preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
পুরোনো কলকাতার ইতিহাস চর্চা
প্রবন্ধ

পুরোনো কলকাতার ইতিহাস চর্চা

পুরোনো কলকাতার ইতিহাস শুধু নথিপত্রে নয়, ছড়িয়ে আছে কবি-সাহিত্যিকদের লেখায়, গানে ও আড্ডায়। সুগত মিত্র এই প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন গবেষণার সূত্র, নামকরণ ও নানা বিতর্ক, পাশাপাশি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রূপচাঁদ পক্ষী ও দাদাঠাকুরের মতো চরিত্রদের রসালো উপস্থিতি। ইতিহাস, সাহিত্য ও শহুরে স্মৃতির এক মনোগ্রাহী ভ্রমণ।

আজ প্রায় দীর্ঘদিন হল পুরোনো কলকাতার ইতিহাস, সংস্কৃতি মনস্ক গবেষকদের কাছে একটি প্রিয় গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যন্ত পুরোনো কলকাতাকে নিয়ে কম বই লেখা হয়নি। হরিহর শেঠ থেকে শুরু করে হরিসাধন মুখোপাধ্যায় এবং ইদানিং কালে বিনয় ঘোষ, রাধারমণ মিত্র, শ্রীপান্থ, প্রাণকৃষ্ণ দত্ত, কে নেই সেই তালিকায়। ইংরেজ ইতিহাসবিদদের সংখ্যাও সেখানে কম নয়। তবে পুরোনো বহু তথ্য আজ ধ্বংসের মুখোমুখি।
কোম্পানির সরকারি নথিপত্র ছাড়াও পুরোনো কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো বিদেশি লেখক, যতদূর মনে হয়, রেভারেন্ড জেমস লং, যাঁর দুটো লেখা বেরিয়েছিল ‘ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রিকায়, ১৮৬০ আর ১৮৫২ সালে ‘Echoes From Old Calcutta’ নাম দিয়ে। অতএব সচেতনভাবে পুরোনো কলকাতার ইতিহাস চর্চা শুরু হয়, আনুমানিক উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। অবশ্য কলকাতার খোঁজ পাওয়া যায়, তারও অনেক আগে, মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যে। যাতে প্রমাণিত হয়, কলকাতা ছিল কলকাতাতেই।
তবে কলকাতার ইতিহাস বহুমাত্রিক সন্দেহ নেই। যেমন দিগন্তবিস্তৃত তার শাখা-প্রশাখা, তেমনি তার বিষয়বৈচিত্র্য। যদি বাজারের কথা ধরা যায় তো তার গোনাগুনতির শেষ নেই। যেমন, মল্লিক ঘাটের ফুলের বাজার, চিৎপুরের ফলের বাজার, কলেজ স্ট্রিটের বই বাজার, শিয়ালদহের চোরাই বাজার আর সর্বোপরি নিউ মার্কেট তো আছেই। কলকাতার ইতিহাসের প্রতিটি ছত্রে ইতিহাস। যেমন কলকাতা নামকরণেই বিতর্ক। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাধারমণ মিত্রের মতান্তর। আবার ‘শোভাবাজার’ নামটির উৎপত্তি শোভারাম বসাকের নাম থেকে নাকি ‘সভাবাজার’ শব্দটি থেকে তাই নিয়েও মতান্তর। অতএব কলকাতার ইতিহাসের প্রতিটি ছত্রে বিতর্ক। তাই কলকাতার ইতিহাস পাঠে আমাদের রীতিমত সাবধানতা প্রয়োজন এবং এবং প্রতিটি ছত্রে গবেষণার মালমশলাও প্রচুর। এখনও পর্যন্ত গবেষককূল কলকাতার ইতিহাসের গবেষণায় নিত্যনতুন মাত্রা যোগ করছেন। নিত্যনতুন তথ্য ‘explore’ করছেন। তাই কলকাতা পাঠের যে-কোনো আলোচনায় আমাদের এই বিতর্ককে মাথায় রেখেই এগোতে হবে।
পুরোনো কলকাতার কবি সাহিত্যিকদের লেখায় পুরোনো কলকাতার কথা ঘুরে-ফিরে এসেছে। বাংলা গদ্যের আবির্ভাব হওয়ার আগে থেকেই কলকাতা শহরের কথা তাঁদের লেখায় উঠে এসেছে। কবিগান, পাঁচাখলি, খেউড়, তরজা, আখড়াই, হাফ আখড়াই তখন বাংলা সাহিত্যের আসর জুড়ে। তা ছাড়াও, এই সন্ধিক্ষণের কবি সাহিত্যিকরাও আসর মাতিয়ে রেখেছেন। রূপচাঁদ পক্ষী, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, হুতোমের নকশায় কলকাতাই প্রধান চরিত্র।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কাছে কলকাতার যে-কোনো শহুরেপনাই ছিল না-পসন্দ। তিনি ছিলেন গ্রামের মানুষ। কাঁচরাপাড়ায় ছিল তাঁর জন্ম। তাঁর মামার বাড়ি ছিল কলকাতায়। কলকাতার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তাঁর একদম পছন্দ হয়নি। শহরের যেখানে-সেখানে জমে থাকা আবর্জনা, দিনে রাতে মশার উপদ্রব তাঁর সহ্য হয়নি। যে-কোনো প্রসঙ্গে অনেকটা স্বভাব কবিদের মতোই কবিতা লেখা বা ছড়া কাটা ছিল তাঁর অভ্যাস।
তিনি লিখলেন, ‘রেতে মশা, দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকেতায় আছি।’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের এরকম অনেক ছড়া পাওয়া যায় হরিহর শেঠ-এর প্রাচীন কলিকাতা পরিচয় গ্রন্থে। সেই গ্রন্থ থেকে এরকম বহু ছড়া সংকলন করেছিলেন অধুনা লুপ্ত ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকা( পৌষ ১৩৩৭, ডিসেম্বর, ১৯৩০) সংখ্যায়। মেয়েদের ইংরিজি শিক্ষার প্রতিবাদ করে গুপ্ত কবি লিখলেন, ‘যত ছুঁড়িগুলো কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে /এ বি শিখে বিবি সেজে বিলাতি বোল কবেই কবে।’ এরকম আরও উদাহরণ হয়তো খুঁজলে পাওয়া যায়।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

উনিশ শতকের প্রকৃত বিদ্যোৎসাহী কবি সাহিত্যিক হিসেবে যদি কারও নাম করতে হয়, তবে তা কালীপ্রসন্ন সিংহ। বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগবশত তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে একটি সভা প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল বিদ্যোৎসাহিনী সভা। বিদ্যোৎসাহিনী সভার কর্মসূচি ছিল বহুমুখী। বিভিন্ন অধিবেশনে মননশীল প্রবন্ধ পাঠ করা ছাড়াও বিভিন্ন খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিকদের প্রকাশ্য সভায় সম্বর্ধনা জানানোও এই সভার অন্যতম কাজ ছিল। মাইকেল মধুসূদন অমিত্রাক্ষর ছন্দে মেঘনাদ বধ কাব্য রচনা করার কারণে বিদ্যোৎসাহিনী সভা একটি সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এই সভা এ ছাড়াও একাধিক পত্রপত্রিকা পরিচালনা করেন। সাহিত্য ও শিক্ষার বিস্তারে কালীপ্রসন্নের এরকম বহু দানধ্যানের কথা জানা যায়। কিন্ত তাঁর সর্বোত্তম কীর্তি ছিল মহর্ষি শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবের লেখা মহাভারতের বাংলা অনুবাদ। কালীপ্রসন্নের লেখা প্রায় সব কটি রচনাই তাঁর সাহিত্যিক বোধ-বুদ্ধি ও পাণ্ডিত্যের পরিচায়ক হিসেবে উল্লেখের দাবি রাখে। কিন্ত এগুলির মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী রচনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হুতোম প্যাঁচার নকশা; শুধুমাত্র সে-যুগের সামাজিক দলিল হিসেবে নয়, সে-যুগের কলকাতার চলিত ভাষা, বিশেষত হুতোমের অনুসৃত ভাষা রীতির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিশেষত তাঁর রচনাটি সমকালীন সমাজ তথা সাহিত্যের অন্যতম স্বাক্ষর। তাঁর ব্যঙ্গবিদ্রূপ মেশানো লেখা আমাদের বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বাবু’ লেখাটির কথা মনে করিয়ে দেয়। নকশার ৭০নং পৃষ্ঠায় হুতোম (কালীপ্রসন্ন) লিখলেন, ‘আজব সহর কলকেতা/ হেথায় রাঁড়ি বাড়ি জুড়িগাড়ি / মিছে কথার কি কেতা।’ সমকালীন শহরকে ফুটিয়ে তুলতে অপরিশীলিত ভাষা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে হুতোম ছিলেন অদ্বিতীয়। কিন্ত তিনি এই হুতোমের ছদ্মনামটি ব্যবহার করলেন কেন? কারণ তাঁর মনে একটি ধারণা ছিল, রাতচরা পাখি যেমন বিনিদ্র রজনী যাপন করে, শহরের সমস্ত অন্ধকার দিকগুলির উপরে নজর রাখে, হুতোমের কলমে যেন সেই নজরদারির আভাস পাওয়া যায়। হুতোমের লেখা আমাদের বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বাবু’ লেখাটির কথা মনে করিয়ে দেয়।
পুরোনো কলকাতার কবিওয়ালাদের মধ্যে কবিত্বে সবচাইতে অভিনন্দন কুড়িয়েছিলেন রাম বসু, হরুঠাকুর, নিতাই বৈরাগী, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রা—এঁরা। আর পাঁচালিকারদের মধ্যে দাশু রায়ের পাঁচালি ছিল ছিল বিখ্যাত, যার মুগ্ধ শ্রোতাদের মধ্যে একজন ছিলেন বালক রবীন্দ্রনাথ। বিখ্যাত কৃষ্ণকমল গোস্বামী ছিলেন ‘নিমাই সন্ন্যাস’-এর পালাকার।
এই উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির সমাবেশে আর এক নক্ষত্রের নাম আমরা প্রায়শই বিস্মৃত হই, তিনি রূপচাঁদ পক্ষী। যাঁর প্রকৃত নাম রূপচাঁদ দাস। আদি নিবাস উড়িষ্যার চিলকায়। রূপচাঁদ ছিলেন সম্ভবত পুরোনো কলকাতার সেরা পাঁচালিকার, টপ্পা ও ঢপগানের রচয়িতাদের মধ্যে ঊজ্জলতম। ছোটোবেলা থেকেই গানের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা। তাঁর লেখা গানগুলির শেষে তিনি ‘পক্ষী’ বা ‘খগরাজ’ শব্দটি জুড়ে দিতেন। আসলে, রূপচাঁদের বাবা গৌরহরি দাস পুত্রের নাম রেখেছিলেন সনাতন। কিন্ত ‘পক্ষী’ শব্দটি খুব জনপ্রিয় হওয়ায় তিনি নিজের নাম পালটে রাখলেন রূপচাঁদ পক্ষী আর তাঁর বাহনটিকেও চেহারা দিয়েছিলেন একটি পাখির মতো। রূপচাঁদ তাঁর গানবাজনা নিয়ে একটি দল খোলেন। এই দল বিভিন্ন বিষয়ে গান তৈরি করত। তাঁর বিজয়া, আগমনী, বাউল, দেহতত্ত্ব, খেউড় ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ের হাস্যরসাত্মক গান বিভিন্ন নাচগানের আসরে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বাগবাজারের শিবনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের ধনী পরিবার ছিল রূপচাঁদের দলের বিশিষ্ট পৃষ্ঠপোষক। তবে এই দলের সদস্যরা গঞ্জিকা সেবনে বিশেষ অভ্যস্ত ছিলেন। সাহিত্যিক অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশীর লেখা উইলিয়াম কেরির মুনশি রামরাম বসুর জীবনোপন্যাস-কে কেন্দ্র করে লেখা ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ থেকে জানা যায়, পক্ষীর দলের সদস্যরা একাসনে বসে ১০৮ ছিলিম গঞ্জিকা খেতে পারতেন। তা ছাড়াও, তাবিজ, কবচ দেওয়ার অভ্যেসও তাঁর ছিল। তার সব মজার মজার গল্প এই উপন্যাসে আছে। সেই যুগের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী দুর্গাদাস লাহিড়ী, রূপচাঁদকে আমুদে ও রসিক পুরুষ বলে বর্ণনা করেছেন।
রূপচাঁদের গানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল উনি ইংরিজি বাংলা মিশ্র ভাষায় গান গাইতে পারতেন। যেমন, শ্রীরাধা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, তিনি দ্বারকার রাজপ্রাসাদের রক্ষীর কাছে অনুরোধ করে গান গাইছেন, ‘লেট মি গো ও রে দ্বারী/ আই ভিজিট টু বংশীধারী/ এসেছি ব্রজ হতে আমি ব্রজের ব্রজনারী/ বেগ উ ডোর কীপার, আই ওয়নঁট টু সি ব্ল্যাক হেড/ ফর হুম আওয়ার রাধা ডেড/ আমি তারে সার্চ করি।’
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ২১১টি গানের একটি সংকলন বেরোয়। পরে তাঁর এইসব গান বিভিন্ন কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়।
রূপচাঁদের লেখাপড়া কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তিনি গানের তালিম নেন ছোটে খাঁ সাহেব ও ছুটি খানের কাছে। পরবর্তী কালের কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই তাঁর নামটি ছদ্মনাম হিসেবে গ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
এইরকম আরেকজন স্বভাব-রসিক কবি সাহিত্যিকের নাম না করলে এ লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি শরৎচন্দ্র পণ্ডিত বা ‘দাদাঠাকুর’। তিনি কলকাতাকে নিয়ে লিখলেন,
‘কলকাতার খেদ’—
‘হায়রে কলকাতা কেবল ভুলে ভরা
হেথায় বুদ্ধিমানে চুরি করে
বোকায় পড়ে ধরা।’
অথবা ‘আয় ভোটার আয় ভোট দিয়ে যা’। অবশ্য দাদাঠাকুর অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগের কবি। তাঁকে নিয়েও তৈরি হয়েছিল বাংলা সিনেমা।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

জন্ম ৫ আগস্ট, ১৯৫০। শিক্ষকতা জীবন দীর্ঘ চার দশকের। তার মধ্যে পনেরো বছর কলকাতার হিন্দু স্কুলে। ৮০-৯০ দশকের স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল শীর্ষে। শিক্ষকতা জীবনে তিনি স্কুল পাঠ্য বই অনেক লিখেছেন। পরিণত বয়সে তিনি বিদ্যাসাগর চর্চায় মন দিলেন। প্রকাশিত হল ‘বিষয়: বর্ণপরিচয়’। ‘তথ্যসূত্র’, ‘কৃত্তিবাস’ প্রভৃতি পত্রিকার লেখার সুবাদে তাঁর নাম ইতিমধ্যেই পাঠক মহলে সুপরিচিত।

অন্যান্য লেখা