পথের পাঁচালী শুধু মাত্র একটি চলচ্চিত্র নয়, একটি দৃশ্য নয়, একটি সুর; একটি কাহিনি নয়, একটি অনুভব। এটি নিঃশব্দে বলে—জীবন যতই কঠিন হোক, তার গভীরে আছে ভালোবাসা, স্বপ্ন, আর এক চিরন্তন গান। যে গান কাশফুলের মতো দোলে আমাদের ভিতরে ভিতরে। আর অপু হয়ে ওঠে সেই অনুভবেরই প্রতিনিধি।
“তুই কি কক্ষনো রেলগাড়ি দেখিসনি?”—দুর্গার এই সরল প্রশ্নের ভিতর লুকিয়ে থাকে এক স্বপ্নবালিকার বিস্ময়, আর সেই বিস্ময়ে অপু ও দর্শক—উভয়েই গভীর আচ্ছন্নতায় বিভোর হয়ে যায়। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী আমাদের সামনে তুলে ধরে এমন এক জগৎ, যেখানে শব্দ নয়, নিঃশব্দতাই হয়ে ওঠে জীবনের অন্তর্দর্শন আর অপার সৌন্দর্যের মিড়। এই চলচ্চিত্র কেবল সিনেমা নয়—এ যেন এক গভীর অনুভব, এক চলমান কাব্য, যা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে উৎসারিত হয়ে সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরায় মানবিকতার এক বিশ্বজনীন ভাষায় ফুটে উঠেছে। ছবির পরিপ্রেক্ষিত বিভিন্ন জায়গায় ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার প্রান্তিক জীবন, দারিদ্র এবং অপূর্ণতা। তবুও কোথাও যেন এক অনাবিল প্রাণবন্ততা মনের কোণে উঁকি দেয়। এই গ্রাম নিছক একটি স্থান নয়, এটি যেন জীবনের এক চলমান অধ্যায়। ধুলোভরা পাঁকপথ, পাকা আমড়ার গাছ, জলসিক্ত বাঁশবন, কুঁড়ে ঘরের চাল চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা, কিংবা দূর প্রান্তরে দুলতে থাকা কাশফুল—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক অবিস্মরণীয় বাস্তবতা। যার ভিতর লুকিয়ে থাকে এক মর্মস্পর্শী কাব্য। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন নিসর্গের মুগ্ধতা আনে, তেমনি তার প্রতিটি কোণায় জড়িয়ে আছে বঞ্চনা, প্রতীক্ষা, ক্লান্তি, আবার এক অনন্ত জীবনীশক্তিও। এই পরিপ্রেক্ষিতে অপু ও দুর্গা—দুই ভাই-বোন যেন সেই গ্রামীণ জীবনের দুটি ধ্রুপদি চরিত্র। তাদের সম্পর্ক শুধু রক্তের বন্ধন নয়, বরং এক নরম, গভীর, আর মানবিক যোগাযোগের সেতু। দুর্গা, বড়ো বোন হিসেবে, কখনও মায়ের কাছে অপু-র দোষ ঢাকে, কখনও মিষ্টির টুকরো তুলে দেয় তার হাতে; আবার কখনও রাগ করে একা গাছতলায় বসে থাকে। অপু তার সমস্ত কৌতূহল, প্রশ্ন আর আনন্দ ভাগ করে নেয় দিদির সঙ্গে। দু-জন মিলে যেমন আকাশের তারা গোনে, তেমনি দৌড়ে যায় রেলগাড়ির শব্দ শুনতে। তাদের সংসার ভাঙাচোরা হলেও তাদের কল্পনার জগৎ নির্মল। বাড়ির উঠোনে পাতা বিছিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে অচেনা, অপার এক পৃথিবী। তাদের ছোটো ছোটো কথাবার্তায়, হাসিতে, দৃষ্টিতে ধরা পড়ে এমন এক আবেগ, যা শহুরে জীবনের কঠোরতায় হারিয়ে গেছে। যেমন দুর্গা অপুকে বলে, “চুপ কর, মায়ের কানে গেলে আবার বকা দেবে।” এই অতি সাধারণ সংলাপের মধ্যেও ফুটে ওঠে এক নিঃশব্দ সুরক্ষা, ভয়, ভালোবাসা ও দারিদ্রের স্বর। গ্রামের পরিবেশ এখানে কেবল পটভূমি নয়, বরং একটি জীবন্ত চরিত্র। কুয়াশাভেজা সকাল, কাঠপাতা জ্বালিয়ে রান্না করা, শীতে কাঁপতে থাকা বৃদ্ধা ইন্দির ঠাকরুনের কাঁথা জড়ানো মুখ, সন্ধ্যার শেষে দূরের পল্লির ঘুঘু ডাকা—এসব মুহূর্তে ফুটে ওঠে সেই জীবনের স্বরূপ, যা নিস্তব্ধ অথচ অত্যন্ত প্রাণময়। আরেকবার অপু জিজ্ঞাসা করে, “দিদি, আমাদেরও কি কোনোদিন শহরে যাওয়া হবে?” এই প্রশ্ন আমরা লক্ষ লক্ষ অপুদের কণ্ঠস্বর শুনি, যারা ছোট্ট গ্রাম্য পটভূমি থেকে তাকিয়ে থাকে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে, এক স্বপ্নময় জগতের দিকে। সত্যজিৎ এই স্বপ্নটিকে বুনেছেন ধুলো, আলো, আর বাতাসের ভেতর দিয়ে। যেখানে প্রত্যেক দৃশ্য যেন এক-একটি কবিতার শস্যক্ষেত্র হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “সহজ মানুষই চরম সত্যের বাহক।” অপু-দুর্গা সেই সহজ মানুষের প্রতীক—তাদের দারিদ্র, অপূর্ণতা, হাসি, কান্না—সবই যেন চরম মানবিক সত্যের পাণ্ডুলিপি। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, “শিল্প আমাদের চোখ খুলে দেয়, কেবল রূপ নয়, মর্ম বোঝার চোখ।”
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
পথের পাঁচালী আমাদের চোখ খুলে দেয়, দেখায় যে সৌন্দর্য শুধু আলোকোজ্জ্বল নয়—তা হতে পারে ধূলিমলিন, ক্লান্ত, কিন্তু হৃদয়ছোঁয়া এক সুরেলা সংগীত। দুর্গার মৃত্যু—এই চলচ্চিত্রের নিঃসন্দেহে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। যেন হঠাৎ করেই থেমে যায় এক স্বপ্নের স্বরলিপি। তারপর অপুর চোখের সামনে শুধু থেকে যায় এক শূন্য উঠোন, আর দূরের ছায়াঘেঁষা প্রান্তরে বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল। যেখানে কান্নার কোনো শব্দ নেই, অথচ নৈঃশব্দ্যের গভীরতায় শোকের ঢেউ অবিরত বয়ে চলে। সেই মুহূর্তে প্রগাঢ় বেদনা আর কোনো সংলাপের দ্বারস্থ হয় না, শুধু বাতাসে মিশে যায় এক অনুচ্চারিত হাহাকার। শেষ দৃশ্যে হরিহর যখন ফিরে এসে কাঁপা হাতে দুর্গার জন্য আনা মালার পুঁটলিটা ধরে রাখেন, আর সর্বজয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন—তখন দর্শকের হৃদয় নিঃশব্দে ভেঙে যায়। সেই মুহূর্তে পথের পাঁচালী আর কেবল একটি সিনেমা থাকে না, তা হয়ে ওঠে আমাদের নিজেদের জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, “আমি সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনের কথা বলি।” এই চলচ্চিত্র সেই কথার নিখুঁত রূপায়ণ। যেখানে প্রতিটি চোখের জল, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি দৃষ্টিপাত, এমনকি প্রতিটি চুপ করে থাকা—সিনেমার ভাষাকে ছাড়িয়ে যায়। পথের পাঁচালী একটি দৃশ্য নয়, একটি সুর; একটি কাহিনি নয়, একটি অনুভব। এটি নিঃশব্দে বলে—জীবন যতই কঠিন হোক, তার গভীরে আছে ভালোবাসা, স্বপ্ন, আর এক চিরন্তন গান। যে গান কাশফুলের মতো দোলে আমাদের ভিতরে ভিতরে। আর অপু হয়ে ওঠে সেই অনুভবেরই প্রতিনিধি। এই অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতেই মনে পড়ে যায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস হাঁসুলিবাঁকের উপকথার সেই অমর বাণী, “মানুষেরা চিরকালই ভাঙে, আবার গড়ে। দুঃখের মধ্যেই সে সুখ খোঁজে, অন্ধকারেই আলো খোঁজে।” এই বাণীর প্রতিধ্বনি যেন আমরা শুনতে পাই অপুর চোখে। দুর্গার না-ফেরার শূন্যতায়, আর সেই নিঃশব্দ দৃষ্টির ভিতরে, যেখানে আশাহীনতাও আশার মতোই গভীর।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
মন্তব্য করুন