ঋত্বিক ঘটকের উপেক্ষিত সত্তাকে অনুসন্ধান করে এই নিবন্ধ। গল্প ও প্রবন্ধের ভাষা, ভাঙন ও মন্তাজে কীভাবে গড়ে উঠেছে তাঁর সিনেমার ভাবজগৎ— এই লেখা সেই অন্তরাল ইতিহাসের পাঠ।
জন্মশতবর্ষে ঋত্বিক ঘটকের নাম আবার উচ্চারিত হচ্ছে। তাঁকে নিয়ে লেখা হচ্ছে নতুন করে। চেতনা নাট্যগোষ্ঠী তাঁর জীবন নির্ভর একটি নাটক মঞ্চস্থ করছে। তবে সবটাই হচ্ছে, মূলত তাঁর সিনেমাকে ঘিরে। এটা ঠিক, চলচ্চিত্রই ঋত্বিক কুমার ঘটকের সিংহাসন। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর সিনেমার ছিন্নভিন্ন ভূখণ্ড। মেঘলা আকাশের নিচে ভিজতে থাকা এক নারী, দূরের ধাবমান ট্রেন, ওঁরাওদের নাচ, শুকিয়ে যাওয়া নদীর চর, ভাঙা চোরা মানুষ ও গাড়ির কান্না, কিছু অভিমান, পাঞ্জাবিতে ছিটকে আসা রক্ত বা চাবুকের যন্ত্রণা। কিন্তু, এসবের নেপথ্যে, অন্তরালবর্তী হয়ে থেকে যান ভিন্ন এক ঋত্বিক কুমার। তিনি কালি ও কলমের ঋত্বিক। সেই ঋত্বিক পঠিত বা আলোচিত হন বড়ো কম। তার একটি কারণ, সম্ভবত, সিনেমায় তিনি যতখানি অপ্রতুল, লেখনীতেও তা-ই। এখনও পর্যন্ত তাঁর আবিষ্কৃত ও প্রকাশিত ছোটোগল্পের সংখ্যা মাত্র ১৭। লিখেছেন দুটি নাটক।
ছোটোগল্পগুলো তিনি লিখেছিলেন ১৯৪৬ থেকে প্রায় ১৯৫২ সালের ভিতর, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তার কিছু প্রকাশিত হয় ওপার বাঙলার রাজশাহীতে, বাকিগুলো এপার বাংলার বেশ কিছু পত্রিকায়, যার মধ্যে অগ্রণী, দেশ বা শনিবারের চিঠির নাম পাই। এর পরে তিনি আর সাহিত্যের কাছে ফিরে যাননি, যদিও জানা গেছে, ১৯৬২ সাল নাগাদ তিনি একটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর একটি বড়ো গল্প, যা পরে চিত্রনাট্যে রূপান্তরিত করা শুরু করেন। কিন্তু, তাঁর বহু অসমাপ্ত সিনেমার মতোই, সাহিত্যের সেই পরবর্তী উদ্যোগও আর সম্পূর্ণ হতে পারেনি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সমস্ত ছোটোগল্প একত্র করে ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে ঋত্বিক ঘটকের একমাত্র গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর। প্রথমে কবি প্রকাশনী থেকে ১৯৮৭ সালে এবং পরে দে’জ পাব্লিকেশন থেকে।
আর আছে তাঁর প্রবন্ধ, যা সংখ্যায় অধিক। বাংলা ও ইংরাজি এই দুই ভাষাতেই তিনি ছোটো বড়ো অজস্র প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। সেগুলো সবটাই মূলত চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে, কিন্তু সেসব রচনায় শুধু চলচ্চিত্র নয়, ধরা পড়েছে ঋত্বিক ঘটকের পঠন পাঠন,, তাঁর দেখা মানুষ ও সমাজ, তাঁর সমাজ দর্শন এবং চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি তাঁর নিজের attitude। এইসব লেখা পড়লে বোঝা যায়, তাঁর ক্যামেরার পিছনে সদা জাগ্রত থেকেছে কালি ও কলমের মন ও মনন।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
তাঁর গল্প ও প্রবন্ধের ভাষা আলাদা। কিন্তু খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যাবে, কিভাবে তাঁর গল্পের ভিতরের ভাষা, ইমেজরি, ছিন্ন–বাক্য, মন্তাজ–মনস্ক লেখা—সব মিলেই গড়ে তোলে তার সিনেমার অবয়ব।
এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা, বিভিন্ন ছোটো পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রায় সমস্ত বাংলা প্রবন্ধ আর সাক্ষাতকার নিয়ে ১৯৭১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় “চলচ্চিত্র, মানুষ ও আরো কিছু” বইটি। তখন বইটি ছিল কৃশতনু। তখন সৌভাগ্যবশত ঋত্বিক কুমার জীবিত ছিলেন। কিন্তু এই সংকলন গ্রন্থ যে পাঠক আনুকুল্য না পেয়ে অচিরেই বিস্মমিতির আড়ালে চলে যায়, এ কথা জানান সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, এ দেশে যিনি অন্যতম প্রধাণ ঋত্বিক বিশারদ ও সংরক্ষক। তাঁরই উদ্যোগে, আর সুরমা ঘটক আর ঋত্বিক তনয় ঋতবানের সহায়তায়, ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট নতুন করে, ওই সংকলনের একটি প্রায় সম্পূর্ণ আর বৃহদায়তন রূপ দিয়েছিলেন। নব কলেবরে, সেই সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ করেন নিউ এজ পাবলিশার সম্ভবত ২০০৩ সালে। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৬৭ টি প্রবন্ধ, আর বেশ কিছু সাক্ষাৎকার, এখনও পর্যন্ত ঋত্বিক ঘটকের বাংলা ভাষায় লেখা সমস্ত প্রবন্ধ আর ভাবনার পূর্ণ আকর। বইটি পাওয়া যায়। এর বাইরে, ঋত্বিক ঘটক ইংরিজী ভাষাতেও বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন, বাংলার বাইরের পাঠককুলের জন্যে। ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যুর পর, ১৯৮৭ সালে, ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে রূপা তাঁর সমস্ত ইংরেজি ভাষায় লেখা প্রবন্ধের একটি সংকলন প্রকাশ করে। বইটির নাম, “Cinema and I”। বইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তিনি, বাগীশ্বর ঝা এবং শংখ ঘোষের সাথে মিলে উপদেষ্টার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন। বইটির ভুমিকাও সত্যজিৎ রায় লিখে দেন। এগুলো তিনি স্বেচ্ছায় করেছিলেন কারণ, সত্যজিৎ রায় চিরকাল ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা ও সিনেমা ভাবনাকে মর্যাদা দিতেন। যদিও শিল্প স্বভাবে ও দর্শনে, ঋত্বিক কুমার ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের বিপ্রতীপ অবস্থানে। এই বইটিতে অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধের সংখ্যা ১৫।
এই তিনটি বই, মূলত ঋত্বিক ঘটকের মসিকর্মের সামগ্রিক পরিচায়ক।
আমি, এই নিবন্ধে, কলমের ঋত্বিক ঘটককে পাঠ করতে গিয়ে সামান্য যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, বা কিছু গল্পের বয়ান আবিষ্কার, যার ছায়া খুঁজে পেয়েছি তাঁর চলচ্চিত্রে, সেইটি ভাগ করে নেবার চেষ্টা করব। এই চেষ্টার ভুমিকা বিশ্লেষকের নয়। কিছু আঁচড়ে একটা পরিচয় ভাগ করে নেব মাত্র।
ঋত্বিক তাঁর গল্পে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন—তাতে কোনো অলংকার নেই, কিন্তু দৃশ্য আছে। তাঁর প্রবন্ধে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন—তাতে দৃশ্য নেই, কিন্তু আছে চিন্তা। এই দুই একসাথে পড়লে আমরা পাই যেটা পাই—একই ব্যক্তির শিল্প আবেগ আর চিন্তার এই দুটি চেহারা। দুটো ভিন্ন অস্ত্র চালাচ্ছেন; কিন্তু দুটোরই একই লক্ষ্য—মানুষ আর সমাজ।
ঋত্বিক কুমার লিখেছেন—“গল্প লিখেছি কারণ কিছু কথা বলার ছিল। সে-কথাগুলো অন্যভাবে বলা যেত না।”
এই “অন্যভাবে বলা যেত না”—এই লাইনটি তাঁর পুরো জীবনকে ব্যাখ্যা করে। কারণ সিনেমায় তিনি একই কথা বলেন—অন্যভাবে।
এই সময়েই তিনি ‘প্রগতি লেখক সংঘ’-র সঙ্গে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী প্রজন্মের লেখকেরা তখন সমাজবাস্তবতার খোঁজে নতুন রীতির সাহিত্য নির্মাণে ব্যস্ত। কিন্তু ঋত্বিকের গল্প আলাদা—তিনি বাস্তবতা লিখতে গিয়ে তার নিচে থাকা অবাস্তবের ঘূর্ণি ধরতে চেয়েছেন।
তাঁর সমস্ত গল্পই যে সাহিত্যমানে খুব উঁচুতারে বাঁধা, একথা হয়তো বলা যাবে না। একেবারে গোড়ার দিকে লিখে গল্প, যেমন “গাছটি” পড়ে বোঝা যায়, এ লেখা পরিপক্কতার জন্যে অপেক্ষা করছে। তবে, শুরু থেকেই, তাঁর চরিত্ররা যেন বাস্তবের মাটি থেকে খানিক ওপরে ভাসে—কিন্তু সেই ভাসমানতার মধ্যেই থেকে যায়, স্পর্শযোগ্য সমাজ ও মানুষের রিয়াল বিশ্ব। তাদের বেঁচে থাকা, আনন্দ বা কান্না।
গল্পগুলোর পটভূমি শহর কলকাতা ও তার প্রান্তবর্তী ভাঙা বস্তি, ছোটো শহর, কিংবা কখনও গঞ্জ। কলকাতা শুধু শহর নয়, এক মানসিক ভূখণ্ড রচনা করে।
“যুদ্ধ গেছে, দেশ গেছে, ঘরও গেছে—শুধু মানুষ রয়ে গেছে কিছুটা”—ঋত্বিকের গল্পে এই মানুষরা আর আগের মতো শান্ত, নরম, ভদ্র নয়; তারা ক্লান্ত, ক্ষুব্ধ, এবং পরস্পরবিরোধী।
ঋত্বিক ঘটকের গল্পসংগ্রহে মাত্র ১৭ টি গল্প পাই।—‘গাছ’, ‘অয়নান্ত’, ‘আকাশ গঙ্গার স্রোত ধরে’, ‘এজাহার’, ‘শিখা’, ‘এক্সট্যাসি’, ‘রূপকথা’, ‘রাজা’, ‘পরশপাথর’, ‘ভূস্বর্গ অচঞ্চল’, ‘স্ফটিকপাত্র’, ‘চোখ’, ‘কমরেড’, ‘সড়ক’, ‘প্রেম’ ও ‘ঝংকার’।
আজ যখন পাঠ করি, কিছু কিছু হঠাৎ আবিষ্কার চমকে দেয়!। তাঁর গল্পের অন্দরমহলে যেন লুকিয়ে থাকে তাঁর পরবর্তী কালের চলচ্চিত্র কল্পনার বীজ।
তাঁর গল্পগুলোকে এককথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। এগুলি একইসঙ্গে বাস্তব, রূপক, অতিলৌকিক, এবং রাজনৈতিক। দ্বৈততা—হাসি আর কান্নার একসাথে উপস্থিতি—ঋত্বিকের গল্পের স্বতন্ত্র সুর।
তাঁর গল্পের ভাষা একইসঙ্গে কাব্যিক ও রুক্ষ। গল্পের বয়ান কখনও লিনিয়ার নয়; অনেকটা সিনেমার মতো কাটে—এক দৃশ্য থেকে হঠাৎ অন্য দৃশ্যে চলে যায়। সময় বা বাস্তবতার রেখা না মেনে।
এবং গল্পে জীবনের কেন্দ্র নয়, ভাঙনটাই কেন্দ্রবিন্দু। চরিত্ররা কখনও নিছক দুঃখের প্রতীক নয়। তারা সংগ্রামী, কিন্তু বেঁচে থাকার আবেশে ভরপুর। তাদের দারিদ্র্য আছে, কিন্তু তার মধ্যে প্রেম ও আছে, কবিতার মতো স্বরও।
কয়েকটি উদাহরণে আসি।
আকাশগঙ্গার স্রোত ধরে গল্পের শুরুতে একটি অসাধারণ কল্প দৃশ্য আসে—একটি শিশুর দৃষ্টি আকাশের দিকে, শিশুর কল্পনায় মিশে যায় অলীক আর বাস্তব!
“আকাশের দিকে তার দৃষ্টি গেল। নিশীথরাজ সোমদেব তাঁর রৌপ্যরথে চলেছেন উদীচী পর্বতের দিকে মণ্ডলাবৃত হয়ে। টুকরো টুকরো মেঘের আভাস এখানে-ওখানে, তাদের বুকে চাঁদের রশ্মিজালে ইন্দ্রধনুর মতো মোহ তৈরি করে। তির্যক আলো এসে পড়ছে তার উঠোনে। মেহেদি বেড়ার আলো-আঁধারের মধ্যে গোঁড় চাকরেরা বসে খুব সম্ভব দেশের কথাই বলাবলি করছিল মৃদুস্বরে, মাঝে-রাখা লণ্ঠনটির আলো এসে পড়েছিল তাদের সেই চোয়াল-উঁচু কালো মুখে আর ছোটো ছোটো চোখগুলোতে, পড়ে চকচক করছিল;”
বাস্তবের মধ্যে একটি পরাবাস্তব স্তর তৈরি হয়। ঘটকের চোখে মানবিক আনন্দও এক আত্মবিভ্রম—সেই আনন্দ কালস্রোতে হারিয়ে যায়। আটকে থাকে সেই কালখণ্ডে, যা সে ফেলে এসেছে।
বৈপরীত্যের এই “হঠাৎতা”– ঋত্বিকের গল্পের শৈলী। যে শৈলী আরও অমোঘ হয়ে রূপ পায় তার সিনেমায়, পরবর্তীতে।
‘অয়নান্ত’ গল্পটি সাধু ভাষায় লেখা। মূলত চেতনার প্রবাহধারার (stream of consciousness) উপর নির্মিত এ গল্প এপিসোডিক। বাহ্য দৃষ্টির চেয়ে অন্তর্জগৎ এখানে বড়ো। ঘটক সিনেমায় যেমন ফ্রেম ও রিদম নিয়ে খেলা করেন, লেখাতেও ভাষা হয়ে ওঠে ক্যামেরাচালিত, অনুভূতির মৃদু ট্রাভেলিং শট। গল্পের ভাষা একদিকে কাব্যময়, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক প্রশ্নে জর্জরিত। গল্পের প্রারম্ভিক প্রেক্ষাপট—বর্ষা, কুয়াশা ও ঝাপসা রাস্তা—শুধু একটি পরিবেশ নয়; বরং যেন এটি মানুষের অবচেতনের দরজা। বৃষ্টির রুক্ষ শব্দ, আকাশের ঘনীভবন, মাঠের ওপারে লাল রাস্তার হারিয়ে যাওয়া—এইসবই যেন চেতনার ধাতুকে আর্দ্র করে চিন্তার নতুন কোষ জন্ম দেয়। বর্ষা এখানে শুধু ঋতু নয়, বরং প্রবেশদ্বার; অস্পষ্ট বাস্তবকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভেঙে ভিতরের স্তর উন্মোচনের পূর্বশর্ত। নায়কের অন্তর্দৃষ্টি precisely এই পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে—যখন প্রকৃতি বাইরে ভেজে, ঠিক তখনই মন ভেতরে জেগে ওঠে।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নায়কের অস্তিত্ব-প্রশ্নমুখী মনন। হাতে তাকিয়ে সে আবিষ্কার করে দেহ-জৈব পদার্থ, অণু-পরমাণু, ইলেকট্রনের সক্রিয়তা এবং আত্মানুভবের স্পন্দন—সমস্তই একই সময়ে বিদ্যমান। এই উপলব্ধি গল্পটিকে বহুমাত্রিক করে তোলে; রিটুইক দেখান, বস্তু নয়—বস্তুর তলায় লুকিয়ে থাকে তার অস্তিত্ব-যুক্তি। এক অর্থে অয়নান্ত হল মাল্টি-লেয়ারের রিয়্যালিটি মডেলের সাহিত্যিক প্রয়োগ—যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও উপনিষদের জ্ঞানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি রিটুইকের ভাষার গঠনেও প্রতিফলিত হয়—দীর্ঘ বিবরণী বাক্য হঠাৎ ক্ষুদ্র স্বগতকথায় ভেঙে গিয়ে চিন্তার ওঠা-নামাকে শ্রব্য-দৃশ্যমান করে তোলে
‘চোখ’-গল্পের প্লট খুব বহিরঙ্গের নয়। গল্পটি এগোয় মূলত দেখার ক্রিয়া-কে কেন্দ্র করে, যেখানে ‘চোখ’ ক্রমশ গল্পের প্লটকে পেরিয়ে স্বতন্ত্র প্রতিমা হয়ে ওঠে। সেই চোখ, তাড়া করে, বিব্রত করে।
চোখ এখানে sensory organ নয়—এক metaphysical wound। দৃষ্টি যত গভীর, ক্ষতও তত। বাক্য ছোটো—ধারালো—চাবুকের মতো। পরিবেশ নয়, inner visual field গল্পটিকে চালায়।
কমরেড গল্পটি শুধু রাজনীতি নয়, বিশ্বাসের ভাঙাচোরা ভৌগোলিক মানচিত্র। তার ভিতরখানা গভীর মানবিক দোলাচলে ভরা। এক বামপন্থী কর্মী—যার আদর্শে বিশ্বাস ছিল অটুট—ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, বিপ্লব শুধু শ্লোগানে হয় না। মানুষের ভিতরের ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষুধা—সব কিছু মিলে আদর্শ প্রায়শই হয়ে ওঠে মায়া। সেই মায়া, নিয়ে যায় বন্ধু হত্যার দিকেও। গল্পের যেটি ক্লাইম্যাক্স, সেই তুঙ্গ স্পর্শী এক মৃত্যুর ছবি আঁকা কটি লাইন পড়া যাক- “সব আমি লক্ষ্য করি লালচে কালো একটা পর্দার ভেতর দিয়ে যেন। আর আমি যেন সমস্ত ঘটনাটার একজন দর্শক, এমনই ঠাণ্ডা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে গেছে মনের ভেতরটা। ছটফট করতে করতে ও নেতিয়ে পড়ল। ক্রমে ওর হাত-পায়ের আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে এল। ছেড়ে দিলাম।”
লক্ষ করি, এই ‘হত্যার’ মোটিফ ফিরে এসেছে তাঁর আরও দুটি গল্পে। ‘প্রেম’ আর ‘এজাহার’ গল্পদুটিতে। অথচ, এই হত্যা অপরাধ প্রবণতা থেকে ঘটছে না। গ্রিক ট্রাজেডির মতো, পরিস্থিতি নিয়ে যাচ্ছে হত্যার দিকে। ব্যাক্তিমানুষ সেখানে যেন পাপেট। হন্তারক অসহায়।
বহু বছর আগে লেখা গল্পের এই হত্যাগুলি যেন ‘সুবর্ণ রেখার’ নিষ্ঠুর আত্নহননের ছবিটির সাহিত্যিক প্রাক্কথন। সীতার আত্নহনন, আসলে ছিল তার দাদা ঈশ্বরের ভগ্নী হত্যা। কিন্তু ঈশ্বর নিজেও এক বৃহৎ হন্তারক সিস্টেমের অসহায় ভিক্টিম!
এজাহার গল্পেও আছে হত্যা। সেখানে পাই—স্বীকারোক্তি, অপরাধ, আর ক্লান্ত বিবেকের বিচারসভা। মনে হবে, এটি যেন এক অপরাধীর confession-এর বয়ান!
এক ব্যক্তি নিজের করা অপরাধ—হয়তো ভয়ংকর—বিবেকের ভিতর লিখে রাখে।
হত্যা আছে, কিন্তু অপরাধ কী, তা স্পষ্ট হয়না। পাঠকই যেন বিচারক।
বিবরণে অস্পষ্টতা নেই, কিন্তু সিদ্ধান্তের জায়গায় আসে মেঘ, দ্বন্দ্ব—এটাই ঋত্বিক কুমার ঘটক। দোষ-নির্দোষের সীমারেখা ঝাপসা। মনে পড়ে যায়, মেঘে ঢাকা তারায় অসহায় পিতার অঙ্গুলি নির্দেশ, দর্শকের দিকে, যখন সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সহসা বলে ওঠে “I accuse”!
এক্সট্যাসি গল্পটি, যার মানে হল উল্লাস, তা যেন বলে উল্লাসে নিহিত এক শূন্যতার গল্প। নাম শুনে মনে হয় আনন্দময়—কিন্তু প্রকৃত অর্থে হাইপার-সেন্সরি ট্র্যাজেডি।
নেশা, বৈকল্য, সাময়িক উৎফুল্লতা—শেষে এসে ঠেকে গভীর শূন্যতায়।
গল্পের অন্যতম কটি লাইন তুলে দিলাম:
“মস্ত ছবিটাকে কে যেন মুছে মুছে আবছা করে তুলল। সবটা মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন একটা The land of the lotus-Eaters! শব্দগুলো সব দূরাগত বলে মনে হয়। একটা হাত নাড়াও এখানে বাড়তি খাটুনি-ধ্যানভঙ্গ হবে এই বিশালতার। আজ এই ঝরনার ধারটিতে বসে মনের মধ্যে প্রবেশ করছে কথাটা, কাজের উদ্যম শুধু নিষ্ফল, চেষ্টার শেষ কেবল নিরাশাতে।”
দূরায়ত শব্দের এই শূন্যতার ছবি যেন ফিরে আসে অযান্ত্রিক ছবির ঘন্টার সেই দৃশ্যে। বিশাল একটি ঘন্টা দুলছে, কিন্তু শব্দ নেই। দেবহীন দেউল যেন।
নিঃশব্দ ঘন্টা—অযান্ত্রিক
প্রাবন্ধিক ঋত্বিক লেখেন—
“সত্য কাঁপে। সেই কাঁপনটাকেই ধরতে চাই।”
সিনেমার মন্তাজ নিয়ে তিনি লিখেছেন—
“দুই ছবির ফাঁকে যে অনুভূতি জন্ম নেয়, সেটাই প্রধান। ছবি তিনটি—অনুভূতি একটি।”
আইজেন্সটাইনের মন্তাজ–তত্ত্বকে তিনি যেন তার গল্পের বয়ানে বুনে দেন। তাঁর গল্পেও আসে হঠাৎ কাট, অসংলগ্ন চিত্র, ছিন্ন বাক্য।
অনুভব নিয়ে তিনি যখন লিখছেন—“ছবিতে যে চিত্র তৈরি হয়, তা বাস্তবের সঙ্গে মেলে কী মেলে না, সেটা বড়ো কথা নয়। দর্শক কী অনুভব করল সেটাই আসল”, তখন বুঝি, কী গল্পে, কী সিনেমায়, ঋত্বিক কুমার, বিশৃঙ্খলা, ছিন্ন শব্দ আর অসমতার বুনোট দিয়ে অনুভবই করাতে চান আসলে।
ঋত্বিক ঘটকের গল্পে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—তিনি কদর্যতাকে সৌন্দর্যের বিপরীতে নয়, বরং তার অংশ হিসেবে দেখেছেন।
গল্প যেন নিজেই এক সম্পাদনা প্রক্রিয়া—কখনও ঝলকের মতো, কখনও ফাঁকের মতো।
তাঁর চরিত্ররা যেমন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনই তাদের মধ্যে একটা অস্তিত্ববাদী একাকিত্ব খুঁজে পাব আমরা৷
ঋত্বিক ঘটকের গল্পপাঠ আমাদের এক জটিল অথচ উষ্ণ জগতে নিয়ে যায়—যেখানে দুঃখ ও আশা, বাস্তব ও স্বপ্ন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক—সব মিলেমিশে থাকে। তাই ঋত্বিক ঘটকের গল্পগুলো তাঁর সিনেমার মতোই আলো–অন্ধকারে ভরা।
সেই অন্ধকারে তিনি যেন আলো খোঁজেন, মানুষের ভিতরের আলো।
স্বপ্ন আর ভাঙনের মধ্যে নিহিত পাতাল ছায়ার মতো তাঁর কলমের গল্প। এক ভাঙা পৃথিবীতে পূর্ণতার কল্পছবি।
এভাবেই, কালি, কলম আর ক্যামেরায় ঋত্বিক কুমার যেন একই ছবি দেখেছিলেন।
যেন বলতে চেয়েছেন—
“যে সৌন্দর্য অবলুপ্ত, আমি তাকে যত্র তত্র দেখি” ( উৎপলকুমার বসু)
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।





