রোবটের ক্রমশ দখল নেওয়া পৃথিবীতে মানুষ, ভালোবাসা আর আদর্শের জায়গা কোথায়? সৈকত, বিপাশা ও সোফিয়ার এই গল্পে প্রযুক্তির অগ্রগতি মুখোমুখি দাঁড়ায় সম্পর্কের ভাঙন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং মানবিকতার সংকটের। এক অস্বস্তিকর ভবিষ্যতের ভেতরেও প্রশ্ন জেগে থাকে—শেষপর্যন্ত মানুষ কি মানুষই থাকবে? ‘জেলার সাহিত্য’ প্রকল্পে এই মাসের নির্বাচিত জেলাগুলি হল বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া। আজ প্রকাশিত হল বাঁকুড়ার কবি ও গদ্যকার সুদীপ মণ্ডলের ছোটোগল্প।
১
মনখানা আজ বিগড়ে ছিল সৈকতের। আসলে সকালের ডিবেটটা হেরে যাওয়ার পর খচখচ করছিল মনটা, মনে হয়েছে গলায় মাছের কাঁটা বিঁধে আছে। আজকে ডিবেটের টপিক ছিল “মানুষের আবেগ দেওয়ালে ঠেকতে ঠেকতে একদম রোবট হয়ে গেছে”। যদিও সৈকত আজ এর পক্ষে বলেছে কিন্তু সুবোধ তাকে দিয়ে এবং তার কাজ দিয়ে বাজিমাত করেছে। কথায় কথায় বলেছে, “সৈকতবাবু আপনাদের এনজিও যেভাবে সেবা করে যাচ্ছে এই দেখে গিয়ে আবেগ দেয়ালে ঠেকে গেছে মনে করা যায়?” এর মাঝে বিপাশা চিৎকার করে বলল, “চা দিয়েছি টেবিলে, বেরিয়ে এস।” বিপাশার চিৎকার শুনে সৈকত বেরিয়ে আছে রুম থেকে, দেখে বিপাশা চা-বিস্কুট খেতে খেতে টিভি দেখছে, সে-ও গিয়ে তার পাশে বসে। বিপাশা বলে ওঠে, “তুমি ডিবেটে হারলে মুখ ভাদ্র মাসের ওলের মতো করে রাখো, আরে যুদ্ধে হার-জিত তো আছে।” সৈকত বিপাশার কথায় ভরসা পেয়ে শান্ত হয়েছিল, তখন টিভিতে একটা খবর ভেসে ওঠে—সোফিয়া আজ আরব কান্ট্রির সিটিজেনশিপ পেল। কে সফিয়া? সে হল একজন রোবট। এটা শুনে সৈকতের বুকে যেন কালবৈশাখী ঝড় উঠল। ভাবল, রোবট আবার সিটিজেনশিপ! তাহলে আমারই তো জেতা উচিত ছিল ডিবেটে। এরপর সে বারান্দা পেরিয়ে, শোবার ঘর পেরিয়ে, ব্যালকনিতে গিয়ে গুগলে টাইপ করল সফিয়া। সাথে সাথে বেরিয়ে এল—Sophia is a social humanoid robot developed by Hong Kong best company Hanson robotics. She is able to display more than 50 facial expressions. Sofia has been covered by media around the Global and has participated in many high profile interview. এসব পড়ার পর মন যেন আরও খারাপ হয়ে গেল তার। রাতের খাবার না খেয়ে শুয়ে পড়ল। বিপাশা জিজ্ঞাসা করল, শরীর খারাপ নাকি? অপর প্রান্ত থেকে কোনো উত্তর এল না। লাইট অফ করে পুরো বাড়ি দিন শেষ ঘোষণা করে শুয়ে পড়ল। ঘুমের ভিতর সৈকত দেখতে থাকল ভালোবাসা, দুঃখ অনুভূতি এবং সততা সফিয়ার সাথে চুম্মাচাটি করছে।
২
আজ ক্লাস থেকে বেরিয়ে সৈকত মোবাইল বের করে দেখল 5 খানা মিসকল বিপাসার। ক্লাসে থাকলে ফোন সাইলেন্ট করে রাখে। এরই মাঝে দেখতে পেল বিপাশার টেক্সট—“সময় হলে ফোন করো, আর্জেন্ট”। সৈকত ফোন করল, সাথে সাথে অপর প্রান্ত থেকে বিপাশার নরম গলা শুনতে পেল। বিপাশা বলল,
—সৈকত খুব খারাপ খবর, আজ এইচ আর ডেকে পাঠিয়েছিল।
—তাতে কি?
—আরে আমার এবারের পারফর্মেন্স ব্যান্ড সবচেয়ে কম। জানো তো ম্যানেজারের কথার প্রতিবাদ করার ফল।
সৈকত ধৈর্য হারিয়ে বলল, আসল কথাটা বলো।
—আরে এই এইচ আর বলল দু-মাসের মধ্যে এই এমএনসি কোম্পানি ছাড়তে হবে কেন-না লোক কমানো হচ্ছে। অনেক কাজও রোবটিক হয়ে যাবে।
সৈকত শান্ত হয়ে উত্তর দিল, কিছু একটা হয়ে যাবে।
ফোন রেখে ভাবতে থাকল, তাদের প্রতিবাদ অহংকার আর শপথ কি আর পূর্ণতা পাবে না! সেই কলেজ লাইফ থেকে দু-জনে মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবে বলে মুখিয়ে থাকত, তাই অর্থনৈতিক দিক সচ্ছল রাখার জন্য চাকরি নিয়েছে বিপাশা আর সৈকত যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে এনজিও চালায়। এবার কীভাবে এই অঙ্ক মিলবে?
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৩
রাতে খাবার টেবিলে দু-জনে কথা চলছিল—কীভাবে তাদের এনজিও বাঁচানো যায়, সংসার বাঁচানো যায়, ভালোবাসা বাঁচানো যায়, শপথ রাখা যায় এবং আদর্শ বাঁচানো যায় এইসব নিয়ে। বিপাশা বলল, আমার পজিশনে কলকাতায় চাকরি পাওয়া একটু কঠিনই, তবে বাইরে গেলে আরও বেশি টাকা পাওয়া যাবে। সৈকতের মুখ থেকে বেরিয়ে গেল—চলে যাও কলকাতার বাইরে, কী আছে এই রংবিহীন শহরে? বিপাশা খেঁকিয়ে উঠে বলল—এই রংচটা শহরের অলিতে-গলিতে আমার শৈশব লেগে আছে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমার যৌবন আমার জন্মদাতা মা ও বাবা। খুব সহজে বলে দিতে পারো, বলো! আমি চলে গেলে তুমি আরও এনজিও নিয়ে মেতে থাকবে আর আমি ব্যাচেলার হয়ে বেঁচে থাকব বাইরে। আমাদের বাচ্চা নাহয় হবে না। তুমি তো আবার এইসব চাও না, ভালোবাসো না। তোমাকে তো কেউ জিজ্ঞাসা করে না বারবার বাচ্চা কবে হবে। তোমার বাড়ির লোকেদের হাজারটা প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আমার জিভে শ্যাওলা পড়ে গেছে। তোমার সন্তান তো তোমার এনজিও। সৈকত আর কথা বাড়াল না, হাত ধুয়ে শুয়ে পড়ল। ভাবল, বিয়ের আগে এই বিপাশা ও তার কত স্বপ্ন ছিল, আশা ছিল মানুষের জন্য কিছু করার। আসলে পরিস্থিতি মানুষের স্বপ্ন, প্রতিশ্রুতিকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে উইপোকার মতো ফোপরা করে যায় ভিতরে ভিতরে। দু-জনে ঘুমিয়ে পড়ে আর সৈকত স্বপ্নের মধ্যে দেখতে থাকে—চারদিকে রোবটরা টাইপ করছে কম্পিউটারে, চারদিকে শুধু রোবট, গাছেরা রোবট, পাখিরা রোবট, সিকিউরিটি গার্ড রোবট, লিফটম্যান রোবট। এদের মাঝখানে একখানা টিমটিমে খুপরির আলোয় আধময়লা জামা পরে একজন মানুষ চা বিক্রি করছে।
৪
সকালে ঘুম থেকে উঠে সৈকত দেখল যেন বাড়িটা শরতের সকালে হিম পড়ার মতো আবহাওয়া নিয়ে শান্ত হয়ে আছে। এই শান্ত পরিবেশ ভাঙল বিপাশা আর কল্পনার চিৎকার-চেঁচামেচিতে। কল্পনা তাদের কাজের লোক, ঘর মোছে আর বাসন ধোয়। রান্নাবান্না বিপাশা নিজেই করে। অন্য রুম থেকে কানে ভেসে আসছিল কল্পনার আওয়াজ, “এত কোনা-মোনা ভালো করে মুছতে পারব না এই টাকার মধ্যে। এটুকুই হবে বউদি, তুমি বড্ড খুঁতখুঁত করো। এই বছরের পুজোর বোনাস দিয়ে ছাড়িয়ে দাও। আমার থেকে ভালো আর কেউ করবে না। এর থেকে ভালো চাইলে রোবট কিনে নাও, ওই যে টিভিতে এড দেয়। ওরা একদম তোমার কথা শুনবে। যেমন তুমি বলবে তেমন, দত্তবাবুর বাড়িতে একখানা আছে।”
৫
আজ ক্লাস শেষ করে গুটিগুটি পায়ে ফিরছিল সৈকত ও সরোজ। এই দু-জনই দুষ্টু বাচ্চাদের ক্লাস নেয়। ফিরতে ফিরতে দু-জনের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক কথাবার্তা হচ্ছিল। বিভিন্নরকম দুনম্বরি, খেলার রাজ আর অটো-অলাদের হুমকি। এসবের মাঝে সৈকত জিজ্ঞাসা করল সরোজকে, “আচ্ছা তোর মায়ের এপেনডিক্স এর অপারেশন কেমন হল?” সরোজ বলল, “আরে রোবটিক অপারেশন হল ভাই। এতে কোনো টেনশন নেই। আর যাইহোক আজকালকার হারামি ডাক্তারদের থেকে বিশ্বাসী।” এই কথা শুনে সৈকতের মনে হল তার চিন্তনে, যাপনে সার সার রোবট ঢুকে গেছে। বাড়িতে গিয়ে এই পড়ন্ত বিকেলে ঘুমিয়ে পড়লে সে। আর ঘুমের ভিতরে দেখতে পেল—একটা হলের ভিতরে সে হাইপ্রোফাইল ইন্টারভিউ দিচ্ছে। সেখানে সে একাই মানুষ, বাকি আর সবাই রোবট। সাদা রোবট, কালো রোবট, প্যান্ট-শার্ট পরা রোবট, শাড়ি পরা রোবট, জিন্স টি-শার্ট পরা রোবট, টপ জিন্স পরা রোবটে গিজগিজ করছে আর এক-একজন করে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে তার দিকে—
১। মানুষের প্রেম করার নূন্যতম বয় সীমা কত ছিল?
২। পৃথিবীতে আগে প্রতি মিনিটে ক-টি ডাইনি মারা যেত?
৩। লগ আউট শব্দটির উৎপত্তি কোথা থেকে?
৪। ধর্ষণ কী এবং কেন হয়?
৫। পরিবেশ দূষণ সম্বন্ধে ইতিহাসে কী কী সচেতনতা নেওয়া হয়েছে?
৬। রাজনীতি ও বিনোদনের ইতিহাস সম্বন্ধে বলুন।
এসবের মধ্যে ঘেমে গলা শুকিয়ে সৈকত ঘুম থেকে উঠে পড়ে। ঢক ঢক করে এক বোতল জল খেয়ে নেয়। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে একটা এরোপ্লেন অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবে—হয়তো এই প্লেনে চড়েই পৃথিবীর একমাত্র বেঁচে যাওয়া মানুষ রোবটের রাজ্য থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।