নীল আলোর রহস্য, ভণ্ড সাধুর ছদ্মবেশ, লোভ, প্রতিশোধ আর এক অলৌকিক জন্তুর অভিশপ্ত ইতিহাস—এই গল্পে গ্রামবাংলার বাস্তবতার সঙ্গে মিশেছে ভয়, রহস্য ও অন্ধকার ফ্যান্টাসির শিহরন। ‘জেলার সাহিত্য’ প্রকল্পে এই মাসের নির্বাচিত জেলাগুলি হল বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া। আজ প্রকাশিত হল বীরভূমের গল্পকার ভাস্কর পালের গল্প।
।। অনিরুদ্ধ।।
শ্যাওলা বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—“এই বাচ্চাটা কে?”
আমি বললাম—“ও আমার ভাগনি, ভীষণ দুষ্টু। গুরুদেব আপনি কি এখন শ্যাওলাটা নেবেন?”
বাবা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। হাবভাব এমন যেন কোনো মহান সিদ্ধপুরুষ। শ্যাওলা বাবা আমাদের গ্ৰামে এসেছেন তা প্রায় দুই বছর হল। সারা গায়ে শ্যাওলা মেখে থাকেন বলে অমন একটা আজগুবি নাম। তবে বাবার কাছে ওই নামে ডাকার জো নেই, একেবারে কাস্তে নিয়ে তেড়ে আসবেন। বলা যায় না, ছোটোখাটো অভিশাপও দিয়ে দিতে পারেন।
সে যাইহোক, আমি বাবার চরণে শ্যাওলা অর্পণ করলাম। বাবা শ্যাওলাটা গায়ে একটু মেখে নিয়ে বললেন—“তোর কী সমস্যা?”
আমি বললাম—“ আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি লালটুদার সাথে এসেছি আপনাকে দর্শন করার জন্য।”
আমার কথা শুনে বাবার মুখে প্রসন্নতার আভা ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে বললন—“আচ্ছা, আমি কয়েকদিনের জন্য একটু বেরোব। তোরা যেন আস্তানা বেদখল হতে দিস না।”
লালটুদা অবাক হয়ে বলল—“ কেন, কোথায় যাবেন আপনি?”
“মহাকাল যেদিকে নিয়ে যাবেন সেদিকেই যাব। বাবাদের একজায়গায় পড়ে থাকতে নেই রে! তবে আমি ফিরে আসব। তোদের উপর মায়া পড়ে গেছে।”—বাবা কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কথাগুলো বললেন।
লালটুদা নিরাশ গলায় বলল—“আপনি যাচ্ছেন কবে? মা বলছিল যাওয়ার আগেই যদি আমাদের বাড়িতে সেবা গ্ৰহণ করতেন তাহলে বেশ হত।”
আবার খুশির ঝিলিক দেখতে পেলাম বাবার চোখে। দেখতে পাওয়ার কথাও বটে, অনেকদিন পর হয়তো ভালো-মন্দ কিছু জুটবে।
বাবা বললেন—“বেশ তো। কাল তাহলে আয়োজন কর। পরশু দিন তাহলে বেরিয়ে পড়ব।”
লালটুদা আর আমি ভক্তিভরে প্রণাম করলাম গুরুদেবকে। হৃদ্ধিকে দেখলাম সে আমার কাছে নেই। গুটি গুটি পায়ে সে বাবার কুটিরের কাছে চলে গেছে। আমি তাকে নিয়ে আসার জন্য উঠতে যাব তখনই বাবা তাড়াহুড়ো করে বললেন—“তোমাকে আর উঠতে হবে না। আমিই ওকে নিয়ে আসছি।”
বাবা কোনোরকমে হৃদ্ধিকে নিয়ে এলেন। অচেনা মানুষ, তারপর আবার গায়ে শ্যাওলা, হৃদ্ধি মেনে নেবে কেন! যাইহোক, তারপর আমরা বাড়ি ফিরে এলাম।
২
।। গুরুদেব।।
শ্যাওলা বাবা তার মহামূল্যবান জিনিসটা খুঁজে পাচ্ছেন না। অথচ লালটুর ঘরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত জিনিসটা ছিল। তাহলে কেউ কি সরিয়ে নিল সুযোগ পেয়ে? কিন্তু কেউ তো জানত না, কাউকেই এ ব্যাপারে কিচ্ছু বলেননি! তা ছাড়া ওটা দেখতে তো একটা সাধারণ টর্চের মতোই, কেউ কি নেবে?
রাত সাড়ে আটটা বাজে। চারিদিক মোটেই নিস্তব্ধ নয়, একটা ঝোড়ো হাওয়া বইছে। সাথে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। আজই কেটে পড়তে হবে, তা না হলে… ।
ফোনটা এল তখনই। বাবা স্ক্রিনে দেখতে পেলেন টুবাই-এর নাম। ফোন রিসিভ করতেই টুবাই ছটফট করতে করতে বলল—“গুরুদেব, আপনার ছোটো টর্চটা আমি জঙ্গলের রাস্তায় কুড়িয়ে পেলাম। শুনলাম আপনি চলে যাচ্ছেন। আপনি ডেরাতেই আছেন তো?”
কথাটা শুনতেই আশঙ্কার কালো মেঘে ঢেকে গেল শ্যাওলা বাবার মুখ। টুবাই আবার টর্চটা জ্বালেনি তো ! শ্যাওলা বাবা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল—“হ্যাঁ, তুমি চলে এস। আমি আজই ন-টার ট্রেনে বেরিয়ে যাচ্ছি।”
“আচ্ছা, আমি আসছি।”—ফোন কাটল টুবাই। যতক্ষণ না নিজের জিনিস নিজের কাছে ঠিকঠাক না আসছে ততক্ষণ যেন শান্তি পাচ্ছেন না বাবা। অমন একটা জিনিস হারিয়ে গেলে কারই বা মাথার ঠিক থাকে! জানাজানি হয়ে গেলে হয়তো এ গ্ৰামেই আর আসা হবে না। আসা না হলে সে অন্য কোথাও চলে যাবে, সব কিছু ভেবে রাখা আছে। আসলে এসব কাজ করতে হলে অনেক দূর পর্যন্ত আগে ভেবে নিতে হয়। তবে এমন অবাস্তব কেস বেশিদিন স্থায়ী হয় না। আর নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে তো সে পায়ের উপর পা দুলিয়ে… ।
“গুরুদেব।”
টুবাই ডাকছে, চিন্তায় ছেদ পড়ল বাবার। কিছুক্ষণ পর বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বাইরে ভয়ানক বৃষ্টি পড়ছে। টুবাই ছাতা মাথায় এসেছে।
“খুব সাহায্য করলে ভাই। তুমি একটু দাঁড়াও, তোমার সাথেই স্টেশন চলে যাব। আমার সমস্ত কিছু গোছানো প্রায় কমপ্লিট।”—বাবা কথাগুলো বলে আবার কুটিরে ঢুকে পড়লেন। বৃষ্টিটা বেশ ঝমঝমিয়ে এসেছে। টুবাই ভাবতে লাগল এতটা রাস্তা সে কীভাবে যাবে! একে তো অনেক মাঠ পেরোতে হবে, তারপর আবার গুরুদেবকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।
ভাবনার মাঝেই গুরুদেব বেরোলেন মুখে একটা হাসি নিয়ে, কাঁধে ঝুলিয়েছেন একটা বিশাল ব্যাগ। ওখানেই যা থাকার সব আছে। ছাতাটা মাথার উপর গুরুদেব মেলে ধরে টুবাই-এর সাথে পথ চলতে লাগলেন।
৩
।। অনিরুদ্ধ।।
লালটুদা জিনিসটা আমাকে দেখাল। জিনিসটা আর কিছুই নয়, একটা টর্চ। ছোটো একটা বোতাম ব্যাটারির টর্চ। একসময় বাবার কাছে এই বাচ্চা টাইপ টর্চের জন্য কত বায়না করেছি। তবে এই টর্চের বিশেষত্ব হল এটা থেকে নীল আলো বেরোয়। আমি ভেবে পেলাম না ,একটা পুচকে টর্চ, এভাবে ঘরে ডেকে এনে দেখানোর কী আছে!
আমি সবে টিউশন থেকে ফিরে এসে মুড়ি খেতে বসেছি তখনই লালটুদার ফোন। এমনভাবে ফোনে বললো যেন গুরুতর কিছু হয়ে গেছে। কোনোমতে চারটি গিলে হন্তদন্ত হয়ে লালটুদার ঘরে এসেছি। লালটুদার টর্চটার প্রতি অমন আগ্ৰহ আর উত্তেজনা দেখে আমার ভারি হাসি পাচ্ছিল।
অনেকক্ষণ টর্চ নিয়ে নানান কেরামতি দেখানোর পর লালটুদা বলল—“এই টর্চটা আমি গুরুদেবের কাছে থেকে চুরি করেছি জানিস!”
কথাটা শুনে আমি জাস্ট হতভম্ব হয়ে গেলাম, লালটুদা বলে কি! আমার মুখের ভাব দেখে মনের কথা পড়ে ফেলে সে বলে—“ওইজন্যই তো গুরুদেবকে সেবাগ্ৰহণের জন্য আমন্ত্রণ করেছিলাম। সবই প্ল্যানমাফিক, বুঝলি!” বলার পর লালটুদা কেমন একটা ম্যাসমেসে হাসি হাসে। আমি ভেবে পাই না একটা সামান্য টর্চ চুরি করে ওর কী এমন লাভ হবে! তাই ওকে বলেই ফেলি কথাটা।
লালটুদা রহস্যময় হাসি হেসে বলল—“ওই নীল আলোর অনেক কেরামতি ভাই। পারলে একবার রাতের দিকে আসিস।”
আমি কৌতূহল চাপা না রাখতে পেরে আবার বললাম—“আচ্ছা লালটুদা, টর্চটার কি ম্যাজিক্যাল পাওয়ার আছে?”
“সব বুঝতে পারবি সময়ে। আমাদের গুরুদেব কি কম জিনিস নাকি? অনেক রিসার্চ করেছি এই ব্যাপারে।”—লালটুদা বিজ্ঞের মতো বলল।
“কীসের রিসার্চ”—আমি আবার প্রশ্ন করি। কিন্তু প্রশ্ন করলেও জবাব পাওয়া যায় না। কী যেন একটা ভাবে লালটুদা।
আমার মনেও নানা প্রশ্ন উঁকি মারছে। কী এমন X-factor আছে টর্চটার মধ্যে যে গুরুদেবের কাছ থেকে সেটা চুরি করতে হল। আর যদি ম্যাজিকাল কিছু থেকে থাকে তাহলে গুরুদেবের নিশ্চয়ই সেটা খুব প্রিয় ছিল। তাহলে ওঁর এখন অবস্থা কী?
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম— “আচ্ছা, শ্যাওলা বাবা কিছু বুঝতে পারেননি?”
“তিনি আর কেমন করে বুঝবেন? টুবাইকে তো ওইজন্যই পাঠিয়েছিলাম ওইরকমই একটা টর্চ গুরুদেবকে দিয়ে আসতে যাতে তিনি হারিয়ে যাওয়া টর্চ নিয়ে দ্বিধামুক্ত থাকেন। টুবাইকে বলতে বলেছিলাম যে সে এটা রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে। আর সে সেটাই বলেছে, আর টর্চটা গুরুদেবকে দিয়ে দিয়েছে।”—কথাগুলো বলে বেশ একটা আনন্দ পায় লালটুদা। মনে মনে আমি লালটুদার শয়তানি বুদ্ধির তারিফ না করে পারলাম না। বললাম—“আচ্ছা, তুমি যে টর্চটা গুরুদেবকে দিয়েছ, সেটা থেকেও কি নীল আলো বেরোয়?”
লালটুদা বিস্ফোরণের মতো একটা হাসি হেসে বলল—“তুই তো আচ্ছা তারকাটা। নীল আলো না বেরোলে কি টর্চটা গুরুজি নেবে?”
আমি আর বেশি ঘাঁটাতে চাইলাম না। তবে এই নীল আলোর কেরামতি দেখার ইচ্ছা আরও বেড়ে গেল।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৪
।। গুরদেব ওরফে তুহিন।।
বেশ রাত। গ্ৰামটার একটা দোকানে এসে পৌঁছালেন গুরুদেব। খুব ভদ্রস্থ একটা দোকান, সবরকম আছে। গুরুদেব দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চটাতে বসলেন, তারপর টর্চটা বের করলেন। দোকানের কিছু দূরে একটা কুকুর বসেছিল, সেইদিকে তাক করে গুরুদেব টর্চের নীল আলো ঘোরাতে লাগলেন। কিন্তু পাঁচ-দশ মিনিট ঘোরানোর পরেও কুকুরের হাবেভাবে কোনো পরিবর্তন এল না। গুরুদেবের গোটা শরীর রাগে-বিরক্তিতে রি-রি করে উঠল।
“ভাইপো, কিছু নেবে? আমি দোকান বন্ধ করে দেব।”—দোকানের মাঝবয়সি ভদ্রলোক বলে উঠলেন। ভদ্রলোকের গলায় হঠাৎ ভাইপো সম্বোধন শুনে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন গুরুদেব। ভদ্রলোক বলবে নাই-বা কেন, কারণ এখন তো তিনি দিব্যি তারুণ্যের বেশে আছেন। আসলে এটাই তাঁর আসল বেশ, নেহাত জায়গাভেদে নানান ভেক ধরে আসতে হয়। দাড়ি কামিয়ে, চুলে একটা ঝিঙ্কু কাট দিয়ে তাকে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে। সেসব তো ঠিকই আছে, কিন্তু তাঁর টর্চ এখন আর খেল দেখাচ্ছে না কেন?
সে বলল—“হ্যাঁ কাকা, একটা ক্রিম বিস্কুট দেন তো।”
দোকানি সঙ্গে সঙ্গে বয়াম থেকে ক্রিম বিস্কুট বের করে দিলেন। তারপর বললেন—“তোমার নাম কী? কদ্দুর যাবে?”
“আমার নাম তুহিন। আমি আপনাদের ওখানেই যাব।”
তুহিনের মুখের কথাটা শুনতেই দোকানির চোখে-মুখে আতঙ্কের ভাব স্পষ্ট হয়ে গেল। তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে এসে তুহিনের কাছে বেঞ্চে এসে বসলেন। তারপর খুবই ঘাবড়ানো গলায় বললেন—“ভাইপো, আজ শনিবার। আজ ওগ্রামে না যাওয়াই মঙ্গল। খুব সামলে থাকতে হয় আমাদের এই দিনটায়।”
তুহিন ভীষণ অবাক হয় দোকানির কথা শুনে। হাসতে হাসতে সে বলে—“কেন আজ ভূতের উপদ্রব শুরু হবে নাকি ওখানে?”
দোকানি একবার তুহিনের দিকে বিরক্তি মুখে তাকান, তারপর বলেন—“শনিবার অর্থাৎ আজকের দিনে আমাদের গ্ৰামে কোনো লোক থাকে না। এই দিনটায় একটা অদ্ভুত জন্তুর আবির্ভাব ঘটে। আর সে, আর সে খুব ভয়ানক! গ্ৰামের লোক কোনো-না-কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে শনিবারের রাতটা কাটায়। এই যে দোকানটা দেখছ, এখানে থেকে বেশ খানিকটা দূরে আমাদের গ্ৰাম। আমি তো দোকান বন্ধ করে দিদির বাড়ি চলে যাব।”
“কিন্তু কারণটা কী? এভাবে ঘরদুয়োর ফেলে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কোনো মানে হয় কি?” —তুহিন বলে ওঠে।
“এখানে আলোচনা করাটা মোটেই ঠিক হবে না। যদি ও শুনতে পায়, তাহলে…”—কথা শেষ করে না দোকানি। কাছেই বসে থাকা কুকুরটার দিকে একবার তাকান তিনি। কুকুরের হাবেভাবে বেশ চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। সে বারবার মুখটা মাটিতে নামিয়ে কুঁইকুঁই করে আওয়াজ তুলছে।
“না, আমি চললাম। তুমি কি আসতে চাও?”—দোকানি শেষবারের মতো ডাকে তুহিনকে। ইতিমধ্যেই তিনি দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে সাইকেলে চেপেছেন। তবে তুহিনের এখান থেকে যাওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্ৰহ দেখা গেল না। তাঁর মগজে শয়তানি বুদ্ধিগুলো আবার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। আর সেগুলো জমাট বেঁধে একটা কপট উদ্দেশ্যে পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে। তাই সে আসন্ন অনুকূল পরিস্থিতির উত্তেজনায় নিজেকে সংযত করে বলল—“না না, আমি ফিরে যাব। আপনি চিন্তা করবেন না।”
আর কিছু বললেন না দোকানি। প্যাডেলে চাপ দিয়ে তিনি চলতে শুরু করেন। পিছনে পিছনে তার কুকুরটাও দৌড়াতে থাকে।
দোকানি চলে যাওয়ার পর তুহিনের নিজেকে রাজা মনে হয়। এখন পুরো গ্ৰামটা ফাঁকা হয়ে যাবে, কোনো জনপ্রাণী থাকবে না। এই সুযোগ, তাঁর নীল আলোর সাহায্যে গ্ৰামের সমস্ত ঘরে লুটপাট চালাবে। কিন্তু নীল আলোটা কাজ করবে কি?
৫
।। অনিরুদ্ধ।।
একখানা জিনিস হাতিয়েছে বটে লালটুদা। যে-কোনো প্রাণীর চোখের উপর টর্চের নীল আলোটা ফেললেই, সেই প্রাণীটা বেহুঁশ হয়ে যায়। আর সে বেহুঁশ হয়ে থাকে প্রায় পনেরো ঘন্টার মতো।
এখন আমি আর লালটুদা হলাম গিয়ে পার্টনার ইন ক্রাইম। খরচ শুধু যাওয়া আসার, লাভ তার দ্বিগুণ। যেমন কাল ভট্টাচার্যদের বাড়ি থেকে ভালোই মালকড়ি এল। ঘটনাটা তাহলে খুলেই বলি।
রাত তখন দশটার মতো হবে। কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর দিন, পূর্ণিমার আলোয় সব কিছু সুন্দর হয়ে উঠেছে। কলোনি পাড়ার মোড়ে বিশাল ফাংশন চলছে, কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় জমাচ্ছে সেখানে। লালটুদা সব কিছু দেখে শুনে আমাকে ফোন করে বলল—“ভাই, আজ খেল জমে উঠবে, সব তো দেখছি ফাংশন দেখতে গিয়েছে! যাবি নাকি আজ রাতে?”
আমি তো সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। ঘরে তো আগে থেকে বলাই আছে যে ফাংশন শেষ হলে ঘরে ফিরব আমরা।
খেলটা সারব পাশের গ্ৰাম বটতলাহাটে। সেখানে অংশুমান ভট্টাচার্যের খানদানি ব্যাপার। ওঁর দুই ছেলেই বিশাল বড়ো সার্ভিসম্যান, রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। সাইকেল নিয়ে আমরা যখন ওখানে পৌঁছালাম তখন ঠিক দশটা বাজে। গ্ৰামের শুরুতেই ওদের বাড়ি। বলে রাখা ভালো আসার পথে রাস্তার কুকুরগুলোকে নীল আলোর কেরামতিতে বেঁহুশ করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির সামনে এসে বুঝলাম, এই বাড়ির সমস্ত লোকজন এখনও ঘুমোয়নি, গেটও খোলা রয়েছে।
লালটুদা চুপিচুপি বলল—“এখনই ঢুকে পড়ি, কি বলিস?”
এবার আমার ভয় করতে লাগল। কারণ লালটুদার কাছে গুরুদেবের যে কীর্তি শুনেছি, তাকে কুকীর্তি ছাড়া কীই-বা বলা যায়! আর আমরাও সেই কুকীর্তি করতে চলেছি। আসলে আমাদের এ তল্লাটে যত বড়ো বড়ো চুরি বা লুঠপাট হয়েছে সম্প্রতি তার মূল কারিগর ছিলেন গুরুদেব ওরফে তুহিন। রাত হলেই তিনি খুঁজে বেড়াতেন বড়ো বড়ো অট্টালিকা। তারপর তাঁর ক্যারিশম্যাটিক নীল আলোর সাহায্যে তিনি বাড়ির লোকজনকে অজ্ঞান করে দিয়ে লুটে নিতেন অনায়াসেই। অথচ দিনের বেলায় এমন সাধুবেশে থাকতেন যে তার মতো মহান সিদ্ধপুরুষ আর এই ভূভারতে নেই।
যদিও গ্ৰামের কেউই এসব ব্যাপারে জানে না, বরং তারা তো শ্যাওলা বাবার অন্ধভক্ত। তো একবার লালটুদা গুরুদেবকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। কিন্তু তাদের মধ্যে মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং হওয়ার ফলে ব্যাপারটা বেশি দূর গড়ায় না।
আমার মনের মধ্যে নিরন্তর বিবেক দংশন করতে শুরু করল। ভাবছি যে কাজটা করতে যাচ্ছি সেটা কি ঠিক? তবুও অ্যাডভেঞ্চারের একটা উত্তেজনা আমি ভিতর থেকে অনুভব করলাম। তাই বললাম—“চলো, ঢুকেই পড়ি।”
বাড়িটির ঠিক পিছনে রয়েছে বাগানবাড়ি। লালটুদা আর আমি চটপট গেট দিয়ে প্রবেশ করে আপাতত সেই বাগানবাড়িতেই আত্মগোপন করে থাকি।
৬
।। গুরুদেব।।
গুরুদেব অর্থাৎ তুহিন নিজের ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে নিয়ে পৌঁছাল মনসাতলার কাছে। পাশে রয়েছে সেই ভয়ংকর জন্তুটা যার কথা সেই দোকানি ভদ্রলোক তাকে আগেই বলেছিলেন। জন্তুটার মুখটা অনেকটা গরিলার মতো হলেও, গোটা শরীরটা যে কীসের মতো তা বর্ণনা করা ভারী শক্ত। তবে জন্তুটার একজোড়া বিশাল কিম্ভুতাকার কালো ডানা রয়েছে সেটা তুহিনও লক্ষ করেছে। আর কুমিরের মতো কন্টকময় লেজটাকে ঝাপটিয়ে সে কেমন একটা ভয়ানক স্বরে যেন নিজের রূপ প্রকাশ করছে।
তুহিন কোনোমতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ঘাড়ের ডানদিকটা থেকে এখনও রক্ত ঝরে পড়ছে। জন্তুটা তুহিনের ঘাড়ের জায়গাটা কামড়ে ধরেছিল। কোনোমতে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে তুহিন আপাতত রেহাই পেয়েছে।
সেই রাতে দোকানি ভদ্রলোক যাওয়ার পর তুহিন গ্ৰামে ঢুকেছিল লুঠপাট করার উদ্দেশ্যে। কারণ লোকটার কাছে সে শুনেছিল যে গ্ৰামের লোক শনিবারে থাকে না, জন্তুটার ভয়ে। কিন্তু একটা ঘরের উঠানে দাঁড়িয়ে থাকার কিছুক্ষণ পরেই সে সম্মুখীন হল সেই ভয়ংকর জন্তুটার। বোঁটকা গন্ধে ভরে গেল চারদিক। তুহিন ভয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল জন্তুটাকে প্রথম দেখে। তবে জন্তুটা দাঁড়ায়নি, সে অনেকদিন পর এই গ্ৰামে একটা মানুষ দেখে তৎক্ষণাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর উপর। গুরুতরভাবে আঘাত পাওয়ার আগেই তুহিনের মাথাতে একটা শয়তানি বুদ্ধি খেলে যায়। সে জন্তুটাকে লোভ দেখায় যে, আজ যদি সে তাকে ছেড়ে দেয় তাহলে সে একটা আস্ত গ্ৰামের সন্ধান দেবে। যেখানে আরও অনেক বেশি লোক থাকে। বলার কিছুক্ষণ পরেই জন্তুটা তাকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায়। সে তার, লোহার মতো শক্ত ডানাগুলোকে শরীরের মধ্যে গুটিয়ে রাখে, তারপর সরীসৃপদের মতো ধপ করে বসে পড়ে জন্তুটা।
ভয়ে কাঁপতে থাকে তুহিন, তা ছাড়া শরীরের ক্ষতও তাকে বিষম যন্ত্রণা দিচ্ছে। সারা গায়ে কাঁটা ফোঁটার মতো যন্ত্রণা হচ্ছে। তবুও স্বস্তির কথা, জন্তুটা তাকে প্রাণে মারেনি, আশ্বাসে কাজ হয়েছে! বিধস্ত আর ক্ষতবিক্ষত তুহিন কোনোমতে আড়ষ্ট গলায় বলে—“তোমার নাম কী? তুমি কীভাবে এখানে এলে?”
জন্তুটা তাঁর নীল আঁশযুক্ত সারা শরীরে একবার জিভটা চেটে নিয়ে বলতে শুরু করে—ঠিক যেন মানুষের গলায়, মানুষের ভাষায়!
৭
।। জন্তুটার কথা।।
আমাদের বাস ছিল মাটির বহু নিচে। এখানে এই গ্ৰামের কাছে জঙ্গলে যে ঢিপিগুলো রয়েছে তারই মধ্যে আমরা বেশ নিরিবিলিতে থাকতাম। অনেক রাত হলে আমরা বেরিয়ে আসতাম খাবারের খোঁজে। আসলে আমরা তখন মোটেই হিংস্র ছিলাম না, আর দেখতেও এমন ছিলাম না। মানুষ আমাদেরকে একদম ভয় করত না। তাই একদিন যখন আমরা ঠিক রাতে খাবারের খোঁজে বাইরে আসি তখন গ্ৰামেরই কিছু ছেলে নিজেদের নৃশংস বিনোদনের জন্য আমাদের কয়েকজন জাতভাইকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। তখন নিজেদেরকে খুব অসহায় মনে হত। মনে হত এ পৃথিবীতে আমাদেরকে এভাবেই সারাজীবন মানুষের অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করে যেতে হবে! এর থেকে কি কোনো নিস্তার নেই। আমাদের ঈশ্বর যে ঠিক কে আমরা জানতাম না, তবু মনে মনে একজন কাউকে কল্পনা করে রোজ তাঁর কাছে নিজেদের পরিস্থিতির কথা বলতাম। ভাবতাম, ঠিক উনি শুনবেন।
তারপর বহু বছর কেটে গেছে। ঈশ্বর আমাদের কথা শোনেননি আর আমরাও আরও অনেককে হারিয়েছি। একদিন মাটির ঢিপির তলে আমরা ঘুমাচ্ছি, হঠাৎ কীসের একটা ছটায় চোখ যেন ঝলসে উঠল। থতমত খেয়ে আমি তাকিয়ে দেখি একটা উজ্বল নীল আলো। সেই আলো থেকে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হল এক দেবপুরুষ, যাকে দেখলেই কেমন ভক্তি চলে আসে!
তিনি বললেন—“আর ভয় নেই। কাল সকাল থেকেই তোমরা এই পৃথিবীতে নিজেদের ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পারবে। এই নীল আলোটা এখানে রেখে দিয়ো।” এই বলে সেই দেবপুরুষ আমাকে নীল আলোটা দিলেন।
সেই নীল আলো প্রাপ্তির প্রথম সকালটা সত্যিই নবজীবনের মতো লাগল। আমরা ছিলাম কুমিরের মতো দেখতে অথচ ভীতু এক সরীসৃপ, কিন্তু ক্রমে আমাদের মুখটা পালটে যেতে লাগল! ক্রমে তা পরিবর্তিত হল গরিলার মতো মুখমণ্ডলে। অদ্ভুতভাবে আমাদের মধ্যে জন্মাল ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা, আমরা শুরু করলাম মানুষের মতো কথা বলা! আমাদের শরীরের দুইপাশে গজাল কালো একজোড়া ডানা, আর সারা শরীর ঢেকে গেল নীল আঁশে। নিজেদের রূপ দেখে তখন আমরা নিজেরাই অবাক আর একইসঙ্গে মুগ্ধও!
নিজেদের শক্তি বেড়ে গেল বলে আমরা কিন্তু তখনই খুব স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরি করতাম না, কারণ ভয়-ভীতি আমাদের তখনও ছিল। সে যাইহোক, আমাদের সেই ঈশ্বরের কৃপায় দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল।
কিন্তু জীবনের গ্ৰাফের যেমন একটা উথ্থান আছে, তেমন একটা পতনও আছে। মজার ব্যাপার হল উথ্থান যত ধীরে ধীরে হয়, পতন হয় কিন্তু ততটাই নির্মমভাবে! জীবনের এই সূত্র অনুযায়ী আমাদের ঈশ্বর প্রদত্ত মহামূল্যবান নীল আলো চুরি হয়ে গেল। কে যে আমাদের এমন সর্বনাশ করল, আর মনেও পড়ল না চুরি হওয়ার পর। তবে সেই নীল আলো চুরি হওয়ার পর আমাদের মধ্যে আবার একটা পরিবর্তন এল! আমরা হয়ে উঠলাম ভয়ানক হিংস্র!
আচ্ছা আপনি কি আমাদেরকে নীল আলো এনে দিতে পারেন, চিরকৃতজ্ঞ থাকব আপনি তথা মানুষজাতির কাছে। —নিজের জীবন কাহিনি শেষ করে জন্তুটা তুহিনের কাছে অনুরোধ করে বসে!
তুহিনের মনে হল এই মুহূর্তে তার মতো ভাগ্যবান এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই! কেন-না এই সময় যদি তার কাছে সত্যিকারের নীল আলোটা থাকত, তাহলে হয়তো-বা জন্তুটা তাকে মেরেই ফেলত!
নয় নয় করে চার দিন সে জন্তুটার হেফাজতে রয়েছে! এতদিনে ওই লালটু, টুবাই সত্যিকারের নীল আলোটা পেয়ে কী কী কীর্তি করে বেড়াচ্ছে কে জানে! তারা লালটুদের গ্ৰামে চলেই এসেছে প্রায়। প্রথমেই জন্তুটাকে নীল আলোর খবর দিলে হবে না। কেন-না নীল আলো পেয়ে যদি সে শান্ত হয়ে যায় তাহলে তো তার প্রতিশোধ নেওয়াই হবে না। এই গ্ৰামের উপর তার এখন অনেক রাগ, প্রতিশোধের আগুন ধিকধিক করে জ্বলছে! সব তছনছ আর ধ্বংস হয়ে গেলে তবে একটু মন শান্ত হবে!
তবে একে এখনই পাঠানো যাবে না। কোনোমতে কাল রাত পর্যন্ত একে আটকাতে হবে। এখানেই তাকে কোনো ফুসমন্তর দিয়ে আটকে রাখতে হবে। আবার কাল রাত হলে নীল আলোর কথা মনে পড়াতে হবে। এসবই ভাবতে ভাবতে তুহিনের মুখে রহস্যময় হাসি খেলে যায়।
সে জন্তুটার উদ্দেশে বলে—“আমি অবশ্যই খোঁজ দেব নীল আলোর। কিন্তু তার জন্য কাল রাত পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করতে হবে।”
৮
।। অনিরুদ্ধ।।
ক্লাবে বসে আছি রিল্যাক্স মুডে। লালটুদারা জমিয়ে ক্যারাম খেলছে। ইতিমধ্যেই আমি ওর নীল আলোটা হাতিয়েছি। এই নীল আলো আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, কয়েকদিনের মধ্যেই আমি গ্ৰামের পয়সাওয়ালা ছেলেদের মধ্যে একজন হয়ে উঠেছি তা সে যেমন উপায়েই হোক! তবে যেমনটা চাইছি তেমনটা পাচ্ছি না। যেটুকু উপার্জন হয় তার অর্ধেকের বেশি লালটুদার পকেটে চলে যায়। তাই তো নীল আলোর টর্চটা চুরি করতে হল। গুরুদেব এমনভাবে টর্চের মধ্যে নীল আলোটা সেট করেছেন… সত্যি কিছু বলার নেই!
কিন্তু আজ দেখছি নীল আলোর উজ্জ্বলতা হঠাৎ বেড়ে গেছে! মাটিতে আলো ফেললেও চোখ ঝলসে যাচ্ছে, ব্যাপার কী?
টর্চটা নিজের করে নেওয়ার পর আর ক্লাবে থাকতে ইচ্ছে করছে না। তাই উঠতে যাব মনস্থির করেছি এমন সময় পাড়ার ছেলে নোটনের ফোন এল। কল রিসিভ করতেই নোটনের ভয়ার্ত গলা ভেসে এল। সে বলল—“কেমন একটা ভয়ানক জন্তু এসেছে রে! বাগদি পাড়ায় দুটো বাচ্চা ছেলে সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির সামনে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় খেলছিল, হঠাৎই একটা কেমন জন্তু ডানা মেলে নেমে আসে। তারপরই ছেলে দুটোকে দেখতে পেয়ে ওখানেই তাদের আছড়ে ফেলে মেরেছে। তা ছাড়া ঘরবাড়ি সব ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। আমি কোনোমতে পালিয়ে বেঁচেছি। তবে মনে হচ্ছে আমাদের এ পাড়াতেও আসবে!”
আমার মুখে আর কোনো কথা ফুটল না। তড়িঘড়ি ফোনটা বন্ধ করলাম। এ আবার কী উটকো ঝামেলা, গোটা শরীর কেমন খালি খালি লাগতে লাগল। তবে কাছে নীল আলো আছে বলে মনে একটু ভরসাও পাচ্ছিলাম!
তবে ততক্ষণে ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। লোকজনের মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। পাড়ার সবাই দেখি লাঠি, শাবল, রড নিয়ে রেডি হয়ে আছে। আমার ব্যাপারটাতে হাসি পেল। আমার কাছে যা আলো আছে, সে যত বড়োই প্রাণী হোক-না-কেন, সব মাথা মাটিতে নামিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে! ইতিমধ্যে ক্লাবের ছেলেরাও সব রাস্তাতে এসে উপস্থিত। ঠিক তখনই একটা বোঁটকা গন্ধ আমার নাকে এসে লাগল।
৯
।। জন্তুটার গ্ৰামে আসার পর।।
এই সময়টাতে নিজেদেরকে আত্মরক্ষা করার জন্য ঘরে খিল দিয়ে ঢুকে পড়াই শ্রেয় ছিল। কিন্তু গ্ৰামের লোকজন তা না করে রুখে দাঁড়াল জন্তুটার বিরুদ্ধে। তাতেই আরও খেপে গেল জন্তুটা। নরখাদক বাঘের মতো মানুষ মারার নেশায় একের পর এক মানুষকে অবলীলায় ঘাড় মটকিয়ে মেরে ফেলতে লাগল। শুধু তা-ই নয়, ঘরবাড়ি, বিশাল বিশাল গাছ, জন্তুটা তার দীর্ঘ কালো ডানার সাহায্যে সব ওলটপালট করে দিয়েছে। সব তছনছ করে যখন ও পাড়াতে এল তখন দেখা গেল অনিরুদ্ধ নামে একটা ছেলে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে।
এতক্ষণ এই জন্তুটা তাঁর কালো কালো ডানা মেলে নানান ঘরের ছাদে নেমে ঘর ছারখার করে পরিবারের লোকজনদের বীভৎস আর মর্মান্তিকভাবে হত্যা করেছে। জন্তুটার আপাত মানুষের ন্যায় মুখটা থেকে তাজা রক্ত ঝরে পড়ছে। যে ক-জন লোক পালিয়ে যায়নি বা জন্তুটার শিকার হয়নি তাদেরও এবার ভয় করতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সকলে এবার নিশ্চয়ই ঘরমুখো হবে।
কিন্তু জন্তুটা এবং অনিরুদ্ধ এখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে! ক্লাবের ছেলেরা, মা-বাবা এবং গ্ৰামের আরও লোকজন ঘরে ফেরার জন্য ডাকল অনিরুদ্ধকে। কিন্তু দু-জনেই অনড়! জন্তুটা একবার বসছে, আবার চারপায়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠছে। একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য লক্ষ করা যাচ্ছে তার মধ্যে। মনে হচ্ছে কিছু একটার সন্ধান পেয়েছে সে!
ঠিক এই সময়ে হঠাৎই অনিরুদ্ধ নীল আলোটা ফেলল একদম জন্তুটার চোখের উপর। সে ভেবেছিল হয়তো জন্তুটা নিমেষেই অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু হল তার উলটো, নীল আলো ফেলতেই জন্তুটা সেটা ছিনিয়ে নিতে অনিরুদ্ধের টুটি টিপে ধরল। আর যতক্ষণ না প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায় ততক্ষণ জন্তুটা ছাড়ল না। তারপর মরে গেছে তা নিশ্চিত হয়ে ছেড়ে দিল অনিরুদ্ধকে। আর তার হাত থেকে টর্চটা নিয়ে নিল। জন্তুটার মুখে একটা প্রাপ্তির হাসি। সে যা চাইছিল এখন সেটা তার হাতে।
আনন্দে পায়ে হেঁটে হেঁটে পথ চলতে শুরু করল জন্তুটা। কিন্তু আবার থামতে হল জন্তুটাকে। চারজন কিশোর আর যুবক ছেলে শাবল আর ধারালো মাংসকাটা চাপাতি নিয়ে পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে!
ওদের মধ্যে একটা ছেলে বলল—“আমি লালটু বলছি। নীল আলোটা আমাকে দিয়ে দে আর এখানে থেকে কেটে পড়। এমনিতেই তুই অনেককিছু শেষ করে দিয়েছিস।”
কথাগুলো শুনে কেমন একটা বিদঘুটে হাসি হাসে জন্তুটা। তারপর লালটু্র কথাগুলো ব্যঙ্গ করে রিপিট করে। সেই সুযোগে চুপিসারে পিছনে গিয়ে একজন শাবল দিয়ে মাথায় আঘাত করতে যাবে এমন সময় চট করে ঘুরে জন্তুটা ছেলেটার ঘাড় মুলো মোচড়ানোর মতো মুচড়ে দিল। তারপর লালটু্কে ধরে তার গোটা শরীর ধারালো নখ দিয়ে চিরে ফেলল। এই দেখে শেষ দুইজন ভয়ে দৌড় দিয়েছে।
পথ হাঁটতে হাঁটতে সব মনে পড়তে লাগল জন্তুটার। তখন অনেক রাত, ঘুমুচ্ছিল ওরা সকলে। হঠাৎ ওর একটা বাচ্চা খুব কাঁদতে শুরু করে। মায়ের মন বুঝতে পারে, সোনার নিশ্চয় খিদে পেয়েছে। তাই সে মাটির নীচ থেকে উপরে বেরিয়ে আসে। বাচ্চাগুলো বিশেষ একটা গাছের ফল খেতে ভীষণ ভালোবাসে। এইজন্য সে সেই গাছটাতে উঠে ফল পাড়তে যায়, ঠিক তখনই শরীর থেকে ছিটকে যায় নীল আলোটা। সেটা একটা ছোট্ট মার্বেলের মতো বস্তু, তা থেকে গাঢ় নীল আলো বের হয়। নীল আলো হারিয়ে যাওয়ার পরই জন্তুটা সব ভুলে যেতে থাকে।
সে নীল আলোটা খোঁজ করতেই ভুলে যায়, ভুলে যায় বাচ্চাদেরকে খাবার খাওয়ানোর কথা। পরিবর্তে সে হয়ে ওঠে হিংস্র, দাপিয়ে বেড়ায় নিকটবর্তী গ্ৰামে। বিস্মৃতির ওই সময়টাতেই একটা শয়তান লোক ওই নীল আলো কুড়িয়ে নেয় আর সেটা টর্চের মধ্যে ফিট করে নানানভাবে সেটার অপব্যবহার করে। লোকটা ঠিক কে, এখন সে অনুমান করতে পারছে!
ও যখন নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছাল তখন দেখা গেল একটা বটগাছের নিচে বসে আছে তুহিন। ওকে আসতে দেখে আর নীল আলোটা দেখতে পেয়ে হাসিমুখে এগিয়ে আসে তুহিন।
চোখে-মুখে তুহিনের আনন্দ যেন আর ধরে না! সে টর্চের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—“আরে, তুমি তো নীল আলো পেয়ে গেছ দেখছি! তা খুব কষ্ট করে আনতে হল বুঝি? জিনিসটা একবার দেখাবে আমায়?”
জন্তুটা কোনো উত্তর দিল না। সে জানে এই মানুষটির ভবিতব্য তার হাতেই লেখা! তাই সে চুপচাপ দম ধরে রইল।
উত্তর না পেয়ে তুহিন বিরক্ত হয় আর ভীষণ রেগেও যায়। কিন্তু তার সাহস হয় না নীল আলোটা জন্তুটার কাছে থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার। তবে জন্তুটা ধীরে ধীরে একদম তুহিনের সামনে এসে দাঁড়ায়, তারপর তুহিন কিছু ভাবার আগেই টুঁটি টিপে ধরে যতক্ষণ না… ।
১০
।। ফিরে এল আস্তানায় ।।
জন্তুটা তার আস্তানায় ফিরে এসেছে। এসে দেখে তাঁর বাচ্চারা কেউ বেঁচে নেই, খিদের জ্বালায় সবাই মারা গেছে। ও কাঁদল না প্রথমে, চুপচাপ বসল। তারপর সন্তানের মৃত শরীরে পরম আদরে কালো ডানা বুলিয়ে দেয়, তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে! কিন্তু বেশিক্ষণ আর চাপা হাহাকার চাপা থাকে না, বেরিয়ে আসে অগ্নুৎপাতের লাভার মতো! সে অঝোরে কাঁদতে লাগল—আকাশ-পাতাল বিদীর্ণ করা সেই কান্না!
কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে ঘুম চলে আসে পাতালরানির। সেই নীল আলো তবুও একা জেগে থাকে। জায়গাটা মায়াবী মনে হয়, তবুও অলৌকিক কোনো ব্যাপার ঘটে না। সন্তানরা আর জেগে ওঠে না, সহজাত দুষ্টুমি মাকে আর সহ্য করতে হয় না!
বেশ কিছুক্ষণ পর পাতালরানি নীল আলোর মার্বেলের মতো সেই জিনিসটাকে সঙ্গে নিয়ে ওপরে উঠে এল। তারপর একরাশ ঘৃণা নিয়ে ফেলে দিল জঙ্গলের মধ্যে। প্রতিশোধের পর সব শান্ত হয়ে এলে, প্রিয়জনদের খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে! পাতালরানির সেই প্রিয়জন আর বেঁচে নেই।
তাই নীল আলোর অনুপস্থিতিতে আবার যখন ও দূর্বল হয়ে পড়ল তখন মৃত্যুই ছিল তার সবচেয়ে প্রাথমিক বাসনা।
আর যে জায়গায় নীল আলোর মার্বেলটা পড়েছিল সেই জায়গাটা অভিশপ্ত হয়ে গেল। জঙ্গল পরিণত হল ধ্বংসস্তূপে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে যে ছাই উৎপন্ন হয়েছিল তা উড়ে উড়ে যেখানে পড়েছিল সেসব জায়গাও হয়ে উঠল বাসের অযোগ্য! যে নীল আলো ছিল একসময় পাতালরানির ক্ষেত্রে আশীর্বাদের বস্তু, তাই হয়ে উঠল এলাকার অভিশাপ আর বিভীষিকা।
পরে, হয়তো অনেক বছর পরে শোনা গিয়েছিল ওই জায়গা নাকি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, কোনো চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায়নি! এখনও কি সেখানে গেলে কোনো গোপন অন্ধকারে পাওয়া যেতে পারে সেই নীল আলো? কে জানে!
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।