preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
উন্মাদনা নয়, স্পর্ধার নাম ‘VINCENT’: বাজারমুখী শিল্পের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই
রিভিউ

উন্মাদনা নয়, স্পর্ধার নাম ‘VINCENT’: বাজারমুখী শিল্পের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই

শিল্পীর উন্মাদনা বা দারিদ্র্য নিয়ে আমাদের এক ধরনের সস্তা রোমান্টিসিজম আছে। ভ্যান গখকে নিয়ে প্রচলিত মিথগুলোও এই রোমান্টিসিজমের বাইরে নয়। কিন্তু 10th Planet-এর প্রযোজনা এবং শরণ্য দে নির্দেশিত নাটক ‘ভিনসেন্ট’ শুরুতেই সেই মোহকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এ নাটক কোনো সহজ, একমাত্রিক বায়োপিক নয়। এটি হয়ে ওঠে শিল্পের সঙ্গে আপসহীন এক স্রষ্টার, বাজারমুখী পৃথিবীর বিরুদ্ধে এক অসম লড়াইয়ের দলিল। লিখলেন সায়ন দত্ত।

“তবুও কোন হতাশ হাওয়া একটা ছেঁড়া ছায়া
তারার ছুঁচে সেলাই ক’রে রাত্রি জুড়ে টাঙায়।”

কিসের ছায়া? কোন তারা? আর এই অনন্ত রাত্রি জুড়েই বা ঠিক কী টাঙানো যায়! প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর এই পঙ্‌ক্তিতে অবচেতনে কি সেই বিচ্ছিন্নতার বোধের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চান? বোধ! ঠিক যা একজন সাধারণ মানুষকে রক্ত-মাংসের গণ্ডি পার করে শিল্পীতে রূপান্তরিত করে। এই বোধ আসলে কোনো আশীর্বাদ নয়, বরং যেন এক অমরত্বের অভিশাপ। একবার শিল্পীর সত্তায় মিশে গেলে আমৃত্যু সে আর মুক্তি পায় না, পৃথিবীর কোনো জাগতিক প্রাপ্তি তাকে শান্তিতে ঘুমোতে দেয় না। সে তখন নিজেরই এক যন্ত্রণাবিদ্ধ ‘ছেঁড়া ছায়া’ হয়ে ঘুরে বেড়ায় ক্যানভাসের তারার আলোয়। এমনই এক অভিশপ্ত অথচ কালজয়ী শিল্পী হলেন ভিনসেন্ট উইলেম ভ্যান গখ, যাঁর প্রতিভার তীব্রতা টের পায়নি তাঁর সমকাল। জীবিত অবস্থায় যে মানুষটির জীবন চরম দারিদ্র্য ও একাকিত্বে কেটেছে, যাঁকে তথাকথিত ‘উন্মাদনা’র অপবাদে দিনের পর দিন প্রান্তিক করে রেখেছিল সমাজ, আজ মৃত্যুর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর তাঁরই ক্যানভাস বিশ্বের সবচেয়ে দামি পণ্যের একটি। পুঁজিবাদের এ এক অদ্ভুত রসিকতা। শিল্পীর যে রক্তক্ষরণ একদিন সমাজের কাছে ছিল নিছকই পাগলামি, আজ তা বুর্জোয়া শ্রেণির ড্রয়িংরুমের অভিজাত ‘অ্যাস্থেটিক্স’। শিল্পীর এই চরম বিচ্ছিন্নতা (Alienation) এবং তাঁর শিল্পের পণ্য হয়ে ওঠার এই যে নির্মম আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। তাকে ঘিরেই গত ১৬ই মার্চ, একাডেমি মঞ্চে ১০ মিনিটের বিরতিসহ ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের এক নিবিড় পরিসরে মঞ্চস্থ হল 10th Planet-এর প্রযোজনা এবং শরণ্য দে নির্দেশিত নাটক ‘ভিনসেন্ট’।

শিল্পীর উন্মাদনা বা দারিদ্র্য নিয়ে আমাদের এক ধরনের সস্তা রোমান্টিসিজম আছে। ভ্যান গখকে নিয়ে প্রচলিত মিথগুলোও এই রোমান্টিসিজমের বাইরে নয়। কিন্তু এই নাটক শুরুতেই সেই মোহকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এ নাটক কোনো সহজ, একমাত্রিক বায়োপিক নয়। এটি হয়ে ওঠে শিল্পের সঙ্গে আপসহীন এক স্রষ্টার, বাজারমুখী পৃথিবীর বিরুদ্ধে এক অসম লড়াইয়ের দলিল। নাট্যকার অভি চক্রবর্তী ভ্যান গখের জীবনের পূর্ণ পরিধি এঁকেছেন এক সুগঠিত ন্যারেটিভে। ১৮৭৮ সালে বেলজিয়ামের বোরিনেজ (Borinage) নামক রুক্ষ ও দরিদ্র কয়লাখনি অঞ্চলে সাধারণ ধর্মপ্রচারক (Lay Preacher) হিসেবে যাওয়া থেকে শুরু করে ১৮৯০ সালে ওভের (Auvers-sur-Oise)-এ আত্মহত্যা পর্যন্ত… নাটক ভিনসেন্টের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বকে স্পর্শ করে। যেখানে পল গগ্যাঁর সঙ্গে কমিউন তৈরির চিন্তা বা ইম্প্রেশনিস্টদের আন্দোলন শুধু শিল্পের আঙ্গিক বদলের গল্প থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রথাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক আন্দোলন।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

এই নাটকে বারেবারে উঠে এসেছে একটি প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক ও সাবঅল্টার্ন প্রেক্ষিত। পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে ধর্মতত্ত্বের পরীক্ষায় পাস করতে ব্যর্থ হলেও, ১৮৭৮ সালের ডিসেম্বরে বেলজিয়ামের বোরিনেজ অঞ্চলে পৌঁছান ভিনসেন্ট। এই অঞ্চলটি ছিল ইউরোপের অন্যতম ভয়াবহ শিল্পাঞ্চল। এখানে হাজার হাজার খনি শ্রমিক প্রতিদিন মাটির তলায় নেমে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তেন। সেখানে খনি শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি, কয়লার ধুলোয় ফুসফুসের রোগ (Black Lung Disease), খনির ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসে (Firedamp) মর্মান্তিক মৃত্যু এবং হাড়গিলে দারিদ্র্য ভিনসেন্টকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৮৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে Wasmes নামক এক খনি গ্রামে তিনি একটি কুঁড়েঘরে বসবাস শুরু করেন। যিশু খ্রিস্টের “দরিদ্রের সেবা” করার আদর্শকে তিনি আক্ষরিক অর্থেই নিজের জীবনে প্রয়োগ করেছিলেন—নিজের বিছানা, খাবার এমনকি কাপড়চোপড় পর্যন্ত শ্রমিকদের দান করে দিয়েছিলেন। নাটকে এই পর্বটির বিস্তার সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অভিনেতাদের শরীরী অভিনয়ে (Physical acting) শোষিত মানুষের সেই ক্লান্ত, ন্যুব্জ কাঠামোর রূপায়ণ অভাবনীয়। মঞ্চে যখন শোষিত শ্রমিক এবং শাসক বা মালিকের অবস্থানের এই বৈষম্য উঠে আসে, তখন তা ঊনবিংশ শতাব্দীর বেলজিয়ামের সীমানা ছাড়িয়ে চিরন্তন হয়ে ওঠে। এ যেন যুগে যুগে টিকে থাকা এক সর্বজনীন শ্রেণি-সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে… যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

আর এই মুভমেন্টের আখ্যান বর্ণনায় গল্প বলার আসল জাদুটা লুকিয়ে থাকে তার ভঙ্গিতে। থিয়েটারের ক্ষেত্রে তা অনেকাংশেই নির্ভরশীল স্পেস বা মঞ্চের ব্যবহারের ওপর। নির্দেশক শরণ্য দে এখানে গতানুগতিক সেট ডিজাইনের রাস্তায় হাঁটেননি। মঞ্চে ব্যবহৃত ফাঁকা কাঠের ফ্রেম, প্লাস্টিকের শিট বা নীল ও হলুদ আলোর যে দ্বান্দ্বিক ব্যবহার উঠে এসেছে, তা নিছকই নন্দনতত্ত্ব নয়। ওই প্লাস্টিকের আস্তরণ যেন আধুনিক, শিল্পহীন, যান্ত্রিক পৃথিবীর এক নিরেট দেওয়াল… যাকে ভেদ করে ভিনসেন্টের তুলির টান পৌঁছতে চায়, কিন্তু বাধা পায়। নাটক জুড়ে ব্রেখটীয় ‘Alienation Effect’ বা বিযুক্তি প্রভাবের সূক্ষ্ম ব্যবহার লক্ষণীয়। দর্শককে কখনও ভিনসেন্টের যন্ত্রণায় সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দেওয়া হয় না, বরং একটু দূরত্ব বজায় রেখে তাঁর সামাজিক অবস্থানটিকে বিচার করার সুযোগ দেওয়া হয়। এই দ্বৈত প্রক্রিয়া—যুক্ত হওয়া এবং বিযুক্ত থাকা—নাটকটিকে নিছক সহানুভূতির গল্প থেকে উত্তীর্ণ করে এক রাজনৈতিক বিবৃতিতে পরিণত করে।

এই বিষণ্ণ ক্যানভাসে নাটকের অন্যতম শক্তিশালী মেটাফর হল ‘কাক’। ভ্যান গখের বিখ্যাত ‘Wheatfield with Crows’ (১৮৯০) ছবির অনুষঙ্গ তো বটেই, তবে নাটক জুড়ে কাক বারেবারে যেভাবে উপস্থিত হয়েছে, তা কেবল ছবির সীমানায় আটকে থাকে না। এ যেন জীবনানন্দের সেই অমোঘ পঙ্‌ক্তি—“স্বপ্ন নয়, শান্তি নয়, ভালোবাসা নয়, / হৃৎয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!” এই কাক হল ভিনসেন্টের সেই ‘বোধ’, যা সর্বদা তাঁর কাঁধে হাত রেখে চলে। এ যেন সেই অমোঘ বিচ্ছিন্নতা, যা স্মরণ করিয়ে দেয়: “সকল লোকের মাঝে ব’সে / আমার নিজের মুদ্রাদোষে / আমি একা হতেছি আলাদা?” এই কাকের শরীরী নির্মাণে এবং মানসিক অস্থিরতার প্রকাশে অভিনেতা আশীষের মঞ্চ-উপস্থিতি এককথায় অসাধারণ। তিনি একটি প্রাণীকে নিছক নকল করেননি, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক ভারকে মূর্ত করে তুলেছেন।

চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক মিথস্ক্রিয়া এবং টেক্সটের বুননের ক্ষেত্রে কিছু কথা না বললেই নয়। নাট্যকার অভি চক্রবর্তীর লেখনীতে এক অদ্ভুত কাব্যিক বিষাদ আছে, যা ভ্যান গখের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। নির্দেশক শরণ্য সংলাপের মাঝে থাকা শূন্যস্থানগুলোকে তাঁর অসামান্য ‘ইমেজ-মেকিং’ দিয়ে এমনভাবে ভরাট করেছেন যে দৃশ্যই সেখানে টেক্সটের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। এই টেক্সটের বুননেই বারেবারে ফিরে এসেছে দুটি অমোঘ ইংরেজি বাক্য, যা নাটকে এক মনস্তাত্ত্বিক মোটিফ (Motif) হিসেবে কাজ করেছে—“I dream my painting, and then I paint my dream” এবং “Do you know what makes the prison disappear?” ভ্যান গখের নিজস্ব বয়ান থেকে নেওয়া প্রথম বাক্যটি আসলে শিল্পের প্রতি তাঁর সেই নিবিড় সমর্পণের কথা বলে, যেখানে অবচেতন আর বাস্তবের সীমারেখা মুছে যায়। তাঁর ক্যানভাস নিছক কোনো বাইরের দৃশ্যপট নয়, বরং তা তাঁর ভেতরের স্বপ্নেরই এক যন্ত্রণাবিদ্ধ অনুবাদ। আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি? যদিও এটি তাঁর ভাইকে লেখা চিঠির অংশ, তবুও এ যেন সমাজ ও রাষ্ট্রের তৈরি করা কাঠামোর প্রতি এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ। সমাজ যে অদৃশ্য গারদে (Prison) এই ‘মিসফিট’ শিল্পীকে বন্দি করতে চায়, শিল্পের অদম্য বিস্তার, সৃষ্টির প্রবল প্রতিরোধ আর প্রেম দিয়েই সে সেই গারদকে অদৃশ্য করে দিতে চায়। এই দুটি বাক্য নিছক সংলাপ হয়ে থাকে না, বরং গোটা নাটকের দর্শনের মূল চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। সম্পর্কের দৃশ্যগুলোতেও সূক্ষ্ম অনুভূতির বুনন তৈরি হয়েছে। ব়্যাচেলের ভূমিকায় শ্রোতা যখন ভ্যান গখকে জিজ্ঞেস করে, “এতদিন কোথায় ছিলেন?”—তখন তা অবধারিতভাবেই বাঙালির মননে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’-এর সেই চিরপরিচিত হাহাকারকে ফিরিয়ে আনে। এক দীর্ঘ যাত্রার শেষে যেন মিলেছে চিরকাঙ্ক্ষিত স্বস্তি। কিন্তু শিল্পীর নিয়তি কি কখনও স্থিতি মানে? এই প্রশ্নটিই নাটকের সম্পর্কগুলোকে করে তোলে আরও বেদনাবিদ্ধ। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নাটকে যাকে ‘ব়্যাচেল’ নামের যৌনকর্মী হিসেবে দেখানো হয়েছে, ইতিহাস দীর্ঘকাল তাকে এভাবেই জেনে এসেছে। কিন্তু ২০১৬ সালে গবেষক বার্নাডেট মার্ফি তাঁর ‘Van Gogh’s Ear: The True Story’ বইতে তথ্যপ্রমাণ-সহ ১৩০ বছরের পুরোনো মিথ ভেঙে দেখান যে, মেয়েটির আসল নাম গ্যাব্রিয়েল বের্লাটিয়ের।)

১৮৮৮ সালে ফ্রান্সের আর্লেসে (Arles) ‘ইয়েলো হাউস’-এ ভিনসেন্ট ও পল গগ্যাঁর (Paul Gauguin) সহবাসস্থানের পর্বটি নাটকের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দুই শিল্পীর মধ্যে শিল্প ও জীবনদর্শন নিয়ে প্রায়ই তীব্র তর্ক ছিল। ভিনসেন্ট চেয়েছিলেন একটি শিল্পী-কমিউন তৈরি করতে, যেখানে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু গগ্যাঁর ছিল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি—তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্পীর একক স্বাতন্ত্র্যে। এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব ক্রমে তীব্র হতে থাকে। ২৩শে ডিসেম্বর রাতে এরকমই এক ভয়ংকর ঝগড়ার পর গগ্যাঁ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেন। একাকিত্বের ভয়ে এবং চরম মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগে ভিনসেন্ট একটি রেজার দিয়ে নিজের বাঁ-কানের প্রায় পুরোটাই (শুধু লতিটুকু নয়) কেটে ফেলেন। মঞ্চে এই আত্মক্ষয়ের দৃশ্য শুধুমাত্র একটি উন্মাদ মুহূর্ত নয়, বরং শিল্পীর সেই চরম বিচ্ছিন্নতার ছবি নির্মাণ করে। যেখানে প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা নিজের শরীরেই ক্ষত তৈরি করে। নাটকে এই সম্পর্কের জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণটি সংক্ষিপ্ত পরিসরে এসেছে, কিন্তু তাতেই দুই শিল্পীর দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক ও নান্দনিক মাত্রা স্পষ্ট হয়েছে।

মঞ্চের সঙ্গে দর্শকের মেলবন্ধনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হল অভিনয়। ভিনসেন্টের চরিত্রে স্বয়ং নির্দেশক শরণ্য দে-র শারীরিক ভাষা এবং চোখের দৃষ্টি মনে করিয়ে দেয় যে, শিল্পীর একাকিত্ব তাঁর দুর্বলতা নয়, বরং সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড়ো প্রতিরোধ। থিওর চরিত্রে আরাত্রিক যেন ভিনসেন্টের জীবনের একমাত্র নোঙর, যাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণ দর্শকের হৃৎয়ে বাঁধে। সিয়েনের মতো একটি জটিল, প্রান্তিক মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রে কল্পনা বড়ুয়ার অভিনয়ে ব্রেখটীয় ‘অ্যালিয়েনেশন’ প্রভাবের ছাপ রয়েছে। যার ফলে দর্শক সিয়েনের যন্ত্রণার সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হওয়ার বদলে একটু দূর থেকে তার সামাজিক অবস্থানটিকে বিচার করতে বাধ্য হয়। মার্গটের চরিত্রে নম্রতা, উরশুলার চরিত্রে দেবযানী এবং ডাক্তারের চরিত্রে শশী গুহ নিজেদের পরিসরে সার্থক। সবচেয়ে চমকপ্রদ হল মুখোশ মালিক, উইসেনব্রাক এবং ডি বক—এই তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার চরিত্রে রাহুলের সাবলীল যাতায়াত। মভ চরিত্রে প্রত্যয়, ফাদারের চরিত্রে সমুদ্র এবং পল গগ্যাঁর চরিত্রে আর্থেস নাটকের গতিকে ধরে রেখেছেন। পারমিতা, তন্দ্রিমা, রাহুল, নম্রতা, দেবযানী, প্রত্যয়, আশীষ, আর্থেস এবং শ্রোতাকে নিয়ে তৈরি কোরাস দলের সুনিয়ন্ত্রিত শরীরী অভিনয় মঞ্চের স্পেসকে আরও মায়াময় করে তুলেছে। এই কোরাস এবং অভিনয়ের সঙ্গে সমানতালে সংগত করেছে নাটকের লাইভ মিউজিক। পাঞ্চজন্য দে-র মিউজিক ডিজাইনের সঙ্গে সৌম্যর গিটার, গৌরবের বেহালা এবং সমুদ্রর পারকাশন যেন ভিনসেন্টের হৃৎস্পন্দনের ওঠা-নামাকেই শ্রুতিগ্রাহ্য করে তুলেছে। এর সঙ্গে আরেক মাত্রা যুক্ত করেছে পারমিতা ও নম্রতার কণ্ঠ। তাদের গান, আবহকে নতুন মাত্রা দান করেছে।

তবে যে-কোনো বৃহৎ ক্যানভাসের মতোই এই প্রযোজনাতেও কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। ভ্যান গখ এবং পল গগ্যাঁর বন্ধুত্বের অত্যন্ত জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণটি মঞ্চে সেভাবে বিস্তৃত হয়নি। যদিও ভ্যান গখের জীবনের যে-কোনো একটি অধ্যায় নিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক রচনা করা সম্ভব, সেখানে তাঁর সম্পূর্ণ জীবনকে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের ফ্রেমে বন্দি করা এক দুঃসাধ্য কাজ। তাই একে পুরোপুরি দুর্বলতা বলাও সমীচীন নয়। নাটকে বেশ কিছু ছবি নিয়ে চমৎকার গবেষণার ছাপ থাকলেও, সময়ের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবির প্রেক্ষাপট এড়িয়ে যেতে হয়েছে।

সবশেষে যে কথাটা বলতেই হয়, তা হল—‘ভিনসেন্ট’ শুধু একজন ডাচ চিত্রকরের জীবনের গল্প নয়। এ গল্প যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা সেইসব সাবঅল্টার্ন শিল্পীদের, যাঁরা বাজারের নিয়মের কাছে নিজেদের বোধকে বিকিয়ে দেননি। যে পৃথিবীতে ক্ষমতার দম্ভ, বাণিজ্যের সমীকরণ এবং হাউজফুল করার তাগিদটাই শিল্পের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ‘ভিনসেন্ট’ একটি স্পর্ধার নাম। জীবিত অবস্থায় সমাজ যাকে ‘মিসফিট’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, ইতিহাস ঠিক তাকেই শিল্পের সিংহাসনে বসায়। এই নাটকের শেষেও তাই আমাদের মনে একটা প্রশ্ন থেকে যায়—এই যে ভিনসেন্টদের আমরা যুগে যুগে পাগলাগারদে বা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিই, এ ব্যর্থতা কি শুধু ভিনসেন্টদের, না কি এই সমাজের? 10th Planet-এর এই সৎ প্রচেষ্টা দর্শককে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখামুখি দাঁড় করায়, মস্তিষ্কে গভীর ছাপ ফেলে। প্রযোজনাটি অবশ্যই দেখুন।

______________

তথ্যসূত্র:

প্রাথমিক উৎস:

১. চক্রবর্তী, অভি। ভিনসেন্ট। নির্দেশনা: শরণ্য দে। প্রযোজনা: 10th Planet। একাডেমি অব ফাইন আর্টস, ২০২৬।

গৌণ উৎস:

জীবনী ও গবেষণা:

২. Naifeh, Steven, and Gregory White Smith. Van Gogh: The Life. Random House, 2011.

৩. Murphy, Bernadette. Van Gogh’s Ear: The True Story. Chatto & Windus, 2016.

৪. Bailey, Martin. “Name of mystery woman who received Van Gogh’s ear revealed for first time.” The Art Newspaper, 20 July 2016.

তত্ত্ব ও দর্শন:

৫. Marx, Karl. Economic and Philosophic Manuscripts of 1844. Translated by Martin Milligan. Progress Publishers, 1959.

৬. Brecht, Bertolt. Brecht on Theatre. Edited and translated by John Willett. Hill and Wang, 1964.

কাব্যগ্রন্থ:

৭. দাশ, জীবনানন্দ। “বোধ” ও “বনলতা সেন”। বনলতা সেন। কবিতাভবন, ১৯৪২।

৮. মিত্র, প্রেমেন্দ্র। প্রেমেন্দ্র মিত্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা। দে’জ পাবলিশিং।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। এখন লেখালেখি আর চরিত্র অভিনয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। “Miles to go before I sleep.”

অন্যান্য লেখা