preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
পাঠপ্রতিক্রিয়া প্রতিযোগিতা: আটটি অবসাদের গল্প
রিভিউ

পাঠপ্রতিক্রিয়া প্রতিযোগিতা: আটটি অবসাদের গল্প

গৌতম চক্রবর্তীর ‘আটটি অবসাদের গল্প’-র পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখেছেন তপন মিত্র। কেতাব-ই পাঠপ্রতিক্রিয়া প্রতিযোগিতার তৃতীয় স্থানাধিকারী এই পাঠপ্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হল কেতাব-ই ব্লগে।

“নিরলস শব্দপ্রবাহ তাকে ক্লান্ত করে। মাঝে মাঝে কেবল বহু স্বর ও ধ্বনির ভেতর থেকে উঠে আসা আধমরা বেড়াল ছানার কাতরানি সে আলাদা করে চিনতে পারে”। — এইভাবে শুরু হয় গৌতম চক্রবর্তীর এই গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘আমাদের একজন’। অতঃপর স্পষ্ট হতে থাকে ‘সরু গলিতে সদ্য ফেলা আবর্জনার দিকে’ তাকানো কাকের ডাক, ‘কাজের বউ কাজে না আসায় গজগজ’ করা একটা চেনা স্বর, বোমা পড়ার শব্দ, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক, আরশোলাদের খসখসানি, মশাদের পিনপিন শব্দ। তারপর দৃশ্যাবলির জন্ম হয় — হালকা হলুদ রঙের দেওয়াল বেয়ে মাকড়সা ও কালো পিঁপড়েরা নিচে নামে, রক্তাক্ত বেড়ালছানাটা ঘরের এক কোণ থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তার দিকে এগোয়, পাশের ঘরের মানুষটা হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে, গজগজ করা মেয়েমানুষটি তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। অতঃপর পরিক্রমা শুরু হয় — স্মৃতির ভিতর দিয়ে, বিস্মৃতির ভিতর দিয়ে, যৌনতার ভিতর দিয়ে, অবচেতনের ভিতর দিয়ে, অবসাদের ভিতর দিয়ে। অবশেষে সে পরিক্রমা শেষ হয় এক পরিত্রাণহীন পরিণতিতে — “সে চোখ বুজে, হাত দিয়ে মাথার পেছন চেপে ধরে, উপুড় হয়ে খানিকক্ষণ শুয়ে থাকে আর তারপর উঠে বসে। তারপর দু-হাতের কবজির কাছ দিয়ে জেগে থাকা নীল শিরা যত্ন সহকারে কাটতে শুরু করে”।

এই গল্পগ্রন্থের বাকি গল্পগুলিও এই রকমই এক নিরুপায় পরিত্রাণহীন পরিণতিতে পৌঁছানোর যাত্রাপথের গল্প।

‘স্ক্রিপ্ট’ গল্পে ল্যাপটপে লিখে রাখা স্ক্রিপ্ট বাস্তবে নির্মিত হতে থাকে আর অসহায় সুতপা সেই পূর্ব-লিখিত স্ক্রিপ্টের ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে, এবং অবশেষে “সরু রড রেলিং-এ মারতে মারতে ঝড়ের গতিতে কেউ উঠে আসছে বোঝা যায়। আবার কলিং বেল বেজে ওঠে আর বাইরে থেকে দরজা খোলার শব্দ হয়। অন্ধকারের মধ্যে সুতপা বলে ওঠে, কে?”

‘মুখাবয়ব: একটা সময়ের বিবরণ’ গল্পে নামহীন চরিত্রটি বাড়ি ভাড়া খুঁজতে গিয়ে দেয়ালের গায়ে ‘হলদেটে সেলোটেপের ছোটো ছোটো চারটে টুকরো চার কোণায় লাগিয়ে মেঝে থেকে মোটামুটি সাড়ে পাঁচ ফুট ওপরে আটকে রাখা’ এ ফোর সাইজের কাগজে আঁকা ‘মাঝবয়সি এক মানুষের মুখ’-এর ছবি দেখতে পায়। এবং “আবার তার হাঁটা শুরু হয়। ... বছরের পর পর বছর ধরে হাঁটার স্মৃতির ওপর ভর করে সে ক্রমানুসারে পা ফেলতে থাকে”। এই পথ-পরিক্রমা শেষে ... আবার শুরু হয় তার বিড়বিড়ানি। “আটাশটা বাড়ি হবে উনতিরিশ, তারপর তিরিশ... তারপর... আমি জানি! আমি জানি! অন্ধকারে চারপাশে সে তার নিজের কথার কোরাস শুনতে পায়”।

‘অয়ন শর্বরীর কোনো একটা দিন’, ‘আবর্ত’, ‘রোহনের যে সব কথা কেউ কেউ জানে’, ‘হলুদ সমুদ্র’ — এই চারটি গল্প তথ্যপ্রযুক্তি অর্থাৎ আই.টি. প্রফেশনাল দের নিষ্প্রাণ জীবনের গল্প। এবং এই গল্পগুলিও আদতে সেই পরিত্রাণহীন পরিণতিতেই পৌঁছায় — “শাটল গাড়িটা অন্য গাড়িদের পাশ কাটিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলে” (অয়ন শর্বরীর কোনো একটা দিন)। “সীমান্ত লম্বা লম্বা পা ফেলে ডেভকে অনুসরণ করে” (আবর্ত)। “পৌলমীর সরু সরু আঙুলগুলো আলতো করে ধরে, আমি তার অবয়ব ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত তাকানোর চেষ্টা করি। মুখে বলি, ‘রাইট নাউ আই ডোন্ট হ্যাভ আ জব’।” (হলুদ সমুদ্র)।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

এই গল্পগ্রন্থের সব থেকে তীক্ষ্ণ গল্প ‘বাবা মেয়ের দিনকাল’। মেয়ের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা বাবা আর বাবার কাছে গল্প শুনতে চাওয়া মেয়ে। এই গল্পে মা-ও আছে— ... আড়চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকালেই দেখতে পেত মরা মাছের মতন চোখ খুলে মা তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই মা দাঁতে দাঁত চিপে বলে উঠত, “চুপচাপ শুয়ে থাক। নইলে গলা টিপে শেষ করে দেব”। সে মায়ের কথা শুনত। আছেন ঠাকুমাও। “ঠাকুমার মাথার লক্ষ লক্ষ কালো সাদা কোঁকড়ানো চুল, লক্ষ লক্ষ সাপের ফণার মতন তার ধিকিধিকি আগুনের মতন লাল হতে থাকা মুখের উপর দুলতে থাকে। ... বাবাকে ইশারায় ডেকে তার হাত শক্ত করে ধরে মাটির থেকে একবারের জন্যও চোখ না তুলে ঠাকুমার সামনে দিয়ে হন্তদন্ত ভাবে সে বেরিয়ে যায়”। তাই মেয়েকে যখন বাবা গল্প বলতে যায় তখন “সারাটা সকাল, সারাটা দুপুর, সারাটা বিকেল, সারাটা দিন, পেরিয়ে আসা সারাটা মাস, সারাটা বছর ধরে জমে ওঠা উৎকণ্ঠা, জ্বালা আর যন্ত্রণা তার শরীরকে অবসাদগ্রস্ত করে তুলতে চায়। আরও গভীর এক ক্লান্তির ভিতরে সে ডুবতে শুরু করে”। ধ্বস্ত সম্পর্কের এই গল্পে বাবার চোখে পড়ে “মেয়ের শুয়ে থাকা বক্স খাটের ধারে জায়গায় জায়গায় বেরিয়ে এসেছে ছত্রাক।... মাস ছয়েক আগেও, বাজার থেকে নাইলন দড়ি কিনে আনার আগে এপাশটায় সে শুত”। আর কোনো এক পাগল ছড়া কেটে যায় — “পাঁচ...চার...তিন...দুই...এক। বাবাও নেই...মাও নেই...বউও নেই...আমিও নেই...মেয়েও নেই। গোটা ফ্যামিলি একেবারে ভ্যানিশ। পুরো ম্যাজিক”।

বিশ্বায়িত ও যন্ত্রতাড়িত এই উদ্ভট সময়ে, কর্পোরেট ও সরকারি— উভয়বিধ ফাজলামিতে ধ্বস্ত, বিপন্ন, অনিশ্চয়তা আর অসহায়তায় তাড়িত ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব অথবা অনস্তিত্ব তুলে আনতে গিয়ে গৌতম গল্পগুলিতে নিয়ে আসেন এক ক্লিন্ন, ক্লিষ্ট, অস্বস্তিকর আবহ। “হলুদ রঙের তলায় বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা লাল ইটের পাঁজরগুলো কালো পিঁপড়েদের চোখে পড়ে। তারা বিশৃঙ্খলভাবে সেদিকে ধেয়ে যায়।তাদের চিহ্নিত পথে মাকড়সারা এগোয় আর একসময় দেয়ালগুলোর শরীরে মিশে যায়। বেড়ালছানাটা কতকটা অস্থির ভাবে ঘরের ভেতর টাল খেতে খেতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়তে থাকে আর এদিক-ওদিক ঠোক্কর খায়। হামাগুড়ি দেওয়া মানুষটা উঠে দাঁড়ায় আর বেড়ালছানাটার পেটে কষিয়ে লাথি মারে” (আমাদের একজন)। “কয়েকদিন বাদে এরকমই আর একটা দিনে বাবার কোলে চড়ে দেয়ালে আংটা দিয়ে লাগানো টুথপেস্ট আর টুথব্রাশ রাখার দানির ভিতর মেয়ে আবিষ্কার করে পাথরের মতন শক্ত হয়ে যাওয়া মরা টিকটিকিটাকে। বাবা শান্ত ভাবে কোল থেকে তাকে নামিয়ে টিকটিকিটাকে লেজের দিক থেকে ধরে বাড়ির পেছনের জলা জমিতে উদাসীন ভাবে ছুড়ে ফেলে” (বাবা মেয়ের দিনকাল)। “ময়লা দেয়ালের গা আঁচড়ে আঁচড়ে কাঠের রঙ পেনসিল দিয়ে করা নানান আঁকিবুকি, অথবা কোনো বাচ্চার পেনসিল দিয়ে দেয়ালের শরীরে আঁকা ভুলে ভরা ইন্ডিয়ার ম্যাপ, ঝাঁট না পড়া মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা পেনসিল, হারিয়ে যাওয়া কলমের ঢাকনা, দোমড়ানো বেওয়ারিশ এটিএম কার্ড, কিছুটা দূরে ঘরের কোণ ঘেঁষে মেঝের চ্যাটচেটে গায়ে লেপ্টে থাকা প্লাস্টিক ব্যাগ, ছেঁড়া ময়লা কাপড়ের টুকরো” (মুখাবয়ব: একটা সময়ের বিবরণ)। “পাশের ঘরের কয়েকদিন আগের মেরামত হওয়া, এখন বন্ধ না করা সেকেন্ড হ্যান্ড এসিটার মৃদু অথচ বিশ্রী ঘড়ঘড় শব্দ; বেসিনের প্যাঁচ কাটা কল পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায়, সেখান থেকে তিরতির করে পড়ে চলা জলের শব্দ; গত কয়েক মিনিটে, গত কয়েকদিনের মতন মোবাইলে একই রকম ভাবে গুটিকতক অফার ও চলতে থাকা লোনের বাকি পড়া ইএমআইয়ের এসএমএস ও খানদুয়েক ন্যাকা বোকা গুড মর্নিং মেসেজ ঢুকবার শব্দ তাকে ভেতরে ভেতরে অস্থির করে তোলে” (অয়ন শর্বরীর কোনো একটা দিন)। “কোনো রোগগ্রস্ত, কদাকার, প্রসবাসন্ন পেটের মতন হলুদ ঢেউ হাজারে হাজারে পাড়ে এসে প্রসব বেদনায় চিৎকার করে মাথা কুটে মরে। আমি ধীরে ধীরে চিত হয়ে শুয়ে পড়ি” (হলুদ সমুদ্র)। এবং এই একঘেয়ে অস্বস্তিকর ক্লেদাক্ত আবহের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ‘আমাদের একজন’ আমরা এক এক জন হয়ে উঠে অবসাদে ডুবে যেতে থাকি।

এই সময় এবং সময়জনিত অবসাদ সম্ভবত শেষ সত্য নয়, কিন্তু একে চিনে নেওয়া জরুরি। গৌতম সেই চিনিয়ে দেওয়ার কাজটা সফল ভাবে করেছেন।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই, ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

মন্তব্য করুন

লেখক

জন্ম- ১৯৬২, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কেলোমাল নামক গ্রামে। শিক্ষা- স্নাতক। পেশায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মী, এখন অবসরপ্রাপ্ত। সামান্য কিছু লেখালেখি করলেও মূলত পাঠক।

অন্যান্য লেখা

দেখতে পারেন