সহজ নাট্যদলের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘দাদুর নাটক’ রবীন্দ্রনাথের রূপকথাকে সমকালীন রাজনৈতিক স্যাটায়ারে রূপান্তরিত করে ক্ষমতার মুখোশ উন্মোচন করে। ইতিহাস, ফ্যাসিবাদ ও আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের মগজধোলাইয়ের প্রেক্ষিতে এই প্রযোজনা দেখায় কীভাবে হাসি ও ব্যঙ্গই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। তীক্ষ্ণ সংলাপ, ব্রেখটীয় ফর্ম ও সংগীত মিলিয়ে এটি আমাদের সময়ের নগ্ন সত্যের এক অস্বস্তিকর অথচ জরুরি দলিল। লিখলেন সায়ন দত্ত।
১৯৪০ সালের ১৪ই জুন। জার্মান নাৎসি বাহিনীর বুটের পদধ্বনিতে প্রকম্পিত হচ্ছে প্যারিসের রাজপথ। আসন্ন পরাধীনতা আর পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা। সমগ্র ফ্রান্সে নেমে আসছে এক শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্ক আর অন্ধকারের ছায়া। ঠিক সেই পতনের আগের রাতে, অবরুদ্ধ প্যারিসের ফরাসি রেডিয়োতে সম্প্রচারিত হল এক অদ্ভুত নাটক। নোবেলজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক অঁদ্রে জিদ (André Gide)-এর অনুবাদে—“Amal et la lettre du roi”।
এর ঠিক দু-বছর পর। ১৯৪২ সালের ১৮ই জুলাই। পোল্যান্ডের ‘ওয়ারশ ঘেটো’-র (Warsaw Ghetto) বন্দিশিবির। চারদিকে স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর নাৎসিদের পৈশাচিক উল্লাস। সেখানে বন্দি এক প্রখ্যাত শিশুচিকিৎসক, শিক্ষাবিদ এবং লেখক ডা. জানুস করজাক (Janusz Korczak)। তিনি জানতেন, তাঁর এবং তাঁর অনাথ আশ্রমের প্রায় ২০০টি শিশুর মৃত্যু অবধারিত, খুব শিগগিরই তাঁদের পাঠানো হবে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। শিশুদের মন থেকে সেই আসন্ন মৃত্যুর ভয় দূর করতে এবং মৃত্যুকে এক প্রশান্তিময় ‘নতুন যাত্রা’ বা ‘রাজার ডাক’ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানোর জন্যই তিনি সেই বন্দিশিবিরের ভেতরেই মঞ্চস্থ করলেন একটি নাটক। কী সেই নাটক? অমল নামের এক রুদ্ধ ঘরে বন্দি বালকের বাইরের পৃথিবীর জন্য হাহাকার এবং শেষে মৃত্যুর মাধ্যমে সেই ‘মহামুক্তি’ বা রাজার চিঠি লাভের আখ্যান। দুটি ক্ষেত্রেই চরম বিপন্নতার রাতে যে নাটকটি বেছে নেওয়া হয়েছিল, তা হল সর্বজনবিদিত— ‘ডাকঘর’। আর নাট্যকারের নাম উল্লেখ করার কি কোনো প্রয়োজন পড়ে?
(ইতিহাসের নির্মম পরিণতি হল, এই নাটক মঞ্চায়নের ঠিক তিন সপ্তাহ পর, ১৯৪২ সালের ৫ বা ৬ আগস্ট, নাৎসিদের নির্দেশে আশ্রমের সেই ২০০টি শিশু এবং ডা. করজাককে ট্রেনের বগিতে তুলে ট্রেব্লিঙ্কা (Treblinka) মৃত্যুকূপে পাঠানো হয়। নাৎসিরা বিশ্ববরেণ্য ডা. করজাককে একা পালিয়ে বাঁচার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু তিনি তাঁর শিশুদের একা মৃত্যুর মুখে ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন এবং তাদের হাত ধরে হাসিমুখে গ্যাস চেম্বারের দিকে এগিয়ে যান।)
এত দশকের পুরোনো এক মর্মান্তিক ইতিহাসের পাতা আজ হঠাৎ কেন উলটাচ্ছি? আসলে, যা বড়ো মাপের সাহিত্য, তা তার স্বভাবসিদ্ধ কারণেই সাহিত্যের মায়াজাল বা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এক মৃত্যুঞ্জয়ী দর্শন হয়ে ওঠে। আর দর্শনকে তো কোনো স্থান-কাল-পাত্রে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়; তা সর্বকালীন এবং সর্বজনীন। চরমতম ফ্যাসিবাদ এবং অবধারিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অমলের সেই ‘রাজার চিঠি’র জন্য অপেক্ষা সেদিন অবরুদ্ধ ইউরোপের কাছে এক অদ্ভুত বিষাদ অথচ মুক্তির সান্ত্বনা বয়ে এনেছিল।
কিন্তু যুগ পালটায়, আর তার সঙ্গে পালটায় স্বৈরাচারের রূপ। আজকের রাষ্ট্রযন্ত্র হয়তো সরাসরি গ্যাস চেম্বারে পাঠায় না, কিন্তু মগজধোলাই, মেকি উন্নয়ন আর অন্ধভক্তির বিষবাষ্পে সে প্রতিনিয়ত শ্বাসরোধ করে মারে সাধারণ মানুষকে। যখন রাষ্ট্রের এই স্বৈরাচার এবং অরাজকতা চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন প্রতিবাদের ভাষাও আর কেবল বিষাদে আটকে থাকে না। তখন মিখাইল বাখতিনের সেই ‘কার্নিভাল’ বা তীব্র স্যাটায়ার (Satire)-ই হয়ে ওঠে প্রান্তিক মানুষের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। এই অমানবিক, বাজারমুখী পৃথিবীতে হাসির চাবুক দিয়ে ক্ষমতার মেকি গাম্ভীর্যকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়াই তখন শিল্পের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কবিতা ‘জুতা আবিষ্কার’-কে সমকালীন রাজনীতির এক তীক্ষ্ণ, ব্রেখটীয় প্যারোডি হিসেবে বিনির্মাণ করে গত ২২শে মার্চ, জ্ঞান মঞ্চে ঠিক এই দুঃসাহসিক এবং অসাধ্য সাধনটিই করল নাট্যদল ‘সহজ’ তাদের সাম্প্রতিকতম প্রযোজনা ‘দাদুর নাটক’-এর মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘকাল ধরে আমাদের তথাকথিত বোদ্ধা ও এলিট সমাজ রবীন্দ্রনাথকে এক গুরুগম্ভীর, ধরাছোঁয়ার বাইরের নৈর্ব্যক্তিক ‘দেবতা’ হিসেবে কাচের বাক্সে বন্দি করে রাখতে চেয়েছে। যেন তিনি কেবলই এক আধ্যাত্মিক রোমান্টিসিজমের প্রতীক! ১৯৫০-এর দশকে শম্ভু মিত্র যখন ‘রক্তকরবী’ দিয়ে সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাচের বাক্সে প্রথম আঘাত হেনেছিলেন, তখন বিশুদ্ধতাবাদীরা প্রমাদ গুনেছিলেন। আর আজ, নির্দেশক অনুভব দাশগুপ্ত (পাবলো) সেই প্রথাবদ্ধ মিথকে একেবারে সজোরে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে রবি ঠাকুরকে আক্ষরিক অর্থেই আমাদের রক্ত-মাংসের ‘গল্পদাদু’ হিসেবে মঞ্চের ধুলোয় নামিয়ে এনেছেন। ‘দাদুর নাটক’ তাই কেবল ‘জুতা আবিষ্কার’-এর নিরীহ আখ্যান নয়; বরং তা আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের এক নিখুঁত, শানিত দর্পণ। যেখানে ধুলো ঢাকার সেই মায়াবী রূপকথার আড়ালে আসলে আজকের মেকি ‘উন্নয়ন’, ‘গোপন নজরদারি’ (ED, সিবিআই-এর মতো রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার), ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি, সময়ের গভীর অসুখ এবং স্তাবকতার বা অন্ধভক্তির এক তীব্র ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজার পা ধুলো থেকে বাঁচাতে পুরো পৃথিবীকে চামড়ায় ঢেকে দেওয়ার যে আখ্যান, তা আজ যেন রাষ্ট্রের যাবতীয় নগ্নতা ও সত্যিটাকে ঢেকে দেওয়ার এক ভয়ংকর রূপক হয়ে দাঁড়ায়।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
থিয়েটারের ক্ষেত্রে কোনো তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে দর্শকের মগজে গেঁথে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হল স্পেস এবং ফর্মের ব্যবহার। অ্যারিস্টটলীয় ট্র্যাজেডির সেই ‘ক্যাথারসিস’ কিংবা স্তানিস্লাভস্কির ‘ম্যাজিক ইফ’ (The Magic 'If') দিয়ে বোনা নিটোল মায়াবী বিভ্রমের (Illusion) এখানে কোনো জায়গা নেই। স্তানিস্লাভস্কি যেমন অভিনেতাদের ‘প্রদত্ত পরিস্থিতি’-তে (Given Circumstances) দাঁড় করিয়ে নিখুঁত বাস্তবতার এক নিশ্ছিদ্র মায়া তৈরি করতে চাইতেন, নির্দেশক অনুভব ঠিক তার বিপরীতে হেঁটে অত্যন্ত সচেতনভাবে বেছে নিয়েছেন ব্রেখটীয় ‘এপিক থিয়েটার’ (Epic Theatre)-এর অমসৃণ রাস্তাকে। দর্শক যাতে কোনোভাবেই গল্পের আবেগে ভেসে গিয়ে চারপাশের পচে যাওয়া বাস্তবের কথা ভুলে না যান, তার জন্য নির্দেশক বারবার সজোরে ভেঙে দিয়েছেন ‘ফোর্থ ওয়াল’ (Fourth Wall)। ব্রেখটীয় ‘Alienation Effect’ বা বিযুক্তি প্রভাবের এমন চূড়ান্ত এবং সফল ব্যবহার সাম্প্রতিক বাংলা থিয়েটারে সত্যিই বিরল। লুইজি পিরানদেল্লোর (Luigi Pirandello) ‘সিক্স ক্যারেক্টারস ইন সার্চ অফ অ্যান অথর’-এর মেটা-থিয়েট্রিক্যাল (Meta-theatrical) কাঠামোর মতোই এখানে খোদ নির্দেশক অনুভব মঞ্চে উঠে রাজার সঙ্গে তর্কে জড়াচ্ছেন, চরিত্রদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাদের ডায়ালগ বা ব্লকিং। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ দর্শকাসনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। যেন তিনি নিজেই আজ হতবাক হয়ে দেখছেন তাঁর সৃষ্টি করা দেশের এই চরম বিপন্নতা। এই দ্বৈত-স্তরীয় চলন দর্শককে সারাক্ষণ সজাগ রাখে এবং আক্ষরিক অর্থেই চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দেয় যে, তারা কেবল একটি নাটক দেখছে না, তারা আসলে তাদেরই চারপাশের এক পচে যাওয়া বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
যে-কোনো সার্থক রাজনৈতিক থিয়েটারের অন্যতম বড়ো অস্ত্র হল তার সংলাপ। ‘দাদুর নাটক’-এর ক্ষেত্রে এই সংলাপ বা টেক্সট কোনো স্থির বা মৃত দলিল নয়; বরং তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যাওয়া এক জীবন্ত, শ্বাপদসংকুল রূপরেখা। প্রাথমিকভাবে নাটকের যে ড্রাফট তৈরি হয়েছিল, কালক্রমে তা যে সমকালের বিষবাষ্প মেখে প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয়েছে, তা যে-কোনো মননশীল দর্শকের কাছেই অত্যন্ত স্পষ্ট। ধুলো ঢাকার অজুহাতে শুরু হওয়া ‘জুতা আবিষ্কার’-এর সেই চেনা আখ্যান এখানে এক ভয়ংকর সমকালীন রূপ নেয়, যেখানে পদে পদে আছড়ে পড়ে পলিটিক্যাল স্যাটায়ারের (Political Satire) তীক্ষ্ণ চাবুক। রাজ্যের দারিদ্র্যকে নির্মূল করার বদলে বস্তির সামনে রাতারাতি পাঁচিল তুলে দিয়ে তাকে আড়াল করার প্রহসন, ১৪৪ বছর পর পুণ্যস্নানের নামে সাধারণ মানুষের মগজে ধর্মীয় আফিমের প্রয়োগ, ‘স্বচ্ছতার অভিযান’-এর আড়ালে জমতে থাকা দুর্নীতির পাহাড় কিংবা এসএসসি (SSC) কেলেঙ্কারিতে নিলাম হয়ে যাওয়া অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন—আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের এই প্রতিটি কদর্য ক্ষত নাটকের সংলাপে এমনভাবে উঠে আসে যে, দর্শক প্রবল হাসির দমকের মাঝেই হঠাৎ এক গভীর, অস্বস্তিকর যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে বাধ্য হন। এই হাসি আসলে এক অসহায় সময়ের আর্তনাদ।
সংলাপের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা এই রাজনৈতিক প্রহসন আমাদের অবধারিতভাবেই মনে করিয়ে দেয় সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’-র কথা। সেখানে যেমন ছন্দের চটকে আর মগজধোলাইয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকত চরম স্বৈরাচার, ‘দাদুর নাটক’-এর রাজসভাও ঠিক তেমনই এক মেকি বন্দনাগানের আধুনিক সংস্করণ। তবে এই নাটকের স্পর্ধা অন্য মেরুর। ধুলো ঢাকার অজুহাতে যারা আজ রাজসভাতে, তারা আসলে ভুলে যায় যে চামড়ার আস্তরণ দিয়ে একটি দেশের সব কদর্যতাকে ঢাকা যায় না। আর ঠিক এই দমবন্ধ করা স্তাবকতার মাঝখানেই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতার সেই অবাধ্য বালকের মতো সজোরে আঘাত হানে এই নাটকের সংলাপগুলো। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র মিথ্যে উন্নয়নের আড়ম্বরে আর জাঁকজমকে নিজেকে মুড়ে রাখতে ব্যস্ত, তখন এই নাটকের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আর দর্শকের অট্টহাসিই যেন একজোট হয়ে শাসকের দিকে আঙুল তুলে বলে ওঠে—“রাজা, তোর কাপড় কোথায়?” চাটুকার পরিবৃত শাসকের সেই নগ্নতাকে এত সহজ ভাষায়, এত তীব্র স্যাটায়ারের সঙ্গে সাধারণের সামনে তুলে ধরাটাই এই প্রোডাকশনের সবচেয়ে বড়ো জয়। রবীন্দ্রনাথের রূপকথার খোলসটি কখন যে নিঃশব্দে খসে পড়ে আজকের এই রক্ত-মাংসের, পচে যাওয়া সমকালের দলিল হয়ে ওঠে, তা দর্শক টেরই পান না। বা হয়তো ভীষণভাবে পান। একটি শতবর্ষ প্রাচীন কবিতাকে আজকের খবরের কাগজের হেডলাইনের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তোলার এই যে জাদু, তা লুকিয়ে আছে এই শানিত সংলাপের বুননেই।
এই শানিত সংলাপের ঠিক সমান্তরালেই এই রাজনৈতিক স্যাটায়ারের অন্যতম শক্তিশালী মেটাফর হয়ে ওঠে এর কোরাস এবং লাইভ মিউজিকের ব্যবহার। শর্মিলার অসামান্য কোরিওগ্রাফিতে কোরাস দল যখন মঞ্চের ওপর সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকার তৈরি করে, তখন তা কেবল দৃষ্টিনন্দন শারীরিক বিন্যাস থাকে না; বরং তা এক দলবদ্ধ জনসমুদ্রের অমোঘ রূপক হয়ে ওঠে। এই কোরাস কখনও শাসকের ইশারায় ওঠা-বসা করা মগজধোলাই হওয়া দাস, আবার পরক্ষণেই তারা ফেটে পড়া বিক্ষুব্ধ জনতা। সৈকত মান্নার আলোকসম্পাত মঞ্চের এই আলো-আঁধারির দ্বান্দ্বিক রূপটিকে, ক্ষমতার এই মনস্তাত্ত্বিক জ্যামিতিকে আরও প্রখর করে তোলে।
তবে এই নাটকের মেরুদণ্ড হল এর সংগীত। গ্রিক ট্র্যাজেডি বা ব্রেখটের ‘এপিক থিয়েটার’-এর চলন মেনে এখানকার সংগীতশিল্পীরা (অহনা, কবীর, জোসেফ, বুবান কয়াল) আখ্যানের কেবল নীরব সঙ্গী বা আবহ রচনা করেন না, তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই সময়ের ধারাভাষ্যকার। কবীরের লেখা তীক্ষ্ণ এবং বিদ্রূপাত্মক গানগুলো সমকালীন বুর্জোয়া রাজনীতির ফাঁপা বুলিগুলোকে সজোরে চপেটাঘাত করে। গান এখানে নিছক বিনোদন নয়, বরং ব্রেখটীয় ‘বিযুক্তি’ বা অ্যালিয়েনেশনের এক মোক্ষম হাতিয়ার। লাইভ মিউজিক এবং শব্দের (ময়ূখ মজুমদার) এই অনায়াস যুগলবন্দি নাটকের ব্যঙ্গাত্মক মেজাজকে এক অন্য বৌদ্ধিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক মিথস্ক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি স্যাটায়ার বা প্যারোডির ভারসাম্য বজায় রাখা বোধহয় সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ একটু এদিক-ওদিক হলেই তা সস্তা ভাঁড়ামি বা চটুলতায় পর্যবসিত হতে পারে। কিন্তু ‘সহজ’-এর অভিনেতারা সেই অলঙ্ঘ্য লক্ষণরেখাটি অসাধারণ মুনশিয়ানায় বজায় রেখেছেন। রাজার চরিত্রে দীপ কাইজার বসুর (Deep Kaizar Basu) মঞ্চ-উপস্থিতি এককথায় অনবদ্য। তিনি কেবল একজন স্বৈরাচারী শাসকের একমাত্রিক ক্যারিকেচার করেননি, বরং ক্ষমতার মোহে অন্ধ, দম্ভী অথচ কোথাও গিয়ে নিজেরই তৈরি করা ইমেজের খাঁচায় বন্দি এক অসহায় মানুষের মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর সংলাপে রঙের রাজনীতির মেরুকরণ, ক্রিকেট উন্মাদনাকে জাতীয়তাবাদের মোড়কে বেচে দেওয়া বা সমকালীন পলিটিক্যাল মিম-কালচারের রেফারেন্সগুলো দর্শককে প্রবলভাবে হাসালেও, সেই হাসির রেশ কাটতে-না-কাটতেই মস্তিষ্কের গভীরে এক অদ্ভুত অস্বস্তির জন্ম দেয়… যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। অপরদিকে মহামন্ত্রীর চরিত্রে অমিয় চক্রবর্তী নিখুঁত ও পরিমিত। তিনি যেন সেই চিরন্তন ম্যাকিয়াভেলিয়ান (Machiavellian) চতুর রাজনীতিকের প্রতীক, যে রাজাকে শিখণ্ডী করে আসলে পেছন থেকে সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের অদৃশ্য কলকাঠি নাড়ে। এ ছাড়া অন্যান্য সমস্ত কলাকুশলীর সম্মিলিত (Ensemble) শারীরিক অভিনয় মঞ্চের এনার্জিকে এক মুহূর্তের জন্যও থিতিয়ে পড়তে দেয় না। নাটক তো কোনো একক শিল্প নয়, দলগত সমর্পণের ঘামেই এর আসল আত্মা বেঁচে থাকে। ব্যক্তিপূজার এই চরম যুগে দাঁড়িয়ে, ‘সহজ’-এর এই সম্মিলিত কাজ দেখার সময় বারবার করে সেই ধ্রুবসত্যটিই মনে পড়ে যায়।
সবশেষে যে কথাটা বলতেই হয়, তা হল— ‘দাদুর নাটক’ কেবল দু-দণ্ড বিনোদনের চটুল হাসির নাটক নয়। একসময় বিশ্বভারতীর রক্তচক্ষু আর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির জাঁতাকলে রবীন্দ্রনাথকে যেভাবে ‘দেবতা’ বানিয়ে এক অলঙ্ঘনীয় কাচের বাক্সে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, আজ স্বত্বের সেই আইনি বেড়াজাল বা বাড়াবাড়ি আর নেই। আর ঠিক সেই স্বাধীনতার সুযোগ নিয়েই ‘সহজ’ আমাদের রবিঠাকুরকে ধ্রুপদি ড্রয়িংরুম থেকে টেনে এনে দাঁড় করিয়েছে একেবারে সমকালের ধুলোমাখা রাস্তায়। অন্যদিকে, নাটকের মঞ্চায়নে ব্যবহৃত প্রপস বা উপকরণের তালিকাও নেহাতই সীমিত। কিন্তু এই আপাত-রিক্ততাই যেন এই প্রযোজনার সবচেয়ে বড়ো শক্তি। এ যেন পোলিশ নির্দেশক জের্জি গ্রোটোস্কির (Jerzy Grotowski) ‘পুওর থিয়েটার’ (Poor Theatre)-এর এক আধুনিক তর্জমা, যা প্রমাণ করে দেয়—শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার জন্য কোটি টাকার জাঁকজমক বা রাজকীয় সেট লাগে না; লাগে কেবল শিল্পীর টানটান শরীর, মেধা আর মেরুদণ্ড।
যে পৃথিবীতে ক্ষমতার দম্ভ, বাণিজ্যের নগ্ন সমীকরণ এবং ধর্মের নেশা সাধারণ মানুষের চোখ অন্ধ করে দিচ্ছে, সেখানে দাঁড়িয়ে একদল তরুণের এই প্রযোজনা তাই এক প্রবল স্পর্ধার নাম। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র চাইছে আমরা প্রশ্ন করা ভুলে গিয়ে কেবল আজ্ঞাবহ দাস হয়ে থাকি, তখন ‘সহজ’ আমাদের হাসতে বাধ্য করে। আর সেই অট্টহাসির দমকেই ফালাফালা হয়ে যায় রাষ্ট্রের লুকিয়ে রাখা যাবতীয় নগ্ন সত্য। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত, স্বাধীনভাবে ভাবতে পারাই হল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে আদিম এবং অকৃত্রিম গণতান্ত্রিক অধিকার। ‘দাদুর নাটক’ আমাদের সেই ভোঁতা হয়ে যাওয়া অধিকারটাকেই আবার শান দিয়ে ফিরিয়ে দেয়।
ক্ষমতার মঞ্চে রাজারা আসবে, রাজারা যাবে। কিন্তু যে শিল্প হাসতে হাসতে মস্তিষ্ককে নাড়া দেয়, বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে—সেই শিল্প বেঁচে থাকবে অন্ধকারের বিরুদ্ধে শেষ ব্যারিকেড হয়ে। তাই যা কেবল বিনোদন দেয় না, বরং নতুন করে বাঁচতে শেখায়, যা সময়োপযোগী, দরকারি—তা অবশ্যই দেখা উচিত।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।





