প্রকাশিত হল শতাব্দী চক্রবর্তীর তিনটি কবিতা- যা কিছু ভাবি, উৎসব চলছে এবং আমরা আদার ব্যাপারী।
যা কিছু ভাবি
পথের কাছে জমা রাখি পথ,
হেঁটে পারাপার হই অজানা গন্তব্যের দিকে
গোলাপ গন্ধ যেন মুক্তাঞ্চল এনে দেয় বিধ্বস্ত দিনে
বিভোর হয়ে একান্নবর্তীর হাঁড়িতে পদগুলি সাজিয়ে দিই কেবল একার জন্য।
তিনভাগ জলের সমস্তটাই হাতের মুঠোয় নিয়ে
ভেবে ভেবে রাষ্ট্রের কাছে রেখে দিই জীবনের শ্রুতি কথামালা যত।
নিষ্ঠুর বিষয়আশয় গেঁথে দিই বর্শার ফলায়
ধুলোবালির মতো মথে দিই চিন্তার ঘাস জমি।
শুকনো পাতার উপর উপুড় করে দিই
সমস্ত সমস্যা ও অপারগতার ঝুলি।
অবশিষ্ট সূর্যের আলোয় ঢুকে যাই গহীন বনাঞ্চলে
আদরের হাওয়া লাগে যখন মধুমাস বেজে ওঠে।
নিষিদ্ধ যা কিছু করতে ইচ্ছা হয় দুর্দমনীয় হাতে,
ঠিক তখনই একঝাঁক কইয়ের মতো মেঘ আসে
আমার ভেতর জ্বালিয়ে দেয় এক দায়িত্ববোধ,
যা কিছু ভাবি তা কেবলই মাতৃগর্ভের অন্ধকার জলের ঘর।
—
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
উৎসব চলছে
আলোর রোশনাই আর সানাইয়ের সুরে
ভরে ওঠে নতুন রঙের বাড়ি উঠোন
সেই উৎসবে জঞ্জালগুলোকে
ঢেকে দেওয়া হয় বাহারি নকশায়
কর্তন করা হয় জীর্ণ ডাল, ঝোপঝাড়, আগাছা
প্রয়োজনে ফুরিয়ে যাওয়া মানুষকেও।
যেখানে জাহির করা হয় সুন্দর মানেই টুকটুকে
গ্রামীণ শ্যামলা মেয়েটি সেখানে সহকারীর পরিচয়ে
দূর সম্পর্কের আত্মীয় হয়ে ওঠে সমক্ষে।
এখানে আলো জ্বলছে! চলছে উৎসব!
জাঁকজমকহীন মেয়ে ‘অড ওয়ান আউট’!
—
আমরা আদার ব্যাপারী
আমরা আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর রাখি না যদিও
তবুও দেবতার নাম ধরে জোয়ার আসে যখন
হুংকার ওঠে তক্তা বানাবে বলে
মন্ত্রণা দেয় কচি মাথাগুলোকে অগ্নি প্রবেশের
নাম দেয় প্রেমিকের ভালোবাসা ‘জিহাদ’ ভ্রামরি
আমরা তাদের ভক্তি করি না ঘৃণা করি।
মন্ত্রোচ্চারণে ধন্য ধন্য করে নাবিককূল
মধু পাবার আশায় তৈলাক্ত পথ নির্মাণ করে যারা
মাদকতায় তলোয়ার উঁচিয়ে হুংকার করে তারা
গর্ভবতী কাপড়ের আড়ে ঢেকে দেয় আলোর পুতুল
অন্ধকার ঘরে ওঁত পাতে যে আমাদের সর্বনাশ!
বান আসে ভেসে যায় উঠোন, তক্তা, ঘুম, খিদে
মহিমান্বিত তার সর্বকালের কর্ম ও তেজ অগ্নি
আমরা চালের ওপর ডাল পেলেই ভুলে যাই
তবুও রক্ত চড়লে কুড়ুল কোদাল হাতে
নামিয়ে দিতে পারি ভাওতাবাজি।
একথা মনে রাখা দরকার দেবতা আমাদের
চিরকাল পূজা পায়, যদিও আমরা আদার ব্যাপারী
তবুও দেবতাকে পণ্য করে যারা
আমরা তাদের ঘৃণা করি, শুধুই ঘৃণা করি।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই, ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
Sukumar Pan Kalipada Pan
1 বছর আগেশব্দ চয়ন ও কবিতা গুলির ভাব,মন স্পর্শ করে। ভালো লাগে আপনার লেখা। শুভকামনা।
ড. বিশ্বজিৎ বাউনা।
1 বছর আগেসময়ের দর্পণ হয়ে উঠেছে এই তিনটি কবিতা। খুব ভালো লাগলো।
bikash mandal
1 মাস আগেআপনার কবিতা ভালো লেগেছে। তিনটি কবিতা: 'যা কিছু ভাবি', 'উৎসব চলছে' এবং 'আমরা আদার ব্যাপারী' [ 'ব্যাপারি' লিখলেই তো ভালো হতো, এটি তৎসম শব্দ নয়]। প্রথম কবিতাটি পড়ে কবিতার কথক 'আমি'-র সঙ্গে পরিচয় গাঢ় করবার কথা ভাবতে ভাবতে দ্বিতীয় কবিতায় প্রবেশ করে দেখি পালাবদল হয়ে গিয়েছে! কিভাবে? দেখুন, প্রথম কবিতায় কথক উত্তমপুরুষে হাজির। সর্বনাম 'আমার'; আর ক্রিয়াপদ 'জমা রাখি' 'পারাপার হই' 'সাজিয়ে দিই' 'রেখে দিই' 'গেঁথে দিই' 'মথে দিই' 'উপুড় করে দিই' এবং 'ঢুকে যাই'। কথকের প্রত্যক্ষ বচন। আর তাতেই আলাপ করবার গরজ বাড়ে। কিন্তু সে গুড়ে বালি! দ্বিতীয় কবিতায় কথক প্রচ্ছন্ন, লুকিয়ে গিয়েছেন। পুরো কবিতাটাই ভাববাচ্য। বৈচিত্র্য এবং চমক। তবে তৃতীয়টিতে কি আরও নতুন কিছু অপেক্ষা করে আছে? হ্যাঁ, তা-ই বটে। সেখানে আবার 'আমি' 'আমরা'-র ভিতরে আকীর্ণ: "আমরা আদার ব্যাপারি" এবং "আমরা তাদের ঘৃণা করি"। 'তাঁদের' নয়, 'তাদের'। অবশ্যই তুচ্ছার্থে; কেননা তারা ঘৃণার পাত্র। এবং 'আমরা' ঘৃণা করি। এভাবে সকলকেই নিজ অনুভবের বৃত্তে টেনে নিলেন শতাব্দী। এই প্রিসিশন মুগ্ধ করেছে।