preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
বটবৃক্ষের ছায়া যেমন
প্রবন্ধ

বটবৃক্ষের ছায়া যেমন

এই মাস থেকে কেতাব-ই ব্লগজিনে শুরু হল ‘জেলার সাহিত‍্য’ নামের এক বিশেষ আয়োজন। যার মূল উদ্দেশ্য পাঠককে বিভিন্ন জেলার নতুন ও পুরোনো লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন জেলার ভিন্ন স্বরকে একত্রিত করে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক রূপনির্মাণ।
আমাদের প্রথম নির্বাচিত জেলাগুলি হল দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, এবং কোচবিহার। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে আমরা প্রকাশ করব এই পাঁচ জেলার সাহিত্য।
আজ প্রকাশিত হল ডুয়ার্সের সাহিত্যিক-শিক্ষক সদ্যপ্রয়াত অর্ণব সেনের স্মরণলেখ, লিখলেন আলিপুরদুয়ারের সুমন গোস্বামী।

১৯৫৬ সালে মাত্র উনিশ বছর বয়সের এক তরুণের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী পত্রিকায়। সুদূর উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরের কোনো তরুণের পক্ষে এমন কাজ সেই যুগে ছিল রীতিমতো শ্লাঘার বিষয়। মাত্র তিন-চার বছর বাদ দিয়ে সেদিনের সেই তরুণ নিজের গোটা জীবনটাই কাটিয়ে দিলেন উত্তরবঙ্গে―মুখ্যত আলিপুরদুয়ার শহরে। গত ৩১ মার্চ শেষনিশ্বাস ত্যাগ করার পর যিনি ভূষিত হচ্ছেন উত্তরবঙ্গের ‘সাহিত্যিকদের শিক্ষক’ রূপে। তিনি অর্ণব সেন। এই অঞ্চলে সকলের মাথা ছাড়িয়ে শালপ্রাংশু দাঁড়িয়ে থাকা বটবৃক্ষ।

যেখানে পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সাহিত্যকর্মই পরিবর্তিত হয় মহানগর কলকাতাকে কেন্দ্র করে, সেখানে অতদূরে বসে সাহিত্যকর্ম! বিরলের মধ্যে বিরলতম ব্যাপার। হ্যাঁ, জানি কেউ কেউ অমিয়ভূষণের প্রসঙ্গ তুলবেন। বলবেন অরুণেশ ঘোষ বা আরও কারও কথা। কিন্তু ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই, আর এঁরা কেউই অর্ণব সেন নন। তাঁরা নিভৃত সাহিত্য সাধক। দশকের পর দশক ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সাহিত্য রহস্যের মারপ্যাঁচ বোঝানোর কাজ তাঁরা কখনোই করেননি। অর্ণব সেন করেছেন। করে গেছেন। তাই তিনি অনন্য। আট বা নয়ের দশকে, যখন ইন্টারনেট ছিল দূর গ্রহের বস্তু, তখন সুদূর উত্তরবঙ্গের নব্য সাহিত্যিকদের হাতে মালার্মে, ব়্যাবো বা সার্ত্রের যোগান দিয়ে গেছেন কে আর? আট থেকে আশি―আক্ষরিক অর্থেই সক্কলের বানান ঠিক করে গেছেন তিনি―আজীবন।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

ডুয়ার্সের বিপুল বৈচিত্র্য সম্পর্কে কম-বেশি জানেন অনেকেই। সে-বৈচিত্র্য কি পাখা মেলে বসেছিল তাঁর কলমে? নইলে এমন বহুবিচিত্র পথে কলম শানানোর মানুষও যে বড্ড বিরল! কবিতা-ছড়া থেকে উপন্যাস; খবরের কাগজের চাহিদা মেটানো লেখা থেকে পাঁচ বছরে একবার প্রকাশ পাওয়া গম্ভীর লিটল ম্যাগাজিনের জন্য নিবন্ধ―অর্ণব সেন ছিলেন যথার্থ সর্বত্রগামী। এবং হ্যাঁ, সচরাচর ফেরাতেন না কাউকেই।

ছবি: সুরজিৎ বণিক

১৯৭২ সালেই আলিপুরদুয়ারে বসে লিখেছিলেন উপন্যাস ‘সমুদ্র নেই দ্বীপ’, তারও আগে ১৯৫৭-৫৮ সালে, কুড়ি-একুশ বছর বয়সেই লিখে ফেলেছেন প্রথম উপন্যাস ‘অন্ধকারের সিঁড়ি’। অনুবাদ করেছেন জাঁ পল সার্ত্রে, মালার্মেদের লেখা। এই সেদিন অবধি লিখে গেছেন নিয়ম করে। সাতাশি পার করেও।

এবং স্মৃতিশক্তি! এ আশ্চর্য পারঙ্গমতাই বোধহয় তাঁকে করেছিল সকলের থেকে আলাদা। আলিপুরদুয়ার কলেজে অধ্যাপনায় যোগদানের আগে কিছুদিন কাজ করেছিলেন বীরপাড়া হাই স্কুলে। সেই সময়ের ছাত্রকে নাম শুনেই চিনে কেবল ফেলা নয়, আরও ক-জনের নাম শুনিয়ে দেওয়া―প্রায় অলৌকিক এই ঘটনার সাক্ষী এই অধম। বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা উল্লেখ করে বিষয়বস্তু জানাতে তাঁকে অনেকবার দেখা গেছে।

শেষ বয়সে, এই ক-বছর আগে, গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের মুখপত্রের পক্ষ থেকে অর্ণব সেন সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। সেখানে নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন তাঁর প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কমিউনিস্ট নেতা যোসেফ স্ট্যালিন। জানিয়েছেন ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসের কথা। জানিয়েছেন তাঁর অপছন্দের মানুষ হলেন তাঁরা, যাঁরা শিক্ষিত হয়েও ধর্মান্ধ। এবং যা দেখতে চান বাকি জীবনে―এই প্রশ্নের উত্তরে যা লিখেছেন, এখানে তুলে দেওয়া যাক:

“...চাই বর্তমান অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন, যা হবে মানবিক এবং সহানুভূতিশীল।” একই উত্তরে যুদ্ধজর্জরিত কলকাতার স্মৃতি রোমন্থন করে বলেছেন: “...নাতসিবাদের পতন শান্তির সংকেত। তবে সারা পৃথিবী যুদ্ধহীন হয় না। কবর থেকে উঠে আসবে কি হিটলারের প্রেতাত্মা? মৃত আইখম্যান? নতুন শতাব্দীতে আবার কি নতুন মোড়কে পুরোনো ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস, আউসভিতশ কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, মৃত্যুমিছিল আর কর্পোরেট দুনিয়ার জয়যাত্রা?

না। আমরা বিশ্বাস করি বৈচিত্র্যে মধ্যে ঐক্যে। নানা সম্প্রদায়, ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের ঐক্যবদ্ধ সার্বিক যুদ্ধ হিটলারের প্রেতাত্মাকে আবার কবরে পাঠাবে।... আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচাবই।... কার্ল মার্কস, রবীন্দ্রনাথ, মাও জে দং ছাড়াও আছেন আরও মানুষ। সবাই একরকম নন।”

এই আশা শুনিয়ে এবং আমাদের মধ্যে রেখে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। শিক্ষকের শিক্ষক, সাহিত্যিকের সাহিত্যিক―অর্ণব সেন।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

আলিপুরদুয়ার শহরের বাসিন্দা সুমন গোস্বামী অনুবাদ করেছেন এডুয়ার্দো গ্যালিয়ানো, অরুন্ধতী রায়দের লেখাপত্তর, সেসব তর্জমার কিছু কিছু বই হয়েও বেরিয়েছে। একদা আলিপুরদুয়ারে অন্যধারার চলচ্চিত্র দেখা(নো)র আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা আর লিটল ম্যাগাজিন করা সুমন গত তিন দশক অধিকার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে নানা পত্রপত্রিকায় প্রাণ-প্রকৃতি-মানুষের হাল হকিকতের কথা লিখে থাকেন, কখনো-সখনো লেখেন বকসা-ডুয়ার্সের নানা জনপদের ইতিহাস-আখ্যান।

অন্যান্য লেখা