গ্রামীণ প্রেম, শরীরী আকাঙ্ক্ষা ও বিয়ের অনিবার্য বিচ্ছেদের ভেতর শ্যামলী-বিষ্ণুর অসমাপ্ত সম্পর্কের গল্প। লোকসংস্কৃতি, নদী ও স্মৃতির আবহে ‘শৃঙ্গার’ এক গভীর, বেদনাময় প্রেম ও বর্জনের কাব্যিক আখ্যান। কেতাব-ই ব্লগজিনে ‘জেলার সাহিত্য’ বিভাগে আজ প্রকাশিত হল কোচবিহার জেলার গদ্যকার সুপ্রতীক চক্রবর্তী-এর গল্প।
বাগদি পাড়ায় আজ বিয়া। শ্যামলী উনিশে পড়সে সবে। ধরলার গাঙে ইট পাতসে সুজন। ডিঙায়ে এই পাড়ে আসা লাগবে। শ্যামলীর মাকে মনে পড়ে! কিংবা ওই খনখনে চুড়ির শব্দগুলা! মাটির লেপানো দেওয়ালে শ্যামলীর মেয়েবেলা বোবা বালিকার মতো নীরবে চায়্যা থাকে! এই ধুকপুকে আন্ধারে শ্যামলীর আর কাউকে মনে পড়ে না? বিশুকেও ভুইল্যা গেসে ও?
বিশু নাকি বৈষ্ণব হইসে? ভালোই হইসে। নিমাইয়ের মতো গায়ের রং ওর। বাগদি পাড়ার পরেই নতুন গাঁ, নাম উজানপুর। বিশু সিলো কবিয়াল। বিশুর বাবা সিলেন সোমেশ্বর গোসাঁই। আসরে আসরে মাথায় ফেট্টি বাইন্ধা দাপায় বেড়াইত বিশু! শয়ে শয়ে লোক দু-বাহু তুইলা… গৌরাঙ্গের পাদপদ্ম স্মরণ করি। বহু আগে ধরলা নদীর বুকে টিমটিম কইরা আলো জ্বলত। ডিঙিগুলা পরপারের নির্লিপ্ত দিগন্তগ্রীবার দিকে উন্মুখ বিরহীর মতো তাকায় থাকত, তিরতির কইরা কাঁপত তরণী! শীতের রাইতে গাঁয়ে খোল বাজত! চাটির আওয়াজ প্রেতকায়ার মতো নিস্তব্ধ চারণ! ঘোলা জলে মাছের লুটোপুটি! ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজে…
কে করে কৃষ্ণনাম? উজানপুরের অলীক বাসর সাজায় কে?
চত্তির ফাটা ফাটা আকাশ! শ্যামলীর মা পালায়সিলো। আর ফেরে নাই। ক্যান ফেরে নাই সেই উত্তর কেউ জানে না। কেউ কয় ওইপাড়ার হরি বর্মণের সাথে পিরিত জমসিল। বয়স আর কতই-বা! কম বয়সে বর মরসে! দেহের ক্ষুধা তো আছে! বাকল ঘষতে দেখসে শ্যামলী, নিজের মাকে, তলপ্যাটে! সেইদিনও শ্যামলী বোবা নক্ষত্রের দিকে তাকায়া বলসিলো মা যেন ভালো থাকে। এই চরাচরে শ্যামলী কখনও কারো সর্বনাশ চায়নি।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
শ্যামলীর বুক ছোটো। বর্ণ কালো। দেহ রুগ্ণ। তবু বিশু উন্মাদের মতো আদর করত। ধরলার তীরে সেই লক্ষী পূর্ণিমার রাত, জামবাটির মতো চাঁদখানা জলের দোলায় রুপার নৌকার মতো টলমল করতেসিল! হিসহিসে বিষাক্ত সাপের মতো বিশু, গরম নিশ্বাস,তীক্ষ্ণ নখ... চল, চল, চল, শ্যামলী, পালায় যাব… চ…
সোহাগ তো নয়, যেন সাগরের ঢেউ! তলায় যাইতে যাইতে শ্যামলীর গলা চিরে বেরায় আসত “কই? কই যাবা?”
—তুই যেইখানে ক-বি! কই যাইতে চাইস? ক!
খোলের দমকের মতো বুকে বাজে এই পৌরুষ! হয় নাই সেই পরিণয়! বিশু গাইত “শ্যামা সনে মিলিব কীভাবে...” উথালপাথাল ধরলার বুকে একটা একটা কইরা নক্ষত্র খইসা পড়ত! মইরা যাইত গোপনে। উজানপুরের ধানবাসি জঙ্গলের ধার লাইগ্যা বিশুর ঘর। বাঁশের মাচায় বইসা বাঁশি বাজাইত বিশু! বাবার শেখানো পদ আউড়াইত! যেন দ্বাদশ শতাব্দীর বাংলাদেশ! কেতকী, মাধবী, নবমল্লিকা! রাধাচূড়ার অপূর্ব শৃঙ্গার! শ্রী রাধিকার চরণযুগল মস্তকে ধারণ করেন শ্রীকৃষ্ণ! রূপলিপ্সু প্রেমিক ভগীরথ তিনি! বিশু কাঁপতে কাঁপতে বইলা উঠত—
সকম্পা ভ্রূবল্লী চলতি নয়নং কর্ণ কুহরং
কৃশং মধ্যং ভুগ্না বলিরলসিত: শ্রোণিফলক:
মেঘের সায়া সবুজ ঘাসে। রাখাল পোদ্দারের কাছে বিশু খবর পায়সিলো শ্যামলীর আইজ বিয়া! রাগ হয় নাই, দুঃখও হয় নাই! বিড়বিড়িয়ে বলসিল কেবল “যা অভাগি, খুব বাঁচা বাঁইচা গেলি!” খোলের ডুগির চামড়ায় খুঞ্চি ধরসে! সারাইতে পঞ্চাশ টাকা! হা কৃষ্ণ! দমকেও ঘুণ ধরল প্রভু!
সানাই বাজে বাগদি পাড়ায়। শ্যামলী আজ সাজবে। শেষবারের মতো সাজবে। কপালে চন্দনের টিপ আঁইকা দিবে কেউ। কালো শরীরটায় পরায় দিবে লাল শাড়ি। শ্যামলী আজ রাধিকার মতো সাজবে। তিতল বসন তনু লাগু/মুনিহুক মানস মনমথ জাগু...
মাধুরী নাই, প্রেম নাই, তবুও অভাগিকে আজ সাজায় দিবে ওরা। নিষ্ঠুর!
বিশু আগের বারের হরু ঠাকুরের মেলা থেইকা ছোটো একটা গোপাল মূর্তি কিনসিল! ওইটা বালিশের পাশেই থাকে। আইজও থাকবে। সানাইয়ের আওয়াজে ব্যথা বাড়ে। প্রকৃতির এক নিয়ম যেন লুন্ঠিত হইতেসে! যা সিলো চিরকালের সঞ্চয়, আজ তাতে ক্ষণকাল আইসা উদ্ধত থাবা মারল! হাজার হাজার লক্ষীপূর্ণিমা আইসবে যাবে! সংসার হবে শ্যামলীর! মন্থর দিগ্বসনা রাত্রির কপালে ছোটো একটা টিপের মতো! শুক্লপক্ষের চান্দের মতো সংসার!
রৌদ্র কইমা আসে। আশ্বিনের অলস অপরাহ্ন! নীলাম্বরী কে আচ্ছন্ন করসে শ্যামলী মেঘ! কৃষ্ণকায় বসুধার বুকে টিপ টিপ কইরা রক্ত ঝরে। আহ্! গৌর আমার! মাটির অতলে বেদনার বেদি। বিশু অপেক্ষা করে। শুধু অপেক্ষা! সব বিরহ ওইখানটায় জুড়ায় যায়! শ্যামলীও যাবে ওইখানে একদিন! নিঃস্ব হয়্যা, রিক্ত হয়্যা! অপরূপা রাধারাণির বেশে... মন্থর বাতাসে বকুলসুবাস! নৈঃশব্দ্যের আড়ালে উচ্ছসিত বাঁশরি মূর্ছনা! অনন্ত অভিসার। বিশু ফেট্টি বাইন্ধা নেয় কপালে। ব্রহ্মপুরে আইজ ওর বড়ো পালা আছে।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।