প্রসূন মজুমদারের এই কবিতাগুলোয় ভাষা হয়ে ওঠে ভাবনার গূঢ় পরিসর। মেঘ, নীরবতা, দেহ, প্রকৃতি ও অনুচ্চারিত বোধের ভেতর দিয়ে তিনি খুঁজে ফেরেন অস্তিত্বের সূক্ষ্ম কম্পন। এই কবিতাগুলো শব্দের আড়ালে লুকোনো দর্শন, সময়ের অনিশ্চয়তা ও মানুষের অন্তর্গত একাকিত্বকে রহস্যময়, ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে উন্মোচন করে।
সত্যকাম
চেয়ে থাকি। পেঁজা মেঘ। ধূসর বকের দেখা, চুপ।
এই রূপ, দীর্ঘসূত্রী... আলো। কালো ও কয়লার মধ্যে অনির্ণেয় ফাঁক ধারণার। ধার শুধু বাকি নয় উভমুখে কাটে ঘুম সময়ের নিঝুম প্রসর। স্তর বোঝো, নিম্নমেঘ বর্ষণের কারণ জানে না। দেনা দীর্ঘতর হয়, কুয়াশার মতো ঢেউ বাষ্পলোকে, ধূম্রযানে যাবে? কেন-কে হারাবে উচ্চ মেঘরাজ্যে দৃষ্টির ওপারে ওড়ে চিল। স্নায়ুর আঁচিল জানো, লহুস্রোতে বিঁধে যাওয়া হাড় যেন দাঁড়, তুমি তার চালনা জানো না, তবু লোনা, সহজ ও সরল কোনো সাম্যরেখা নয়। ফলত প্রলয় আসে, যায় না-বোঝার চাদরে জড়িয়ে। ওড়ে টিয়ে নির্জ্ঞানে সুনীল। বাকি তিল, পল বা মুহূর্ত নেই, নেই দণ্ড, দানও নেই, দানো ঢেউ, ওঠে-নামে সংগমের চূড়া ফেটে উড়ায় লাভার টুকরো, ঝলসে ওঠা ফল, প্রেতিনী তরল জানো? সাজানো বিস্তর শয্যা, এ প্রব্রজ্যা নিরর্থের প্যাঁচানো শার্দুল, বাকি স্থুল, জগৎ তামার পাত্র, তার গাত্র অম্লে ভূমিক্ষয়, সেখানে সময় স্থির ও অস্থির দ্বৈত, যে তাকে সমগ্রে বইত, সরে যায় মেঘের ভিতরে উঁচু মেঘে, সৌরকণা লেগে চমকে চমক তারা ফুটে থাকে নাকফুল, কাঁটা কবরীর করবীর করে নেই স্বপ্ন পরিণাম, তার নাম জানি না, জানি না, প্রেতলীনা পরীর শরীর সূক্ষ্ম, এই মুখ্য, অনন্তর জ্ঞানলুপ্ত গতি, অনন্তের প্রতি আলতো স্নিগ্ধ পদক্ষেপ চলমান উচ্চাবচ ক্ষয় ত্বরিত, অক্ষয়।
তাকে দেখি, সরে, স্বরে আসে না, আসে না
অন্ত্রের ভিতরে, ঝরে, হিরণ্যগর্ভের পাকে, ঝড়ে
চকিত হরিণদৃশ্যে ক্ষণিকা আভায় তাকে চেনা।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
না-বলা কথাটি
কিছু বলব না বলেই এসেছিলাম
অথচ অযুত বলা হল।
সকলই বৈখরীভাষ্য? নদী ও লাগাম
শব্দ কী বোঝায়, কাকে? বৃদ্ধ কাক ডাকে
থেমে, মৃদু, না ডাকার মতো প্রেমে
সেই শব্দ দৃশ্যে, ঘ্রাণে ক্ষীণস্রোতে, অক্ষরবিগ্রহে
মূর্ত, ডুবে যেতে যেতে তাপ, জলে আলো;
পাতারা বাড়াল, চুপিস্বর, নরম প্রখর
কালো বিড়ালির লোম হয়ে ঝরে গেছে নিঃশব্দে, চরমে।
তাকে বলব বলেই এসেছিলাম; না বলায় বলা হল
জল, প্রচলে অচল।
ফলত বৃথাই দৃশ্য, ঘোড়ার মসৃণ পিঠে ঘাম
মধ্যমা, পশ্যন্তি, পরা বাক্বিশ্ব নদী ও লাগাম।
চারা-গাছ
চারা বড়ো হল ঢের। গাছ তাকে জানতেই পারেনি।
গাছ বুড়ো হল, ফের চারা তাকে জানতেও চাইল না।
অতঃপর দু-জনেরই দেখা হল বাতাসে বাতাসে।
তখন মাদুর দোলে আসরের তাসে।
বিবি ও গোলাম গেল, সাহেবও কী যাবে?
গাছ তার কিছুই জানে না, শুধু ভাবে
চারা বড়ো হল তাকে কাছে ছুঁয়ে থাকা দায়?
প্রকৃতি না পরিবেশ পরিস্থিতি বিভ্রমে সাজায়?
হে, তথাগত
অধিকাংশ কবি আজ, তথাগত
ওদের করুণ দুঃখ পড়ে আমি ঘুমতে পারি না।
সে কোন ভাস্কর্যে ছিল শীতকাল, আজও
কেবলই অদৃশ্যের জন্ম হয়, হবে।
ঝাঁকায় দারিদ্র্য-ফল,
ছ্যাঁকা লাগে ছকের শখের ফলে ক্ষীণ
আমি কেন ঘুমোতে পারি না?
কবির নিজস্ব দুঃখ, সেই দুঃখে জুঁইফুলও আনন্দে বিলীন।
ব্যাপনে বিষাদ ও সিন্ধু, ঢেউ ওঠে নগরে ও গ্রামে।
আনন্দভৈরবী শুধু ‘ন্যাত’ শব্দে ফুটে উঠল
প্রাঙ্গনের ফাটানো বাদামে।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।