preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
বাংলার বুদ্ধিজীবী এবং একজন শঙ্খ ঘোষ
প্রবন্ধ

বাংলার বুদ্ধিজীবী এবং একজন শঙ্খ ঘোষ

বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা, নীরবতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে রেখে এই প্রবন্ধে উঠে আসে শঙ্খ ঘোষের আপসহীন কণ্ঠ। রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও অন্যায়ের মুখে কবির নির্ভীক অবস্থান দেখায় প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর চেহারা। অতীত ও বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এই লেখা খুঁজে ফেরে সেই সত্যভাষী শিশুটিকে, যে নির্ভয়ে বলে উঠতে পারে—“রাজা, তোর কাপড় কোথায়?” আজ বিশ্ব কবিতা দিবসে লিখলেন উল্লেখযোগ্য কবি অনিমিখ পাত্র।

“নিজের পুরনো কথা কানে কানে ব্যঙ্গ করে যায় অহর্নিশ
পুলিশ কখনো কোনো অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ”

বুদ্ধিজীবী কাকে বলে, সমাজে কী তার ভূমিকা হওয়া উচিত—এ নিয়ে তর্ক অনেক। এ প্রসঙ্গে বিশ শতকে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য ভাষ্য যে তাত্ত্বিকের, সেই গ্রামসির মতে তো অ-বুদ্ধিজীবী বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং আমরা সবাই বুদ্ধিজীবী।
বুদ্ধিজীবী নিজেকে তো আর বুদ্ধিজীবী বলে না, তার ‘সামাজিক ভূমিকা’ দেখে সমাজই তাকে ওই অভিধা প্রদান করে থাকে। বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের কর্তব্যবিস্মৃত হলে সমসময়ের রাজনীতিও মুখ থুবড়ে পড়ে। যেমনটা কিনা ইতালিতে ঘটেছিল, মুসোলিনির হাত ধরে ফ্যাসিবাদের উত্থানের মাধ্যমে। অথচ রেনেসাঁর আঁতুড়ঘর যে দেশ তাদের এমন ভবিতব্য হওয়ার কথা ছিল কি?
আবার, ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ প্রস্তাব রেখেছেন শব্দটাকেই পালটে দেওয়ার—মেধাজীবী বলাই তাঁর মতে শ্রেয়। এই শব্দটিকে মান্য করেই আরেক ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন যে মেধাজীবীদের দায়িত্ব নিরন্তর প্রশ্ন তোলা।
(তবু, আমরা এই মুহূর্তে চালু অর্থে যে শ্রেণি বা লোকজনকে বোঝায় সেই ‘বুদ্ধিজীবী’ তকমাটিকে ধরেই এই আলোচনা এগোব।)

তত্ত্বকথার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আমরা বরং বাংলা কবিতার বিস্তৃত উদ্যানে ঢুকি, যেখানে কিনা সত্যিই শতপুষ্প বিকশিত হয়েছে। আমাদের মনে পড়বে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী রচিত ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতার সেই কাহিনিসূত্রটি। উলঙ্গ রাজাকে ঘিরে ভীতু, ফন্দিবাজ, নির্বোধ, স্তাবক, কৃপাপ্রার্থীদের ভিড়। রাজার ভড়ং দেখে সেই পরান্নভোজীদের মুহুর্মুহু হাততালি, সাবাশ ধ্বনি। সেই ভিড়ের ভেতর থেকে সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু গলা তুলে জিজ্ঞাসা করবে, “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?” জনমানসে বুদ্ধিজীবীর যে চেহারা প্রতিভাত তা আসলে ওই শিশুটির। সাম্প্রতিককালে, এই পোড়া বাংলায় যাদের আমরা বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিনে এসেছি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাঁদের ভূমিকা ওই শিশুটির মতো নয়। রাজ্যশাসনে বিগত জমানার শেষভাগে তাঁরা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের লাগাতার রাগ-ক্ষোভ-আন্দোলন বিদ্ধ করেছিল তৎকালীন শাসককে। ‘পরিবর্তন চাই’ শীর্ষক ব্যানারে দেখা গিয়েছিল তাঁদের মুখ। মিডিয়ার কল্যাণে কলকাতা থেকে মফস্‌সল—সর্বত্রই, ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি পরিচিত হয়ে উঠেছিল। তার পরে গঙ্গা নদীর খাতে অনেক জল বয়ে গেছে। শাসক দলের বদল ঘটেছে, দেড় দশক প্রায় অতিক্রান্ত। ‘এখন সবই শান্ত, সবই ভালো’—এমন কথা বর্তমান শাসকদলের ঘনিষ্ঠ লোকজনও বুক বাজিয়ে বলবেন না। অন্যায় তো ঘটছেই, ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, মানুষের প্রতিবাদ-আন্দোলনও আছড়ে পড়ছে রাস্তায়। এমনকি সম্প্রতি অ-দলীয় আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে মহানগর।
কিন্তু ভ্রম হয়, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শিবিরের আশ্চর্য নীরবতাই বুঝি বা আসল পরিবর্তন। মাঝেমধ্যে ইতিউতি বিবেকের উদয় হয় বটে, কিন্তু পূর্বেকার মতো সংহত কোনো আহ্বান তাতে নেই। কবি-উল্লিখিত ওই ভিড়ের সঙ্গে বরং তাদের সাজুয্য বেশি। কালক্রমে এই বাংলায় বুদ্ধিজীবী কথাটি একটি অপশব্দ বলে গণ্য হতে থাকে। মানুষ হতাশ ও ক্রমে ক্রুদ্ধ। সোশ্যাল মিডিয়া, লোকাল ট্রেন কিংবা চায়ের ঠেকে বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশ্যে বাছা বাছা বিশেষণ ব্যবহৃত হতে শোনা যায়। আসলে সবাই সেই শিশুটিকে খুঁজছে, পাচ্ছে না।

**

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

“পুলিশ ততক্ষণ কোনো অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ” (কাব্যগ্রন্থ: লাইনেই ছিলাম বাবা)—এই লাইনটি শঙ্খ ঘোষ এর যে কাব্যগ্রন্থে আছে তার প্রকাশকাল ১৯৯৩। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে তখন বাম জমানা। আর, এই লেখার শুরুতে যে উদ্ধৃতি রয়েছে তা ফিরে আসছে কবির শেষতম কাব্যগ্রন্থ ‘সীমান্তবিহীন দেশে দেশে’-তে, যার প্রকাশকাল সন ২০২০। বুদ্ধিজীবী তথা একজন সময়লগ্ন লেখকের কাজ তো নিজেকে প্রশ্ন করাও, সময়ের কষ্টিপাথরে নিজের অবস্থানকে বারংবার যাচাই করে নেওয়া। এই যাচাই করা এবং অন্যায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজ শঙ্খবাবু নিরন্তর করে গেছেন তাঁর অর্ধশতাব্দীর অধিক ছড়ানো সমগ্র কবিজীবন জুড়েই। ভৌগোলিকভাবে দূর ভূখণ্ডের সংকট ও হাহাকার নিয়ে রব তোলা, কিন্তু ঠিক পরিপার্শ্বের ন্যায়-অন্যায় নিয়ে মৌনব্রত পালন—আমাদের বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগও অনেকদিনের। শঙ্খ ঘোষের কলম সচল থেকেছে কাছে-দূরে সমস্তটা নিয়েই। বাংলার বিবেক—এই আখ্যা তিনি এমনি এমনি অর্জন করেননি।
আমাদের মনে পড়বে, বিগত শতাব্দীর সাতের দশকে ইমার্জেন্সির সময় সাংস্কৃতিক জগতে সরকারি খবরদারির কথা। একদিকে রাষ্ট্রীয় পীড়ন, পুলিশ ও খোচড়দের সন্ত্রাস, অন্যদিকে দেশবাসীকে চাগিয়ে তুলতে গালভারি সরকারি নীতিমালা। সঞ্জয় গান্ধি গোটা দেশ ঘুরে বেড়িয়ে প্রচার করছেন ‘কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই’। সেই সময় প্রকাশ পাচ্ছে শঙ্খ ঘোষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই ‘বাবরের প্রার্থনা’ (১৯৭৬)। সরকারি বাণীকে উলটোমুখে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন কবি, লিখছেন—“কথা তবু থেকে যায় কথার মনেই / কঠোর বিকল্পের পরিশ্রম নেই!” ‘আপাতত শান্তিকল্যাণ’ শীর্ষক কবিতায় ধরা পড়ছে জরুরি অবস্থার প্রকৃত দিনযাপনের চেহারা—“পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি / কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি / এখন সবই শান্ত, সবই ভালো”। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করার, এমনকি শিল্প-সাহিত্যকেও নিজেদের মাপমতো ইচ্ছেমতো কেটেছেঁটে রাখবার জন্য অতিসক্রিয় সে-সময়কার সেন্সর নীতির চিত্র কবি ধরেছেন টবে বসানো রাধাচূড়া গাছের অসামান্য রূপকে—“খুব যদি বাড় বেড়ে ওঠে / দাও ছেঁটে দাও সব মাথা / কিছুতে কোরো না সীমাছাড়া / থেকে যাবে ঠিক ঠাণ্ডা চুপ—/ ঘরেরও দিব্যি শোভা হবে / লোকেও বলবে রাধাচূড়া”। কিন্তু বাঁধন যতই শক্ত হবে বাঁধন টুটে যাবার ইন্ধনও তত বাড়বে—জগৎ সংসারের নিয়মই এই। দ্রোহের ইশারা বুনে রেখে কবি তাই এই কবিতার শেষাংশে বলে দেন, টবে রাধাচূড়া কেটেছেঁটে রাখা যায় বটে সাময়িক, তবে সে কিন্তু ভেতরে ভেতরে চারিয়ে দেয় তার শিকড়, চাপ সৃষ্টি করে টবের বাঁধনসীমায়—আর টব একদিন সেই চাপে ফেটে যেতেই পারে। রাষ্ট্রীয় অপশাসন আর তার মার খেতে খেতে মানুষের একদিন সমস্বরে ফুঁসে ওঠার চিরকালীন ছবি হয়ে থাকে এই কবিতা।
আমাদের মনে পড়বে কয়েক বছর আগে প্যামফ্লেটের মতো ছড়িয়ে পড়া ‘স-বিনয় নিবেদন’ কবিতাটি। ২০০৯-এ প্রকাশিত ‘মাটিখোঁড়া পুরনো করোটি’ নামক বই-এর কবিতা। তৎকালীন শাসকদলের এক নেতার ‘লাইফ হেল’ করে দেওয়ার এক উক্তি নিয়ে রাজনৈতিক পরিসর সরগরম। শঙ্খবাবু রেখে যাচ্ছেন তাঁর অমোঘ বক্রোক্তি—“আমি তো আমার শপথ রেখেছি / অক্ষরে অক্ষরে / যারা প্রতিবাদী তাদের জীবন / দিয়েছি নরক করে”। সেই সময় নাগরিক সমাজের আন্দোলনে মাঝেমধ্যেই মহানগর মুখরিত। কবি নিজেই বেশ কয়েকবার মিছিলের ডাক দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা একটা সংগঠিত চেহারা নিচ্ছে আস্তে আস্তে। কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠছেন প্রতিবাদের মুখ। সরকার বদলের পর, কিংবা তাঁদের কাঙ্খিত সরকার আসবার পর, কী আশ্চর্য তাঁদের বেশিরভাগেরই চরিত্র থেকে প্রতিবাদী শব্দটা মুছে যেতে দেখলাম আমরা। পরিবর্তে নানান সরকারি দাক্ষিণ্য, পুরস্কার ও উপঢৌকনে শোভিত হতে দেখা গেল তাঁদের। আর, যিনি মিছিলের ডাক না দিলে তা নাগরিক মহামিছিলে পরিণত হওয়া একপ্রকার অসম্ভব ছিল সেইসময়, সেই শঙ্খ ঘোষ? তার উত্তর আছে কবির ২০১১-২০২০—এই সময়পর্বের কবিতায়। তাঁর কবিতাসংগ্রহের তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ডে।

**

সেই জমানার মতো এই জমানাতেও রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা জমে উঠেছিল শঙ্খ ঘোষের ‘মুক্ত গণতন্ত্র’ শীর্ষক কবিতাটি নিয়ে। উপজীব্য বীরভূমের এক দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী নেতার হুমকির ছলে বলা মিঠেকড়া ভাষ্য, বিরুদ্ধতা যেখানে উঠবে সেখানেই নাকি রাস্তাজুড়ে উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকবে, এরকম একটা কিছু। অর্থাৎ উন্নয়ন এখানে আর কল্যাণকর নয়, সদর্থক নয়। তা, প্রকারান্তরে বিরোধিতাকে গায়ের জোরে চুপ করিয়ে দেওয়ার ছল মাত্র। কবির কলমে তা রূপ পায় এইরকম—“দেখ্ খুলে তোর তিন নয়ন / রাস্তা জুড়ে খড়গ হাতে / দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন”। হইচই হয়েছিল বিস্তর, কবিকে শুনতে হয়েছিল এমন কটুক্তিও—“কে এই শঙ্খ ঘোষ?”
লুম্পেনাইজেশনকে স্বীকৃতি পেতে দেখেছি আমরা সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে, ভয়াবহ অন্যায় ‘ছোটো ছোটো ছেলেদের ছোট্ট ভুল’ হিসেবে গণ্য হয়েছে, প্রশ্রয় পেয়েছে ‘দামাল ছেলেরা’। শঙ্খ ঘোষ ধরে রেখেছেন সেসব মাৎস্যন্যায়—“আমারই কন্ট্রোল-করা দামালেরা পূর্ণায়ত সাবালক আজ / তাদের শিল্পিত কাজে মুগ্ধ আমি, মুগ্ধ এ সমাজ।”(সুদিন; শুনি শুধু নীরব চিৎকার)
কিংবা ওই একই কাব্যগ্রন্থে—

“মাঝে মাঝে বটে দুষ্টুমি করে
তাজা তাজা কিছু দামাল ছেলে।
ধাষ্টমো ক’রে তারও বিরুদ্ধে
উঁচু স্বর কেউ তুলতে এলে
সুশাসন-কাজে নিরুপায় লাজে
তাদেরই তো হবে ভরতে জেলে।”

কবিকে দ্রষ্টা হিসেবে ভাবার চলও তো বহুযুগের। তাঁর আজকের কথা যেন উঠে আসে আগামীদিনের মুখে। ঘটমান বর্তমানের খোলসটাকে ছাড়িয়ে কবির দৃষ্টি যেন বহুদূরে যায়। না, তখনও ‘অভয়া’-র দুর্ঘটনাটি ঘটেনি। শঙ্খ ঘোষ চিরকালের জন্য চলে গেছেন ২০২১-এর ২১ এপ্রিল। ২০১৫-য় বেরোনো কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতা আছে—থাপ্পড়। তার শুরুর দুই পঙ্‌ক্তি কী অদ্ভুতভাবে যেন ইঙ্গিত করে ‘অভয়া’ পরবর্তী কার্যক্রমের দিকেই—

“নির্যাতিতা? বিচার চেয়ে মুখ খুলেছ তুমি?
তৈরি করে তুলছ নিজের সর্বনাশের ভূমি!”

আসলে কোথাও তেমন কিছু হয়নি, অনর্থক সুশাসনকে কালিমালিপ্ত করার হীন উদ্দেশ্যেই যে বিরোধীদের যত হইচই, শাসকের সেই বয়ানকেই তুলে আনছেন কবি, ব্যঙ্গার্থে—

“আমি যদি বলি কিছুই হয়নি
নিশ্চিত তবে কিছুই হয়নি
যা কিছু তোমরা হয়েছে ভাবছ
আসলে সেসব কিছুই হয়নি।”

পুলিশের বিরুদ্ধে দলদাসত্বের অভিযোগ ওঠে মাঝেমাঝেই। তারা বিরুদ্ধস্বর দমনের ক্ষেত্রে অতিসক্রিয়, আবার শাসকঘনিষ্ঠ অপরাধীদের বেলায় যেন ললিতলবঙ্গলতা! তেমন তেমন ক্ষেত্রে—

“পুলিশ তখন ভদ্র বড়ো, রা কাড়ে না চড়ে—
হেঁটমুণ্ডে পদোন্নতি বচ্ছরে বচ্ছরে।”

এই ‘পদোন্নতি’র গাজর অবশ্য ঝোলানো আছে বুদ্ধিজীবীদের সামনেও। ঘটনা যখন ঘরের কাছে, তখন তাদের বিবেক যেভাবে ঠাণ্ডাঘরে ঘুমিয়ে থাকে তার কারণও হয়তো বা ওটিই। কৃপাপ্রার্থী হয়ে উঠলে মুখ খুলতে অসুবিধে তো হবেই! শঙ্খবাবুর মতো এত স্পষ্ট ভাষায় যুগের এই অসুখকে আর কেই-বা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন—

“উন্নয়নকালে এরকম দু-একটা কাণ্ড ঘটে যায় সোনা।
তাছাড়া চারদিকে এত আলো মেলা খেলা আহ্লাদের ফোয়ারা দেখছ না?
এর মধ্যে বারবার প্রতিক্রিয়া দিতে দিতে হয়ে যাব প্রতিক্রিয়াশীল?
না না, ঠিক হবে না তা। বন্ধ সব কথা—
প্রগতিপথিক আমি, আমার তো কাজ আজ পথভ্রষ্ট ক্রিয়াহীন শুধু এক মহানীরবতা।”
(প্রতিক্রিয়া; সীমান্তবিহীন দেশে দেশে)

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধেও শঙ্খবাবুর কবিতায় স্পষ্ট শোনা গেছে তাঁর আপসহীন অবস্থান। কালবুর্গি কিংবা গৌরী লঙ্কেশের হত্যার কথা সরাসরি উঠে এসেছে তাঁর সাম্প্রতিক লেখায়। ফলে, রাজনীতির কোনো পক্ষই তাঁকে স্বস্তির সঙ্গে হজম করতে পারেনি।

কী বলছেন শঙ্খ ঘোষ?—যে-কোনো সমস্যা-সংকটে বাংলার নাগরিক সমাজের এই এক তাকিয়ে থাকা ছিল। সেই জায়গাটা ফাঁকা। সমসময়ের হলাহল থেকে মুখ লুকিয়ে কালোত্তীর্ণ রচনায় মগ্ন থাকার ছলনা তিনি করেননি। শঙ্খ ঘোষের স্নেহে-প্রশ্রয়ে লালিত হয়েছেন অনেকেই, কিন্তু অনেকেই হেঁটেছেন তাঁর চর্যার বিপরীতে। বুদ্ধিজীবী অভিধাটি আজ আর গৌরবের নয়। কবিতার সেই শিশুটিকে আর কোত্থাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

জন্ম ১৯৮৩, পশ্চিম মেদিনীপুর-এর হলদি নামের গ্রামে। উচ্চশিক্ষার্থে কলকাতায় আসা। ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক। অদ্যাবধি প্রকাশিত কবিতার বই ৯টি: যতদূর বৈধ বলি (সপ্তর্ষি প্রকাশন, ২০০৯), কোনো একটা নাম (কৌরব, ২০১৩), পতনমনের কুর্সি (সপ্তর্ষি প্রকাশন, ২০১৬), সন্দেহপ্রসূত কবিতাগুচ্ছ (আঙ্গিক-মাস্তুল যৌথ উদ্যোগ, ২০১৭), আলো দেখার নেশা (ধানসিড়ি, ২০১৯), রাস্তার কোনো ছুটি নেই (সিগনেট প্রেস, ২০২০), অনিমিখ পাত্র-র কবিতা (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০২২), আমি অনেকের চিৎকার (মাস্তুল, ২০২৪), পাশে বসার চেতনা (সঙ্ঘমিত্রা হালদারের সঙ্গে যৌথ সংকলন, শব্দ কলকাতা পাবলিশিং হাউজ, ২০২৫)। দ্বিভাষিক অনলাইন সাহিত্য জার্নাল duniyaadaari.com-এর সহ-সম্পাদক। কবিতা অনুদিত হয়েছে ইংরাজি, ইতালিয়ান, চাইনিজ ইত্যাদি ভাষায়। নিজেও অনুবাদের কাজে আগ্রহী। কবিতাপ্রয়াসী ছাড়া তাকে গাছপাগল ও পাহাড়প্রেমিক বলা যেতে পারে।

অন্যান্য লেখা