এই মাস থেকে কেতাব-ই ব্লগজিনে শুরু হল ‘জেলার সাহিত্য’ নামের এক বিশেষ আয়োজন। যার মূল উদ্দেশ্য পাঠককে বিভিন্ন জেলার নতুন ও পুরনো লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন জেলার ভিন্ন স্বরকে একত্রিত করে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক রূপনির্মাণ। আমাদের প্রথম নির্বাচিত জেলাগুলি হল দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, এবং কোচবিহার। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে আমরা প্রকাশ করব এই পাঁচ জেলার সাহিত্য। আজ প্রকাশিত হল জলপাইগুড়ির কবি ও গদ্যকার পিনাকি রঞ্জন পালের-এর গল্প ‘ভোরের অপেক্ষায়’।
জলপাইগুড়ির ডুয়ার্স অঞ্চল। শীতের রাত এখানে যেন এক হিমশীতল চাদরে মুড়ে রাখে চারপাশ। ঘন কুয়াশায় ঢাকা ‘সবুজপাতা চা বাগান’-এর মুনশি লাইনের শ্রমিক বস্তিটা রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই এক গভীর, অশুভ নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। দিনেরবেলা যে বাগান সবুজ পাতার জাদুতে চোখ জুড়িয়ে দেয়, রাতের অন্ধকারে সেই একই বাগান রূপ নেয় এক বিশাল, রহস্যময় গোলকধাঁধার। দূরে কোথাও রাতজাগা পাখির ডাক আর চা-গাছের পাতা চিরে বয়ে যাওয়া উত্তুরে হাওয়া র শোঁ-শোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
সেই বস্তিরই এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটা আধভাঙা, জরাজীর্ণ কোয়ার্টার। বাড়ি বলা ভুল, বরং বলা ভালো ইট আর টিনের এক ভগ্নপ্রায় কাঠামো। চারপাশের দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে বহু আগেই, বেরিয়ে রয়েছে কঙ্কালের মতো ইট। এই বাড়িরই একটা স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার ঘরে ছেঁড়া, পাতলা একটা কম্বলের তলায় একে অপরের শরীরের ওমটুকু সম্বল করে জড়সড়ো হয়ে শুয়ে আছে চারটে প্রাণ।
“দাদা... রাতে দেওয়াল টপকে কেউ যদি ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন আমাদের কী অবস্থা হবে বলো তো?”
অন্ধকারের বুক চিরে ফিশফিশ করে কথাগুলো বলে উঠল সাত বছরের ছোট্ট আরিয়ান। তার গলা কাঁপছে। ভয়ে গোল গোল হয়ে আছে বড়ো বড়ো দুটো চোখ, যা অন্ধকারেও স্পষ্ট বোঝা যায়।
বারো বছরের বিকাশ ছোটো ভাইয়ের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। সংসারের বর্তমান ‘মাথা’ বা অভিভাবক সে-ই। কিন্তু এই হাড়কাঁপানো শীতে আর ঘুটঘুটে অন্ধকারে তার নিজের বুকেও যে আতঙ্কের হিমস্রোত বয়ে যাচ্ছে, তা সে কাউকে বুঝতে দিতে চায় না। সে জানে, এই ভাঙাচোরা বাড়িটাকে সে নিজেও ভীষণ ভয় পায়। দরজার পাল্লাটা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। ছিটকিনিটা কবেই জং ধরে খসে পড়েছে। একটা মরচে পড়া তার দিয়ে দরজার দুটো পাল্লা কোনোমতে বেঁধে রাখা হয়েছে মাত্র। বাইরে থেকে একটু জোরে ধাক্কা দিলেই হুড়মুড়িয়ে খুলে পড়বে দরজাটা।
বিকাশ নিজের ভয়টা লুকিয়ে রেখে শান্ত গলায় বলে, “ভয় পাস না আরিয়ান, আমি তো আছি। আর দিদিরাও তো আছে। কেউ আসবে না।”
বিকাশের দুই পাশে শুয়ে আছে তার দুই দিদি, রিয়া আর প্রিয়া। অভাব আর আতঙ্কের এই অন্ধকারে তারাও যেন বয়সের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে গেছে। রিয়া আরিয়ানকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে ফিশফিশ করে বলে, “চোখ বন্ধ কর ভাই, সকাল হয়ে এল বলে।”
কিন্তু ঘুম কি আর সহজে আসে? এই বয়সে যেখানে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেখানে বিকাশের কাঁধে এখন তিন ভাই-বোনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে বিকাশের মনে পড়ে যায় সেই অতীত, যা আজকের এই রাতের থেকেও বেশি অন্ধকার।
পাঁচ বছর আগের কথা। তখন আরিয়ান তো একেবারেই কোলের শিশু। বিকাশ নিজেও খুব ছোটো। বাবা মারা যাওয়ার দিনের স্মৃতিটা আজ আর খুব একটা স্পষ্ট নয় বিকাশের কাছে। শুধু মনে আছে, উঠোনে অনেক মানুষের ভিড়, আর বাতাসে একটা চাপা কান্নার শব্দ। বাবার মৃত্যুর পর ভেবেছিল, অন্তত মায়ের আঁচলের তলায় মাথা গুঁজে দিনগুলো কেটে যাবে। কিন্তু নিয়তির হয়তো অন্য কিছুই পরিকল্পনা ছিল। তিন বছর আগে, এক কুয়াশা ঢাকা ভোরে মা তাদের চারজনকে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেলে রেখে কোথায় যেন চলে গেল। আর কোনোদিন ফেরেনি।
সেই দিনটার কথা মনে পড়লে আজও বিকাশের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মা কোথায় গেল, কেন গেল, সে-উত্তর আজও তাদের অজানা। সেই থেকে শুরু হয়েছে এই চার নাবালকের একার লড়াই। তাদের নিজেদের মধ্যে ভালোবাসার টান রক্তের সম্পর্কের থেকেও যেন আরও গভীরে শেকড় গেড়েছে। তারা জানে, এই পৃথিবীতে তাদের চারজন ছাড়া আর কেউ নেই।
হঠাৎ... বাইরের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা শব্দ হল।
খড়মড়... খড়মড়...
চা-বাগানের শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কেউ যেন হেঁটে আসছে। পা ফেলার শব্দগুলো খুব সন্তর্পণে, কিন্তু স্পষ্ট। চার ভাই-বোনের শ্বাস যেন আটকে গেল এক লহমায়। বিকাশ কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, শব্দটা ক্রমশ তাদের ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছে।
আরিয়ান বিকাশের হাতটা শক্ত করে খামচে ধরল। প্রিয়া আর রিয়া একে অপরের হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
পদশব্দটা এবার একদম তাদের ভাঙা দরজার ওপাশে এসে থামল।
বিকাশের মনে হল তার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে উঠে এসেছে। সে অন্ধকারে হাতড়ে পাশে রাখা পুরোনো, মরচে পড়া দা-এর বাঁটটা শক্ত করে ধরল। সে জানে, এই বয়সে সে কোনো পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাথে পেরে উঠবে না, কিন্তু ভাই-বোনদের গায়ে আঁচড় লাগার আগে তাকে পেরোতে হবে।
বাইরে এক ভারী নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কেউ একজন দরজার ঠিক ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে আসা ফ্যাকাশে জ্যোৎস্নার আলোটা হঠাৎ একটা কালো ছায়ায় ঢেকে গেল। লোকটা, বা যা-ই হোক-না-কেন, দরজার পাল্লায় হাত রেখেছে।
ক্যাঁচ...
জং ধরা কবজাটা একটা বিশ্রী শব্দ করে উঠল। তার দিয়ে বাঁধা পাল্লাটা সামান্য ফাঁক হলো। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া সাপের মতো হিসহিস করে ঘরে ঢুকল। বিকাশ দা-টা উঁচিয়ে ধরে নিশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে একটা ছায়া দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি মারার চেষ্টা করছে।
“কে... কে ওখানে?”—বিকাশের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না, শুধু একটা অস্ফুট গোঙানি শোনা গেল।
হঠাৎ বাইরে থেকে একটা চাপা গররর... শব্দ ভেসে এল। পরক্ষণেই একটা শেয়াল দরজার পাশ থেকে ছুটে চা-বাগানের অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল।
পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল। ছায়াটাও সরে গেল দরজার ওপাশ থেকে। আবার সেই ফ্যাকাশে জ্যোৎস্নার আলো ঘরে ঢুকল।
চার ভাই-বোন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেয়াল! হ্যাঁ, চা বাগানে শেয়াল বা বুনো শুয়োর প্রায়ই ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এই কয়েকটা মুহূর্ত তাদের কাছে যেন কয়েক যুগের মতো মনে হল।
বিকাশ দা-টা নামিয়ে রেখে হাঁপাতে লাগল। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে এই কনকনে শীতেও। সে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরে দেখল ছেলেটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।
“কিছু না রে... একটা শেয়াল ছিল”—বিকাশ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু সে জানে, আজ শেয়াল এসেছে, কাল যে কোনো মানুষ আসবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। এই ভাঙা দরজা আর জরাজীর্ণ দেওয়াল তাদের কোনো সুরক্ষাই দিতে পারবে না। রাত যত বাড়ে, তাদের মনের ভেতরের এই আতঙ্কটাও তত বড়ো হতে থাকে।
বাইরে হিমেল হাওয়া আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। ঘরের ভেতর চারটে প্রাণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল। তাদের চোখে ঘুম নেই। তারা শুধু অপেক্ষা করে আছে ভোরের। কারণ তারা জানে, সূর্য উঠলে এই ভৌতিক রাত আর চা বাগানের জমাটবাঁধা অন্ধকার কেটে যাবে। দিনের আলো তাদের অন্তত এই ভাঙা ঘরে একটা মিথ্যা নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। কাল সকাল হলে আবার বেঁচে থাকার নতুন লড়াই শুরু হবে।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
দুই
ভোরের প্রথম আলো যখন সবুজপাতা চা বাগানের কুয়াশার চাদর ভেদ করে মুনশি লাইনের শ্রমিক বস্তিতে এসে পড়ল, তখন রাতের সেই হাড়হিম করা আতঙ্কটা যেন একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে। ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে আসা একচিলতে রোদ বিকাশের চোখে পড়তেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল। সারা রাত ভালো করে ঘুম হয়নি। চোখের কোলে কালশিটে, কিন্তু তবুও দিনের আলো দেখে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। পাশে তাকিয়ে দেখল, আরিয়ান তখনও রিয়া আর প্রিয়ার মাঝে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বিকাশের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। রাতের অন্ধকার কাটলেও, দিনের আলো তাদের জীবনে যে খুব একটা স্বস্তি নিয়ে আসে, তা নয়। বরং সকাল হওয়া মানেই শুরু হয় এক নতুন লড়াই—ক্ষুধার লড়াই।
বিকাশ আস্তে করে উঠে ঘরের এককোণে থাকা মাটির উনুনটার কাছে গেল। উনুনটা ঠান্ডা, ছাইগুলো বাতাসে উড়ছে। গতকাল দুপুর থেকে সেখানে কোনো আগুন জ্বলেনি। ঘরের হাঁড়ি-কুঁড়ি সব ফাঁকা। একটা পুরোনো টিনের কৌটোয় যেটুকু চাল ছিল, তা কাল রাতেই শেষ হয়ে গেছে। শুধু একটু নুন আর কয়েকটা শুকনো লঙ্কা পড়ে আছে। পেটের ভেতরটা খিদের জ্বালায় মোচড় দিয়ে উঠছে বিকাশের, কিন্তু সে জানে এখন কাঁদার বা আক্ষেপ করার সময় নেই।
সে বাইরে বেরিয়ে এল। শীতের সকালের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া শরীরটাকে কাঁপিয়ে দিল। চা বাগানের চারপাশটা এখন কর্মচঞ্চল হতে শুরু করেছে। শ্রমিকরা পিঠে ঝুড়ি বেঁধে পাতা তোলার জন্য কারখানার দিকে বা নির্দিষ্ট সেকশনের দিকে পা বাড়াচ্ছে। বিকাশদের বাড়ির ঠিক উলটোদিকেই থাকে তার কাকু আর কাকিমা—দূরসম্পর্কের আত্মীয়। বিকাশ দেখল, কাকিমা মাথায় একটা গামছা বেঁধে, হাতে কাস্তে নিয়ে জঙ্গল থেকে ঘাস কাটার জন্য বেরোচ্ছেন।
“কাকিমা...”—বিকাশ একটু দ্বিধাগ্রস্ত গলায় ডাকল।
কাকিমা থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে-মুখে রাজ্যের ক্লান্তি। এই হাড়ভাঙা খাটুনির জীবনে নিজেদের পেট চালানোই যেখানে দায়, সেখানে চারটে অনাথ বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া তাঁদের পক্ষেও সম্ভব নয়। কাকিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী রে বিকাশ, উঠে পড়েছিস? আমরা তো কাজে যাচ্ছি রে বাবা। ফিরতে সেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। দুপুরে তো কেউ বাড়িতে থাকব না। তোরা বরং একটু তাড়াতাড়ি স্কুলে চলে যাস। ওখানে তো খাবার দেবে।”
বিকাশ মাথা নেড়ে সায় দিল। সে জানে, এই জগতে কেউ কারও নয়। কাকিমার কোনো দোষ নেই। নিজেদের লড়াইটা নিজেদেরই লড়তে হবে। কাকিমা হনহন করে চা বাগানের সরু রাস্তা ধরে মিলিয়ে গেলেন। বিকাশ ঘরে ফিরে এসে ভাই-বোনেদের ডেকে তুলল।
“ওঠ আরিয়ান, দিদি... ওঠ। স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।”
ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত শরীরে স্কুল যাওয়ার উৎসাহ খুব একটা থাকে না, কিন্তু এই চার ভাই-বোনের কাছে স্কুলটা শুধু অক্ষর পরিচয়ের জায়গা নয়, স্কুল হল তাদের বেঁচে থাকার প্রধান রসদ। রিয়া আর প্রিয়া কোনোমতে ছেঁড়া, পুরোনো জামাগুলো পরে নিল। আরিয়ানের স্কুলের প্যান্টটার বোতাম নেই, একটা সেফটিপিন দিয়ে আটকে দিল প্রিয়া।
চার ভাই-বোন যখন চা বাগানের এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল, তখন তাদের পেটের আগুনটা যেন শীতের ঠান্ডাকেও হারিয়ে দিচ্ছে। আরিয়ান হাঁটতে হাঁটতে বিকাশের হাত ধরে করুণ গলায় বলল, “দাদা, বড্ড খিদে পেয়েছে রে। পেটের ভেতরটা কেমন যেন কামড়াচ্ছে।”
বিকাশ ছোটো ভাইয়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে। সে কোনো মিথ্যা আশ্বাস দেয় না। শুধু বলে, “আর একটু চল ভাই। স্কুলে গেলেই স্যার আমাদের খেতে দেবেন। আজকে বোধহয় খিচুড়ি আর ডিম সেদ্ধ আছে।” ডিমের কথায় আরিয়ানের ম্লান মুখে একটু আশার আলো ফুটে ওঠে।
সবুজপাতা টি এস্টেট হাইস্কুল আর তার ঠিক পাশেই শিশুশিক্ষাকেন্দ্র। এই স্কুলটাই যেন এই অবহেলিত শিশুদের জন্য এক টুকরো স্বর্গ। স্কুলের লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই প্রধান শিক্ষক সুব্রত সেনের চোখে পড়ল বিকাশদের। সুব্রতবাবু মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সহৃদয়। তিনি এই চার ভাই-বোনের করুণ ইতিহাস খুব ভালো করেই জানেন। বাবা-মা হারা এই বাচ্চাগুলোর অদম্য জেদ তাঁকে মুগ্ধ করে। এত অভাব, এত খিদে, রাতের বেলা অত আতঙ্ক— এত কিছুর পরেও ওরা একদিনও স্কুল কামাই করে না।
সুব্রতবাবু এগিয়ে এসে বিকাশের মাথায় হাত রাখলেন। “কিরে বিকাশ, সব ঠিক আছে তো? রাতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”
বিকাশ মাথা নিচু করে বলল, “না স্যার, ঠিক আছি।”
সুব্রতবাবু বুঝতে পারলেন ছেলেটা লুকোচ্ছে। ওদের ফ্যাকাশে মুখ আর শুকনো চোখগুলোই বলে দিচ্ছে পেটের ভেতর কেমন আগুন জ্বলছে। তিনি আর কথা বাড়ালেন না। শুধু বললেন, “যা, ক্লাসে গিয়ে বোস। আজ তাড়াতাড়ি মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করছি।”
ক্লাসে বসে শিক্ষকের কথাগুলো বিকাশের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল স্কুলের বারান্দার দিকে, যেখান থেকে রান্নার একটা সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। ডাল, চাল আর সবজি দিয়ে ফোটানো খিচুড়ির সেই গন্ধটা যেন জাদুর মতো কাজ করছিল। শুধু বিকাশ নয়, রিয়া, প্রিয়া আর শিশুশিক্ষাকেন্দ্রের ক্লাসে বসে থাকা ছোট্ট আরিয়ানেরও একই অবস্থা।
অবশেষে বহু কাঙ্ক্ষিত সেই স্কুলের ঘণ্টা বাজল। ঢং ঢং ঢং...
এই ঘণ্টার শব্দটা তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সংগীত। ক্লাস থেকে বেরিয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়াল ছাত্র-ছাত্রীরা। সুব্রতবাবু নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করতে লাগলেন। বড়ো বড়ো থালায় ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর একটা করে আস্ত সেদ্ধ ডিম। যখন বিকাশের থালায় খাবারটা পড়ল, তার মনে হল সে যেন অমৃত হাতে পেয়েছে।
চার ভাই-বোন স্কুলের মাঠের এককোণে একটা শিমুল গাছের তলায় গোল হয়ে বসল। কেউ কোনো কথা বলছে না। শুধু গোগ্রাসে খাচ্ছে। আরিয়ানের খাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন গত এক সপ্তাহ ধরে কিছুই খায়নি। বিকাশ নিজের ডিমের অর্ধেকটা চুপিচুপি আরিয়ানের থালায় তুলে দিল। আরিয়ান দাদার দিকে তাকাল, কিন্তু খিদে এতই বেশি যে সে কোনো প্রতিবাদ না করে সেটা খেয়ে নিল। রিয়া আর প্রিয়াও একে অপরের সাথে খাবার ভাগ করে নিচ্ছে।
আধপেটা খেয়ে থাকা এই শিশুদের কাছে এই মিড-ডে মিলের খাবারটাই সারা দিনের একমাত্র ভরসা। এই খাবারটুকু না জুটলে হয়তো তারা কবেই এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যেত। পেট ভরে খাওয়ার পর আরিয়ানের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটল। বিকাশেরও মনে হল পেটের আগুনটা অবশেষে নিভেছে।
কিন্তু এই শান্তি, এই স্বস্তি বড়োই ক্ষণস্থায়ী। বিকাশের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে জানে, এই খাবারটুকু শুধু আজকের দুপুরের জন্য। বিকেলে স্কুল ছুটি হওয়ার পর যখন তারা আবার সেই ভাঙা, অন্ধকার ঘরটায় ফিরে যাবে, তখন রাতের বেলা কে তাদের খাবার দেবে? কে তাদের রাতের অন্ধকারে রক্ষা করবে? স্কুলের এই ঘণ্টাটা তাদের সাময়িক স্বস্তি দিলেও, আগামীকালের অনিশ্চয়তাটা তাদের মাথার ওপর খড়্গের মতো ঝুলেই রইল।
তিন
ডুয়ার্সের শীতের বিকেলগুলো বড্ড মায়াবী হয়। চা বাগানের সবুজ পাতার ওপর দিয়ে যখন পড়ন্ত সূর্যের সোনালি আলো তির্যকভাবে এসে পড়ে, তখন চারপাশটা যেন কোনো নিপুণ শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস বলে মনে হয়। কিন্তু এই মায়াবী রূপের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত, হিমশীতল বিষণ্ণতা। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তুরে হাওয়া যেন ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সবুজপাতা চা বাগানের মুনশি লাইনের আঁকাবাঁকা, এবড়োখেবড়ো পথ ধরে স্কুল থেকে ফিরছিল চার ভাই-বোন। দুপুরে স্কুলের মিড-ডে মিলের খিচুড়ি আর ডিমের স্বস্তিটা ততক্ষণে হজম হতে শুরু করেছে। পেটের ভেতর আবার সেই চেনা শূন্যতা।
বিকাশের বুকটা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে, আর তার মানেই হল সেই অন্ধকার, সেই ভাঙা দরজা, আর সেই হাড়হিম করা আতঙ্ক। আরিয়ান বিকাশের আঙুলগুলো শক্ত করে ধরে হাঁটছে। চারপাশের চা-গাছগুলোর ছায়া দীর্ঘ হয়ে রাস্তার ওপর পড়ছে, যেন কালো কালো রাক্ষস হাত বাড়িয়ে তাদের ধরতে আসছে।
ঠিক এমন সময় পিছন থেকে একটা পরিচিত সাইকেলের ঘণ্টি বেজে উঠল। ক্রিং ক্রিং!
“কিরে বিকাশ, তোদেরই খুঁজছিলাম!”
বিকাশরা ঘুরে দাঁড়াল। বাগানের পুরোনো পিয়োন হরিশকাকু সাইকেল থেকে নামছেন। তাঁর কাঁধে ঝোলানো খাকি রঙের চামড়ার ব্যাগ। হরিশকাকুর মুখের হাসিটা দেখলেই বিকাশের মনে একটা অদ্ভুত ভরসা জাগে। মাসের এই একটা দিনের জন্যই তো ওরা চাতকের মতো অপেক্ষা করে থাকে।
হরিশকাকু ব্যাগ হাতড়ে একটা হলদেটে খাম বের করলেন। “নে, ধর। তোর পিসির চিঠি আর মানিঅর্ডার এসেছে। আজই সদর পোস্ট অফিস থেকে নিয়ে এলাম।”
বিকাশের হাতটা একটু কাঁপল খামটা নেওয়ার সময়। এই সামান্য একটা কাগজের খাম তাদের কাছে শুধু টাকা নয়, এটা যেন হাজার মাইল দূর থেকে পাঠানো একটা অদৃশ্য আলিঙ্গন। খামের ওপর গোটা গোটা অক্ষরে পিসিমা সাবিত্রীর নাম লেখা। বিকাশ খামটা বুকে চেপে ধরল। খামের ভেতর থেকে যেন এক অদ্ভুত ওম তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।
“হরিশকাকু, পিসি কি নগেনদাদুকে ফোন করবে আজ?”—বিকাশ জানতে চাইল।
“হ্যাঁ রে। চিঠিতে লেখা আছে, আজ বিকেলে নগেনের মুদি দোকানে ফোন করবে সাবিত্রী। তুই বরং সোজা ওখানেই যা।”
হরিশকাকু সাইকেলে উঠে প্যাডেল মারতে মারতে চলে গেলেন।
বিকাশ রিয়া আর প্রিয়ার দিকে তাকাল। ওদের ম্লান মুখেও একটা খুশির ঝিলিক। আরিয়ানের চোখ দুটো চকচক করে উঠল, “দাদা, পিসির টাকায় আজ রাতে আমরা ভাত খাব তো? আর একটু আলুভাজা?”
বিকাশ হেসে ওর মাথা নেড়ে দিল—“হ্যাঁ ভাই, আজ রাতে আমাদের উনুন জ্বলবে।”
চার ভাই-বোন প্রায় ছুটতে ছুটতে বাগানের মোড়ে নগেনদাদুর মুদি দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। দোকানের পুরোনো ল্যান্ডলাইন ফোনটার দিকে তারা এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন ওটা কোনো জাদুর বাক্স। ঠিক বিকেল পাঁচটায় ফোনটা বেজে উঠল। ক্রিং... ক্রিং...
নগেনদাদু রিসিভারটা তুলেই হেসে উঠলেন, “হ্যাঁ সাবিত্রী, এরা সবাই এসে বসে আছে। নে, কথা বল।” তিনি রিসিভারটা বিকাশের হাতে ধরিয়ে দিলেন।
“হ্যালো... পিসি?”—বিকাশের গলাটা একটু বুজে এল।
“বিকাশ! বাবা আমার, কেমন আছিস তোরা? আরিয়ান, রিয়া, প্রিয়া কেমন আছে?”—হাজার মাইল দূরের ধোঁয়াশা আর ভিড়ে ঠাসা শহর দিল্লি থেকে ভেসে এল সেই পরম আদরের স্বর। সাবিত্রীর গলাটা ভাঙা, সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির ক্লান্তি স্পষ্ট, কিন্তু ভালোবাসার কোনো কমতি নেই তাতে।
বিকাশ নিজের সব ভয়, রাতের বেলা দরজার ওপাশে শোনা সেই রহস্যময় পায়ের শব্দ, খিদের জ্বালা—সব কিছু গিলে নিয়ে বলল, “আমরা খুব ভালো আছি পিসি। আজ স্কুলে ডিম সেদ্ধ খাইয়েছে। হরিশকাকু টাকা দিয়ে গেছে। আরিয়ান তো আজ আলুভাজা খাবে বলে লাফাচ্ছে।”
ওপার থেকে একটা চাপা কান্নার শব্দ শুনতে পেল বিকাশ। দিল্লির একটা ছোট্ট, স্যাঁতসেঁতে খুপরি ঘরে বসে ফোনটা ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন পিসিমা সাবিত্রী। বয়স পঁয়ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। এই বয়সে গ্রামের আর পাঁচটা মেয়ের ভরা সংসার থাকে। কিন্তু সাবিত্রী বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি। নিজের যৌবন, নিজের স্বপ্ন, নিজের একটা সংসার—সব কিছু তিনি বলি দিয়েছেন এই চারটে অনাথ ভাইপো-ভাইঝির জন্য। তিনি জানেন, তিনি বিয়ে করে নিজের সংসার পাতলে, এই বাচ্চাগুলোকে দেখার আর কেউ থাকবে না। দিল্লির এক অবাঙালি পরিবারে দিনরাত আয়ার কাজ করে, বাসন মেজে যে সামান্য ক-টা টাকা তিনি জমান, তার প্রায় সবটাই প্রতি মাসে পাঠিয়ে দেন মুনশি লাইনে।
“বিকাশ রে...”—সাবিত্রী নাক টানলেন, “তোদের ওই ভাঙা বাড়িটার কথা ভাবলে রাতে আমার দু-চোখের পাতা এক হয় না। টিভিতে দেখি উত্তরবঙ্গে নাকি খুব চিতাবাঘ বেরোচ্ছে। চা বাগানে রাতে কত নেশাখোর, কত খারাপ লোক ঘোরে। দরজার তো ওই ছিটকিনি ভাঙা অবস্থা! রাতে কেউ যদি... যদি ঘরে ঢুকে পড়ে?”
বিকাশের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। পিসির বলা কথাগুলোই তো তার রোজ রাতের বাস্তব। কাল রাতের সেই দরজায় ধাক্কা দেওয়ার স্মৃতিটা মনে পড়ে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। কিন্তু পিসিকে সে-কথা বলা যাবে না। বললে মানুষটা দুশ্চিন্তায় মরেই যাবে।
“আরে না পিসি, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি তো বড়ো হয়েছি। আমার কাছে একটা ভারী দা আছে। কেউ এলে আমি ঠিক তাকে তাড়িয়ে দেব।”—বিকাশ গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।
সাবিত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলেন—“প্রশাসনের তরফে একটা পাকা ঘর বানিয়ে দিলে ছেলে-মেয়েরা একটু নিরাপদে থাকতে পারত রে। কতবার পঞ্চায়েতে গেলাম, কেউ শুনল না। মাথার ওপর একটা শক্ত ছাদ থাকলে অন্তত তোরা রাতে শান্তিতে ঘুমোতে পারতিস। যাইহোক, সাবধানে থাকিস তোরা। রাতে একদম বাইরে বেরোবি না। আর টাকাটা সাবধানে খরচ করিস।”
ফোনটা রাখার পর বিকাশের চোখের কোণটা একটু চিকচিক করে উঠল। সে দ্রুত চোখ মুছে নগেনদাদুর দোকান থেকে চাল, ডাল, একটু সরষের তেল, আর আরিয়ানের জন্য দু-টাকার একটা বিস্কুটের প্যাকেট কিনল। পিসির পাঠানো খামটা প্যান্টের পকেটে সযত্নে রাখা।
দোকান থেকে বেরিয়ে যখন তারা আবার তাদের সেই জরাজীর্ণ কোয়ার্টারের দিকে পা বাড়াল, তখন চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। চা বাগানের ফ্যাক্টরির সাইরেন বাজছে। দূর থেকে ভেসে আসছে শেয়ালের একটানা ডাক। শীতের রাত তার সমস্ত রহস্য আর রোমাঞ্চ নিয়ে ডুয়ার্সের বুকে জাঁকিয়ে বসেছে। বাতাসে যেন ফিশফিশ করে কথা বলছে কোনো অশরীরী ছায়া।
বিকাশ এক হাতে চাল-ডালের পলিথিনটা ধরে আছে, অন্য হাতে শক্ত করে ধরে আছে আরিয়ানের হাত। পকেটে রাখা পিসির ওই খামটা যেন একটা ম্যাজিক বর্মের মতো কাজ করছে। খামের ভেতরের টাকাগুলো নয়, খামের সাথে জড়িয়ে থাকা পিসিমার ওই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ওই আত্মত্যাগই যেন এই চার ভাই-বোনকে রাতের অন্ধকারের সমস্ত বিপদ থেকে আড়াল করে রাখার একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি করে দিয়েছে।
বাড়ির উঠোনে পা দিতেই হাওয়াটা যেন হঠাৎ বড্ড ভারী হয়ে গেল। ভাঙা দরজাটা বাতাসে ক্যাঁচক্যাঁচ করে দুলছে। অন্ধকারের ভেতর থেকে মনে হল দুটো জ্বলজ্বলে চোখ যেন তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। বিকাশ ঢোঁক গিলল। পিসির খামটা পকেটে থাকলেও, এই বাস্তব পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা আর রাতের চা-বাগানের অজানা বিপদগুলো যে তাদের জন্য ওঁত পেতে বসে আছে, তা সে খুব ভালো করেই জানে। উনুন জ্বলবে ঠিকই, কিন্তু আজ রাতটাও কি কালকের মতোই কোনো নতুন আতঙ্ক নিয়ে আসবে?
চার
উঠোনের ঘুটঘুটে অন্ধকারে জ্বলজ্বলে চোখদুটো দেখে বিকাশের বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। এক হাতে পিসির পাঠানো টাকার খাম আর চাল-ডালের প্যাকেট, অন্য হাতে ছোট্ট আরিয়ানের কাঁপতে থাকা আঙুল। চা-বাগানের নিস্তব্ধ রাতে ঝিঁঝি পোকার ডাকটা যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে কানের পর্দায় বিঁধছে। বিকাশ সাহস সঞ্চয় করে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ঢিল তুলে নিয়ে অন্ধকারের দিকে ছুড়ে মারল। একটা খসখস শব্দ, আর তারপরেই একটা বুনো খট্টাশ (গন্ধগোকুল) চা-গাছের ঝোপের দিকে দৌড়ে পালাল।
বিকাশ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল—“কিছু না রে, খট্টাশ ছিল। চল ভেতরে চল।”
ভাঙা দরজাটা কোনোমতে তার দিয়ে আটকে ঘরের ভেতর ঢুকল চার ভাই-বোন। বহুদিন পর আজ তাদের মাটির উনুনে আগুন জ্বলল। কাঠের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করলেও, সেই আগুনের ওমটুকু যেন তাদের মৃতপ্রায় শরীরে নতুন প্রাণের সঞ্চার করল। ফুটন্ত ভাতের গন্ধ আর সরষের তেলে আলুভাজার সুবাসে ঘরের ভেতরের ভ্যাপসা, স্যাঁতসেঁতে গন্ধটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। চারটে কচি মুখ উনুনের আলোয় উদ্ভাসিত। পিসিমা সাবিত্রীর পাঠানো ওই কয়েকটা টাকা আজ রাতের জন্য অন্তত তাদের এক টুকরো স্বর্গের সন্ধান দিয়েছে। পেট ভরে খাওয়ার পর আরিয়ান কখন যে বিকাশের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা সে টেরই পায়নি।
কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উনুনের আগুন নিভে আসে, আর তার সাথেই ফিরে আসে সেই চেনা আতঙ্ক। কনকনে উত্তুরে হাওয়া ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে তিরের ফলার মতো শরীরে বিঁধতে থাকে। বাইরে কোনো শুকনো পাতা ঝরে পড়ার শব্দ হলেও বিকাশের মনে হয়, ওই বুঝি কেউ এল! পিসির বলা কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়—“মাথার ওপর একটা শক্ত ছাদ থাকলে অন্তত শান্তিতে ঘুমোতে পারতিস।” বিকাশ নিজের শিয়রে রাখা মরচে পড়া দা-টার হাতল শক্ত করে মুঠি করে ধরে রাখে। সে জানে, এই ভাঙা দরজা তাদের বাঁচাতে পারবে না, তাদের একটা পাকা ঘরের বড্ড দরকার।
পরদিন সকালে উঠেই বিকাশ একটা বড়ো সিদ্ধান্ত নিল। আজ সে স্কুলে যাবে না। রিয়া আর প্রিয়াকে বলল আরিয়ানকে নিয়ে স্কুলে যেতে। সে নিজে যাবে গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে। পিসির পাঠানো টাকা দিয়ে পেট হয়তো কয়েকদিন চলবে, কিন্তু মাথার ওপর ছাদ আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পেতে গেলে সরকারের দরজা খটখটানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
সবুজপাতা চা-বাগান থেকে পঞ্চায়েত অফিস বেশ কয়েক কিলোমিটার দূর। ভাঙা সাইকেলটাও নেই, অগত্যা পায়ে হেঁটেই রওনা দিল বারো বছরের এক কিশোর, যার কাঁধে আস্ত একটা সংসারের ভার। চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যখন সে পঞ্চায়েত অফিসে পৌঁছাল, তখন বেলা অনেকটাই গড়িয়েছে।
পঞ্চায়েত অফিস চত্বরে থিকথিক করছে ভিড়। কেউ বার্ধক্য ভাতার জন্য, কেউ জমির পর্চার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে। ধুলোমাখা ফাইল আর সরকারি আমলাদের ব্যস্ততার মাঝে বারো বছরের রুগ্ণ, আধময়লা শার্ট পরা বিকাশকে কেউ পাত্তাই দিল না। টানা দু-ঘণ্টা একটা বেঞ্চের কোণে বসে থাকার পর অবশেষে এক সহৃদয় পিয়োনের দয়ায় সে গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ইসদোর খাড়িয়ার ঘরে ঢোকার সুযোগ পেল।
উপপ্রধানবাবু রাশভারী মানুষ, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে একটা কোমলতা আছে। চশমার ফাঁক দিয়ে বিকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী রে বাবা? তুই তো মুনশি লাইনের সেই ইন্দোয়ারদের ছেলেটা না? কী দরকার বল?”
বিকাশ ঢোঁক গিলে নিজের সবটুকু সাহস জড়ো করে বলল, “স্যার, আমাদের ঘরের দরজাটা ভাঙা। রাতে বাগানে শেয়াল, চিতাবাঘ ঘোরে। খুব ভয় করে স্যার। পিসিমা দিল্লি থেকে টাকা পাঠায়, কিন্তু তাতে তো ঘর হয় না। আমাদের যদি আবাস যোজনায় একটা পাকা ঘর দিতেন... আর একটা রেশন কার্ড! রেশন কার্ড নেই বলে আমাদের খুব কষ্ট হয় স্যার।”
কথাগুলো বলতে বলতে বিকাশের গলা ধরে এল। একটা বারো বছরের ছেলের মুখে এমন বেঁচে থাকার আকুতি শুনে উপপ্রধানবাবুর কলম থেমে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিলেন।
“তোর পিসির কথা আমি জানি। মেয়েটা তোদের জন্য নিজের জীবনটা শেষ করে দিল। কিন্তু রে বাবা...”—ইসদোর খাড়িয়া একটু ইতস্তত করে বললেন, “সরকারি নিয়মের একটা বড়ো বেড়াজাল আছে। তোরা চার ভাই-বোনই তো অপ্রাপ্তবয়স্ক। মানে, তোদের কারও বয়স আঠারো হয়নি। আইন অনুযায়ী, কোনো নাবালকের নামে সরাসরি আবাস যোজনার ঘর বা আলাদা রেশন কার্ড বরাদ্দ করা যায় না। তোদের তো কোনো আইনি অভিভাবকও নেই যে তার নামে ঘরটা দেব। বাবা মৃত, মা নিরুদ্দেশ। আমি তোদের কষ্টটা বুঝি রে, কিন্তু আমার হাত-পা যে এই আইনের দড়িতে বাঁধা।”
বিকাশের মনে হল তার পায়ের তলা থেকে কেউ যেন মাটিটা সরিয়ে নিল। সরকারি নিয়ম! যে নিয়ম মানুষের সুবিধার জন্য তৈরি, সেই নিয়মই আজ তাদের মতো অনাথ শিশুদের বেঁচে থাকার পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“তাহলে কি আমরা এভাবেই... ওই ভাঙা ঘরে ভয়ে ভয়ে মরে যাব স্যার?”—বিকাশের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল, “রাতে যখন কেউ দরজায় ধাক্কা দেয়, তখন আমার ছোটো ভাইটা ভয়ে কাঁপে। সরকারি নিয়ম কি আমাদের ভয়ের কথা বোঝে না?”
ঘরের ভেতর এক ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এল। উপপ্রধানবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বিকাশের কাঁধে হাত রাখলেন। এই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিনি হয়তো একটা ছোটো যন্ত্রাংশ মাত্র, কিন্তু তাঁর ভেতরের মানুষটা তো আর মরে যায়নি।
“শোন বিকাশ, কাঁদিস না”—তিনি শান্ত গলায় বললেন, “সরাসরি হয়তো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, তোদের ব্যাপারটা আমি বিডিও সাহেবের কাছে বিশেষ কেস হিসেবে পাঠাব। তোদের জেঠু বা অন্য কোনো আত্মীয়ের নাম যদি অভিভাবক হিসেবে তালিকায় ঢোকানো যায়, আমি সেই চেষ্টা করব। রেশন কার্ডের জন্যও আমি ফুড ইন্সপেক্টরের সাথে কথা বলব। একটু সময় লাগবে, কিন্তু আমি তোদের এই অন্ধকারে ফেলে রাখব না। এটা আমার কথা রইল।”
বিকাশ পঞ্চায়েত অফিস থেকে যখন বেরিয়ে এল, তখন বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসছে। হাতে কোনো পাকা কাগজ নেই, ঘরের চাবি নেই, আছে শুধু একটা মৌখিক আশ্বাস। কিন্তু তবু, ওই এক টুকরো আশ্বাসই যেন অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে একটা ছোট্ট আলোর বিন্দুর মতো।
সে যখন চা-বাগানে ফিরে এল, তখন আকাশে সন্ধ্যাতারা ফুটেছে। রিয়া, প্রিয়া আর আরিয়ান উঠোনে তার জন্য অপেক্ষা করছে। বিকাশকে দেখেই আরিয়ান ছুটে এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরল, “দাদা, কালকে রাতে আর ভয় করবে না তো? আমাদের নতুন দরজা হবে?”
বিকাশ ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। সে জানে, আজ রাতেও ভাঙা দরজাটা হাওয়ায় কাঁপবে। আজ রাতেও কোনো অজানা জানোয়ার বা মানুষের পায়ের শব্দে তাদের রক্ত হিম হয়ে আসবে। পিসির পাঠানো টাকার মেয়াদও ফুরোবে একদিন। পঞ্চায়েতের প্রতিশ্রুতির ফাইল হয়তো লাল ফিতের জটে আটকে থাকবে মাসের পর মাস।
কিন্তু আজ বিকাশের চোখে আর শুধু ভয় নেই। আজ সেখানে একটা জেদ চেপে বসেছে। সে বুঝতে পেরেছে, এই পৃথিবীতে কেউ তাদের হাতে রুপোর চামচে করে ভবিষ্যৎ তুলে দেবে না। সরকারি নিয়মের বেড়াজাল ছিঁড়ে বেরোতে গেলে তাদের নিজেদেরই লড়াই করতে হবে।
“ভয় করবে না আরিয়ান”—বিকাশ শক্ত গলায় বলল, “আমাদের পড়াশোনা করতে হবে। রিয়া, প্রিয়া, তোরা কেউ স্কুল ছাড়বি না। আমি বড়ো হয়ে চাকরি করব। নিজের হাতে এই ঘরের চারদিকে ইটের দেওয়াল তুলব। পিসিকে দিল্লি থেকে ফিরিয়ে আনব। সেদিন আর কেউ আমাদের দরজায় ধাক্কা দেওয়ার সাহস পাবে না।”
চা-বাগানের হাড়কাঁপানো শীতের রাত আবার নেমে আসে মুনশি লাইনে। ভাঙা ঘরের ভেতর চার ভাই-বোন আবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। বাইরে অন্ধকারের রাজত্ব, বিপদের হাতছানি। কিন্তু এই চারটে স্পন্দিত বুকের ভেতর এখন আর শুধুই বেঁচে থাকার আর্তি নেই, সেখানে জন্ম নিয়েছে এক টুকরো স্বপ্ন। একটা শক্ত ছাদের স্বপ্ন, একটা ভয়হীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
রাত যতই গভীর আর ভয়ংকর হোক-না-কেন, তারা জানে, এই অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়। তারা শুধু অপেক্ষায় আছে সেই ভোরের, যে ভোর শুধু সূর্যের আলোই আনবে না, নিয়ে আসবে তাদের নতুন জীবনের উত্তাপ।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।