এই কবিতাগুচ্ছ মানুষ, ঈশ্বর, শরীর ও সমাজের অন্তর্লীন দ্বন্দ্বকে তীক্ষ্ণ ও প্রতীকময় ভাষায় প্রকাশ করে। স্বপ্ন, ক্ষুধা, বিশ্বাস ও ভাঙনের ভেতর গড়ে ওঠে এক অস্বস্তিকর অথচ গভীর কাব্যজগৎ। কেতাব-ই ব্লগজিনে ‘জেলার সাহিত্য’ বিভাগে আজ প্রকাশিত হল কোচবিহার জেলার কবি গৌরব-এর কবিতা।
রিপোর্টাজ
এমনিতে ভয়ংকর হলেও আমরা আসলে নেশা কেটে গেলে অসভ্য একটা জাতি।
(আদম আর আমার মাঝখানে যে অসামান্য গতিবেগ তৈরি হয়েছিল, তা কেটে যেতেই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠবে।)
আমরা আসলে নখ-দাঁতবিহীন জাতি, শুধু পুরুষত্ব আর শেকড়ে বাঁধা পৈতৃক গামছাখানা কোমরে বেঁধে নিই মাঝেমধ্যে।
(এখনও প্রসবযন্ত্রণায় শিশুসুলভ কেঁদে উঠি, মাঝেমধ্যে শিশির ছুঁয়েও দেখি, বমি হয়। অথবা কবিতা লিখি, কল্পতরু আর জন্মসূত্রে পাওয়া ঈশ্বরের কাছে নুয়ে পড়ি, লতা অথবা আদিম নারীর কোমরবন্ধের মতো)
আদতে আমরা এখনও নাবালক এক প্রাগৈতিহাসিক জাতি, নির্মেদ ফোকাসে স্পষ্ট যাপন করা শরীরের মতো বা চোখবন্ধ করা আলোর মতন নরম এক জাত।
শুধুমাত্র শেষযাত্রায় কেঁপে ওঠে পৈতৃক গামছাখানা…
ইস্তেহার ১
আমরা ভালো মানুষ হতে চেয়েছিলাম।
তাই অসামান্য বেগে বানিয়ে নিয়েছি ঘর, বাড়ি, মায়াবী চারমিনার, দানপ্রিয় ঈশ্বর, আর একটা সুখী সংসার।
সোনার জলছাপ চুক্তিতে লেখা হল আমরা সেই ভালো মানুষেরা যারা দিনের পর দিন শীতল প্রশ্বাসের ইস্তেহার পেয়েছিল, যারা জল কাদা মাটি পেরিয়ে স্বপ্ন দেখেছে নির্মোহ বান্ধব স্পর্শের।
অথচ, দুই, তিন, চার পৌষ পেরিয়ে, রেললাইন পাড়, পিচ ভাঙা কানাগলি পেরিয়ে দৈব সে বরাভয় এখনও এসে পৌঁছতে পারেনি আমাদের শ্রান্ত বারান্দায়।
হাত, চামড়া, নখের মাংস, রক্তাক্ত গোড়ালি মিলেমিশে হতে থাকবে লক্ষ্মী পায়ের ছাপ। প্রিয় খাবারের নুনভাব বেড়ে গিয়ে জ্বালা ধরবে অস্পষ্ট ভাগ্যরেখায়।
ইস্তেহার ২
গত অমাবস্যায় ঈশ্বর এসেছিলেন দুয়ার প্রান্তরে। মাটি, ইট, চুল্লির তাপমাত্রা পেরিয়ে, দলবেঁধে, হাঁটুগেড়ে জড়ো হই আমরা। মাথা নত করি।
রাত বাড়তেই হাতজোড় করে ঘুম চেয়েছি। স্বপ্নহীন, অসংলগ্ন উচ্চারণহীন একটা ঘুম।
অথচ পূর্ণিমা অবধি আমাদের সময় কেটে গেল ধান, গম, আনাজের কবরখানায়। হিমঘরে উঁচু দেওয়ালটায় নখ, নখের আঁচড়, থালা, বাসন, সংকর ধাতুর দাগ, দরজায় খোদাই করে দেবতার অবস্থান। মেহনত বলতে বিরামহীন অপলক দৃষ্টি।
আমরা একটা ঘুম চেয়েছিলাম শুধু। যে ঘুমের অপরপ্রান্তে ফাঁকা উনুনের পাশে ছাই জমে থাকে, থাকবে অবশিষ্ট ভাত, খাবার খণ্ড। জমে থাকে আমাদের ঈশ্বরবিহীন আর্ত উচ্চারণ।
তবে ভালো করে দেখলে বুঝি দেবতার সংঘবদ্ধ হাতে আজও পোড়া ইটের উলকি নিশান। ঈশ্বর ক্ষুধার্ত হলে আমাদের অস্বস্তি হয় মাত্র।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
স্পেকট্রোস্কোপ
থরে থরে ভারসাম্য বিক্রি হচ্ছে।
ফ্লাডলাইটে ঝলসে যাচ্ছে ম্যানিক্যুইনের চোখ।
খাবলে ওঠা চামড়ায় আমরা ভারসাম্য কিনছি, গায়ে মাখছি।
এক-একটা রং গুলে তৈরি হচ্ছে আলো।
সেই আলো কামড়ে অজানা উড়ন্ত বস্তু হয়ে ভেসেই যাচ্ছি…
ভারসাম্য, অবাধ্য শেকড়ের মতো রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার ডুব সাঁতার।
(গড়পঞ্চকোটের অজয় কৈবর্তর হাত থেকে খেজুরপাতা-বোনা ফুলগুলো নিলাম, আলতামিরার সমস্ত ঐশ্বর্য।
“...পুজোয় জামা কিনব, কিছু দাও না!”
সঙ্গে অনেক রং ছিল, তুলি ছিল আমার কাছে।…
ক্লাস ফোরের অজয় কৈবর্তর চোখে সৃষ্টির সমস্ত রঙের অবাধ বিচরণ,
সে অনেক আগেই বাঁচতে শিখেছে।)
বুদ্ধ মৃত, এখন শুধুই সিদ্ধার্থ বেঁচে আছেন।
ঈশ্বর ও গুটিপোকা (অথবা অয়েল প্যাস্টেল)
১.
ঈশ্বরের সাথে খোশমেজাজে গল্প হয় মাঝে মাঝে। গাছতলায় বসে আরামকেদারায় শুধু শীতদিন আর কড়িকাঠের সুখদুঃখ নিয়ে অভিযোগ-অভিমান চলতে থাকে। শীতকাল পাশে এসে বসে, আগুন তাপায়। একহারা এই বুড়োর সংসারে অশান্তি চলছে শুনেছি।
২.
ঈশ্বর অসাবধানে আড়মোড়া ভেঙে চোখ খোলেন, আলো-ছায়া মিলেমিশে হাঁটু মুড়ে বসে। সন্ধ্যা হঠাৎ মিলিয়ে হয় ফজরের আজান। আমি জানি আইনত শীতকাল কখনও কাব্য করে না। শুধু কখনো-কখনো ফ্যাচফ্যাচে আলবাল দার্শনিক বৃত্তান্ত শুনলে আমাকে আড়ালে খোঁচাতে থাকে। কানে ফিশফিশ করে, “স্যারকে বল। আমার খুব অসুখ। ওই কথাটা বল হতচ্ছাড়া!...”
৩.
ঈশ্বর একেবারেই কথা বলেন না। শুধু হঠাৎ ‘কাট, কাট’ বলে চিৎকার করেন। আরামকেদারা কখনও ফিনাইল গন্ধ হাসপাতাল হয়, কখনও-বা চন্দনকাঠ আর শ্মশানবিছানা। কিংবা হয়ে ওঠে সারি বেঁধে উড়ে-চলা আগুনপোকার স্তূপ। অথচ, আমি একনাগাড়ে কথা বলে যাই। কখনও কথামালার গল্প, কখনও সরষেফুলে প্রজাপতির কাহিনি, খেতে খেতে পায়ের ছাপ আর কখনও গুহামানবজাতির লড়াইয়ের গল্প। কিন্তু আসলে কে কীভাবে কী বলে সেটা বুঝতে পারাটাই আসল কথা। ঈশ্বর আসলে কথা বলেন না। আমার তেলচিটে পাশবালিশ আরামকেদারার কাছে নিয়ে এলে তিনি ‘কাট’ বলে মুহূর্তে সব গোলমাল করে দেন।
৪.
আমি একবার একটা গান লিখেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম ‘জ্যামিতিবেলার দুঃখ গান’। শীতকাল হাঁটুগেড়ে গান শুনে বলে “খালি কাব্যি করিস”। বাচ্চা বেড়ালটাও মুখ ভেংচে চলে যায়, নরম পাতায় কানে সুড়সুড়ি দিতে দিতে শীতকাল ফ্যাচফ্যাচ করে, “বল বল, আমার খুব অসুখ!”…
ঈশ্বর একবার পাশ ফেরেন। প্রেমিকার আঙুল ছোঁয়ার আগেই একটা অস্পষ্ট ‘কাট’ শোনা যায়। আঙুল হয়ে যায় গুটিপোকার খোলস বা ধূসর অয়েল প্যাস্টেল।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।