তপস্যার মতো ভালো ও গুণী মেয়েকে সার্থক ধরে রাখতে পারল না? হয় ওর লাম্পট্য নয়তো শারীরিক অক্ষমতা, এরই মধ্যে কোনো একটা ওদের বিচ্ছেদের কারণ, এই আলোচনাই সকলের কথায়, আচরণে এমনকি সাধারণ হাসিঠাট্টায়ও সার্থক টের পায়। মাঝে-মাঝে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে ডিভোর্স এমন কী একটা ব্যাপার! এ তো অনেকেরই হচ্ছে! কিন্তু নিজেকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত রাখাটা ওর বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। এত বছর অবিবাহিত থাকার পরে ওর বিয়ে যেন একটা ইভেন্ট কলা জগতে। অন্তত সার্থকের নিজের তেমনটাই মনে হয়। তার বিয়ে ভেঙে যাওয়াও সকলেরই মুখরোচক আলোচনার বিষয়, এই ভাবনা এখন অনবরত সার্থকের মাথার মধ্যে হাতুড়ির মতো শব্দ করে জানিয়ে দেয়।
ডোরবেলটা বাজতেই সার্থক বিরক্ত হল। ভেলভেট কাপড়ের মোটা বাদামি পর্দার ভেতর দিয়েও তীব্র সূর্যের আলো এসে এতক্ষণ ওর ঘুম ভাঙাতে পারেনি। ডোরবেলের ক্রমাগত কর্কশ শব্দটা মাথার ভেতর হাতুড়ির শব্দের মতো সেঁধিয়ে যাচ্ছে। ঘুম ভাঙতেই পিঠের চামড়ায় সেই ফোঁড়ার ব্যথাটা জেগে উঠল। সার্থক একবার উপুড় হয়ে শুয়ে ফোঁড়াটা ছোঁয়ার চেষ্টা করল। হাতটা যেন জ্যাম হয়ে গেছে, পিঠের পিছনে যাচ্ছেই না। তারপর ডানদিকে কাত হয়ে শুয়ে বাঁ-হাত দিয়ে পিঠের ফোঁড়াটা ছুঁল। বেশ ব্যথা করছে আজ। আকারেও বড়ো হয়েছে অনেকটা।
ডোরবেলটা আবারও বাজছে। বিছানা ছেড়ে ওঠার বদলে চাদরটা টেনে নিল।
‘সীতাদি, সীতাদি!’
দু-বার হাঁক দিল। সাড়া দিল না কেউ। সার্থক নিজের মনেই হাসল।
‘যাহ শালা! সীতাদি তো কাল দুপুরের ট্রেনে বাড়ি গেছে। জাজপুরে একবার গেলে সে তো মাস না কাটিয়ে কখনও ফেরে না।’
মাথার কাছে রাখা মোবাইলটা টেনে নিল। তপু খুব রাগ করত মাথার কাছে মোবাইল রাখলে। তপুর কথা মনে পড়লেই ওর ভেতরটা কেমন একটা জ্বালা করে। খুব রাগ হয়। তবে তপুর ওপর নয়। ঝুমার ওপর। ঝুমার অস্তিত্ব ওর জীবনে না থাকলে তপু কোনোদিন ওকে ছেড়ে যেত? কতদিনই-বা থাকল তপু?
তপুকে ও নিজে যেচে প্রায় সাধ্যসাধনা করে নিজের জীবনে এনেছিল। এই ৪৮ বছরের জীবনে বহু মেয়ের সঙ্গ পেলেও তপুই প্রথম মেয়ে যাকে ও বিয়ে করেছে সামাজিকভাবে। ভাবনাটা মনে আসতেই হাসল ও। নিজেই নিজেকে বলল—
‘কে কাকে বিয়ে করেছে? কলকাতার বিখ্যাত চিত্রকর সার্থক খাস্তগির বিয়ে করেছে তপস্যা চৌধুরীকে, না কি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি ভাষার পার্শ্বশিক্ষক তপস্যা চৌধুরী সার্থক খাস্তগিরকে?’
ডোরবেলটা থেমেছে। সার্থক স্বস্তি পেল। এখন যদি এমন কেউ আসে যে একটু গরম জল করে পিঠের ফোঁড়াটা তুলো দিয়ে চেপে ধরে ফাটিয়ে দিতে পারে? তপু থাকলে নিশ্চয়ই গরম জল এনে সেঁক দিত। তপু নেই ভাবতেই সার্থকের মাথার ভেতরে আগুন জ্বলে উঠল। ঝুমাকে যদি একটা পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারত তাহলে তপু হয়তো আজ চলে যেত না ওর জীবন থেকে। ওর একা সংসারের জন্য, ওর শুশ্রূষার জন্য তপুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কে হতে পারে? ঝুমা? ঝুমাকে তো ও জীবনে আনেইনি কখনও। যদিয়ো প্রথম যেদিন ঝুমার সঙ্গে ললিতকলা একাডেমিতে দেখা হয়েছিল ও নিজে যেচেই ওর সঙ্গে কথা বলেছিল। সেদিন বিখ্যাত অ্যাকাডেমি প্রাপক অশীতিপর রাহুল বাজাজের আর্ট এক্সিবিশন ছিল। পরদিন সার্থকের নিজের ছবি প্রদর্শনী। কলকাতায় এই এক্সিবিশন হলে সার্থকের কোনো চিন্তা ছিল না। অ্যাকাডেমিতে একটা এক্সিবিশনের জন্য জুনিয়র আর্টিস্টরা সার্থকের পিছন-পিছন ঘোরে। ওখানে সার্থক কারও দাদা, কারও ভাই, কারও বন্ধু তো কারও প্রেমিক। প্রতিটা সম্পর্ক, প্রতিটা সম্বোধনের এমনকি প্রতিটা কথার পেছনে কিছু-না-কিছু চাহিদা সার্থক টের পায়। নিজে প্রতিষ্ঠান হওয়ার মতো যোগ্যতা ও অর্জন করতে পারেনি কিন্তু ক্ষমতাতন্ত্রের বিত্তে ওর অনায়াস যাতায়াত। এই যোগ্যতা ওকে কেউ হাতে ধরে দিয়ে যায়নি। আজ যেভাবে ওকে প্রতিষ্ঠান মনে করে অনেকেই ওর কাছে আসে সেভাবেই ও একদিন ক্ষমতাতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করত।
মাঝরাতে বাবার হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ বুঝতে পেরে জিভের নীচে সরবিট্রেট দিয়ে সার্থক গিয়েছিল বাবার বন্ধু পাড়ার ডাক্তার সুবিনয় বসাককে ডাকতে। অত রাতে চেনা ডাক্তারকে পর্যন্ত বাড়িতে আসতে রাজি করাতে পারেনি ও। দ্রুত চিকিৎসার আয়োজন করতে পারলে হয়তো ওর বাবা বেঁচে যেত, সার্থক সেই আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। দিদি সুস্মিতার সঙ্গে জামাইবাবু ত্রিদিবের বিয়েটা বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও সার্থক ব্যর্থ হল। ওদের ডিভোর্সটা হয়েই গেল। সুস্মিতার একটা চাকরির ব্যবস্থা পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি ও। এখনও খোরপোষের টাকার জন্য সুস্মিতার লড়াইয়ে একমাত্র সঙ্গী ও। এই এতগুলো ব্যর্থতা সত্ত্বেও শিল্পের জগতে ক্ষমতাতন্ত্রের হাত ধরতে ও সফল হয়েছে। সার্থক এতদিনে শিখে গেছে ক্ষমতাবান শিল্পীদের মন জুগিয়ে চলার মন্ত্র। কেউ হাতে ধরে ওকে শেখায়নি। মধ্যবিত্ত জীবনে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ওকে সত্যকে মিথ্যায় ও মিথ্যেকে সত্যে রূপান্তর করা শিখিয়ে দিয়েছে।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
ডোরবেলটা আবার বেজে উঠল। এবার আরও বেশি কর্কশ। দরজায় ধাক্কাও দিচ্ছে বোধহয় কেউ! সার্থকের ঘরের বন্ধ দরজার ভিতর দিয়ে শব্দটা এল। মোবাইলটা হাতে ধরা। তপুকে মেসেজ করার একটা ব্যর্থ চেষ্টাও ও করতে পারল না। দরজাটা এবার খুলতেই হবে ওকে।
‘সরো।’
এই একটা শব্দ উচ্চারণ করেই তপু ঘরের ভিতর ঢুকে এল।
বিস্ময় আর আনন্দ একসঙ্গে সার্থকের অনুভূতিকে এমন স্থবির করে দিল যে কিছুক্ষণ ও কোনো কথা বলতে পারল না। দরজার কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়ে তপুকে ভেতরে আসার জায়গা করে দিল।
তপু কোনোদিকে না তাকিয়ে সার্থকের ঘরে এল। সার্থককে ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই ঘরটাই তপস্যার ঘর ছিল। প্রায় এক বছর তপস্যা চলে গেছে সার্থকের ফ্ল্যাট ছেড়ে, সার্থকের জীবন থেকেও। এই এক বছরে সার্থক ক্রমাগত চেষ্টা করে গেছে তপস্যাকে ফিরিয়ে আনতে।
তপস্যা ছেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বড়ো সমস্যা সার্থকের বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের মধ্যে প্রশ্নচিহ্ন। প্রশ্নচিহ্ন আর চিহ্নতে থেমে নেই। প্রশ্নগুলো বাড়তে-বাড়তে সার্থক বউকে সুখ দিতে পারে না, এই সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে। সিদ্ধান্তটা প্রশ্নের আকারে বারবার ওর কাছে এসেছে। কেউ বলেছে, সার্থকের জীবনে এত মেয়ে তাই বোধহয় বউ ছেড়ে চলে গেছে। অ্যাকাডেমির সভাপতি জগবন্ধু সরকার তো সার্থককে সেদিন মুখের ওপর বলেই দিলেন—
‘তোমার স্ত্রী-র ব্যাপারটায় বড়ো দুর্নাম রটেছে তোমার। এবার তোমার নামটা পুরস্কারের জন্য তোলাই যাবে না। সামনের বার দেখা যাবে। তার আগে কেসটা সলভ করার চেষ্টা করো।’
তপস্যার মতো ভালো ও গুণী মেয়েকে সার্থক ধরে রাখতে পারল না? হয় ওর লাম্পট্য নয়তো শারীরিক অক্ষমতা, এরই মধ্যে কোনো একটা ওদের বিচ্ছেদের কারণ, এই আলোচনাই সকলের কথায়, আচরণে এমনকি সাধারণ হাসিঠাট্টায়ও সার্থক টের পায়। মাঝে-মাঝে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে ডিভোর্স এমন কী একটা ব্যাপার! এ তো অনেকেরই হচ্ছে! কিন্তু নিজেকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত রাখাটা ওর বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। এত বছর অবিবাহিত থাকার পরে ওর বিয়ে যেন একটা ইভেন্ট কলা জগতে। অন্তত সার্থকের নিজের তেমনটাই মনে হয়। তার বিয়ে ভেঙে যাওয়াও সকলেরই মুখরোচক আলোচনার বিষয়, এই ভাবনা এখন অনবরত সার্থকের মাথার মধ্যে হাতুড়ির মতো শব্দ করে জানিয়ে দেয়।
‘কতক্ষণ ধরে বেলটা বাজাচ্ছি। ফোনটাও নট রিচেবল বলছে।’
বিছানার বালিশগুলো সরিয়ে তপস্যা কী যেন খুঁজছে! খুঁজে না পেয়ে সার্থকের দিকে ফিরে খুব নির্মমভাবে বলল—
‘তোমার ফোন নট রিচেবল থাকুক বা ব্যস্ত থাক, তা আমার মাথা ঘামাবার বিষয় নয়। চাবিটা দাও।’
তপু ফিরে এসেছে। আর এই ঘরে এসে এমনভাবে জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছে, সার্থকের কাছে চাবি চাইছে, এসবই যেন বহু আকাঙ্ক্ষিত রূপকথার ফল। সার্থকের জীবনে আবার রূপকথার আনাগোনা। ভাবনাটা ওকে কিছুটা অবশ করে দিল। পিঠের ফোঁড়াটার যন্ত্রণাও এখন আর টের পাচ্ছে না ও।
‘আমার হাতে সময় নেই। চাবিটা দাও নাহলে নিজেই আলমারিটা খোলো।’
বিহ্বল একটা ভাবের মধ্যেই সার্থক উত্তর দিল—
‘তুমি আমার ফোন ধরো না কেন?’
‘এসব কথা বলার আমার সময় নেই। তুমি আলমারিটা খোলো। আমার ফ্রেঞ্চ লার্নিং সার্টিফিকেটটা এখানেই ফেলে গেছি। ওটা লাগবে একটা জরুরি কাজে।’
‘আর তোমার ডিএ-র জন্য আমার সই লাগবে না?’
‘না। আমি ডিভোর্স ফাইল করছি। তুমি উকিলের চিঠি পাবে। আমরা আর স্বামী স্ত্রী নই।’
‘ডিভোর্স ফাইল করেছ, ডিভোর্স হয়নি আমাদের।’
সার্থক এবার কঠিন গলায় বলল।
‘খাতায় কলমে হয়নি। যাতে হয়, তার জন্যই আবেদন করেছি। আমি তোমাকে স্বামী বলে মানিই না।’
সার্থক এগিয়ে যায় তপস্যার দিকে—
‘তপু! প্লিজ!’
‘তুমি একদম এগোবে না। আমি চিৎকার করব। থানায় যাব আমি।’
সার্থক যেন শুনতেই পায়নি তপস্যার কথা। ও আরও এগিয়ে আসে। তপস্যার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়।
‘আমার মাকে নিয়ে আসা উচিত ছিল। নাহলে অভিষেককে। তুমি একটা পাগল, নপুংসক! সরো এখান থেকে। পুলিশ নিয়ে আসব আমি এবার।’
পিঠে ব্যথাটা এবার চাগাড় দিয়ে উঠছে। মাথার মধ্যেও হাতুড়ির শব্দটা বেশ জোরে শুনতে পাচ্ছে ও। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তপস্যাকে দেওয়ালে চেপে ধরল ও। তপস্যা চিৎকার করে উঠতেই খুব জোরে ওর মুখ চেপে ধরল। তপস্যাও প্রবল বেগে ওকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ধাক্কাধাক্কিতে তপস্যার মাথা খাটের কোণে জোরালো এক ধাক্কা খেল। তপস্যার কপাল ফেটে রক্ত পড়ছে। হাত দিয়ে রক্তটা দেখে তপস্যা চিৎকার করে উঠল।
‘তুমি কেবল নপুংসক নও, নরপিশাচ! এই রূপটাও দেখা বাকি ছিল। এইবার তোমার জেল কেউ আটকাতে পারবে না।’
সার্থক এক ধাক্কায় ওকে ফেলে দিয়ে মুখ চেপে ধরল। তপস্যা চিৎকার করার চেষ্টা করছে। সার্থক ক্রমাগত শক্তি প্রয়োগ করে ওকে থামাচ্ছে। হাতের সামনে থেকে বালিশটা তুলে তপস্যার মুখ চেপে ধরল ও। চাপ ক্রমশ বাড়তেই থাকল। একসময় তপস্যা নিঃস্পন্দ হয়ে পড়ে রইল। তপস্যার নিথর দেহটা অনুভব করে সার্থক শান্ত হল। ওর স্যান্ডোগেঞ্জিতে রক্তের ছিটে। তপুর কপালের ফাটা জায়গায় এখনও রক্ত!
তপুর দেহ কি ঠান্ডা হয়ে গেছে?
নাহ্! এখনও গরম আছে।
সার্থক তপুর বুকে কান পেতে হৃৎস্পন্দন শোনার চেষ্টা করছে। না, কোনো শব্দ ও শুনতে পেল না। পিঠের ফোঁড়াটার কথাও বেমালুম ভুলে গেল।
এখন কী করবে ও? তপু থানা-পুলিশের ভয় দেখালে ও বরাবরই কুঁকড়ে যেত। এত কষ্ট করে যে খ্যাতি, যশ, প্রতিপত্তি, সম্মান ও অর্জন করেছে সব একনিমেষে ধুলোয় মাটি হয়ে যাবে, এই ভাবনাই ওকে অস্থির করে তুলত। তপস্যাকে ফিরে আসতে অনুরোধ করত ও বারবার।
তপস্যা ফিরে এল। কিন্তু, এখন কী করবে ও?
বিছানা হাতড়ে ফোনটা খুঁজল। কিন্তু কাকে ফোন করবে?
আবার কলিংবেল বেজে উঠল।
ও আর দেরি করল না। স্যান্ডোগেঞ্জিটা দ্রুত বাথরুমে ছুড়ে ফেলে ওয়াশবেশিনের আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। অর্ধেক সাদা অর্ধেক কালো বুকের রোমে রক্তের ছিটে এসে লেগেছে কি না ভালো করে দেখল।
না। নেই। রক্তক্ষরণ তেমন হয়নি। ওর তপুর রক্ত শেষবারের মতো ছুড়ে ফেলা স্যান্ডোগেঞ্জিটার মধ্যে রয়ে গেছে। উত্তেজনায় হাতের চেটো ঘামে ভিজে গেছে। হাতদুটোকেও আয়নার সামনে এনে খুঁটিয়ে দেখল। কোথাও কোনো রক্তের দাগ আর নেই!
কেবল সারা শরীর ঘামে ভিজে রয়েছে। রক্ত নয়, এই ঘামই এখন তপু হত্যার একমাত্র সাক্ষী!
কলিংবেল বেজেই চলেছে।
তোয়ালে দিয়ে গা মুছতে-মুছতে আইহোলে চোখ রেখে দেখল। ঝুমা!
ঝুমাকে দেখে এই প্রথম ও একটু আনন্দ পেল। শান্তিও।
ঝুমাকে আজ ও আসতে বলেছিল। আসলে ঝুমাকে ও কবেই ওর জীবনে আসতে না করে দিয়েছে। তাও মেয়েটা এঁটুলির মতো পিছনে পড়ে থাকে। তপস্যার অনুপস্থিতিতে ঝুমাকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতেই ও ঝুমাকে ডাকত। তপস্যা ফিরে এলেই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করতে একটুও ভাবতে হত না সার্থককে। ঝুমা উঠতি এক শিল্পী, তায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এরকম উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়েরা সার্থকের পিছনে পড়ে থাকবে এ তো স্বাভাবিক! ঝুমার না আছে ভালো একটা চাকরি, তায় ডিভোর্সি, সাত বছরের মেয়ে সমেত। এরকম একটা মেয়ে সার্থকের স্টেটাসের সঙ্গে একদমই মানানসই নয়। এই কথা ঝুমাকে যতবার বলেছে, ও কেবল সেই দিল্লিতে অকাদেমিতে দেখা হওয়ার দিন থেকে তপস্যাকে বিয়ে করার আগের দিন পর্যন্ত ওর সঙ্গে সার্থক কীভাবে মেলামেশা করেছে তার খতিয়ান দেয়। এতে আরও বিরক্ত বোধ করত সার্থক। এরকম ঘনিষ্ঠ মেলামেশা শাশ্বতী, তটিনী, সৌমিতা, নীলাঞ্জনা সকলের সঙ্গেই ও করে। কেউ তো ওর মতো এমন গায়ে পড়া নয়। শিল্পীদের জীবনে এসব একটু-আধটু থাকেই। ঝুমার যেন কোনো পেডিগ্রি নেই। চ্যাটচ্যাটে গায়ে পড়া স্বভাবের জন্য আরও বিরক্ত লাগত ওকে। তবে সার্থকের মা বেঁচে থাকার সময়ে একবার মাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার সময়ে বিল দিতে গিয়ে ও দেখল ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙতে হবে। ঝুমাকে সমস্যাটা বলার সঙ্গে-সঙ্গেই ঝুমা ওকে কিছু টাকা ধার দিয়েছিল। নিজের জমানো সঞ্চয় ও এদিক-ওদিক থেকে মিলিয়ে-ঝুলিয়ে সার্থক সেবার হাসপাতালের বিল মিটিয়েছিল। স্থায়ী আমানতে ওকে হাত দিতে হয়নি। তা-বলে ঝুমাকে যে স্থায়ীভাবে জীবনে জায়গা কখনোই দিতে পারবে না এ বিষয়ে ও নিশ্চিত ছিল। আরেকবার সার্থকের হাতে কাচ ফুটে গিয়ে সেপটিক মতো হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুদিন ও ব্রাশ তুলি ঠিকমতো ধরতেই পারছিল না। সেই সময় ওর একটা সোলো এক্সিবিশনের ডেট পড়েছিল। সেই ডেট ক্যানসেলই করে দিত কিন্তু জগবন্ধুদা সেকথা শুনে ওকে বলেছিল—
‘বিরাট মিস করবি তুই। দিল্লি থেকে শিল্পপতি দিলীপ ঝুনঝুনওয়ালা আসছে। শিল্পের সমাঝদার কি না বলতে পারব না, তবে নিজেকে সমাজদার দেখাতে বেশ কিছু ছবি নিশ্চয়ই কিনবে। প্রদর্শনীটা করতে পারলে তোর কিছু লাভ হত রে!’
সার্থকের ক্ষতিতে জগবন্ধু সরকারের দীর্ঘশ্বাস পড়ায় একটু আনন্দই পেয়েছিল ও। বাংলায় শিল্পের জগতে সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটি, যিনি রাজ্যের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতাবান মানুষের অতি ঘনিষ্ঠ তিনি সার্থকের দুঃখে দুঃখী! সার্থকের জন্য সমব্যথী!
নাহ্! সার্থক সুযোগ হাতছাড়া করেনি। সুযোগ সুবিধায় না করার মতো মানসিকতা গড়ে ওঠার পথে যে বাধাগুলো সেগুলোকে জয় করা সম্ভব হয়নি ওর। তাই কীভাবে প্রদর্শনীটা করা যায় সেই ভাবনার মাঝেই ক্রমাগত ঝুমার ফোন, মেসেজ, সার্থকের জন্য ওর উৎকণ্ঠায় বিরক্ত হতে হতেও ভাবনাটা মাথায় খেলে গেল।
ঝুমা সারাদিন ওর স্টুডিয়োতে পরিশ্রম করে যে ছবিগুলো এঁকেছিল, তা বেশ ভালোই। পরিণত শিল্পীর হাত। আঁকার হাত যে ঝুমার তৈরি ও একেবারে ঈশ্বরপ্রদত্ত একথা সার্থক কখনও ঝুমাকে না বললেও মনে-মনে স্বীকার করত। সেবার ঝুমার আঁকাগুলোর তলায় নিজের নাম বসিয়ে প্রদর্শনী করল ও। খুব একটা উৎসাহ অবশ্য ছিল না ওর। কিন্তু এক ডেট মিস করলে পরের ডেট কবে পাওয়া যাবে তার ঠিক ছিল না। আর ঝুনঝুনওয়ালার সৌজন্যে যদি কিছু অর্থাগাম হয় ওর? তা ছাড়া ঝুনঝুনওয়ালার সঙ্গে জগবন্ধুদা পরিচয় করিয়ে দিলে দিল্লিতে বা অন্য কোথাও প্রদর্শনী বা ইভেন্টের জন্য স্পনসরশিপ পেয়ে যাওয়ার একটা আশাও থেকে যায়।
সবাই ছবিগুলোর খুব প্রশংসা করেছিল। বেশ কিছু টাকাও পেয়েছিল সেবার ছবিগুলো বিক্রি করে। ঝুমার মতো আকাট মুখ্যু একটা মেয়ে কেবল সার্থক ওকে ওর সঙ্গে দু-দিন থাকতে দিয়েছে বলে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল!
সেই ঝুমা আজ এই সংকটে দরজার একদম বাইরে। ওকে ভেতরে এনে সবটা বলে পরামর্শ চাইবে? সার্থক আর দেরি করল না। দরজাটা খুলল। ঝুমা ভেতরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিল। তোয়ালেটা সরিয়ে ঝুমাকে জড়িয়ে ধরল। ঝুমাকে জড়িয়ে ধরতেই ওর খুব কান্না পেল। সার্থক একটা শিশুর মতো কেঁদে উঠল। ঝুমা হতবাক। ঝুমার গা থেকে চন্দনের মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে। তুপুর গা থেকেও একটা দামি সুগন্ধির ঘ্রাণ আসছিল। সব ছাপিয়ে নিজের গায়ের ঘামের উগ্র গন্ধটাই এখনও নাকে এসে লাগছে ওর।
‘কী হল? এমন কাঁদছ কেন? কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার? তপস্যা ফোন ধরেনি? না পিঠের ফোঁড়া?’
‘তুমি তো সবটা জানো। সব জেনেও আমার সঙ্গে থাকবে? সবসময়?’
ঝুমার মুখটা খুঁটিয়ে লক্ষ করছে সার্থক। আনন্দ বা উত্তেজনাই তো মনে হচ্ছে। নিজেকে নিয়ে এত বেশি ভাবতে-ভাবতে অন্যের মন বা মুখ কিছুই পড়ার ক্ষমতা বহুদিন ও হারিয়েছে। তাই সঠিক বুঝতে পারছে না। কথাটা শুনে ঝুমা খুশি হল কি না?
পিঠের ফোঁড়াটা দেখল ঝুমা। তারপর বলল—
‘তুমি এখনও ব্রাশ করোনি? মুখ থেকে বাসি গন্ধ আসছে। যাও মুখ ধুয়ে এসো। আমি জল গরম করছি। ফোঁড়াটা পেকে উঠেছে। একটু চেপে সেঁক দিলেই ফেটে যাবে।’
সার্থক ঝুমাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল। এবার ঝুমা আলতো করে ঠেলে দিয়ে বলল—
‘অনেক হয়েছে। যা বলছি করো। আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। আগে চা খাবে? মুখ ধুয়ে এসো শিগগির।’
সার্থকের বাড়িতে এসে এরকম গিন্নি-গিন্নি ভাব ঝুমা প্রায়ই করে। সার্থক প্রতিদিন ভাবে আজ সব হয়ে যাওয়ার পরে ওকে না করে দেবে। বিছানায় বসে সিগারেটে টান দিতে-দিতে ঝুমার জামাকাপড় পরা থেকে ওর ঘর গোছানো সব দেখতে-দেখতে মাথার ভেতর কিরকম একটা খুন চেপে ধরত ওর। মনে হত, এই অতিরিক্ত গিন্নি ভাবটার জন্যই ও মুহুর্মুহু ফোন করত সার্থককে। সঙ্গে মেসেজও। কতবার তপস্যার সঙ্গে থাকাকালীন ঝুমার ফোন মেসেজ এসেছে! সার্থক লুকাতে পারেনি। লুকাতে চায়ওনি। ঝুমার মতো মেয়েরা ওর জন্য আকুল এটা তো ওর একটা গর্বের বিষয়। ওরকম সাধারণ একটা মেয়ের যে কোনো গুরুত্ব নেই সার্থকের জীবনে সে-কথা কি তপস্যার মতো প্রখর বুদ্ধিমতী মেয়ে বুঝতে পারেনি? ভাবনাটা মাথায় এলেই ঝুমাকে এক ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতে ইচ্ছে করত ওর। কিন্তু তপস্যা ফিরে না আসা অব্ধি ওর ছন্নছাড়া জীবন, ঘর-সংসার এমনকি আঁকার জিনিসপত্র গোছানোর জন্যও একজনকে চাই তো! বিনা পয়সায় এমন বিশ্বাসী কাজের লোক ও পাবেই-বা কোথায়? তার ওপর ছবি আঁকার সেন্স, মুড বিষয়ে ধারণা ওর অসাধারণ। ঝুমা যে প্রতিভাময়ী একথা সার্থক নিজের কাছে অন্তত স্বীকার না করে পারে না।
‘আগে এক কাপ চা দাও। শরীরটা ভালো লাগছে না।’
‘এই বাসিমুখে চা খাবে?’
‘আহা! ঝুমা! সবসময় এসব ভালো লাগে না। তুমি চা করবে, না আমি নিজেই...’
‘আচ্ছা বাবা! তা-ই হোক।’
ঝুমা রান্নাঘরে চলে গেলে সার্থক আরেকবার ওর ঘরে এল। তপস্যার নিথর দেহটার দিকে তাকাতেই হাত-পা কেমন অবশ হয়ে আসছে ওর। বেশিক্ষণ এ ঘরে থাকা ঠিক হবে না। দরজাটায় তালা দিয়ে বেরোতে পারলে ভালো হত? তালা দেওয়ার কথায় ওর মনে একটা ভাবনা এল। সে-ভাবনাটাকে ঠিকমতো রূপ দিতে পারলে এ যাত্রায় ওর নিস্তার পাওয়া নিশ্চিত!
নাকি ঝুমাকে একবার যা ঘটেছে সবটা বলে দেখবে? সঙ্গে একটা প্রস্তাবও রাখবে, যা ঝুমার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা!
বাইরে বেরিয়ে দেখল ঝুমা টেবিলের ওপর গতকাল রাতে ফেলে যাওয়া গল্পগুচ্ছটা খুলে পড়ছে। দু-কাপ চা-ও রাখা আছে টেবিলে। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। সার্থক যে সদ্য উনুন থেকে নামানো গরম চায়ে চুমুক দিতে পারে না একথা ঝুমা জানে। তাই চা করেই ডাকাডাকি করেনি।
সার্থককে চায়ের কাপ নিতে দেখে ঝুমাও চায়ের কাপে চুমুক দিল। বইয়ের পাতা থেকে মুখ সরালো না। সার্থক চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবল, এই সুযোগ! ঝুমা বই পড়ছে। এখন যদি বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ও নিজে পুলিশ ডেকে আনে? অথবা বাইরে বেরিয়ে লোকজন ডেকে এনে বলে—‘আমার প্রেমিকা আর আমার বউ দু-জনে প্রচণ্ড ঝগড়া হাতাহাতি করছে, আপনারা প্লিজ এসে থামান!’ তাহলে পুলিশ বা বাইরের লোক এসে ফ্ল্যাটের ভিতর তপস্যার মৃতদেহ আর ঝুমা দু-জনকেই দেখতে পাবে। ওদের ফ্ল্যাটে বা গলির ভেতর কোনো সিসিটিভি নেই এটা ও জানে। ঝুমা কখন এসেছে তা কেউ বলতে পারবে না। অনায়াসেই এই খুনের দায় ঝুমার ওপর পড়বে। তপস্যার ওপর ঝুমার খুব রাগ। সেইসব রাগের মেসেজও সার্থকের হোয়াটস্যাপে আছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই একটু আরাম পেল ও।
‘এখন সাতসকালে গল্প পড়ছ?’
‘হ্যাঁ। গল্পই তো জীবন। আমরা সবাই এক-একটা গল্পের পাতা ছাড়া আর কি বলো তো?’
‘ছবি আঁকা ছেড়ে গল্প লিখবে নাকি?’
‘ভাবছি, মন্দ হত না। লেখার জগতে এমন সার্থক খাস্তগির, জগবন্ধু সরকারের মতো লোকজন নিশ্চয়ই নেই? ওখানে নিশ্চয়ই এত রাজনীতি হয় না?’
‘ধুর! রাজনীতি কোথাওই হয় না। এই জন্য তোমাকে মাথামোটা বলি। সব জায়গায় কেবল আপনি বড়ো হব, টাকা কামাব নীতি। এটাকে রাজনীতি বলে না। রাজনীতি কাকে বলে তাও বোঝো না?’
ঝুমার মুখ ঈষৎ শুকনো। সার্থক হাসার চেষ্টা করল।
‘তা কী পড়ছ?’
‘শাস্তি’
‘শাস্তি’ শব্দটা উচ্চারিত হতেই সার্থকের হৃৎস্পন্দন দ্রুত হল। একটু যেন কেঁপেও উঠল ও। ঝুমা টের পেল না। খুব ক্ষীণ স্বরে সার্থক বলল,
‘হঠাৎ?’
‘কী? হঠাৎ কী?’
ঝুমার গলায় উচ্ছ্বাস।
‘এই গল্পটাই পড়ছ কেন?’
সার্থকের গলার স্বর আরও দুর্বল।
‘শাস্তি গল্পটা আমার দুটো কারণে ভালো লাগে। এক, রবীন্দ্রনাথ কীরকম একটা মেয়েলি শব্দ ‘মরণ’-কে উচ্চতা দিয়ে গেলেন!’
সার্থকের এসব শুনতে ভালো লাগছে না। বাইরে বেরোনোর জন্য কী বাহানা দেবে ঝুমাকে তাই ভাবতে গিয়ে বলল,
‘আর দ্বিতীয় কারণ?’
‘আমি নিজেকে চন্দরার জায়গায় আর তোমাকে ছিদামের জায়গায় বসিয়ে ভাবি, আমি যদি বড়োজায়ের সঙ্গে অত মুখরা হয়ে ঝগড়া করতে পারি, তাহলে তুমি আমাকে অন্যের দোষ নিজের কাঁধে নিতে বললে আমি কখনও তোমার কথা শুনতাম না। তোমাকেই দোষী বলতাম পুলিশ, আদালত ও গ্রামবাসী সবার সামনে।’
ঝুমা হাসছে। সার্থক চেষ্টা করেও হাসতে পারল না। আবারও কেঁপে উঠল। ওকে দেখে ঝুমা বলল—
‘খুব ব্যথা করছে? কেঁপে উঠলে যে?’
সার্থক আরও একবার কেঁপে উঠল।
‘ইশ! ব্যথাটা বেড়েছে বেশ! আমি গরম জল নিয়ে আসি। তুমি চুপ করে বসো এখানে। চা-টা শেষ করে নাও।’
সার্থক হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। ঝুমা পিঠের ফোঁড়াটার কথা বলছে। ওর মাথায় আবার নতুন একটা পরিকল্পনা এল। ঝুমাকে বলবে— ‘এমনি তুলোয় হবে না। সামনের ফার্মাসি থেকে বরিক তুলো নিয়ে আসছি।’ তারপর পরিকল্পনামাফিক আগে থানায় ফোন করবে, তারপর নীচের ফ্ল্যাটের বাবুয়াদাদের খবর দেবে। ভাগ্যিস ঝুমাকে এখনও সবটা জানায়নি। শাস্তি গল্পে চন্দরা যেমন ছিদামকে ভালোবাসত, তেমনভাবে ভালোবাসে না ও সার্থককে। সে-কথা তো জানিয়েই দিল। আচ্ছা, চন্দরা কি ছিদামকে ভালোবেসে খুনের দায়টা নিজের ওপর নিয়ে নীরবে ফাঁসির সাজা মেনে নিয়েছিল? এই ভাবনাও ওর মাথায় আসল। তবে বেশিক্ষণ ভাবল না ও। যত দেরি হবে তত ও বিপদে পড়বে। ঝুমা রান্নাঘর থেকে কী যেন বলল? শোনার প্রয়োজন নেই। দ্রুত জামাটা গায়ে চাপাতে ঘরে এল ও। তাড়াতাড়ি একটা টিশার্ট গলাতেই দরজা খোলার শব্দ!
ঝুমা ভেতরে এসে গেছে। ওর হাতে ধরা সার্থকের অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপটা পড়ে গেল। ভাঙা কাপের একটা টুকরো গিয়ে আটকে গেল তপস্যার কপালের ক্ষতস্থানে। তপস্যা স্থির, চোখদুটো খোলা। সেখানে ভয় নয় ঘৃণা যেন জ্বলজ্বল করছ!
‘আমি চাইনি। ও নিজেই আমার ওপর এমন চড়াও হল, বলল, ওর গয়নাগুলো নাকি আমার কাছে আছে। আসলে মায়ের গয়নাগুলো ও...’
‘চুপ। তুমি খুন করেছ!’
চিৎকার করে উঠল ঝুমা। সার্থক একদম সময় ব্যয় না করে ঝুমার মুখ চেপে ধরল। ওর ঘাড়ের কাছে চুমু দিতে দিতে বলল—
‘আমাকে আর-একবার উদ্ধার করো প্লিজ। এই খুনের দায়টা থেকে মুক্ত করো। আমাকে সাহায্য করো প্লিজ।’
ঝুমা দাঁত বসালো সার্থকের আঙুলে। সার্থক ব্যথা সহ্য করেও হাত সরাল না। আরেকটা হাত ওর স্তনের গায়ে রেখে বলল—
‘এই সমস্যাটা মিটে গেলেই আর কোনো বাধা থাকবে না। আমাদের বিয়ে হবে। একটা ছোটো সার্থক তুমি চাইতে। তোমার সব স্বপ্ন আমি পূরণ করব ঝুমা। আমার পাশে থাকো। আমাকে বাঁচাও প্লিজ।’
ঝুমা প্রবল বেগে ওকে ঠেলে দিয়ে দরজার কাছে গেল। সার্থক হাতের সামনে পুরোনো একটা লোহার রড দেখতে পেল। জানলার শিকগুলো সদ্য পালটানো হয়েছে। সেগুলোই হবে হয়তো। লোহার শিকটাকে হাতে তুলে নিয়ে ঝুমার মাথায় সজোরে আঘাত করল। ঝুমা পড়ে গেছে মেঝেতে। ঝুমার মাথা থেকে রক্ত এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তপস্যার শরীর। ঝুমা ছটফট করছে মেঝেতে। কী যেন বলার চেষ্টা করছে।
সার্থক যেন শুনতে পেল, ঝুমা ‘খুনি’ শব্দটা উচ্চারণ করছে। সার্থকের মাথার ভেতর আবার হাতুড়ির শব্দ প্রকট হচ্ছে। পিঠের ফোঁড়াটা চাগাড় দিয়ে তীব্র ব্যথা জানাচ্ছে। ঝুমার কাছে নিচু হয়ে বসল সার্থক, লোহার শিকটা দিয়ে আবার ওর মাথায় আঘাত করতে করতে বলল—
‘আমি নই, তুমি খুনি। অনেকদিন তোমাকে না করেছি। তবুও তুমি যাওনি। আর তোমার থেকে যাওয়াই আমার সব হ্যাঁ-কে না-তে মিলিয়ে দিল। সার্থক খাস্তগির তোমার মতো সাধারণ বোধবুদ্ধির ব্যক্তিত্বহীন একটা মেয়েকে হ্যাঁ বলতে পারে না। আমার জীবনটাকে না-তে বদলে দিয়ে একটুও দায়িত্ব নেবে না?’
আঘাত করতে ও খেয়াল করেনি ঝুমা কখন একেবারেই স্থির হয়ে গেছে। আর ওর মুখে কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তি নেই। সার্থক কিছু বুঝতে পারার আগেই আবার ডোরবেল বেজে উঠল।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
মন্তব্য করুন