preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
রাষ্ট্রের দম্ভ, প্রান্তিকের ‘অসৎ বিশ্বাস’: সার্ত্রের নাটক ও ‘রাষ্ট্র বনাম গণিকা’
রিভিউ

রাষ্ট্রের দম্ভ, প্রান্তিকের ‘অসৎ বিশ্বাস’: সার্ত্রের নাটক ও ‘রাষ্ট্র বনাম গণিকা’

সার্ত্রের ‘The Respectful Prostitute’ অবলম্বনে গোত্রহীন আর্ট অ্যাকাডেমির নতুন নাটক ‘রাষ্ট্র বনাম গণিকা’—এক নির্মম রাজনৈতিক নাট্যভাষ্য। Scottsboro Boys মামলার ইতিহাস থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্রের আদর্শিক ক্ষমতা, মিথ্যা বয়ান, এবং প্রান্তিক মানুষের নৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে এই প্রযোজনার বিশ্লেষণে উঠে আসে শোষক ও শোষিতের চিরন্তন দ্বন্দ্ব। অভিনয়, মঞ্চভাবনা ও নির্দেশনার মুনশিয়ানায় উন্মোচিত হয় এক গভীর রাজনৈতিক নাট্যপাঠ। লিখলেন সায়ন দত্ত।

সময়টা ১৯৩১ সালের ২৫শে মার্চ। মহামন্দার ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া আমেরিকায় তখন বর্ণবাদের নগ্ন আস্ফালন। সেই অশান্ত সময়ে টেনেসি থেকে আলাবামাগামী একটি মালবাহী ট্রেনে উঠেছিল ৯ জন কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর ও তরুণ, যাঁদের বয়স ১৩ থেকে ১৯-এর কোঠায়; কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো সহায়সম্বলহীন কিছু ভাসমান মানুষ। যাত্রাপথে শ্বেতাঙ্গ সহযাত্রীদের সঙ্গে বিবাদ বাধলে শ্বেতাঙ্গরা ট্রেন থেকে নেমে পুলিশকে খবর দেয়। রটিয়ে দেওয়া হয়, ওই কৃষ্ণাঙ্গ তরুণেরা নাকি দুই শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধর্ষণ করেছে। পেইন্ট রক স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারের বাইরে জড়ো হয় লিঞ্চিং-পিপাসু উন্মত্ত শ্বেতাঙ্গ জনতা; তাদের সামলাতে আলাবামা ন্যাশনাল গার্ড ডাকতে হয় প্রশাসনকে। এরপর মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হয় বিচারের নামে এক চরম প্রহসন। আপাদমস্তক শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের নিয়ে গঠিত জুরি বোর্ড প্রাথমিকভাবে আটজনকে বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড দেয়; সবচেয়ে কমবয়সি ১৩ বছরের লেরয় রাইট পায় যাবজ্জীবন। চিকিৎসকের পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো প্রমাণ সেভাবে না মিললেও রায় বদলায় না। ইতিহাসের পাতায় এই কলঙ্কজনক অধ্যায়টিই ‘Scottsboro Boys’ মামলা নামে কুখ্যাত।

পরবর্তীকালে দুই অভিযোগকারিণীর একজন, রুবি বেটস, আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেন যে পুরো অভিযোগটিই ছিল মিথ্যা। আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির আইনি শাখা ‘International Labor Defense’ (ILD) প্রথম ওই নির্দোষ ৯ জনের হয়ে লড়তে এগিয়ে আসে; পরে NAACP-ও সেই লড়াইয়ে যোগ দেয়। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে লেগে যায় পাক্কা দুই দশক। ৯ জন মিলে সমষ্টিগতভাবে ১০০ বছরেরও বেশি সময় জেল খেটেছিলেন এমন এক অপরাধের জন্য, যা তাঁরা কখনোই করেননি। ২০১৩ সালে আলাবামা রাজ্য মরণোত্তরভাবে তাঁদের ক্ষমা প্রদর্শন করে। কী সহজ তাই না! কিন্তু সেই ক্ষমায় ইতিহাসের দগদগে ক্ষতগুলো কি আর মুছে যায়?

ইতিহাসের এই দগদগে ক্ষতের কথা আজ আবার নতুন করে বলতে হচ্ছে, কারণ, এই ঘটনার প্রায় চোদ্দো বছর পর, ১৯৪৫ সালের শুরুতে ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র আলবের কামুর পত্রিকা Combat ও Le Figaro-র সংবাদদাতা হিসেবে আমেরিকা সফরে যান। সে-সফরে তিনি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন আমেরিকার প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ যা কেবল দক্ষিণের রাজ্যগুলোতেই নয়, তথাকথিত ‘উদার’ উত্তরেও। সার্ত্র-জীবনীকার অ্যানি কোহেন সোলাল লিখেছেন, এই আমেরিকা সফরটিই ছিল সার্ত্রের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রকৃত সূচনা—“এটিই তাঁর প্রথম কোনো নিছক সামাজিক কারণের প্রতি একাত্মতা”।( “It is far from home, from his daily reality and his sociohistorical connivances, that his first endorsement of a purely social cause takes place.”) প্যারিসে ফিরে এসে তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের সংকট নিয়ে কলম ধরেন। সেই রূঢ় অভিজ্ঞতা এবং ‘Scottsboro Boys’-এর ইতিহাসের নির্যাস থেকেই ১৯৪৬ সালে জন্ম নেয় তাঁর কালজয়ী নাটক “La Putain respectueuse” (The Respectful Prostitute)। সেই বছরের ৮ই নভেম্বর প্যারিসের থিয়েটার অ্যান্টোয়ানে নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয়। অনেক দার্শনিক এবং সমালোচক মনে করেন এটি সার্ত্রের mauvaise foi বা ‘অসৎ বিশ্বাস’-এর এক অমোঘ নাট্যরূপ যেখানে মানুষ নিজের স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করে স্বেচ্ছায় ক্ষমতার দাসত্ব গ্রহণ করে। যে তত্ত্ব তিনি ইতিপূর্বেই বিশ্লেষণ করেছিলেন তাঁর L’Être et le Néant বা Being and Nothingness (১৯৪৩) গ্রন্থে।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

গত ৭ই মার্চ, শনিবার হালিসহরের বিনোদিনী মঞ্চে মঞ্চস্থ হল সার্ত্রের এই ধ্রুপদি নাটক অবলম্বনে গোত্রহীন আর্ট অ্যাকাডেমির প্রযোজনা ‘রাষ্ট্র বনাম গণিকা’। পার্থপ্রতিম দাশের নির্দেশনায়, বিরতিহীন ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের এই নাটকের ভাষান্তরে আক্ষরিক অনুবাদের পথই বেছে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বিদেশের মাটির এক যন্ত্রণাবিদ্ধ আখ্যানকে সযত্নে এদেশের মঞ্চে রোপণ করার এক সৎ ও দুঃসাহসী প্রচেষ্টা এই প্রযোজনা।

নাটকের আখ্যান আবর্তিত হয়েছে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে। ট্রেনের কামরায় বিনা প্ররোচনায় এক নিরীহ কৃষ্ণাঙ্গকে খুন করে এক ক্ষমতাবান শ্বেতাঙ্গ যুবক। সেই ঘটনার একমাত্র চাক্ষুষ সাক্ষী সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক স্তরের এক নারী—লিজ়ি নামের এক শ্বেতাঙ্গ গণিকা। রাষ্ট্রযন্ত্র তার ক্ষমতা ও বুর্জোয়া শ্রেণির দম্ভ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে সেই নির্দোষ কৃষ্ণাঙ্গকে ফাঁসাতে। আর এর জন্য তাদের প্রয়োজন লিজ়ির একটি মিথ্যে বয়ান। শুরু হয় লিজ়ির ওপর প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও প্রলোভনের ভয়ংকর খেলা। একদিকে তার জেগে ওঠা বিবেক ও সত্যনিষ্ঠা, আর অন্যদিকে রাষ্ট্রের দেওয়া মিথ্যে ‘সম্মান’ ও মেকি দেশপ্রেমের হাতছানি। শেষপর্যন্ত কে জিতবে এই অসম লড়াইয়ে—সত্য, না কি ক্ষমতার দম্ভ? এই তীব্র আদর্শিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই নাটকটি এগোতে থাকে। যেহেতু প্রযোজনাটি মূলানুগ, তাই আখ্যান নির্মাণে নির্দেশক খুব বেশি স্বাধীনতা নেননি। তবে যেটুকু পরিবর্তন ঘটেছে, তা নাট্যিক সাবলীলতার স্বার্থেই অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

‘রাষ্ট্র বনাম গণিকা’ বারবার এই নির্মম সত্যটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে সাধারণ মানুষ নিছকই দাবার বোড়ে। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার পরে যাকে ‘Ideological State Apparatus’ বা ‘আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, সেই সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার নগ্ন কার্যকারিতাই এই নাটকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র কখনও পেশিশক্তি প্রয়োগ করে, আবার কখনও মনস্তাত্ত্বিক মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে তার কাঙ্ক্ষিত আখ্যান তৈরি করে নেয়। এই সর্বগ্রাসী ব্যবস্থার সামনে সাধারণ মানুষ বড়োই অসহায়। নাটকটি আপাতদৃষ্টিতে বর্ণবাদের কথা বললেও, এর গভীরে নিহিত রয়েছে এক চিরন্তন শ্রেণিসংগ্রামের ছবি। এখানে যে দুই মেরুর সংঘাত সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে, তার একদিকে সুবিধাভোগী শাসক শ্রেণি, আর অন্যদিকে শোষিত প্রান্তিক জনগণ। শোষকের এই আধিপত্য বিস্তারের খেলা মঞ্চের দৃশ্যকল্পে ভীষণভাবে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। এর নেপথ্যে অনুঘটকের কাজ করেছে পরিমিত আলো এবং আবহসংগীতের সুনিপুণ ব্যবহার।

মঞ্চের সঙ্গে দর্শকের মেলবন্ধনের আরও অনেকগুলি মাধ্যমের মধ্যে অন্যতম একটি মাধ্যম হল অভিনয়। আর অভিনয়ের কথা এলে প্রথমেই বলতে হয় সেনেটরের ভূমিকায় অভিনেতা পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে ছলে-বলে-কৌশলে সাধারণ মানুষের মগজধোলাই করে নিজের বয়ান প্রতিষ্ঠিত করে, তা তাঁর পরিমিত ও তীক্ষ্ণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অসাধারণভাবে মূর্ত হয়েছে। অন্যদিকে, লিজ়ি চরিত্রে অভিনেত্রী সঞ্চালিকা পালের অভিনয় প্রথম থেকেই নজর কাড়ে। একটি প্রান্তিক মেয়ের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব তাঁর শারীরিক ভাষা ও অভিব্যক্তিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কেবল বুদ্ধিদীপ্ত নাট্যানুবাদের ক্ষেত্রেই নয়, অভিনেতা সৌভিক মণ্ডল নিজের চরিত্রের রূপায়ণেও সমান মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। এই নাটকে কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্রের উপস্থিতি এবং মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। গোটা নাটক জুড়ে ফিরে ফিরে আসা তাঁর আর্তনাদ আসলে যুগে যুগে শোষিত, নির্যাতিত প্রান্তিক মানুষের যৌথ আর্তনাদেরই প্রতিফলন। অভিনেতা সাংখ্যদীপ চক্রবর্তী এই চরিত্রটিকে মঞ্চে অসাধারণ দক্ষতায় ও সংবেদনশীলতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। নাটকের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা শরীরী অভিনয় (physical acting) দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখে। এই প্রসঙ্গেই আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় কোরাস দলের কথা। মঞ্চে যখন চরিত্রের অভ্যন্তরীণ মানসিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছায়, তখন কোরাসের শরীরী অভিনয় এবং মঞ্চে ব্যবহৃত দুটি পর্দার বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগ এক অদ্ভুত মায়াময় থিয়েট্রিক্যাল স্পেস তৈরি করে। আর এই স্পেস নির্মাণের নেপথ্যে যাঁর কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন সিনোগ্রাফার অনির্বাণ ঘোষ। মঞ্চ ছিল একেবারেই বাহুল্যহীন, কিন্তু স্পেসের প্রতিটি কোণ এবং আলো-আঁধারির পরিমিত ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত, যা অবধারিতভাবে দর্শকের চোখ টেনে নেয়। এককথায় বললে রিসোর্স হয়তো সামান্য, কিন্তু তার প্রয়োগ অসামান্য। এই সামগ্রিক দৃশ্যকল্প নির্দেশনার ক্ষেত্রেও বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। যা নির্দেশনার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।

তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজনার দুর্বলতাও চোখে পড়ে বই-কি। কিছু জায়গায় নাটকের সংলাপ যেমন শাণিত ও তীক্ষ্ণ, তেমনি কিছু দৃশ্যে দীর্ঘ সংলাপের ভার নাটকের স্বাভাবিক গতিকে বেশ খানিকটা শ্লথ করে দিয়েছে—বিশেষত প্রথম দৃশ্যে এই সমস্যাটি সবচেয়ে স্পষ্ট। এই দীর্ঘ সংলাপের মুহূর্তগুলোতে আবহসংগীতের অনুপস্থিতি কানে লাগে। উপযুক্ত আবহের ব্যবহার হয়তো দৃশ্যগুলোর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আরও বাড়াতে পারত।

মঞ্চের আখ্যান সুদূর আমেরিকার হলেও, নাম ও পোশাকের বহিরাবরণ বাদ দিলে চরিত্রদের আচরণে আপাদমস্তক বাঙালির ছাপ এতে স্পষ্ট। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, থিয়েটারের বৃহত্তর ক্যানভাসে এটি মোটেও দৃষ্টিকটু বা বেমানান লাগেনি। বরং এখানেই লুকিয়ে আছে এই নাটকের সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক দর্শন। দেশ, কাল বা পাত্রের সীমানা পেরিয়ে শোষক ও শোষিতের সমীকরণ যে চিরকাল একই থাকে, এই প্রযোজনা সেই রূঢ় সত্যকেই সামনে আনে। ১৯৩১ সালের আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য ও বর্ণবাদের সঙ্গে আজকের পৃথিবীর কি খুব কোনো অমিল আছে? এই তো কিছুদিন আগেই আমাদের দেশে শুধুমাত্র মন্দিরে প্রবেশ করার ‘অপরাধে’ এক দলিত শিশুকে হত্যা করা হল। আবার রাজস্থানের ইন্দ্র কুমারকে ‘উচ্চবর্ণের’ শিক্ষকদের জন্য রাখা মাটির পাত্র থেকে জল খেয়ে ফেলেছিল বলে শিক্ষকের নির্মম প্রহারের শিকার হতে হল। অথবা ভাবুন ২০২০ সালে পুলিশের হাঁটুর নিচে পিষ্ট হয়ে জর্জ ফ্লয়েডের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর আমেরিকার গণ্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার নানা দেশে ছড়িয়ে পড়া সেই প্রতিবাদের ঢেউয়ের কথা। এই বীভৎস ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে, আমেরিকার সেই বর্ণবাদ আজও আমাদের সমাজে জাতপাতের লড়াই, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং ধর্মের ভেতরে থাকা বর্ণবাদী আগ্রাসনের রূপ নিয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। সার্ত্রের নাটকের সেই সংলাপ আজও কানে বাজে—“যখন দু-জন অপরিচিত শ্বেতাঙ্গ একসঙ্গে কথা বলতে বসে, তখন কোথাও-না-কোথাও একটি কৃষ্ণাঙ্গ মরতে বসে”। (সংলাপের ভাবানুবাদ) আসলে শাসকের চাবুক এবং শোষিতের আর্তনাদের কোনো ভৌগোলিক সীমানা হয় না।

সার্ত্র তাঁর Being and Nothingness-এ যে ‘অসৎ বিশ্বাস’-এর কথা বলেছিলেন, লিজ়ি তার সবচেয়ে করুণ উদাহরণ। সে জানে সত্য কী, তবু ক্ষমতার ভাষায় নিজের স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দেয়। এই আত্মসমর্পণ কেবল লিজ়ির একার নয়—এটি প্রতিটি সাধারণ মানুষের সেই মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি, যখন সে সত্যকে চিনেও অস্বীকার করে; যখন সে জানে অন্যায় হচ্ছে, তবু মাথা নোয়ায়।

তাই নাটকের সেই কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটির নাম যদি আজ কোনো বাঙালি নাম হত, আর লিজ়ির নাম যদি হত ‘ললিতা’—তাহলেও এই নিপীড়নের চিত্রপট বিন্দুমাত্র বদলাত না। কারণ, ক্ষমতার কাঠামো বদলায় না, শুধু চরিত্রদের নাম বদলে যায়।

‘রাষ্ট্র বনাম গণিকা’—এই নামটিই যেন এক নীরব ইশতেহার। যেখানে রাষ্ট্র আছে, সেখানে সে থাকবে অভিযোগকারীর আসনে। আর গণিকা—সে যে-ই হোক, সে প্রান্তিক, সে অনিবার্যভাবে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। তাই এই মঞ্চায়ন কেবল একটি নাট্যঘটনা নয়; যেন এক দাহ্য মশাল, যা অন্ধকারের মধ্যে উঁচু করে ধরা থাকে আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে— ভুলে যাওয়া মানেই সম্মতি। আর নীরবতা, শেষপর্যন্ত যেন অন্যায়ের সঙ্গেই এক নিঃশব্দ অংশগ্রহণ। ‘গোত্রহীন’ আর্ট অ্যাকাডেমি যে শব্দ শুরু করল, সে-শব্দ বাক্যে পরিণত হোক। এই কলাকুশলীদের কাছ থেকে আগামীতে আরও সৎ, আরও দুঃসাহসী নাট্যপ্রযোজনা দেখার আশা রইল।

তথ্যসূত্র:

১. Carter, Dan T. Scottsboro: A Tragedy of the American South. Louisiana State University Press, 1969.

২. Cohen-Solal, Annie. Sartre: A Life. Translated by Anna Cancogni, Pantheon Books, 1987.

৩. Sartre, Jean-Paul. Being and Nothingness. Translated by Hazel E. Barnes, Philosophical Library, 1956.

৪. Althusser, Louis. On the Reproduction of Capitalism: Ideology and Ideological State Apparatuses. Verso Books, 2014.

৫. Human Rights Watch. Hidden Apartheid: Caste Discrimination against India’s “Untouchables”. 2007. (সমকালীন দলিত নিপীড়নের প্রেক্ষিত বিশ্লেষণে)।

৬. Taylor, Keeanga-Yamahtta. From #BlackLivesMatter to Black Liberation. Haymarket Books, 2016.


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। এখন লেখালেখি আর চরিত্র অভিনয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। “Miles to go before I sleep.”

অন্যান্য লেখা