অরিজিৎ লাহিড়ীর গ্লিচ—তীর্থঙ্করের কলকাতা ফেরত, চাকরি হারানো, এআই-অফার আর প্যান্ডেলে মানবতার প্রদর্শনী। হিউম্যানিটির পোস্ট-রিয়েল সংকটে মা, ঈশিতার সঙ্গে মানবিক টানাপোড়েন আর একটি কাচের কিউবে আটকে পড়ার তীব্র, আধুনিক ও আবেগস্পর্শী কাহিনি—প্রযুক্তি-দুনিয়ার নয়েজে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গান।
কাশীপুরের তীর্থঙ্কর রায়, তুই ফিরছিস কলকাতায়—একটা লেগ্যাসি সিস্টেম-এর পুরোনো ভার্সনে লগ-ইন করবার মতো। গুগল ম্যাপস বলছে পৌঁছাতে সময় লাগবে এক ঘণ্টা সতেরো মিনিট, কিন্তু তোর ভেতরের রিটার্ন টাইম? ইনফিনিটি।
চাকরি নেই—লাস্ট কমিট ছিল তিন মাস আগে, সোজা ট্র্যাশ ব্রাঞ্চ-এ পুশ হয়ে গেছে। লিঙ্কডইন বায়ো-তে এখনও লেখা: লুকিং ফর চ্যালেঞ্জিং রোলস, যেন নিজেকে অটো-এনকোড করে রাখলে বাস্তব বদলে যাবে।
তোর ওয়ালেট অ্যাপ দেখে মাত্র পাঁচ বছরের স্মল ফাইন্যান্স ব্যাংকের এ টি এম-ও বিশহাজারি স্নিকার পরে হাসে, কিউআর কোড মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তোর বাড়ির লোক জানে তুই ছুটিতে ফিরছিস। ছুটি—এখনকার ভাষায় ইউ আই রিফ্রেশ।
ভেতরে চলছে মেমোরি লিক, বাইরে মুখে ফেস ফিল্টার্ড হিউম্যান ভার্সন টু পয়েন্ট জিরো। মা বলেছেন, ‘তোর ফ্যাভ ইন্ডিয়ার কুর্তাগুলো ধুয়ে রেখেছি’।
হ্যাঁ রে? শেষ কবে তোর আইডেন্টিটি ক্লিন হয়েছিল? এই শহরে এখন নয়েজ ক্যানসেলেশন-এর দরকার নেই—তুই নিজেই এক ইন্টারনাল মিউট মোড-এ।
আর সেই ছোট্ট ছেলেটা, একটা ছোট্ট রিল ভিডিয়োতে... যে বলেছিল, ‘আমার বাবার চাকরি তুমি খেলে কেন?’—...আসলে তো সে তুই-ই।
ফিড স্ক্রল করতে করতে তুই আটকে যাস একটা রিল-এ—একটা সাত-আট বছরের বাচ্চা, গলায় টিনটিনে কণ্ঠ, মুখে অদ্ভুত সিরিয়াসনেস।
সে বলছে, ‘আমার বাবার চাকরি কে নিল?’
ক্যামেরা ক্রমশ জুম—চোখের কোণায় কেটে রাখা দুঃখ, কিন্তু কনটেন্ট ক্রিয়েটররা ব্যাকগ্রাউন্ডে লাগিয়েছে সোয়াড মিউজিক।
ভিডিয়োর ক্যাপশন: ‘এআই স্টোল মাই ফাদার’—হ্যাশট্যাগে ট্রেন্ড করছে ‘ফাদার্স ডে’। নিচে একটা কমেন্ট তোর চোখে আটকায়—‘ভাই ভাইরাল করে দে, স্পনসর আসবে!’
এআই আসলে কী করেছে? চাকরি খেয়েছে? না, শুধু কর্পোরেট গিল্ড-এর মুখোশ খুলে দিয়েছে? আগে এইচ আর বলত—‘আমরা পরিবার’, এখন বলে—‘তুই রিসোর্স ভাই, রিপ্লেসেবল। আপগ্রেডেড ভার্সন তো আগেই বসে আছে ক্লাউডে।’
এম এল মডেল (ম্যশিন লার্নিং মডেল) মানুষকে চিনতে পারে না, কিন্তু সিইও-রা জানে কাকে কবে ফায়ার করলে শেয়ার প্রাইস তিন শতাংশ বাড়বে। তোর চাকরি চলে গেছে, কারণ তুই ‘হিউম্যান’ ছিলি। এবং এই সিস্টেম, ভাই... সিস্টেম না, একটা ওয়েল ট্রেইন্ড সাইকোপ্যাথ অ্যালগরিদম।
কলকাতা এয়ারপোর্টে নামতেই চোখে লাগে হিউমিডিটি আপডেট—তোর মুখের উপর দিয়ে ফেস সেরাম লেয়ার গলে পড়ে যায়, আর ঠিক সেইখানেই একটা ছোটো মেয়ে ফোন হাতে রিল তুলতে তুলতে বলে—‘কলকাতার হ্যাপিনেস ইনডেক্স ইজ ইনক্রেডিবল, রাইট?’
তুই হেসে পাশ কাটাস, যেন তোর জীবনেও এখনও কিছু ইনক্রেডিবল বাকি আছে।
কলকাতা এয়ারপোর্টে নামতেই মোবাইলে একটা মেসেজ আসে—‘ইওর ফাইনাল সেটেলমেন্ট রিলিজড’। পাঁচ বছর আগে তুই দৌড়েছিলি একটা ওএলএক্সড ড্রিম-এর পিছনে—গুরগাঁও, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু... তুই সবার মতোই একদিন বলেছিলি—‘কলকাতা ফিরে কী করব?’
আজ তুই ফিরলি তীর্থঙ্কর, শুধু করার কিছু নেই।
উবার না নিলে উপায় ছিল না—লাগেজ এত ভারী, আর ইয়েলো ট্যাক্সি ‘পুজোর ভাড়া’ চাইছে, হিউম্যান ফেস-ভ্যালু দেখে। তোর ফোনে থাকা শেষ অ্যামাজন ভাউচার আর ইউ পি আই ক্যাশব্যাক মিশিয়ে তুই একটা উবার প্রিমিয়ার বুক করেছিস।
ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে, ‘অফিস করতেন নাকি বাইরে? লাগেজ তো স্যুটকেসের মতো নয়, লাইফস্টাইলের মতো।’
—কাজ করতাম, এখন একটু বিশ্রাম।
ভেতরে তুই-ই ভাবিস—‘এটা বিশ্রাম না ভাই, এক্সিস্টেন্সের ডাউনলোড পজ়।’
একটা বিলবোর্ড চোখে পড়ে—‘চ্যাটজিপিটি-র দয়া, এবার আপনার দোকানে এআই!’
তুই তাকিয়ে থাকিস—যেন ঈশ্বর এবার সাবস্ক্রিপশন বেসড।
ডোরবেল বাজাতেই মা দরজা খুলেই বলেন—‘এই যে এলেন বাবু সাত মাস বাদে! কালকে ফেসবুকে একটা ছবি দেখলাম—কফি হাতে দাঁড়িয়ে, লিখেছিস, সাইলেন্স ইজ আ সাইন অফ গ্রোথ—বুঝলাম, কিছু একটা গেছে!’
—মা, একটা টেকনিক্যাল ট্রান্সফরমেশন চলছে অফিসে। ওরা এজাইল মডেলে শিফট করছে, আমাকেও ফ্লোটিং রোল দিচ্ছে।
মা চুপ করে তোর জুতোজোড়া তুলে রাখেন শু-ব়্যাকে।
তারপর বলেন—‘ফ্রিজে আছে মাটন। রান্নাটা তোকে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট শেখাবে।’
—মা, আমি তো টেক লিড ছিলাম!
মা তাকিয়ে বলেন—‘রেঁধে খেতে পারিস না, তুই কোন লিড? তোর তো ডেটাপ্যাক ফুরিয়ে গেছে, মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।’
ঘর ভরতি, তবু তোদের কথার মধ্যে ল্যাটেন্সি।
তোর ফোনে তখনও একটা লাস্ট মেইল নটিফিকেশন ঝুলছে—‘ডিয়ার তীর্থঙ্কর, উই থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর ক্যনট্রিবিউশন...’
তুই পড়িস না, মার গলার স্বরই এখন তোর ওয়াই-ফাই।
তুই বসে থাকিস সোফায়, পাদুটো ছড়িয়ে।
মার রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে ঝাঁঝ, আর তোর মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় লাস্ট সিঙ্ক হওয়া ফাইলের নাম—‘ফাইনাল_এইচআর_কল_রেকর্ডিং.ডব্লুএভি’।
তুই হাসিস, ঠোঁট টেনে—স্টক ফটো টাইপ হ্যাপিনেস, যেটা ইনস্ট্যাগ্র্যামে দেখলে সবাই লিখত— ‘মুড’।
তুই জানিস, আসলে সেটা ফোল্ডার নেইম ছিল—‘ডিপ্রেশন উইথ স্টেবিলিটি’।
মা জিজ্ঞেস করেন, ‘চা খাবি?’
—না গো, আজকাল ক্যাফেইন সহ্য হয় না, অ্যাংজাইটি পিক্স।
মা ভাবেন অফিসের প্রেসার, তুই জানিস—প্রেসার কুকার নেই, উনুনটাই তো উধাও।
ফোনে তখনও ঝুলছে একটা রিমাইন্ডার —অনবোর্ডিং কিট রিটার্ন করবার।
তুই তাকাস ওদিকে, আবার ফিরিয়ে নিস চোখ—যেন ফেলে আসা প্রেমিকাকে না দেখে থাকার ব্যথা।
ফোনটা বেজে ওঠে।
রিংটোন: ‘ফিক্স ইউ’—কোল্ডপ্লে, লো-ফাই পিয়ানো ভার্সন। পিয়ানোর করুণ সুরে ভেসে আসে লাইনটা—‘হোয়েন ইউ ট্রাই ইয়োর বেস্ট বাট ইউ ডোন্ট সাক্সিড…’
তুই তাকাস স্ক্রিনে—ডিসপ্লেতে লেখা: ‘হিউম্যান রিসোর্স রিসাইক্লিং ইনিশিয়েটিভ’।
তুই ধরিস। ওপাশে কন্ঠ—নিখুঁত, অথচ নিঃসাড়—যেন কেউ পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশনকে কন্ঠ দিয়েছে।
‘তীর্থঙ্কর, আপনি কি সেই লোক—যিনি একসময় পিপল এনালাইটিক্স টুল বানাতেন, আর এখন নিজেই একটা কেস স্টাডি?’
তুই গিলিস ঢোঁক, কিছু বলিস না।
ও বলে, ‘আমরা এবারের পুজো থিমে আপনাকে চাই, রিয়েল হিউম্যান বিইং। আপনার কাজ: দর্শকদের চোখে তাকিয়ে প্রতিদিন তিন বার কাঁদতে হবে, আর দিনে একবার প্রশ্ন করতে হবে—আমি কি অলস ছিলাম, না কি অটোমেশন আগে এসেছিল?’
তোর চোখে এক ফালি আলো পড়ে, কিন্তু তার রিফ্লেকশনটা যেন স্ক্রিন শেয়ারিং উইন্ডোর মতো ফ্ল্যাট।
তুই শুধু বলিস—‘ড্রেস কোড কী লাগবে?’
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
দুই
মঞ্চের পেছনে একটা স্ট্যান্ডিং ফ্যান হেলাফেলায় ঘুরছে, পেছনে একটা বড়ো এলইডি ডিসপ্লেতে লেখা—
‘হিউম্যান রিএকশন থ্রু অ্যালগরিদমিক আর্ট—এ স্পেশাল প্যান্ডেল এক্সপেরিয়েন্স’।
ঢুকেই একটা ভেজা ঠান্ডা গন্ধ টের পাচ্ছিস—আলো-আঁধারির মাঝে কেউ একটা স্লাইড শো চালাচ্ছে।
আর ঠিক তখনই তোর সামনে ভেসে ওঠে ঈশিতা মিত্র—হ্যান্ড-ফ্রি কানে গোঁজা, হাতে ম্যাকবুক, চোখে কাচবিহীন চশমা।
ঈশিতা তোর দিকে তাকায়—একটু দৃষ্টি পরীক্ষা করে—উপরে নিচে, যেন হিউম্যান রিসোর্স নয়, ইউজার আই ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করছে।
সে বলে—‘আপনি থিম-অ্যাক্টর, তাই না? আপনার পোর্টফোলিও আমরা দেখেছি। একটু… ব্রোকেন ফেস আছে, এটাই আমরা খুঁজছিলাম।’
তুই কিছু বলিস না। এক হাতে ফোন, অন্য হাতে আইডি ব্যাজটা উলটে-পালটে ধরিস—যেন ভেবেই উঠতে পারছিস না, এটা নতুন পরিচয় না পুরোনো অপমানের ব্যাপার।
ঈশিতা বলে—‘মেক শিওর, যেন প্রতিদিন কাঁদাটা এক্স্যাক্টলি সেম টাইমে হয়। লোকের ইমোশন এখন অলস, তাদের ফিলিংসে পুশ নোটিফিকেশন দিতে হয়।’
হালকা গলা খাঁকারি দিস। সে বলে—‘ওহ্, আর হ্যাঁ—আপনি থিমে হিউম্যান। মানে আপনি যে জিনিসটা, সেটা অনেকেই এখন আর ঠিকঠাক বুঝতে পারে না। তো প্লিজ, রিমাইন্ড দেম।’
ভাবছিস, এটা কী হচ্ছে?
আর আমি, মানে—লেখক, আমি তোর কানে একটু ফিসফিস করে বলি—এই পুজোতে, তুইই থিম। রিয়েল হিউম্যান বিইং। না, ভগবান না। ভিক্টিম। ভেতরে তুই, বাইরে দর্শক। তুই বাঁচিস, ওরা ব্যস্ত রিল বানাতে। তোর কাজ? বসে থাকা, চুপচাপ।
দিনে তিন বার কাঁদবি—একটা ঘামছাড়া চোখে জল ফেলবি, যেটা তারা থ্রি সিক্সটি ক্যামেরায় ধরবে।
একটা বাচ্চা দাঁড়াবে গ্লাসের বাইরে, সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে—তুমি কি আমার বাবার চাকরি খেয়েছ?
এটাই তো এখন আর্ট, রে ভাই—মেশিন ভাঙে না, মানুষ ভেঙে পড়ে, আর প্যান্ডেল হিট হয়।
তুই বসে থাকিস একটা জিরো গ্র্যাভিটির চেয়ারে—হাতল নেই, ব্যাকরেস্ট নেই, শুধু ভারহীন বোধটুকুই ফার্নিচার।
ঈশিতা হোলোস্ক্রিনে একটা পিচ চালায়—‘এ বছর থিম—রিয়েল হিউম্যান বিইং।’
খেয়াল করিস না তুই যে, তোর নাম কোথাও নেই।
ঈশিতা বলে—‘তুমি দাঁড়াবে একটা গ্লাসের কিউবের ভেতর, মাথার ওপর থাকবে সফ্ট লাইট, চারপাশে সেন্সর লাগানো থাকবে—তুমি কাঁদলে আলো বাড়বে, তুমি চুপ থাকলে বেজ মিউজিক বদলাবে। একটা বাচ্চা থাকবে বাইরে—ক্যাপচা-ফেস, ছোট্ট সাইনবোর্ড হাতে, যেটাতে লেখা থাকবে—তুমি কি আমার বাবার চাকরি খেয়েছ?’
হয়তো তাকিয়ে থাকবি—জানিস না, উত্তর দিবি কি না। কারণ প্রশ্নটা তো তোর নিজের ভেতরেই গেঁথে গেছে।
যাক গে, ওসব ছাড়…এখন রিহার্সালের সময়।
সামনে খুলে যায় ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস দরজা। তুই ঢুকিস, পেছনে শব্দ হয়—‘শুউউউট!’
কেউ একটা বলে—‘ভালো করে দ্যাখো, কীভাবে হিউম্যান একটা স্পেসে টিকে থাকে।’
দাঁড়িয়ে থাকিস মাঝখানে—চুপচাপ, চেয়ার নেই, বসার অনুমতি নেই—এটাই ‘এক্সপেরিয়েন্স’।
হঠাৎ চারপাশে আলো বদলায়—‘সিম্যুলেটেড সানসেট’—গায়ে পড়ে কমলা আলো, পেছনে বাজে কোনো এক ভ্যাপসা সোলো পিয়ানোর টিউন।
একটা স্পিকার ফিসফিসিয়ে বলে—‘ইমোশন ফেল, বাট নট টু মাচ...কিছুটা রেখে দাও ফাইনাল ডে-র জন্য।’
তুই চোখ বন্ধ করিস, কিন্তু মন খুলে যায়—একটা রিল মনে পড়ে, একটা ছাঁটাইয়ের ইমেল, মায়ের গলা, আর একটা কথাও না বলা কান্না।
তুই কিছু বলিস না। ক্যামেরা তা রেকর্ড করে।
গ্লাসের আড়াল থেকে তাকাস—ঈশিতা দাঁড়িয়ে, সাদা প্যাডে নোট নিচ্ছে। কোনো রিঅ্যাকশন নেই মুখে—একটা এআই-মেইড ফেসের মতো নিষ্প্রকাশ।
তুই হালকা নড়িস—কাঁধে ব্যথা টানে।
ঈশিতা লেখে: ‘ন্যাচারাল ডিসকমফোর্ট—রিটেইন।’
পেছনে বাজছে সাউন্ডস্কেপ—একটি মেশিন কান্না বুঝতে পারে না, কিন্তু বাজার বোঝে।
হঠাৎ শিশুটার প্রবেশ—সেই সাইনবোর্ড হাতে, ‘তুমি কি আমার বাবার চাকরি খেয়েছ?’
ঈশিতা চোখ তোলে। ক্যামেরা জুম ইনে।
তুই তাকাস, আর ঈশিতা প্রথমবার তোর দিকে তাকায়—একটা ক্ষীণ চেনা আর অচেনা দৃষ্টির ঠিক মাঝখান থেকে।
তিন
প্যান্ডেলে সাদা কিউবটা উঠে গেছে, সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে লোকজন রিলজ আর স্টোরি বানাচ্ছে—‘এটা কি রিয়েল? না, থিম?’
তোর কপালে টুকটুকে লাল টিপ—কনটেন্ট টিম বলেছে, ‘এটা কানেক্ট করে ইমোশনালি’।
ডিনার আসে সিল করা প্যাকেটে—‘লো সোডিয়াম স্পেস-পাস্তা উইথ সল্টেড রিয়েলিটি’।
সঙ্গে এক বোতল জল—‘পি এইচ ব্যাল্যান্সড গিল্ট রিমুভার’।
সন্ধ্যে ছ-টা থেকে ভোর পাঁচটা—তুই ‘লাইভ ইমোশন ডিসপ্লে মডিউল’, পেইড ফর ইন অ্যাডভান্স। কনট্র্যাক্টে লেখা ছিল তো—‘বিরক্তি, দুঃখ, ক্লান্তি—সব অনুভূতি ইউজার-ফেসিং হতে হবে।’
তুই কিউবের ভিতর দাঁড়িয়ে—চোখে সেই প্যাথেটিক হিউম্যান এক্সপ্রেশন লোড করা।
বাইরে দাঁড়িয়ে ছ-সাত বছরের একটা মেয়ে—হাতে কটন ক্যান্ডি, চোখে উৎসব, গলায় প্রশ্ন।
সে বলে—‘ওই কাকুটাকে কাঁদতে বলেছে কে? ওর কি বাড়ি নেই?’
লোকজন হেসে ফেলে, কেউ ভিডিয়ো তোলে, আর তুই তাকিয়ে থাকিস—গ্লাসের ওপারে, নিঃশব্দে।
পাশ থেকে একজন বিজ্ঞগোছের কাকু বলেন—‘থিম বুঝলি না? এটা ইম্প্যাক্টফুল। এই হল রিয়েল আর্ট। ’
আর তুই হঠাৎ বুঝে ফেলিস—তোর যন্ত্রণাটাও এখন কনটেন্ট।
এই ডিউটির আগেই—তোর মুখ স্ক্যান করে বানানো হয়েছে একটা সরো রেস্পন্স-সেট—হিউম্যান ইমোশনসের জন্য।
ক্লান্তির টাইমস্ট্যাম্প, অপমানের এক্সপ্রেশন, সবই এআই প্রেডিক্টেড।
তোর বেদনা? সিস্টেম বলে—পারফেক্টলি প্ল্যানড পেইন পয়েন্ট।
অষ্টমীর রাত।
হঠাৎ দেখিস পাশের কিউব-এ যে লোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল—হঠাৎ, সে নিজের কপালটা ঠোকায় কাচে। একবার... দু-বার… কপাল বেয়ে রক্ত নামছে, কিন্তু লোকটা থামছে না—তোদের অ্যাক্ট থামানো বারণ, কারণ ‘থিম চলতে থাকবে যেভাবেই হোক’।
সিকিউরিটি দৌড়ে আসে, কাচ কালো হয়ে যায়, ঈশিতা কিছু বলে না—শুধু মেসেজ পাঠায়, ‘সবাই পজিশন হোল্ড করো। দর্শক যেন বুঝতে না পারে।’
এই ইনস্টলেশনটা আর্ট না—এটা একটা স্লো-বার্ন শবদাহ।
আর তুই? তুই দাঁড়িয়ে, মাথার ভিতর আওয়াজ হচ্ছিল—পরেরটা কি তুই?
নবমীর ভোর।
তোদের সবার আজ ডিউটি শেষ—ঈশিতা ওয়াকিটকিতে বলে, ‘আজকে ছুটি, কাল ফাইনাল পুশ। বিসর্জনের দিনটাও ব্র্যান্ড এক্সটেনশন।’
তুই বেরোতে বেরোতে দেখিস—একটা কাচের কিউব এখনও পড়ে আছে মঞ্চে, আলো নিভে গেছে, তবু তার ভেতর কার যেন নিঃশ্বাস, ধোঁয়ার মতো জমে রয়েছে গ্লাসে।
বুঝে ফেলিস—শেষ নয়, কিছুই শেষ নয়।
সিগারেট ধরাতে গিয়ে দেখিস—ঈশিতা দাঁড়িয়ে।
সে বলে, ‘ফিরতে ইচ্ছে করছে?’
হাসিস , বোকার মত প্রশ্ন করিস—‘তুমি কি অফিসে কথা বলছ, না শহরের?’
‘দুটোরই কনট্রাক্ট শেষ হয়ে আসছে।’
জিজ্ঞেস করিস—‘তুমি থাকো কোথায়?’
ঈশিতা বলে—‘এই তো, কাচের বাইরে কোথাও, অথচ কাচটাই শরীরে আটকে গেছে।’
ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলিস, ‘তুমি জানো, আমি চাকরি চলে যাওয়ার পর মা-কে বলিনি।’
সে একটু চুপ করে, তারপর ফিসফিসিয়ে—‘আমি জানতাম, তুমি বলবে না বলেই এই রোলে তোমাকে কাস্ট করেছি।’
‘কাল বিসর্জন’—ঈশিতা বলে, গলায় কোথাও কোনো আবেগ নেই। তুই জবাব দিস, ‘ভাসিয়ে দিলে তো আর ফেরার কিছু থাকে না।’
ও বলে, ‘সব কিছু ভাসে না। কিছু জিনিস চুপচাপ ডুবে যায়।’
‘তুমি কি ভাসতে চাও না ডুবে যেতে?’—জিজ্ঞেস করিস।
ঈশিতা হালকা হাসে, ‘আমি শুধু চাই কেউ জিজ্ঞেস করুক, থেকে যাব কি না।’
তুই চুপ করে থাকিস, এই প্রথম, সত্যিই। আইডি কার্ডটা খুলে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলিস।
ও বলে, ‘কাল দেখা হবে?’
তুই বলিস না কিছু, শুধু চলে যাবার আগে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকিস এক সেকেন্ড বেশি।
চার
তুই দাঁড়িয়ে থাকিস ঠাকুরের প্রতিমার পাশে—ওরা খুলছে থিম, আলগা করছে ইন্সটলেশনের গাঁট, পেছনে শোনা যাচ্ছে রেকর্ডেড শঙ্খ, ঢাক আর লাউডস্পিকারে ঘোষিত হচ্ছে রাস্তাঘাট ক্লিয়ারেন্স আপডেট।
একটা নাট-বল্টু হাতে নিস, ভাবিস—এই রঙিন রাজ্যের স্পাইনটা আসলে ইস্পাত, হ্যান্ড-টাইটেন্ড।
আচমকা দেখিস—একজন লোক, প্যান্ডেল খুলতে খুলতে চোখের চশমা মুছে চুপ করে কাঁদছে। তুই এবারও তাকিয়ে থাকিস, কিছু বলিস না।
সে-ও বলে না কিছু। শুধু একবার মুখ তুলে দেখে—আর আবার স্ক্রু-ড্রাইভার চালায়, যেন কাঁদা একটা রুটিনের মধ্যেই পড়ে।
বিসর্জনের ঘাটে এখন প্রতিমা নামছে। আলোর রিফ্লেকশনে কাঁপছে জল, ঈশিতা হাঁটছে পাশে, হাতে ক্যামেরা, বলছে—‘এই জায়গাটায় জলটা সবসময় ফ্রেমের বাইরে থাকে।’
তুই বলিস—‘তুমি কি শুধু ফ্রেমের ভেতরেই দেখো, না মাঝে মাঝে লেন্স বন্ধ করো?’
ও থেমে যায় একমুহূর্ত, তারপর হাসে—‘আমি শুধু তখন দেখি, যখন কেউ দেখে না।’
তুই হঠাৎ বলে ফেললি—‘আমাদের মধ্যেও কি ফ্রেম আছে?’
ও থেমে যায় একমুহূর্ত, তারপর হাসে—‘আছে, কিন্তু রেজোলিউশন খুব লো।’
হঠাৎ তোদের পায়ের নিচে বাঁশের একটা টুকরো বা কিছু গড়িয়ে আসে। ঈশিতা তোকে ধরে ফেলে—না, রোমান্স না—ব্যালান্স।
রাত সাড়ে আটটা—ক্লাব প্রেসিডেন্টের বালিগঞ্জের বাড়ির টেরাস আর সংলগ্ন বলরুমে বিজয়া গেট-টুগেদার, চিপসের বদলে কোয়িনোয়া, আর সন্দেশের পাশে ব্র্যান্ডেড সোডা।
তুই প্রায় চুপচাপ—একটা সোফার কোনায় বসে, প্লাস্টিকে মোড়ানো ঠাকুরের মুখ যেন এখনও তোর ভেতরে।
ঈশিতা হঠাৎ পাশে বসে—বলছে, ‘তুই আর আমি একটা সিম্যুলেটেড কাপল হতে পারি।’
তুই কুঁচকে ফেলিস চোখ—ও বলে, ‘মানে রিয়েল কিছু না, একসাথে রিল বানাব, ফলোয়ার বাড়াব, আর যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে ‘তোমরা কি কাপল?’, বলব—‘ডিপেন্ডস অন নেটওয়ার্ক।’ ’
তুই চুপ করে থাকিস, একটু হাসিস। না করতে মন চায়, তবু হ্যাঁ বলছিস—কারণ এই শহরে, ‘না’ মানেই অ্যালগরিদম ফেলিওর।
ঈশিতা বলে—‘তুই যে এখন এক্স-ইঞ্জিনিয়ার, তার একটা হটনেস আছে।’
তুই একটু কনফিডেন্স নিয়ে বলিস—‘তুই যে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া আর কাউকেই চিনিস না, সেটাও বেশ সেক্সি।’
ও হাসে, এক চুমুক সোডা খায়—জিরো ক্যালরি, ফুল এফেক্ট। ও বলল, ‘চল টেরেসে যাই, এখানে অনেক আওয়াজ।’
তুই উঠিস, হাঁটিস, একটু হোঁচট খাস—ইচ্ছে করেই।
টেরেসে ঠাণ্ডা হাওয়া, ও বলল, ‘তুই চাইলে আজকের রাতটাকে একটা গ্লিচ ভাবতে পারিস। সকাল হলে সব ডিলিট।’
তুই বলিস না কিছু, শুধু কাঁধে হাত রাখিস—ক্লাউড আপলোড অন।
ঈশিতা বলছে—‘তোর সাথে নরমাল কথা বলা যায়, এটা এখন রেয়ার।’
তুই বলিস—‘তোর গলার আওয়াজে একটা ওয়াইফাই ডিসকানেক্টেড শান্তি আছে।’
ও কাছাকাছি আসে—কাঁধ ছুঁয়েছে কি না, বোঝা যায় না।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলিস না, সামনে একটা বোতল পড়ে থাকে—অর্ধেক পান করা, অর্ধেক আলোয় ভেজা।
ঈশিতা হঠাৎ বলে—‘তুই চাইলে আমাকে হাগ করতে পারিস। ’
একটু থমকে দাঁড়াস, তারপর আস্তে করে জিজ্ঞেস করিস—‘এটা কি ব্যাকআপ, না রিস্টার্ট?’
ওর উত্তর আসে না—শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস, আর হালকা গন্ধ—লেবুজল আর ক্লাউড বডি স্প্রে।
আরে গুরু! করেছিস কী? আজ লক্ষীপুজোর পরদিন তুই আর ঈশিতা একটা ছোটো রুমে—দেয়ালে ছায়া পড়ছে, সিলিং ফ্যানে হালকা হেলানো আলো।
ওর চুল থেকে ভিজে গন্ধ আসে—তুই হাতটা এগিয়ে দিস, আর সেটা থামে না।
শরীর ছুঁয়ে যায় শরীরকে, কিন্তু গতি নেই, নেই কোনো তাড়া, যেন তোরা দু-জনেই জানিস—এই ছোঁয়া, এই শ্বাস—ডাউনলোড হচ্ছে সম্পর্ক।
ঈশিতা তোকে থামায় না, তুইও কিছু জিজ্ঞেস করিস না—দু-জনের চোখেই সেই মুহূর্তে একটা চুক্তি তৈরি হয়—কিছু বললে এটা শেষ হয়ে যাবে।
তুই ঈশিতার সাথে এখন একটা রুটিনে ঢুকে পড়েছিস—বিকেলে লেক রোড ধরে হাঁটা, রাতে দু-জনে মিলে সিরিজ দেখে ঘুমোনোর আগের গপ্পো, টেক্সটে নয়, ফোনে—হাউ কিউট!
তুই জানিস, ঈশিতা রাতে ফোন ধরেনি—ওর বাড়ি দুর্গাপুরে গেছে বিজয়া সারতে, পারিবারিক চাপ এড়ানো যায় না এই পোস্ট ট্রুথ হাইপাররিয়েল যুগেও।
একা বসে আছিস খাটে, ল্যাপটপে স্ক্রিনসেভার ঘুরছে—একটা ঘুরন্ত গ্রহ, যে ঘোরে কিন্তু কোনো কক্ষপথে বাঁধা নয়।
ঠিক তখনই আসে একটা ইনবাউন্ড মেইল—‘হাইপারহিউম্যান™ তোকে ডাকছে। তুই কি রেডি নেক্সট ইভলিউশনের জন্য?’
মেইলের শেষে ক্লিক করার মতো একটা ছবি—তুই ক্লিক করিস—স্ক্রিনে খুলে যায় একটা হলোগ্রাফ-স্টাইল প্রেজেন্টেশন—জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে একরাশ নীল আলো—আর কোথাও দূরে বাজতে থাকে ‘এক্সিট মিউজিক’।
আরে বাহ্ রে ভাই! ল্যাপটপ স্ক্রিনে এখন—
সাবজেক্ট: কনগ্র্যাচুলেশনস, তীর্থঙ্কর!
ফ্রম: রিক্রুটিং-বট#৯২৭৮@হাইপারহিউম্যান.এআই
প্রিয় তীর্থঙ্কর,
তোমার পেছনে তিন মাস ধরে চলা অনবদ্য ডেটা স্ক্র্যাপিং, ইমোশনাল এনালিটিক্স, আর সোশ্যাল-ভিউবেইসড ফিটনেস টেস্ট-এ তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ।
আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি, তুমি হাইপারহিউম্যান™-এর “সিনিয়র সিন্থেটিক এম্প্যাথি কনসালট্যান্ট” পদে নির্বাচিত হয়েছ।
লোকেশন: দুবাই-ভারচুয়াল মাল্টিভার্স
স্যালারি: বেস ৫.৫ লাখ ভারতীয় মুদ্রা প্রতি মাস + মাসিক ফিল্টারড ইমোশনাল ইনসেনটিভ
বেনিফিটস:
আনলিমিটেড সিম্যুলেটেড বোর্ডিং পাস
এনহ্যান্সড স্লিপ সাইকেল মডিউল
এথিকালি সোর্সড কগনিটিভ ডিজন্যান্স
নোট: এই চাকরি মেনে নিলে তুমি সমস্ত পুরোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, ও স্মৃতিকে আর্কাইভ মোডে পাঠাতে সম্মত হচ্ছ।
ডিজিটালি সাইন করে ফেলো, আর ঢুকে পড়ো নেক্সট-জেনারেশন ওয়ার্কলাইফ ইনভ্যালিডেশনে।
থ্যাঙ্ক ইউ ফর চুজিং হাইপারহিউম্যান™—হিউম্যানিটির পোস্ট-রিয়েল রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট ।
***
স্ক্রিনে স্ক্রল করে যায় ‘আই অ্যাগ্রি’ বোতামটা। আর কোথাও, খুব গভীরে, ঈশিতার গলার আওয়াজ ভেসে আসে—‘তুই তো ভালোই ছিলি, হঠাৎ এত সিরিয়াস হলি কেন?’
ঘরের ভিতরে ভেসে বেড়ায় মেটালিক সাইলেন্স।
কোলে খোলা ল্যাপটপ, অফার লেটার আবার নিজে থেকেই খুলে গেছে—বোতামটা বাম্পিং অ্যানিমেশনে বলছে, ‘চল বন্ধু, রিয়েল-থেকে ভার্চুয়ালে পা রাখ।’
ঈশিতা মেসেজ পাঠিয়েছে, ‘তোর মুখটা কাল থেকে দেখি না... ম্যাসিভ মিসিং!’
তুই টাইপ করিস, মুছিস, আবার টাইপ করিস—‘আজ একটু মাথা ব্যথা, রেস্ট নিচ্ছি।’
সত্যিটা লিখিস না। কারণ সত্যিটা তোর কাছেও ক্লিয়ার না—তুই একটা অফার পেয়েছিস, যেটা শুধু তোর চাকরি ফেরত দিচ্ছে না, দিচ্ছে তোর অস্তিত্বের নতুন সফটওয়্যার আপডেট।
তুই তখন ঘরের কোণে হুড়মুড় করে নামিয়ে রাখা হুডির ভিতর গুটিয়ে বসে আছিস, ল্যাপটপের স্ক্রিনে অফার লেটার এখনও খুলে আছে।
তোর বাঁ-চোখ টানছে ক্লান্তিতে, আর ডান চোখ সন্দেহে।
ঠিক তখনই মা ঢুকে পড়লেন—ঘরে ঢুকে এক মুহূর্তে এসি-র রিমোট তুলে নিয়ে বিপ করে বন্ধ করলেন।
‘এই কার্তিক মাসে এসি? তুই কি পেঙ্গুইন নাকি? নাকি ওই হুডিটার নিচে শরীর কাঁপছে লজ্জায়?’
তুই একটু মুখ লুকিয়ে বলিস—‘না মা, এইটা নতুন জব অফার… ভাবছিলাম।’
মা ঘাড় বাঁকিয়ে দেখেন স্ক্রিনে লেখা কিছু, তারপর হালকা চশমা ঠিক করে বলেন—‘এত ইংরেজি লেখা, মনে হচ্ছে যেন চাকরি না, স্পেস মিশন। সাবধানে নিস, শেষে না মঙ্গল গ্রহে ট্রেনিং পাঠিয়ে দেয়।’
তুই একগাল হেসে গুটিয়ে পড়িস আবার হুডির ভিতর।
কখন যে নিজের ল্যাপটপটা হঠাৎ খুব ভারী মনে হতে থাকে, বুঝতেই পারিস না।
মা হঠাৎ বললেন—‘চাকরি যা-ই হোক, হুডির তলায় মনখারাপ লুকিয়ে রাখা যায় না।’
তুই চোখ নামিয়ে শুধু বলিস—‘মা, যদি আমি পালটে যাই?’
মা চা কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে বললেন—‘মানুষ তো হাঁ করে বাঁচে, পালটে গিয়ে বাঁচে না। পালটায় যারা, তারা আর মানুষ থাকে না।’
তুই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিস, জানালার বাইরে কালো আকাশে ফ্ল্যাশিং লাইট দেখে মনে হয়, যেন সিগন্যাল দিচ্ছে কেউ—ওপাশে কে যেন তোকে ডাকছে। আসলে কেউ বাজি টেস্ট করছে। কাল তো কালীপুজো।
স্ক্রিনে অফার লেটার নিজে থেকেই মিনিমাইজ হয়ে যায়, আর উঠে আসে নতুন উইন্ডো—ডেটা মাইগ্রেশন ইনিশিয়েটেড।
এবার তোর ফোনটা হালকা কাঁপে—স্ক্রিনে ঈশিতার নাম, সাথে একটা এক-লাইনের টেক্সট : ‘তুই খুব ভালো, কিন্তু আমরা আর…’
তোর বুকের ভেতরে এক মুহূর্তে কেমন একটা প্লাগ-পুল্ড ফিলিং—যেন কারও সিস্টেম আপডেট থেমে গেছে নিরানব্বই শতাংশে।
তুই কিছু লিখিস না, শুধু চোখ নামিয়ে দেখিস স্ক্রিনের নিচে এক অদ্ভুত লাইন ফুটে উঠছে, অফার লেটারের নিচে—‘রিজেকশন কনফার্মড। সাবজেক্ট স্টেইজ থ্রি-তে এন্ট্রি পেল না।’
তোর লাভ স্টোরি আসলে একটা ডিসট্রাকশন ছিল। তুই ভালোবাসিস—সেটাই তো তোকে দুর্বল করে দেয়।
আর আমি জানতাম—তুই অফারটা নিবি না, কারণ তোর কাছে রিয়েলিটিই ছিল একমাত্র রিডেম্পশন। আর সেই রিয়েলিটিতে ঈশিতা নেই। ওকে আর রাখছিই না।
ঘটনা তোকে নিয়ে নয়। তোকে ঘিরে। আর লেখক—মানে আমি—চুপ করে বসে আছি মনিটরে, একটা ছোট্ট হাসি মুখে, যেমন স্ক্রিপ্ট লেখে কেউ কোনো গেমের শেষ মিশনের আগে।
ফাইল সেভড: তীর্থঙ্কর_ভার্সন_১.৯_বিটা_ব্যাকআপ।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।