preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
নাট্য সমালোচনা ‘বিদায়বরণ’
রিভিউ

নাট্য সমালোচনা ‘বিদায়বরণ’

আমরা অনেকেই নিজেদের টিকে থাকা নিয়ে খুশি নই। তবু আমরা টিকে থাকি। হতাশা, একঘেয়েমি, ক্লান্তিকর জীবনকে সঙ্গী করে। কখনও চরম সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ব্যর্থ হই। কখনও এই অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়েও ভালোবাসার অন্বেষণ করি। আমাদের এই জীবনকে কেন্দ্র করেই আন্তন চেকভের ‘আঙ্কল ভানিয়া’ অবলম্বনে করুণাময়ী সপ্তর্ষির নতুন প্রযোজনা ‘বিদায়বরণ’। নাটকটি দেখে এসে লিখলেন সায়ন দত্ত।

‘Anything that can go wrong, will go wrong’… ক্লান্তিকর, একঘেয়ে, হেরে যাওয়া জীবনে যখন হতাশা তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী হিসেবে আপনাকে বেছে নিতে চাইছে, তখন আপনিই বা দূরে থাকেন কী করে? জীবন তো পক্ষপাতের খেলা। ফলত, জীবনও সাজিয়ে ফেলে তার স্বপক্ষে যুক্তি। এই পর্যায়ে এসে উপরে বলা ‘মারফিজ ল’-কে বেদবাক্য বোধ হতে পারে। কিন্তু!... আমাদের অনেকেই নিজের টিকে থাকা নিয়ে খুশি নই। আন্তন চেকভ সেই সহজ অথচ জটিল কথাটি টের পেয়েই সম্ভবত ১৮৯৭ সালে লিখেছিলেন ‘Uncle Vanya’। যদিও জানা যায় এই নাটকের উৎস সন্ধানে আরও কিছুটা পেছনে যেতে হবে ‘The Wood Demon’ (১৮৮৯)-এর হাত ধরে। এসব কথা আপাতত থাক। মূল কথাতে আসি। সময় ও অবস্থানের চাপে থাকা অসুখী মানুষজনের কাহিনি নিয়েই ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যায় ঢাকুরিয়ার অবন মহলে প্রথম মঞ্চায়ন হলো আন্তন চেকভের ‘Uncle Vanya’ অবলম্বনে করুণাময়ী সপ্তর্ষির নাটক ‘বিদায়বরণ’। নাটকটির সময়সীমা ১০ মিনিটের বিরতিসহ ২ ঘণ্টা।

নাটকটি বিষয়ে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে এর অনুবাদ নিয়ে দু-এক কথা বলতেই হয়। এটি সাধারণ ভাবানুবাদ নয়। নাটকের কাহিনি মূল রচনার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে। চরিত্রের নামকরণে দেশিকরণের ঝোঁক দেখা যায়, যা বিশেষ সার্থক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘Uncle Vanya’ নাটকটির একটি বিস্ময়কর ইতিহাস রয়েছে, তা নিয়ে দু-এক কথা না বললেই নয়। চেকভ ১৮৮৯ সালে ‘The Wood Demon’ নামে একটি পাঁচ অঙ্কের রোমান্টিক কমেডি রচনা করেছিলেন, যা ২৭ ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে মস্কোর আব্রামোভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়। কিন্তু প্রথম রাতেই প্রতিদ্বন্দ্বী থিয়েটারের অভিনেতারা বক্স থেকে শিস দিয়ে, হাততালি দিয়ে বাধা সৃষ্টি করে। অভিনেতারা সংলাপ ভুলে যান, অভিনেত্রীরাও ছিলেন অপ্রস্তুত। ফলে বলা বাহুল্য দর্শকরা এই প্রযোজনার তীব্র সমালোচনা করেন। ১. মাত্র তিনটি প্রদর্শনীর পর নাটকটি বন্ধ হয়ে যায়। ২. এই ঘটনার জন্য চেকভ নাটকটিকে নিজের রচনাবলির প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত করতেই অস্বীকার করেন। এই ব্যর্থতার পর, ১৮৯০ সালে চেকভ তিন মাসের কষ্টকর যাত্রা শেষে সাখালিন দ্বীপে পৌঁছান। সেখানে রুশ সাম্রাজ্যের সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরীয় কারাগার উপনিবেশে তিনি চার মাস ধরে অমানবিক জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করেন। ৩. সমালোচকরা মনে করেন, এই যাত্রাই চেকভের জীবনদর্শন ও শিল্পদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে (সঠিক তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে অধিকাংশ সমালোচক ১৮৯৬ সালের কথা বলেন) চেকভ ‘The Wood Demon’ নাটকটিকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্লিখন করেন এবং তা চার অঙ্কের নাটক ‘Uncle Vanya’ হিসেবে রূপান্তরিত করেন। ৪. এই রূপান্তরে চেকভ অনেক চরিত্র বাদ দেন। আগের দুই ডজনের বেশি চরিত্র থেকে মাত্র নয়টি চরিত্রে নামিয়ে আনেন তিনি। ৫. তিনি মূল নাটকের আত্মহত্যার দৃশ্যকে পরিবর্তন করে ব্যর্থ হত্যা প্রচেষ্টায় রূপান্তরিত করেন এবং সমাপ্তির পরিবর্তন ঘটিয়ে এক অস্পষ্ট, অসমাপ্ত পরিণতি যোগ করেন। ৬. বিশেষভাবে, তিনি দুটি ভিন্ন চরিত্রকে (একজন মদ্যপ প্রলোভক এবং পরিবেশবাদী ‘কাঠ-দৈত্য’কে) একত্রিত করে ডক্টর আস্ত্রভ চরিত্র সৃষ্টি করেন। যা নাটকের সবচেয়ে জটিল চরিত্র হয়ে ওঠে। ৭. ‘বিদায়বরণ’-এ এই ডক্টর আস্ত্রভই হয়ে উঠেছেন ডাক্তার অরণ্য। উভয় ক্ষেত্রেই চরিত্রটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

এবার আসি কাহিনির প্রসঙ্গে। আন্তন চেকভের কাহিনির মূল সুতো যেখানে চালিত হয়েছিল কিছু হেরে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া মানুষের আলস্যময় অবসর জীবনের অপরিবর্তনশীল পরিণতিকে পাথেয় করে, সেখানে ‘বিদায়বরণ’ যেন দর্শকের কাছে বার্তা দিয়ে যায় কখনও নীরবে, কখনও-বা সংলাপের মুনশিআনায়। মূল নাটকে প্রফেসর সেরেব্রিয়াকভ তাঁর প্রথম স্ত্রীর সম্পত্তিতে বাস করেন, যা পরিচালনা করেন ভানিয়া এবং সোনিয়া। প্রফেসরের দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়েলেনার আগমনে সকলের জীবনে ঘটে যায় আলোড়ন। ‘বিদায়বরণ’ এই কাঠামোকে অনুসরণ করলেও তাতে যুক্ত করেছে নিজস্ব ভাষ্য।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

নাটক জুড়ে আধুনিক নগর সভ্যতা, এই সভ্যতার ফলে বেড়ে ওঠা একদল ফাঁপা মানুষ এবং এই ফাঁপা মানুষদের মাঝে বুদ্‌বুদের মতো গড়ে ওঠা ফাঁপা সম্পর্কের বিরুদ্ধে তীব্র কটাক্ষ রয়েছে। কঠিনকে সহজ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার তাগিদেই একদিন গোড়াপত্তন হয়েছিল নগর সভ্যতার। তাই স্বভাবতই এই নগর সভ্যতার গর্ভে যে মানুষ বেড়ে উঠবে, তার মননে, চিন্তনে প্রয়োজনীয়তাই যে একমাত্র বিষয় হয়ে উঠবে … তা নাটকে প্রফেসর সমর্পণ চরিত্রকে দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায়। প্রফেসর সমর্পণ হলেন সেই মানুষ যিনি আজীবন বই লিখে খ্যাতি অর্জন করেছেন, কিন্তু জীবনের সন্ধ্যাবেলায় এসে তাঁর নিজের সৃষ্টির অসারতা তাঁকে তাড়া করে। তিনি ভাস্করের পরিশ্রমে গড়া সম্পত্তিতে বাস করেন, কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতাবোধ তাঁর মধ্যে নেই। চেকভ প্রফেসরের এই স্বার্থপরতাকে কখনও সরাসরি নিন্দা করেন না, বরং তাঁকে উপস্থাপন করেন একজন ব্যর্থ, রুগ্‌ণ, অসুখী মানুষ হিসেবে—যার রাগ, যন্ত্রণা আসলে নিজের প্রতিই। নাটকে চরিত্রটি যথাযথ।

এরই উলটো দিকে যেন প্রাচীন জীর্ণতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাস্কর চরিত্রটি। ভাস্কর হলেন চেকভের মূল নাটকের ‘আঙ্কল ভানিয়া’—যে মানুষটি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন প্রফেসরের সংসার চালাতে, কিন্তু বুঝতে পারেন তাঁর ত্যাগ ছিল অর্থহীন। তিনি প্রফেসরকে মনে করতেন মহান পণ্ডিত, কিন্তু কাছে এসে দেখেন তিনি একজন সাধারণ, স্বার্থপর মানুষ মাত্র। চেকভ ‘Uncle Vanya’-তে এই উপলব্ধির মুহূর্তটিকে ভীষণ নাটকীয় করে তোলেন। ভানিয়া প্রফেসরকে গুলি করতে চান কিন্তু ব্যর্থ হন। এই ব্যর্থ হত্যার চেষ্টা আসলে যেন ভানিয়ার নিজের ব্যর্থ জীবনের রূপক। ‘বিদায়বরণ’-এও এই মুহূর্তটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নগর সভ্যতার আগ্রাসনে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত অরণ্য। আর সেই অরণ্যেরই মুখপাত্র হয়ে যেন নাটকে এসেছে ডাক্তার অরণ্য চরিত্রটি। অরণ্য গাছেদের সঙ্গে কথা বলে, তার একাকী জীবনে গাছেরাই যেন তার সঙ্গী। চেকভের মূল নাটকে ডক্টর আস্ত্রভ উনিশ শতকের শেষভাগে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—বন কাটা মানে সভ্যতার ধ্বংস। তিনি বলেছিলেন, বন যখন চলে যায়, তখন মানুষের নৈতিকতাও ক্ষয়ে যায়। এই দার্শনিক অবস্থান আজকের পরিবেশ আন্দোলনের পূর্বাভাস। ‘বিদায়বরণ’-এ ডাক্তার অরণ্যের মাধ্যমে এই বার্তা প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যদিও সমকালীন পরিবেশ বিপর্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে নাটকে। নগর সভ্যতায় সীমাহীন বিকল্প মানুষকে সিদ্ধান্তহীন করে দেয়—তারই যেন প্রতীক হয়ে উঠেছেন প্রফেসর সমর্পণের দ্বিতীয় স্ত্রী জাগরী। মৃণালকান্তি, মানস—স্থাবর প্রাচীন সময়ের প্রতীক। তাই নাটক জুড়ে মানসের নিজস্ব অবস্থান মেলে না, সে মনে করে প্রফেসর সমর্পণ যা বলবে ঠিকই বলবে। একই কথা মৃণালকান্তি বাবুর ক্ষেত্রেও খাটে। সুরভি, সরল জীবনের প্রতীক। এদের সকলের মধ্যে একটিই মিল—কেউ তার অবস্থানে খুশি নয়। আর সেই বিষাদ অবস্থা সুরভি, ভাস্কর, জাগরীর নাটকের মনোলগে, বাকিদের সংলাপে স্পষ্ট। ফলে নাটকে থাকা চরিত্ররা হয়ে ওঠে রক্ত-মাংসের।

এই পর্যায়ে আলোর ব্যবহারের প্রশংসা না করলেই নয়। মনোলগের সময় মঞ্চ জুড়ে আলো-আঁধারির খেলা এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করে। বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয় নীল আলো। নীল আলো যেমন আকাঙ্ক্ষার কথা মনে করায়, ঠিক তেমনি এটি তো বেদনা এবং বিষণ্ণতারও প্রতীক। মঞ্চ পরিকল্পনাও সাবলীল—সীমিত উপকরণে যেভাবে একটি জরাজীর্ণ প্রাসাদের ভগ্নদশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়।

এবারে নাটক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সম্পর্ক ও না-সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। সুরভি সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে। ফলত, তার হৃদয়কুসুমকে হৃদয়বাণে বিদ্ধ করতে যে মন চাইবেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ হেন পরিস্থিতিতে অরণ্যের মতো সর্বগুণ সম্পন্ন নায়কোচিত এক চরিত্র থাকলে, কী আর করা যায়! আবার প্রফেসর সমর্পণের স্ত্রী জাগরী বয়সে প্রফেসরের থেকে অনেকটাই ছোটো। প্রফেসরের প্রতি জাগরীর এক প্রকার শ্রদ্ধা আছে। আবার অপরদিকে মরুময় ভাস্করের অবসন্ন জীবনে কিছুদিনের জন্যই আসা জাগরী যেন মরূদ্যান। নাটক যত এগিয়ে চলে, সম্পর্কের রসায়নের জটিল জাঁতাকলে দর্শক যেন ততই নিমজ্জিত হতে থাকে। তবে এক্ষেত্রে যে কথা বলতেই হয়, অরণ্য, সুরভি এবং জাগরীর সংলাপ বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় পুতুল নাচের ইতিকথার প্রসঙ্গ। মানুষকে সত্যিই কি কোনো অদৃশ্য সুতোর দ্বারা বাঁধা! তারই আঙুলের নাচনে সবাই নেচে চলেছে! আমাদের জিজ্ঞাসু মনকে আরও খানিকটা উসকে দেয় নাটকটি। মনস্তত্ত্বের কঠিন তত্ত্বগুলোর কথা খানিক মনে আসে বই-কি, তবে সবকিছু তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। নাটকের মধ্যে চরিত্রদের এই পারস্পরিক মানসিক মিথস্ক্রিয়া দর্শকের কাছে অবশ্যই উপভোগ্য।

চেকভের নাটকের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল তাঁর নাটকে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে, কিন্তু আদতে কেউ কারও কথা শোনে না। প্রত্যেকে তার নিজ অবসাদে, নিজ আকাঙ্ক্ষায় এতটাই নিমগ্ন যে যোগাযোগ হয় না, হয় শুধু সংলাপের আদান-প্রদান। এই বৈশিষ্ট্য চেকভকে করে তুলেছিল আধুনিক নাটকের অগ্রদূত। তিনি দেখিয়েছিলেন যে নাটকে বড়ো ঘটনার প্রয়োজন নেই। জীবনের ছোটো ছোটো মুহূর্ত, অব্যক্ত আবেগ, নীরবতার ভার… এগুলোই হতে পারে নাট্যরসের উৎস।

তবে নাটকটির বেশ কিছু জায়গায় খানিক খামতি চোখে পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় (মূলত পুরোনো ঘড়ি এবং বাড়ি বিক্রির প্রসঙ্গ) সংলাপ বেশ দীর্ঘ বোধ হয়েছে, যা নাটকের স্বাভাবিক গতিকে বাধাপ্রাপ্ত করেছে। এ ছাড়াও আবহে বেশ কিছু ফাঁক চোখে পড়ে। মূলত বৃষ্টির দৃশ্যে ঝড়ের আওয়াজ দৃশ্যের শুরুতে শোনা গেলেও তা হঠাৎই থেমে যাওয়া কেমন যেন কানে অসামঞ্জস্য লাগে। সম্পূর্ণ নাটক জুড়ে বারবার বৃক্ষচ্ছেদন, নগরায়ণের প্রসঙ্গ এলেও সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা নাটকে একবারও আসেনি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আরাবল্লী পাহাড়ের এক নতুন সংজ্ঞা গ্রহণ করে। ফলে পর্বতমালার ৯০% অংশ চলে যায় আইনি সুরক্ষার বাইরে। (৮, ৯, ১০) একইভাবে, ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিলে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঞ্চা গচিবাওলি এলাকায় ৪০০ একর বনভূমি নির্বিচারে উচ্ছেদ করা হয় আইটি পার্ক নির্মাণের জন্য। যার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। (১১, ১২, ১৩) তাই বলাবাহুল্য নাটকের চরিত্ররা তাদের স্থানে এবং কালে যথাযথ হলেও তারা কেউই সমকালীন হয়ে উঠতে পারেনি। মনে রাখতে হবে চেকভের ‘Uncle Vanya’ পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে প্রথম দিকের নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম। ডক্টর আস্ত্রভের চরিত্রে বনাঞ্চল ধ্বংস এবং পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে যে উদ্‌বেগ প্রকাশিত হয়, তা উনিশ শতকের শেষভাগে ছিল যুগান্তকারী। ‘বিদায়বরণ’ যদি এই বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারত, নাটকটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠত।

সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গিয়ে অসীমকে ছোঁয়ার চেষ্টাই শিল্পকে শিল্প করে তোলে। নাটকটি পারতপক্ষে তা করতে সক্ষম হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় সংলাপ অসাধারণ। নাটকের একটি বিশেষ দৃশ্যে সম্পর্কে দূরত্বের ইঙ্গিতবাহক হিসেবে প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। নগর সভ্যতার ননবায়োডিগ্রেডেবল অভিশাপ তো এই প্লাস্টিক। যার ক্ষয় আছে, কিন্তু শেষ নেই। এই রূপকল্প সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়ে সম্পর্কের ভঙ্গুরতায়, দূরত্বে। নাটকটিতে শারীরিক অভিনয় বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়নি। তবে নাটকের শুরুতেই ডাক্তার অরণ্যের চরিত্রে অভিনেতা দীপ কাইজার বসুর অভিনয় বিশেষভাবে মনে থাকবে। তাঁর সংযত অভিব্যক্তি, ক্লান্ত কণ্ঠস্বর এবং নিঃসঙ্গতার প্রকাশ চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। নাটকটির নির্দেশক সমুদ্রনীল সরকার নাটকটিতে ভাস্করের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনিও বিশেষ প্রশংসার দাবিদার—তাঁর চরিত্রে এক ব্যর্থ, পরাজিত মানুষের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। পুরো নাটকটিতে দুটি গান ব্যবহৃত হয়েছে। নাটকের প্রেক্ষাপটে গানদুটি যথাযথ।

মানসিক দোলাচল, সিদ্ধান্তহীনতা, অস্থিরতা—জাগরী চরিত্রের সংলাপের মধ্য দিয়ে বারবার ফুটে উঠেছে। আর চরিত্রটিকে যথাযথভাবে মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছেন স্মিতা চক্রবর্তী। সুরভি চরিত্রে অভিনেত্রী নম্রতা রায়ের উচ্চারণে স্পষ্টতা, অভিনয় দক্ষতা এবং মৃণালকান্তি চরিত্রে অভিনেতা তপন পুরকাইতের নাটকের শেষার্ধে কবিতা পাঠ দর্শককে মুগ্ধ করবে। চেকভের নাটকের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হল শেষের দিকে আসা সোনিয়ার মনোলগ—‘Uncle Vanya’-তে যে মনোলগে ব্যর্থ জীবনের মধ্যেও আশার এক ক্ষীণ আলো জ্বালানো হয়। ‘বিদায়বরণ’-এও সেই মুহূর্তটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, এবং তা পরিবেশনে যথাযথ আবেগময়তা লাভ করেছে।

থিয়েটার একটি দলগত শিল্প—নাটকটি দেখলে টের পাওয়া যায়। প্রতেকেই তার নিজ নিজ কাজের সেরাটাই দর্শককে উপহার দিয়েছেন। আলো পরিকল্পনা, মঞ্চ নকশা, পোশাক… সব কিছুতেই সততার ছাপ। অবশ্য কিছু প্রযুক্তিগত উন্নতি সম্ভব। প্রতিটি শিল্পীর নিরলস ও সৎ প্রচেষ্টা নাটকটিকে সফল করে তুলেছে।

করুণাময়ী সপ্তর্ষির এই প্রযোজনা প্রমাণ করে যে চেকভের নাটক আজও প্রাসঙ্গিক, আজও তা আমাদের কথাই বলে। মানুষের হতাশা, অপূর্ণ স্বপ্ন, জীবনের অর্থহীনতার খোঁজ—এসব তো কালাতীত বিষয়। আজকের ব্যস্ত, প্রতিযোগিতামূলক, ডিজিটাল যুগেও মানুষ ভাস্করের মতোই জীবন নিয়ে প্রশ্ন করে। সুরভির মতোই খোঁজে ভালোবাসা। জাগরীর মতোই দোদুল্যমান থাকে সিদ্ধান্তে এবং অরণ্যের মতোই দেখে প্রকৃতির ধ্বংস, মানুষের নৈতিক অবক্ষয়। এই সর্বজনীনতাই চেকভকে মহান করে তুলেছে। এবং ‘বিদায়বরণ’ সেই মহত্ত্বের একটি ছোট্ট প্রতিফলন। ‘বিদায়বরণ’ নাটকটির জন্য রইল একরাশ শুভকামনা। নাটকটি দেখুন। করুণাময়ী সপ্তর্ষির আরও নতুন প্রযোজনা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

গ্রন্থপঞ্জি:
Rayfield, Donald. Anton Chekhov: A Life. Evanston, IL: Northwestern University Press, 2000.
Rayfield, Donald. Chekhov's Uncle Vanya and The Wood Demon. London: Bristol Classical Press, 1995.
Gilman, Richard. The Making of Modern Drama. New Haven: Yale University Press, 1987.
Bentley, Eric. “Craftsmanship in Uncle Vanya.” Anton Chekhov's Plays. Trans. and ed. Eugene K. Bristow. New York: Norton, 1977.
Benedetti, Jean. The Moscow Art Theatre Letters. London: Methuen Drama, 1991.


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। এখন লেখালেখি আর চরিত্র অভিনয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। “Miles to go before I sleep.”

অন্যান্য লেখা