preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
আদিভাষা, আদিস্মৃতি
প্রবন্ধ

আদিভাষা, আদিস্মৃতি

আদিম জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে কুড়মিরা অন্যতম। সাঁওতাল, কোল, মুণ্ডা, শবর, ওঁরাও, হো, বিরহোড় প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কুড়মিদের সমগোত্রীয় সম্পর্ক রয়েছে। এইসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা যেমন সাঁওতালি, মুন্ডারি, হো কিংবা শবর ভাষা আজও কথ্য রূপে প্রচলিত। এর মধ্যে একমাত্র সাঁওতালি ভাষাই ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বীকৃতি পেয়েছে। বাকি আদিভাষাগুলির সরকারি স্বীকৃতি আজও অধরা। ‘জেলার সাহিত্য’ প্রকল্পে এই মাসের নির্বাচিত জেলাগুলি হল বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া। আজ প্রকাশিত হল পুরুলিয়ার শক্তিশালী কবি অভিমন্যু মাহাতর প্রবন্ধ।

আদিম জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে কুড়মিরা অন্যতম। সাঁওতাল, কোল, মুণ্ডা, শবর, ওঁরাও, হো, বিরহোড় প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কুড়মিদের সমগোত্রীয় সম্পর্ক রয়েছে। এইসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা যেমন সাঁওতালি, মুন্ডারি, হো কিংবা শবর ভাষা আজও কথ্য রূপে প্রচলিত। এর মধ্যে একমাত্র সাঁওতালি ভাষাই ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বীকৃতি পেয়েছে। বাকি আদিভাষাগুলির সরকারি স্বীকৃতি আজও অধরা।

কুড়মি জনগোষ্ঠীর ভাষা কুড়মালি। দীর্ঘদিন ধরে এই ভাষা মূলত কথ্য ভাষা হিসেবেই প্রচলিত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, অসম, ছত্তিশগড় ও বিহার-সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কুড়মালি ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। তবে কুড়মালি কেবল কুড়মি সম্প্রদায়ের ভাষা, এমন দাবি জোর দিয়ে করা যায় না। কারণ কুড়মি জনগোষ্ঠীর বাইরে আরও বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ কুড়মালিকে কথ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। কামার, কুমোর, ধোপা, নাপিত, সহিস, মুদি, মাহালি, মুচি, ডোম, ছুতোর, তাঁতি, মোমিন, কুইরি, বাউরি, বাগদি, রাজোয়াড়, ঘাটোয়াল প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষও এই ভাষায় অভ্যস্ত। পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের ‘জলহা’ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও কুড়মালির প্রচলন রয়েছে। আসলে কুড়মি জনগোষ্ঠী যখন শিকারনির্ভর বা স্থানান্তর কৃষিভিত্তিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল, তখন তাদের নিজস্ব ভাষা ছিল কুড়মালি। পরবর্তীকালে কৃষিকেন্দ্রিক স্থায়ী জীবনযাপনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরও তাদের আশপাশে বসবাস শুরু হয়। এর ফলে কুড়মি সমাজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব পার্শ্ববর্তী জনগোষ্ঠীর উপর পড়ে। ধীরে ধীরে তারাও কুড়মালি ভাষাভাষী হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংস্কৃতির আদান-প্রদানও ঘটে।

সারা ভারতে প্রায় চার কোটি মানুষ কুড়মালি ভাষায় কথা বলেন। শুধু ভারতেই নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশেও কুড়মালি ভাষাভাষী মানুষের বসবাস রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ভাষা মূলত মৌখিক পরম্পরায় টিকে থাকলেও, ধীরে ধীরে সাহিত‌্য পরিসরেও কুড়মালির উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে। ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই কুড়মালি ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আজও অধরাই রয়ে গিয়েছে। ফলে ভাষাটির সার্বিক বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারে নানা প্রতিবন্ধকতা থেকে যাচ্ছে। আশির দশক থেকেই ঝাড়খণ্ডের রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষত্রিয় আদিবাসী ভাষা বিভাগে কুড়মালি ভাষা পড়ানো শুরু হয়। পরবর্তীকালে উড়িষ্যার কোলহান বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগ বিশ্ববিদ্যালয়েও কুড়মালি ভাষা ও সাহিত্য পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুধু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, ঝাড়খণ্ডের বেশ কিছু স্কুলে নবম শ্রেণি থেকে কুড়মালি ভাষা পড়ানো হয়। পশ্চিমবঙ্গেও কুড়মালি ভাষা শিক্ষার প্রসারে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সিধু-কানহু-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঝাড়গ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে কুড়মালি ভাষার পঠনপাঠন চালু হয়েছে। পাশাপাশি পুরুলিয়ার দুটি কলেজে স্নাতক স্তরেও এই ভাষা পড়ানো শুরু হয়েছে। তবে এত কিছুর পরেও কুড়মালি ভাষার সামনে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হল এর নিজস্ব লিপির অভাব। অঞ্চলভেদে বাংলা, হিন্দি, অসমীয়া ও ওড়িয়া হরফে কুড়মালি লেখা হয়ে থাকে। ফলে ভাষাটির একক লিখিত রূপ গড়ে ওঠেনি। এর ফলে সাহিত্যচর্চা, পাঠ্যপুস্তক নির্মাণ ও ভাষার মান্য রূপ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় সরকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না মেলায় কুড়মালি ভাষা আজও প্রান্তিক অবস্থানেই রয়ে গিয়েছে। ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতি, গান, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন ও ঐতিহ্যও ক্রমশ অস্তিত্বের সংকটে পড়ছে। তাই কুড়মালি ভাষার স্বীকৃতি এখন শুধু একটি ভাষাগত দাবি নয়, বরং একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার আর্জি।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

কুড়মালি সংস্কৃতিবিদদের একাংশের মতে, ‘কুড়ম’ শব্দের অর্থ কচ্ছপ। বহু আদিম জনগোষ্ঠীর মতো কুড়মি সমাজের মধ্যেও একটি টোটেমিক বিশ্বাস আজও প্রচলিত রয়েছে। আদিম জনজাতিগুলির মধ্যে এমন ধারণা দেখা যায় যে, তাদের পূর্বপুরুষ কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী, পাখি, বৃক্ষ বা লতাগুল্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই প্রাণী বা উদ্ভিদকেই তারা নিজেদের আদি উৎস এবং পূর্বপুরুষের প্রতীক হিসেবে মান্য করে। কুড়মি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও কচ্ছপকে সেই আদি প্রতীক বা পূর্বপুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিশ্বাস থেকেই কুড়মি সমাজে কচ্ছপ হত্যা বা কচ্ছপের মাংস ভক্ষণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়। নদী, পুকুর কিংবা মাঠে কোথাও কচ্ছপ দেখতে পেলে কুড়মিরা তার ক্ষতি করেন না। বরং অনেক ক্ষেত্রে কচ্ছপকে সযত্নে জলে ছেড়ে দেওয়ার আগে তার গায়ে তেল বা সিঁদুর লাগিয়ে সম্মান জানান। এই আচার কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসেরই প্রতিফলন নয়, বরং প্রকৃতি ও জীবজগতের প্রতি আদিম মানবসমাজের গভীর শ্রদ্ধাবোধেরও পরিচায়ক। অনেক সংস্কৃতিবিদের মতে, ‘কুড়ম’ শব্দ থেকেই পরবর্তীকালে ‘কুড়মি’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কুড়মি ও সাঁওতাল সমাজে বহু প্রাচীন চিহ্ন ও প্রতীক আজও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে টিকে রয়েছে। যদিও এই প্রতীকগুলির নির্দিষ্ট পাঠ বা অর্থ বর্তমান প্রজন্মের কাছে সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবুও নানা আচার-অনুষ্ঠান, লোকাচার ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেগুলির ব্যবহার এখনও দেখা যায়। কুড়মিরা ঘরের চৌকাঠে, দেওয়ালচিত্রে, খোদাই বা উল্কিচিহ্নে, বাঁশের দাগকাটায়, ধানের পাড়নে কিংবা গবাদি পশুর গায়ে ছাপ দেওয়ার সময় এই প্রতীকগুলি ব্যবহার করে থাকেন। ফলে অনেক গবেষকের মতে, এইসব চিহ্ন প্রাচীন কোনো লিপি বা সাংস্কৃতিক স্মৃতির উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। এই প্রেক্ষিতে কিছু গবেষক ও সংস্কৃতিবিদের দাবি, কুড়মি সমাজের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র থাকতে পারে। তাঁদের মতে, কুড়মালি ভাষার শিকড়ও অত্যন্ত প্রাচীন, যার সূত্রপাত আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের সময়কাল পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। অনেকের ধারণা, কুড়মিদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন সিন্ধু সভ্যতার অন্তর্গত দ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠীর অংশ এবং মেহেরগড়ের প্রত্ন-দ্রাবিড় মানবসমষ্টির উত্তরসূরি। যদিও এই মতের পক্ষে আরও বিস্তৃত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, তবুও কুড়মি সমাজের লোকবিশ্বাস, প্রতীকচর্চা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সেই প্রাচীন উত্তরাধিকারের ইঙ্গিত বহন করে।

চাঁচর গীত ও চর্যাপদ
কুড়মালি সংস্কৃতির মধ্যে আজও টিকে আছে চাঁচর গীত। তবে এই গীত অবলুপ্তির পথে। সম্প্রতি এক গবেষণাগ্রন্থে  কিরীটি মাহাত তুলে ধরেছেন চাঁচর গীত ও চর্যাপদের সাজুয্য। একটি উদাহরণ—

          চাঁচর গীত
বিনাহ ঠেঁগেকেরে হরিনারে
উমকলে ডেগলঅ পাহাড়।
মুড় কাটলে নেহি মরইএ
নেজ কাটলে মরি জাই।।

এই চাঁচর গীতের হুবহু পদ চর্চাপদে রয়েছে।

আরও একটি চাঁচর গীত

কিআ দেখি বকলি আগা ডাঁড়িঞ বসলি
       কিআ দেখি পাঁইখ মড়রইএ
কিআ দেখি করিন বেটি অঁগ মচকাই,
       রসিকাকে লেগল ভুলাই?
মাছা দেখি বকলি আগা ডাঁড়িঞ বইসলি
        মেঘা দেখি পাঁইখ মড়রইএ
রসিকাকে দেখি করিন বেটি অঁগ মচকাইএ
        রসিকাকে লেগল ভুলাই।

এই চাঁচর গীতের সাজুয্য পদ চর্চাপদের ৯ এ দেখতে পাই।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় মুন্ডারি ভাষার কথাও। ভারতবর্ষের প্রাচীন আদিবাসী ভাষাগুলির মধ্যে মুন্ডারি অন্যতম। আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি নেতা বীরসা মুন্ডার মাতৃভাষা ছিল মুন্ডারি। অথচ আজও এই ভাষা কেন্দ্রীয় সরকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করতে পারেনি। শুধু কেন্দ্রীয় সরকারই নয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এখনও মুন্ডারি ভাষাকে সরকারি স্বীকৃতি দেয়নি। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এই কারণে যে, যাঁকে আজ রাষ্ট্র ‘বীরযোদ্ধা’ ও আদিবাসী সমাজের আইকন হিসেবে সম্মান জানায়, তাঁর নিজের মাতৃভাষাই আজও প্রান্তিক ও উপেক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ। ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, অসম থেকে শুরু করে দেশের নানা অঞ্চলে মুন্ডারি ভাষাভাষীদের বসবাস। তবুও ভাষাটির সংরক্ষণ, শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। শুধু মুন্ডারি নয়, ভারতের আদিবাসী সমাজে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন ভাষার ঐতিহ্য। সাঁওতালি, কুড়মালি, কড়া, টোটো, কোকবরক, কুই, খাসি, লেপচা, হো, গারো, ভূমিজ-সহ চল্লিশটিরও বেশি ভাষা আজ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে চলেছে। কিন্তু এর মধ্যে বহু ভাষাই আজ বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষা চর্চা কমে যাওয়া, শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার অনুপস্থিতি, সরকারি উদাসীনতা এবং বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক চাপ—সব মিলিয়ে একের পর এক ভাষা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে একমাত্র সাঁওতালি ভাষাই ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু বাকি আদিবাসী ভাষাগুলি এখনও সেই স্বীকৃতির অপেক্ষায়। ফলে এই ভাষাগুলির সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, মৌখিক ইতিহাস, লোকগাথা ও জীবনদর্শনও ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আসলে একটি ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারকও বটে। কোনো জাতির ভাষা যখন বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন শুধু কয়েকটি শব্দ হারিয়ে যায় না, হারিয়ে যায় সেই জাতির ইতিহাস, লোকঐতিহ্য, জীবনদর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও। তাই আদিবাসী ভাষাগুলির সংরক্ষণ ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি আজ কেবল ভাষাগত অধিকার নয়, বরং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষারও প্রশ্ন।

আদি জনজাতিদের ভাষার ইতিহাস আজও বহুাংশে অন্ধকারে ঢাকা। ইতিহাসের যে বয়ান আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, তার অনেকটাই মূলধারার ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত। যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চাকে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে ভাষার ইতিহাসও অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত, বৈষম্যমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যার শিকার হয়েছে বলে একাংশের গবেষক ও সংস্কৃতিবিদদের মত। এই প্রসঙ্গে সংস্কৃত ভাষাকে ঘিরেও নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। অনেকের মতে, সংস্কৃত মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা পুস্তকভাষা—যা ধর্মগ্রন্থ, শাস্ত্র ও জ্ঞানচর্চার নির্দিষ্ট পরিসরের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল। এই ভাষার বিকাশের পিছনে উচ্চবর্ণকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোর প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কৃত ভাষা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল এবং নির্দিষ্ট একটি শিক্ষিত ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তার চর্চা।

ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আজও অসংখ্য মানুষের মাতৃভাষা হিসেবে নানা আঞ্চলিক ও আদিবাসী ভাষার অস্তিত্ব দেখা যায়। কিন্তু সংস্কৃতকে কোনো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন কথ্যভাষা হিসেবে চিহ্নিত করার উদাহরণ ঐতিহাসিকভাবে খুব কম। এই কারণেই প্রশ্ন ওঠে, যে ভাষা মূলত পাণ্ডিত্যচর্চা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তাকে কীভাবে সমস্ত ভাষার ‘জননী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হল? আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, কোনো ভাষার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার লোকজ চর্চায়—লোকগান, প্রবাদ, ছড়া, মৌখিক সাহিত্য ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে। আদিবাসী ভাষাগুলির ক্ষেত্রে আমরা সমৃদ্ধ লোকসংগীত, লোককথা ও মৌখিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা দেখতে পাই। কিন্তু সংস্কৃত ভাষার ক্ষেত্রে সেই অর্থে বিস্তৃত লোকজ বা কথ্য সাংস্কৃতিক পরম্পরার উপস্থিতি নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে। ফলে ভাষার উৎপত্তি, শ্রেষ্ঠত্ব ও ঐতিহাসিক আধিপত্য নিয়ে নানা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। তবে এই বিতর্কের নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর আজও মেলেনি। ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও সংস্কৃতিচর্চার পরিসরে এই প্রশ্নগুলি এখনও আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে। আর সেই কারণেই ভারতের ভাষা-ইতিহাসকে নতুন করে, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্মূল্যায়নের দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অভিমন্যু মাহাতর জন্ম পুরুলিয়া জেলার শরবেড়িয়া গ্রামে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আওলা বরষা ধনি’ প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘মাটি’, ‘আমার নাম জঙ্গলমহল’, ‘লাঙ্গল, শুনছো?’,  ‘খিলিপান’, ‘রিমিল’, ‘পরব গাঁয়ে জনম।’ তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেছেন কুড়মালিতে। ২০১৪ সালে ‘মাটি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য আকাডেমি যুব পুরস্কার। পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাডেমির বিভা চট্টোপাধ্যায় স্মারক পুরস্কার।

অন্যান্য লেখা