুটি পিঁপড়া ঢুকছে লাইন দিয়ে। উপরে রেলগাড়ির মতো সরু স্রোত। পা পড়লেই কামড়াচ্ছে। কাঁচা সিঞ্জার চাটির ঘরে ধারিগুলো ভেঙে পড়ছে। থপ থপ করে লাফিয়ে ব্যাঙগুলো ঢুকে পড়ছে ঘরে। চুলাগুলো কাদা কাদা হয়ে গেছে ভিজে। ভাগ্যিস রাতে বাসন মেজে রাখা হয়েছে। ছাপড়ার ছাদে বালতি রেখে ডিস গামলা রেখে পানি সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে হাতধোয়া আর বাসন ভাড়া ধোয়া পাখলা করার ব্যবস্থা করেছে নুরজাহান। নুরজাহানের জাহান বলতে গেলে স্বামী মফিয়ার। বড়ো মেয়ে পাম্পি আর তিন বছরের ছোটো ছেলে রবিউল। রবিউল ছাপড়া ঘরের চৌকিতে বসে শুয়ে আছে আর পাম্পি খেলা দিচ্ছে। নুরজাহান একটু আগেও ওকে দুধ খাইয়েছে। গোয়াল ঘরের গোরুগুলোকে খড় খেতে দিয়েছে ময়নাদের বাড়ি থেকে এনে। দুটো গাই গোরু। একটা বাছুর। এদেরকে এখন গলিঘর থেকে শিফট করা হয়েছে দেওর মতিয়ারের নির্মীয়মান পাকাঘরের মেঝেতে। যেটা কিনা একটু উঁচু। গোরুগুলো নিশ্চিন্তে খড় খেয়ে যাচ্ছে। তাদের দিন দুনিয়া নেই। অবলা বলেই হয়তো। খেতে দিলেই খুশি। মতিয়ারের বউ ময়নার ঘর থেকে স্টোভ নিয়ে আসে মফিয়ার। ভাসুর। মতিয়ার টনিজাল নিয়ে এগিয়ে গেছে জাম্পোইয়ের দিকে। টেমাই দেওয়া ছিলো গতকাল রাতে। ভোরে গিয়ে দেখে একটা বড়ো ডারাইস সাপ ভেতরে ঢুকে আছে। অত ছোটে ফুটো দিয়ে কি করে ঢুকেছে? সাপটাকে অনেক জেদ্দোজহোত করে বের করে নিয়ে আসে। সব মাছ খেয়ে শালা সাপটা আর বের হতে পারেনি।
স্টোভে রান্না হচ্ছে ভাত। খোকরা ভাত যেটুকু ছিল সেটা খেয়েছে পাম্পি। যদিও সে গরম ভাত ছাড়া কিছু খেতে চায় না। নুরজাহান বাচ্চাকে দিতেও চায় না। কিন্তু কী করা যাবে?
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
মফিয়ার লুঙ্গি দোপোন্দা করে পরে। পুরানা কালো রঙের ছাতা নিয়ে বের হয়। পঞ্চায়েতের বাড়িত নাকি রিলিফ দেওয়া হচে। মুই আগানু বলে বেরিয়ে পড়ে মফিয়ার। খবর নেওয়া দরকার। মতিয়ার সেই সেলায় গেইছে আর খবর নাই চ্যাংরাটার। বাপ মা মরা দুইভাই। একসঙ্গে থাকে। একই ভিটায়। তিরপাল একখান যদি পাওয়া যায় আরও ভালো। মতিয়ারের একখান তো দেওয়া হইছে গোরুগুলোর উপর। যাতে না ভিজে।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সেই পঞ্চায়েতের বাড়ির সামনে গিয়ে খাড়া হয়। সফিয়ার পঞ্চায়েতের বাড়িতে বিরাট ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে প্যাচপেচে কাদা পায়ে হাতে মেখে লাইন এগিয়ে গেছে। কাউকে তিরপাল দেওয়া হচ্ছে। কাউকে রিলিফ। রিলিফ মানে কি? ছোটোবেলা থেকে মফিয়ার দেখে আসছে বন্যায় রিলিফ দেওয়া হয়। রিলিফ চিড়া আর মিঠাই। চিড়া, মিঠাই প্লাস্টিকের প্যাকেটে নিয়ে বাড়ি ফেরে। ফেরার রাস্তায় দেখে দু-দিকের ধানখেত ডুবে গেছে। গাছগুলোর কোমর ডুবে গেছে। ঢেইয়ের মতো মাথাগুলো বের করে আছে উঁচু দুয়েকটি জমির ধানগুলো। ম্যাসমার হয়ে গেছে ছোটো ছোটো গাছগুলো। পুকুর থেকে জাম্পোই থেকে পানির ঘ্রাণ আসছে। খেজুর গাছ গামারি নিম মান্ডাল গাছগুলো ভীতসন্ত্রস্ত এদিক-ওদিকে চাইছে। আকাশ আবারও কালো হয়ে আসছে। কেউ কেউ ছাতা নিয়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে। চপ্পল গুটিয়ে বগলে জড়িয়ে নিজেকে সার্কাসের ট্রাপিজ খেলার মেয়েদের মতো নিজেদের পিছলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় থমকে থমকে যাচ্ছে। ধীর হয়ে আসছে গতি। ফলে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেল।
রাস্তায় দেখা হল ধনেশ রায়ের সঙ্গে। পঞ্চায়েতের বাড়ি থেকে ফিরছে।
কী রে ধনেশদা কী খবর?
আর কী কোইম? যা অবস্থা।
ধনেশের সাদা গেঞ্জি প্রায় ভিজে চুপসে গেছে গায়ের সঙ্গে। ছাতা মাথায় নিভৃতে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে মাথাহীন দুই যুবকের কথোপকথন দেখতে পাচ্ছে বর্ষার আকাশ।
নদীর খবর কী?
ভালো না।
বান আসিবে?
আসিয়ার পারে। জল ঢুইকলে টের পাবু।
কইস কি?
হ্যাঁ।
আচ্ছা বাড়ি যাং।
ঠিক আছে দাদা। আগানু।
ধনেশ চলে গেলে মফিয়ার আরেকবার ছাতা তুলে আকাশের দিকে তাকায়। নিজেকেই বলে ওঠে কী যে হোবে? আল্লাহ বারে।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল মফিয়ার। হঠাৎই মতিয়ারের ডাকে ওর ঘুম ভাঙে।
কী হইসে? ডাকাইস ক্যানে?
দাদা উঠ্, তাড়াতাড়ি আগেয়ার নাগিবে।
তা হইসে কী?
আরে তুই ঘুমা। মুজনাইয়ের দুধিয়া বানা ঢুকিসে। দেখ বেরে চাইরপাশ।
উদ্বেগে নুরজাহানকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে আসে মফিয়ার। এক পলকেই বুঝতে পারে।
আরে এইলা দুধিয়া বানা।
সেইটায় তো কও তোক।
নুরজাহান ছাওয়ালাক ওঠা।
ওঠাও।
ধড়ফড় করে সবাই সচকিত হয়ে ওঠে।
ময়নার কোলে রবিউল আর পাম্পি হাত ধরে মফিয়ারের। মতিয়ার গোরুগুলোকে বেঁধে দেয় পাকা ঘরে। চোখ মুছে এক দৌড়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। নুরজাহানের হাতে ভোটার কার্ড। পাম্পির ক্লাস ওয়ানের বই। ঘরের দুটো চাবি। মফিয়ার পাগলের মতো দু-দিকে তাকায়। কাঁচা রাস্তা। অন্ধকার। সাইলের গাছগুলো দু-দিকে। ভয়ার্ত আকাশ। গাছ। পাতালে সেঁধিয়ে পড়া খেজুরগাছ। সন্ধ্যার অন্ধকারে লন্ঠনের আলোয় সামনে দেখা যায় মুজনাইয়ের দুধিয়া বানা। আর কিছু নাই। কোনো জন্তুজানোয়ার মানসি দুনষি কিচ্ছু নাই। বাঁশের গাছ সাক্ষী। গামারি সাক্ষী। মান্ডাল সাক্ষী। এরাই রাস্তা চেনায়। খয়েরবাড়ির মাঠঘাট আকাশ নদী সব কিছুই জুড়ে মুজনাইয়ের দুধিয়া বানা। একজন আরেকজনের হাত ধরে এগোতে থাকে সূদুরে পঞ্চায়েতের প্লাংকিন ঘরের দিকে।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।