preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
ইলিউশন
গল্প

ইলিউশন

প্রজ্ঞা ঘরের একটি বিশেষ কোণের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্য কোনো দিকে ঘাড় ঘোরাতেও পারছে না সে। আজ লিখতে বসার আগে রাতের ওষুধগুলো সে তো সবই খেয়েছে। তবু কিছুতেই রিল্যাক্সড হতে পারছে না। সাহস করে একবার সৌমিকের দিকে তাকাতে গিয়ে সোফায় একটা কী যেন দেখতে পেল সে। আলোটা এই মুহূর্তে নিবে গেছে। সোফার ওপর কী যেন রয়েছে না!

লাশটা পড়ে আছে বড়ো নালার পাশের ডাস্টবিনটায়। চোখদুটো বন্ধ, ডান হাতটা মুঠি পাকানো। মুঠোর মধ্যে থাকা কতকগুলো রক্তমাখা প্যাড দেখা যাচ্ছে। শেষমুহূর্তে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে চেপে ধরেছিল বোধহয়। কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। শরীরের নানা জায়গার ক্ষত থেকে বেরোনো রক্ত ডাস্টবিনের পচা কালো জলের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। ভোর অন্ধকার থাকতে যারা ময়লা ফেলতে আসে, দূর থেকে খানিকটা ছুড়ে দেয় ময়লার প্যাকেট অথবা মিউনিসিপ্যালিটি থেকে দেওয়া সবুজ বালতি উপুড় করে দেয় তারা বোধহয় লাশটাকে দেখতে পায়নি। ওর ওপরেই সবজির পচা খোসা, মাছের কাঁটা, চেষ্টা করেও চিবোতে না-পারা খাসির মাংসের হাড়, খালি বিস্কুটের প্যাকেট, নষ্ট কাগজ ফেলে দিয়ে গেছে। আসলে দু-দিন আগেই একটা মরা কুকুর এখানে কে ফেলে রেখে গেছে। সেটা থেকে গন্ধ উঠতে শুরু করেছে। কুকুরটা দাঁত খিঁচিয়ে ফুলে জয়ঢাক হয়ে একপাশে পড়ে। একটা ভিড় জমে উঠেছে লাশটাকে কেন্দ্র করে। সকলেরই নাকে রুমাল চাপা বা হাত দিয়ে নাকটা আড়াল করার চেষ্টা। তবু কেউই সরে যাচ্ছে না লাশটার কাছ থেকে। বরং আরও আরও লোক জড়ো হচ্ছে দেখার জন্য। যেন পৃথিবীর নবমতম আশ্চর্য চোখের সামনে এইমাত্র উন্মুক্ত হল। মানুষের কৌতূহলের সঙ্গে ডাস্টবিনের বিকট গন্ধ এবং পচা জল কোনোটারই পাল্লা দেওয়া চলে না।

পুলিশ এল বেশ খানিকক্ষণ পর। ওসি এসে প্রথমেই কনস্টেবলকে ভিড় হালকা করতে বললেন। তারপর নাকে রুমাল চাপা দিয়ে লাশের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। লাশের গলায় রুমাল বাঁধা। শার্টের শেষ অংশের খুঁট দুটো কায়দা করে কোমরের কাছে বেঁধে রেখেছে। রোমিও, না কি লোকাল গুন্ডা! ইদানিং এ অঞ্চলের দু-দল মাফিয়ার মধ্যে গোলমাল চলছে। গোলাগুলি চলেছে, বোম পড়েছে। তবে লাশ এই প্রথম। ওসির বিশেষ কিছুই দেখাশোনার নেই। অলরেডি ডোম ও ফরেনসিককে খবর দেওয়া হয়েছে। লাশের কিছু ছবি তুলে লাশ গাড়িতে তুলে দেওয়া হল। ভিড় আগেই কিছুটা সরে গেছিল। এবার আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে গেল।

প্রদীপ এতক্ষণ হাইরাইজটার চোদ্দোতলার জানলা থেকে দূরবীন দিয়ে সবটাই দেখছিল। পুলিশ চলে যেতে দূরবীনটা নামিয়ে রেখে একমাগ কফি নিয়ে বসল। তার মুখ দেখে তার চিন্তার গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করা মুশকিল। সদা নিস্পৃহ তার মুখখানা তার চিন্তাগুলোকে আড়াল করার একটি পর্দা বিশেষ। প্রদীপ এই মুহূর্তে সোফায় বসে আছে। রিল্যাক্স করছে। আজ দেবী কাজে আসেনি। নিজেই তাই প্রদীপ রান্নার উদ্যোগ নেয়। শনিবার ছুটির দিন। জমিয়ে রান্না করে খাওয়া যাবে। তারপর বসে বসে রিল্যাক্স করবে প্রদীপ। আজ আর বেরোবে না কোথাও। ডিম্পির কাছে যাওয়ারও আজ কোনো মানে হয় না। বাড়িতে একটু হুইস্কি, সঙ্গে খানিকটা চাট হলেই আর কিছু লাগবে না। প্রদীপ একা একা মদ খেতে ভালোবাসে। লোকলস্কর নিয়ে হইহই হলে তার নেশা জমে না। দেবী বা ডিম্পি কেউ একটা কাছে থাকলে অবশ্য ভালো লাগে। শুধু ভালো লাগে বলাটা ভুল। মদ খেতে খেতে দু-দলা মাংস হাতে নিয়ে নাড়ানাড়ি করতে না পারলে তার যেন একটা অভাববোধ থেকে যায়। মনে হয় কী যেন একটা মিসিং। মনোরমা এসব একেবারেই পছন্দ করত না।

ছেড়ে দাও আমাকে। বিরক্ত লাগছে।
প্রদীপ নিস্পৃহ একটা চাহনি দিয়ে বলত, কেন?
স্বাভাবিক সময়ে তো কখনো ফিরেও তাকাও না। হুইস্কি পেটে পড়লেই শুরু হয়।
তো? প্রদীপ ততোধিক নিস্পৃহ।
তো আমার নিজেকে বেশ্যা মনে হয়!
এতে বেশ্যা ভাবার কি হল!
যদি অন্যসময়ও ভালোবাসতে, কাছে আসতে, তবে ভাবতাম না। কিন্তু তা তো নয়!

প্রদীপ ছেড়ে দিত মনোরমাকে। চোদাচুদির এত সফিস্টিকেশন প্রদীপের পোষাত না। এর থেকে ডিম্পি ভালো। মোটা ঠোঁট আর ময়দার বড়ো দুটো দলা নিয়ে সামনে বসে থাকে। যখন খুশি যা খুশি করো। রাগ, অভিমান কোনোটারই বালাই নেই। টাকাটা বুঝে পেলেই হল।

দেবী বরং একটু লজ্জা লজ্জা ভাব করে। গোপন কথা বলার মতো ফিসফিস করে। যেন কেউ দেখে ফেলবে! শুনে ফেলবে!

এই আঠাশ তলা হাইরাইজের চোদ্দতলায় কী হয়-না-হয় কেউ তার খোঁজ রাখে না। তবু দেবীর এই ঢং ভালো লাগে প্রদীপের। আর কোনো নখরা দেবী করে না। টাকা পেলে সে-ও খুশি। তাছাড়া বাজারের টাকা, ইস্ত্রি, মুদিখানা সবেতেই দেবী কিছু কিছু করে টাকা সরায়। প্রদীপ টের পায়। কিছু বলে না। ওর এই খুঁটে খাওয়া দেখতে প্রদীপের ভালো লাগে।

আজ প্রদীপের অবশ্য কাউকেই দরকার মনে হল না। আজ সে বেশ ফুর্তিতে আছে। এই মৌতাত শালা মেয়েছেলে নিলেও জমত না। আজ দিনটা একা একা সেলিব্রশন করার।

প্রদীপ বেশ খানিকক্ষণ হুইস্কি খেয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোলো। ফ্রিজে পর্ক রাখা আছে। পর্কের একটা প্রিপারেশন করে নিলেই হবে।‌ রাম দিয়ে পর্কটাকে ম্যারিনেশনে বসিয়ে দিল প্রদীপ। শুয়োরের মাংস! কথাটা মনে হতেই ঠোঁটের কোনায় একচিলতে হাসি খেলে গেল প্রদীপের। শুয়োরই তো! শালা অন্যের হাগা খেয়ে বেড়ায়! তাতেও অবশ্য কিছুই যায় আসে না! কিন্তু সতীত্বের ঢংটা পোষায় না প্রদীপের। সেই তো মল খসালি, তবে কেন লোক হাসালি! মনোরমাও একই কাজ করেছিল। প্রদীপকে তার ভালোলাগেনি। বললেই তো হত! অতো গোপনীয়তার দরকার ছিল না। ছিল, আসলে নিজেকে সতী প্রমাণ করে অ্যালিমানি নেওয়ার দরকার ছিল। তারপর নতুন আশিক! নতুন...

মনোরমার লোভ মনোরমাকে শেষ করে দিল। অবশ্য শেষ হয়ে যাওয়ার পর আফশোস হয়েছিল প্রদীপের। মনোরমা জ্যান্ত থাকাকালীন প্রদীপ বোঝিনি মনোরমা এত সুস্বাদু। ওর মাংস খাওয়ার সময় বুঝল, চমৎকার খেতে। হয়তো সব নরমাংসই এমন চমৎকার! তবে তাই বলে ওই নর্দমার কীটটাকে নিশ্চয়ই প্রদীপ জিভে ঠেকাবে না! ওর একটা ডিগনিটি আছে।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

এই অবধি লিখে একবার চারপাশটা তাকিয়ে নিল প্রজ্ঞা। সৌমিক কখন ঘর অন্ধকার করে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল করেনি। ঠিক প্রজ্ঞাদের বাড়ির সামনের পোস্টে যে স্ট্রিটলাইটটা লাগানো আছে সেটা ক-দিন হল খারাপ হয়েছে। দাসকাকু খবর দিয়েছেন লোকাল পার্টির ছেলেদের। এখনও সারানো হয়নি। আলোটা সারারাত দপদপ করে। আজও তাই। ঘরের ভিতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। নাইট ল্যাম্প জ্বালালে সৌমিকের ঘুম হয় না। বাইরে থেকে যেটুকু আলো আসে তাতেই মোটামুটি ঘরটা একটা আবঝা অন্ধকার হয়ে থাকে। তাতে অসুবিধে হয় না প্রজ্ঞার। কিন্তু আজ একবার ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হচ্ছে, আর একবার যেন সামান্য আবছা। আবছা আলোয় ঘরটাকে দেখে কেমন গা ছমছম করে উঠল প্রজ্ঞার। মনে হল যেন গা-টা ভারী হয়ে উঠেছে। ঘরের ভিতরে এমন কিছুই নেই যা দেখে কোনো কিছুর অবয়ব বলে মনে হয়। একটা বড়ো ওয়ারড্রোব, একটা ছোটো সোফা সেট আর একটা খাট। এগুলো দেখে অন্য কিছু মনে হওয়ার অবকাশ নেই। তবু প্রজ্ঞা বুঝতে পারছে তার অস্বস্তি হচ্ছে। সৌমিককে হাত বাড়িয়ে ডাকতে চেয়েও ডাকতে পারছে না। ওর গলা জিভ শুকিয়ে গেছে। নিশ্বাস পড়ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। প্রজ্ঞা ঘরের একটি বিশেষ কোণের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্য কোনো দিকে ঘাড় ঘোরাতেও পারছে না সে। আজ লিখতে বসার আগে রাতের ওষুধগুলো সে তো সবই খেয়েছে। তবু কিছুতেই রিল্যাক্সড হতে পারছে না। সাহস করে একবার সৌমিকের দিকে তাকাতে গিয়ে সোফায় একটা কী যেন দেখতে পেল সে। আলোটা এই মুহূর্তে নিবে গেছে। সোফার ওপর কী যেন রয়েছে না! শুকনো জামাকাপড় তো সে দুপুরেই ভাঁজ করে রেখেছিল। সৌমিক কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছে। তাহলে সোফায় কী! ভাবতে ভাবতেই লাইটটা আবার একবার দপ করে উঠেছে। প্রজ্ঞা এবার পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সোফায় যেন কী একটা রয়েছে। তার হাতের কাছে মোবাইলটা পাচ্ছে না সে। ল্যাপটপটা স্লিপমোডে চলে গেছে। ওর কৌতূহল হচ্ছে। ভয়ও পাচ্ছে। সৌমিককে দু-বার ফিসফিস করে ডেকেও সাড়া পেল না। নিজে কোনোরকমে সাহসে ভর করে উঠে দাঁড়াল। ঘরের আলোটা জ্বালানোর কথা মনে নেই। কোনোরকমে হেঁটে সোফার কাছে পৌঁছোতেই আলোটা আবার দপ্ করে উঠল। সোফায় কে যেন শুয়ে আছে! খুব চেনা চেনা! কিন্তু... হঠাৎই প্রজ্ঞার চোখের সামনে ডাস্টবিনের দৃশ্যটা একঝলক যেন চলকে উঠল। সামনে ভালো করে তাকাতেই দেখল, লাশটা ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে...


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই, ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

মন্তব্য করুন

লেখক

পেশায় অধ্যাপক, নেশায় সাহিত্যরসপিপাসু। ভালোবাসেন বসন্তের সন্ধ্যা সমীরণে জ্যোৎস্নায় ছাদে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে। জীবনের আপেক্ষিকতায় বিশ্বাসী রিনি গঙ্গোপাধ্যায় মৃত্যুইচ্ছাকে সম্মান করেন। অল্প সময় হল লিখছেন।

অন্যান্য লেখা

দেখতে পারেন