preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৪
ধারাবাহিক

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৪

সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই'র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ চতুর্থ পর্ব।

সেহওয়ান শরিফের বাতাসে যখন লাল ধুলোর ধীর দোলন স্তিমিত হয়, তখন মরুভূমির মৃদু মর্মর আর ঢোলের ধাক্কা মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুরণন তৈরি করে। ধামাল, ধ্বনি, ধ্যান—এই তিনের দোলাচলে যে সাউন্ডস্কেপ জন্ম নেয়, সেটিই দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক অনন্ত স্পন্দন। “দমা দম মস্ত কলন্দর”—এই চারটি শব্দ যেন ছন্দের চক্র, চেতনার চাবিকাঠি, আর সুরের সঞ্চারিত স্রোত। টোনাল ট্রুথ-এর এই পর্বে আমরা এই সুরকে কেবল শ্রবণ করব না, বরং স্ক্যালপেল দিয়ে খুলব—তার ইতিহাস, তার হারমোনিক হাড়গোড়, তার সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সূক্ষ্ম স্তর, এবং তার সাংস্কৃতিক সঞ্চালন।

কিন্তু তার আগে একটি বহুল প্রচলিত বিভ্রান্তিকে পরিষ্কার করা জরুরি। জনপ্রিয় গানে প্রায়শই “ঝুলে লাল কলন্দর” উচ্চারণটি এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যেন ঝুলে লাল এবং লাল শাহবাজ কলন্দর একই ব্যক্তি। বাস্তবে এই দুই চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন সময় ও ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটের মানুষ। ঝুলে লাল মূলত সিন্ধি হিন্দু সমাজের লোকদেবতা, যার কাহিনি দশম শতকের সামাজিক আতঙ্ক থেকে জন্ম নেয়। স্থানীয় মুসলিম শাসক মিরখশাহের জোরপূর্বক ধর্মান্তরের আশঙ্কা থেকে উদ্ভূত এক রক্ষাকর্তার ধারণা ধীরে ধীরে দেবত্ব লাভ করে। তাঁর সঙ্গে জলের সম্পর্ক, নদীর রূপক, মাছের ওপর ভাসমান প্রতীক—সবই বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে লাল শাহবাজ কলন্দর ছিলেন দ্বাদশ শতকের এক সুফি দরবেশ, সৈয়দ উসমান মারওয়ান্দি নামে জন্মগ্রহণকারী এক ভবঘুরে সাধক। তাঁর নামের তিনটি অংশই প্রতীকী—লাল, আধ্যাত্মিক উন্মত্ততার রং; শাহবাজ, আকাশে উড়ন্ত বাজপাখির স্বাধীনতা; কলন্দর, প্রথা-প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থাশীল এক মরমি পথিক। ঝুলে লাল যেখানে সামাজিক সুরক্ষার প্রতীক, কলন্দর সেখানে আধ্যাত্মিক অরাজকতার দূত। একজন নদীর, অন্যজন বাতাসের।

এই পার্থক্য সময়ের সঙ্গে সুরের বাজারে মুছে গেছে। কাওয়ালি, লোকসংগীত, বলিউডি অভিযোজন সবখানেই দুই নাম একসাথে উচ্চারিত হয়। কারণ সংগীতের স্মৃতিতে ধ্বনি অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে শক্তিশালী। “ঝুলে লাল কলন্দর” উচ্চারণের অলিটারেটিভ ছন্দ এতটাই শ্রুতিমধুর যে তা সহজেই জনপ্রিয়তার প্লেলিস্টে জায়গা করে নেয়।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

এই বিভ্রান্তি সরিয়ে যদি আমরা “দমা দম মস্ত কলন্দর”-এর সুরের স্থাপত্যে প্রবেশ করি, তবে প্রথমেই চোখে পড়ে তার সম্মোহনী সরলতা। কাওয়ালি ধারার এই গান সাধারণত মধ্যম লয়ের একটি আটমাত্রিক ছন্দচক্রে দাঁড়িয়ে থাকে—কেহারওয়া বা ধামালধর্মী তালের উপর। হারমোনিয়ামের মূল সুরটি অত্যন্ত সীমিত স্কেলে ঘোরে, প্রায়শই ভৈরবী-জাতীয় স্বরসংস্থান বা মিশ্র খামাজ ঘরানার ধাঁচে। কিন্তু এই সরলতার মধ্যেই আছে তার শক্তি। সুরটি ছোটো, পুনরাবৃত্তিমূলক, প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের মতো। প্রধান কণ্ঠশিল্পী যখন উচ্চারণ করেন “দমা দম মস্ত কলন্দর”, সমবেত কণ্ঠ তা প্রতিধ্বনিত করে। এই কল-অ্যান্ড-রেসপন্স কাঠামোই গানটিকে সম্মোহনী করে তোলে।

সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক থেকে ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালি পরিবেশনায় একটি নির্দিষ্ট অ্যাকুস্টিক স্থাপত্য থাকে। প্রধান কণ্ঠ মাঝখানে, হারমোনিয়াম তার ঠিক পাশেই, ঢোলক ও তবলা সামান্য পিছনে, আর সমবেত কণ্ঠশিল্পীরা একসাথে ক্ল্যাপিং করে তালকে ঘনীভূত করেন। মাইক্রোফোনিং সাধারণত ক্লোজ-মাইকড নয়; বরং সামান্য অ্যাম্বিয়েন্ট স্পেস রাখা হয় যাতে সমবেত কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ধরা পড়ে। এই প্রতিধ্বনিই দরগাহর আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।

রুনা লায়লার সংস্করণে এই কাঠামো প্রথম বড়ো রূপান্তর পায়। তাঁর পরিবেশনায় ঢোলকের পাশাপাশি ব্রাস সেকশন, বেস গিটার এবং ডিস্কো-ধাঁচের ড্রাম প্যাটার্ন যুক্ত হয়। ফলে সুরের রিদমিক ড্রাইভ অনেক বেশি নাচযোগ্য হয়ে ওঠে। তাঁর কণ্ঠে কাওয়ালির গাম্ভীর্যের বদলে আসে এক ধরনের চঞ্চল চপলতা—ছন্দের ঝলক, শব্দের ঝিলিক। রুনার সংস্করণে সুরের স্কেল প্রায় একই থাকলেও অ্যারেঞ্জমেন্ট তাকে পপ অ্যান্থেমে রূপান্তরিত করে।

নুসরাত ফতেহ আলি খানের সংস্করণে আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মহাকাব্যিক মেজাজ তৈরি হয়। তাঁর পরিবেশনায় আলাপ দীর্ঘ, মেলিসমা বিস্তৃত, এবং তানের গতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। তিনি মূল সুরের ওপর গমক, মুরকি এবং তান যোগ করে এক ধরনের সুর-সুনামি তৈরি করেন। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক থেকে তাঁর রেকর্ডিংগুলোতে হারমোনিয়ামের মিড-রেঞ্জ ফ্রিকোয়েন্সি খুব স্পষ্ট রাখা হয়, আর তবলার অ্যাটাক সামান্য উঁচু করা হয় যাতে ছন্দের ধাক্কা শ্রোতার শরীরে পৌঁছায়। তাঁর কণ্ঠের ডায়নামিক রেঞ্জ এত বিস্তৃত যে মিক্সিংয়ে প্রায়ই কম্প্রেশন কম ব্যবহার করা হয়, যাতে সেই কাঁচা শক্তি অটুট থাকে।

পাকিস্তানি ব্যান্ড জুনুন যখন এই গানটিকে সুফি রকের শরীরে ঢুকিয়ে দেয়, তখন তার সাউন্ডস্কেপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। ইলেকট্রিক গিটারের ডিস্টোরশন, ড্রামের শক্তিশালী ব্যাকবিট এবং বেস গিটারের গভীর লো-এন্ড গানটিকে নতুন এক শক্তি দেয়। সুরের কাঠামো একই থাকে, কিন্তু টেক্সচার বদলে যায়। এখানে হারমোনিয়ামের জায়গায় গিটার রিফ, ঢোলকের জায়গায় ড্রাম কিট, আর কাওয়ালির সমবেত কণ্ঠের জায়গায় রক ভোকালের রুক্ষ উচ্চারণ।

এই তিনটি সংস্করণ তুলনা করলে বোঝা যায় একই সুর কীভাবে তিনটি ভিন্ন সোনিক জগৎ তৈরি করতে পারে। রুনা লায়লার সংস্করণ পপ-সংবেদনশীল, নুসরাতের সংস্করণ আধ্যাত্মিকতায় উন্মত্ত, আর জুনুনের সংস্করণ বিদ্যুত্ময় বিদ্রোহী। তিনটি রূপ তিনটি ভিন্ন সাউন্ড দর্শন—ডিস্কো ড্রাইভ, কাওয়ালি ক্যাথারসিস, রক রেজোন্যান্স।

বাংলায় ভূমি ব্যান্ড যখন এই গানকে গ্রহণ করে, তখন আবার এক নতুন স্তর যুক্ত হয়। ড্রাম, গিটার এবং লোকসুরের সহজ প্রবাহে গানটা এক ধরনের বঙ্গীকরণ পায়। এখানে কলন্দর যেন বাউলদের আত্মীয় হয়ে ওঠে—সিন্ধু প্রদেশের ধুলো আর বাংলার পলিমাটি সুরের মধ্যেও মিশে যায়।

পপ সংস্কৃতির বাণিজ্যিক যুগে এই গান আরও বহু রূপ নেয়। মিকা সিং কিংবা হানি সিংয়ের সংস্করণে দ্রুত বিট, ভারী বেস এবং ক্লাব-স্টাইল প্রোডাকশন গানটিকে প্রায় নাচের ট্র্যাকে পরিণত করে। সেখানে আধ্যাত্মিক তীব্রতার বদলে শরীরী শক্তি বেশি জায়গা পায়।

২০১৭ সালে সেহওয়ান শরীফে লাল শাহবাজ কলন্দরের দরগায় সন্ত্রাসী হামলা এই গানটিকে নতুন অর্থ দেয়। সেই রক্তাক্ত প্রাঙ্গণে কয়েক ঘণ্টা পরেই আবার ধামাল শুরু হয়। ঢোলের দমক, মানুষের ঘূর্ণন, আর সমবেত কণ্ঠের পুনরাবৃত্তি যেন ঘোষণা করে—সুরকে হত্যা করা যায় না।

শেষপর্যন্ত “দমা দম মস্ত কলন্দর” কেবল একটা গান নয়; এ এক চলমান ছন্দচক্র। কখনও তা ভক্তির, কখনও বিদ্রোহের, কখনও নিছক সুরের আনন্দের। একজন সুফির কাছে এটি ঈশ্বরের আহ্বান, একজন নাস্তিকের কাছে এটি ছন্দের সম্মোহন। কিন্তু দু-জনেই শেষপর্যন্ত একই অভিজ্ঞতায় পৌঁছায়—এক ছন্দময় মুক্তিতে।

ঢোলের ধাক্কা, ধামালের দোলা, আর কণ্ঠের কাঁপন—এই তিনের মিলনে যে অনন্ত অনুরণন জন্ম নেয়, সেটিই “দমা দম মস্ত কলন্দর”। এ কেবল শব্দ নয়; এক শ্বাস, এক স্পন্দন, এক অবিনশ্বর সাউন্ডওয়েভ—যা সময়, সীমানা, সংস্কৃতি সব কিছুকে অতিক্রম করে চলেছে।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা