preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
সকলের জন্য সংবিধান: পর্ব ২
ধারাবাহিক

সকলের জন্য সংবিধান: পর্ব ২

30 Aug, 2025.

এই ধারাবাহিক আলোচনায় ভারতের সংবিধান সম্পর্কে ধারণা তৈরি করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। তেমন প্রচেষ্টা আগে হয়নি, এমন কোনো দাবি আমাদের নেই। তফাৎ শুধু এই, আমরা চাইছি সহজ বাংলায় এই আলোচনাটা চালিয়ে যেতে। যতটা সম্ভব সহজ। যে কোনো দেশের নাগরিক সংবিধান সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকবেন, এ কথা ধরে নেওয়া হলেও, কথাটা যে সত্য নয়, তা আমরা দৈনন্দিন জীবনে জানি। সেই জানা সত্যটা একটু যদি পাল্টে যায়, এরকম একটা প্রত্যাশা থেকে আমাদের এই অভিযান। আপনি, আপনারা, যোগ দিন এই আলোচনায়।

কেন আমরা সকলের জন্য সংবিধান এরকম একটা দুরূহ প্রকল্প শুরু করেছি, তার একটু আভাস দেওয়া প্রয়োজন। সংবিধান নিয়ে নানাবিধ কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা আমরা শুনতে পাই, তা থেকে সামান্য ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু সেই ধারণার মধ্যে অনেকটা ফাঁক-ফোকর থাকে। বিভিন্ন সামাজিক আলোড়নের সময়ে, গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে, সংবিধান নিয়ে যেসব ধারণা তৈরি হয়, তার মধ্যে সম্পূর্ণতার অভাব থাকে অনেকটাই। তা বলে আমরা এমন কোনো দাবি করছি না আমাদের এই প্রয়াস সম্পূর্ণ হবে, এতে কোনো ফাঁক ফোকর থাকবে না, সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হবে। আমরা একটা রূপরেখা তৈরি করতে চাইছি।

রূপরেখা শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান একটা রূপরেখা তৈরি করে। একটি রাষ্ট্রের চলমানতার পদ্ধতির রূপরেখা। ভারতের সংবিধান প্রণেতারাও তার অতিরিক্ত কিছু করেননি। একটা রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তাঁরা। সামাজিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে তাঁরা একটা কাঠামো তৈরি করেছিলেন। সেটাই সংবিধান রচনার পদ্ধতি। যে কোনো কাঠামোর চলমানতার জন্য এই রূপরেখা প্রয়োজন।

ভারতের সংবিধান শুরু হচ্ছে, একটি প্রস্তাবনা দিয়ে। যে প্রস্তাবনার শুরুতে লেখা রয়েছে, আমরা ভারতের জনগণ (উই, দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া) ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতন্ত্রী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণতন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা। এর জন্য কী কী প্রয়োজন তার কথাও বলা রয়েছে প্রস্তাবনা। বলা হয়েছে সকল নাগরিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ন্যয়বিচারের কথা। এখানে জোর দেওয়া হয়েছে ন্যায়বিচার বা জাস্টিস-এর ওপর, জাস্টিস শব্দটিকে লেখা রয়েছে বড় হরফে। এর পর জোর দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতা বা লিবার্টি শব্দটির ওপর। কিসের স্বাধীনতা? চিন্তার স্বাধীনতা, অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা, আস্থার স্বাধীনতা, উপাসনার স্বাধীনতা। এরপর সাম্য (ইকোয়ালিটি)। সাম্য প্রসঙ্গে এসেছে অবস্থা ও সুযোগের সাম্য প্রসঙ্গ। এই ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সাম্য নাগরিকদের মধ্যে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে সংবিধানের প্রস্তাবনায়।

শুধু নিশ্চিত করার কথাতেই প্রস্তাবনা থেমে যায়নি। সেখানে নাগরিকদের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্বের বোধ যাতে উন্নীত হয়, যে সৌভ্রাতৃত্বের মধ্যে নিশ্চিত থাকবে ব্যক্তির সম্মান (ডিগনিটি) এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংহতির বোধও যাতে নাগরিকদের মধ্যে বর্ধিত হয়, সে কথাও বলা হয়েছে।

বর্তমান প্রস্তাবনাটি একেবারে শুরুতে এরকম ছিল না। সেখানে ছিল ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’-এর কথা। সংবিধানের ৪২ তম সংশোধনীতে যুক্ত হয় ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতন্ত্রী এই দুটি শব্দবন্ধ। এ ছাড়াও প্রথমে সংহতির প্রসঙ্গটি ছিল না, ওই একই সংশোধনীতে সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত হয় সংহতি। এই সংশোধনীটি কার্যকর হয় ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

সংবিধানের প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে আমাদের হয়ত আবার ফিরে আসতে হবে। এই আলোচনার স্বার্থেই। আমরা আগেও বলেছি, আমাদের এই প্রকল্প সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ নয়। একটা সাধারণ ধারণা তৈরির চেষ্টা। ফলে, পরপর সূচি অনুসারে আমাদের আলোচনা এগোবে না। আমাদের সম্পূর্ণ আলোচনাতে সংবিধানের সকল দিক, প্রতিটি বিন্দু আলোচিত হবে না। তা আমাদের সাধ্যাতীত, এক্তিয়ার বহির্ভূতও বটে। আমরা কিছু বিষয় ছুঁয়ে দেখব, যা আমরা সবাই জেনে রাখলে ভাল হয় বলে আমাদেরই মনে হচ্ছে।

প্রথম দফার আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে আমরা মৌলিক অধিকার নিয়ে দু-এক কথা উল্লেখ করেছিলাম। নাগরিকের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি বহুবার, বহু ক্ষেত্রে আলোচনায় উঠেও আসে। সাধারণ বুদ্ধিতেই আমরা বুঝতে পারি, যদি অধিকার থাকে, তাহলে তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে কর্তব্যও। ভারতের সংবিধানও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা সে বিষয়টি এই সুযোগে একবার দেখে নিতে পারি।

সংবিধানের ৪ ক ভাগে আলোচিত হয়েছে, নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যের বিষয়টি। এই ভাগটির অন্তর্ভুক্ত সংবিধানের ৫১ ক অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদে নাগরিকের ১১টি কর্তব্যের কথা লেখা রয়েছে।

ভারতের নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য

এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে, সংবিধান মেনে চলা ও সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা। একই সঙ্গে সংবিধানের অন্তর্গত প্রতিষ্ঠানসমূহ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথাও উল্লিখিত রয়েছে।

স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল যে আদর্শকে ঘিরে, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনও নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত।

ভারতের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও সংহতি রক্ষা নাগরিকের কর্তব্য।

কর্তব্যের মধ্যে পড়ে দেশরক্ষাও, প্রয়োজনে দেশের ডাকে জাতীয় পরিষেবায় নিজেকে নিযুক্ত করা সেই কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে সংবিধানে।

ধর্মীয়, ভাষাগত, এলাকাগত ও অন্যান্য সমস্ত রকম বিভাজন অতিক্রম করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সৌভ্রাতৃত্বের আদর্শে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা এবং মহিলাদের প্রতি অবমাননাকর সমস্ত ধরনের আচার-আচরণ পরিহার করার কথা একই সঙ্গে সংবিধানে মৌলিক কর্তব্যের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

আমাদের কৃষ্টি যে মিশ্র, সে কথার উল্লেখ করে সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হিসেবে সেই মিশ্র কৃষ্টির উত্তরাধিকারকে সসম্মানিত রাখা নাগরিকের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

বন, হ্রদ, নদী, বন্যপ্রাণ সহ পরিবেশ—এ সব কিছুকে রক্ষণাবেক্ষণ করা, তাদের উন্নত করা এবং সমস্ত জীবিত প্রাণিকুলের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া, নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য বলে সংবিধানে উল্লিখিত হয়েছে।

ভারতের সংবিধান অনুসারে, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা, মানবতাবোধ, অনুসন্ধিৎসা ও সংস্কারসাধনের প্রতি আকাঙ্ক্ষাবর্ধন নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

সরকারি সম্পত্তি বিনষ্টি ও হিংসা—উভয়কেই পরিত্যাগ করা নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য।

জাতি যাতে আরো উচ্চস্তরে উদ্যোগী হতে পারে ও আরো বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারে, সেই লক্ষ্যে ব্যক্তি ও সমষ্টির শ্রীবৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করা ভারতের নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য।

সমস্ত বাবা-মাকে ছয় থেকে চোদ্দ বছর বয়সী সন্তান লেখাপড়া শেখার সুযোগ দিতে হবে। এ কেবল বাবা-মায়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, যে সব অভিভাবক নাবালককে প্রতিপালন করছেন, তাঁর ক্ষেত্রেও এই কর্তব্য নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতের সংবিধান যখন রচিত হয়, তখন নাগরিকের কর্তব্যের কথা ছিল না। ৪২ তম সংশোধনীতে নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য সংবিধানে ঢোকানো হয়। সে সময়ে কর্তব্যের সংখ্যা ছিল ১০। ২০০২ সালের সংশোধনীতে সন্তান ও প্রতিপাল্যকে শিক্ষাদানের সুযোগ, নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হিসেবে সংবিধানে গৃহীত হয়।

১৯৭৭ সালে ৪২ তম সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়, সে কথা আমরা এখনই উল্লেখ করলাম। এই নিয়ে সামান্য কয়েকটি কথার উল্লেখও সম্ভবত করে রাখা উচিত। মৌলিক কর্তব্য নিরূপণ করতে গিয়ে যে প্রসঙ্গগুলির উত্থাপন করা হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে ভারতে ধর্মীয়, ভাষাগত ও আঞ্চলিক বিভেদ রয়েছে, যেগুলিকে অতিক্রম করার কথা প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহিলাদের প্রতি অবমাননাকর আচার আচরণও ভারতে দেখা যাচ্ছে, যা পরিহার করা নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। উঠেছে মিশ্র কৃষ্টির কথাও। ভারতের বিভিন্নতা, তার বৈচিত্র্য, এগুলি যেন রক্ষিত হয়, সে ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে, যা থেকে এমন মনে করা বাতুলতা নয় যে এই বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা লঙ্ঘিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে। পরিবেশ সম্পর্কিত ও অন্যান্য প্রাণিকুল নিয়ে সচেতনতার বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে কর্তব্য হিসেবে। অর্থাৎ, সংবিধানের ৪২ তম সংশোধনী প্রণয়নের সময়কাল থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পর্কে দেশের নাগরিকের কর্তব্য হিসেবে দেখানো প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ৪২ তম সংশোধনী আনা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে, তা কার্যকর হয় ১৯৭৭ সালে। অর্থাৎ, স্বাধীনতার ৩০ বছর পর, অধিকারের সঙ্গে যে কর্তব্যও বিদ্যমান থাকে, সে কথা প্রথমবার সংবিধানে লেখা হল। দ্বিতীয়ত, লেখা হল এমন সব কর্তব্যের কথা, যা থেকে স্পষ্ট, স্বাধীনতার ৩ দশক পরেও নাগরিকদের মধ্যে নানারকম বিচলন ঘটতে থাকছিল, যা দেশের শুভ ও সমৃদ্ধির পক্ষে অন্তরায়।

এই বিচলন প্রসঙ্গে আমাদের অনতিদূর ভবিষ্যতে কথা বলতেই হবে, কারণ আমাদের এই প্রকল্প বালিতে মুখ গুঁজে পড়ালেখা করার নয়।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

মন্তব্য করুন

লেখক

আলোচক একজন অনধ্যাপক। নাতিশিক্ষিত, ভূয়োদর্শী। বয়সকালে বিভিন্নরকম সংঘে জড়িত ছিলেন। সেইসব সংঘযাপনের বর্ণময় তথা বর্ণহীন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাই আলোচককে এ ধরনের দুঃসাহসিক প্রকল্পপথে যেতে ইন্ধন জোগায় এবং উজ্জীবিত করে।

অন্যান্য লেখা