এই মাস থেকে কেতাব-ই ব্লগজিনে শুরু হল ‘জেলার সাহিত্য’ নামের এক বিশেষ আয়োজন। যার মূল উদ্দেশ্য পাঠককে বিভিন্ন জেলার নতুন ও পুরনো লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন জেলার ভিন্ন স্বরকে একত্রিত করে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক রূপনির্মাণ। আমাদের প্রথম নির্বাচিত জেলাগুলি হল দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, এবং কোচবিহার। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে আমরা প্রকাশ করব এই পাঁচ জেলার সাহিত্য। আজ প্রকাশিত হল জলপাইগুড়ি জেলার গদ্যকার শুভময় সরকার-এর গল্প।
নদী মানে নৌকো, ছই, লণ্ঠনের মৃদু আলো আর অপার রহস্যময়তা! আর এই রহস্যময়তা থেকেই নাগরিক জীবনকে ছুঁয়ে থাকে অনি। এভাবেই ছুঁয়ে থাকতে চায়, একটু দূর থেকে কিন্তু খুব দূরে নয়। নাগরিক জীবনকে পুরোপুরি ছেড়ে যেতে ভয় হয় অনির। অদ্ভুত এক আশ্রয়হীনতা কাজ করে আর সেই আশ্রয়হীনতা থেকেই আশ্রয়সন্ধানের তাগিদে ছুঁয়ে থাকতে চায় নদীপাড়ের নাগরিক জীবন!
চিরকালই নদীমাতৃক অনি। সমুদ্র ওকে টানে না। গভীর হয়েও গভীরতা কম, উচ্ছ্বাস বেশি। অনি জীবনকে ছুঁয়ে থাকে এই মাঝনদী থেকে। সামনে পেছনে নিকষ কালো অন্ধকার! দূরে জীবনের স্রোত। এই অনিশ্চয়তা থেকে যেন ওই আলোর স্রোতে চলমান শহরকে আরও বেশি প্রাণবন্ত লাগে। ছইয়ের নিচে আজ ঢোকে না অনি। কালো জলের স্রোতে চলতে চলতে ওপরের আকাশের দিকে তাকায়। এত বড়ো ক্যানভাসে নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়। দূরের ওই আলোকোজ্জ্বল বাড়িগুলো, চলমান শহর, ঝলমলে পথঘাট সবই বড়ো ক্ষুদ্র মনে হয়!
অনি জানে না এ নৌকো কোথায় যাবে। কোনো মাঝিমাল্লা কিচ্ছু নেই, হাল ধরতে হয় না এ নৌকোয় কিন্তু সব কিছু হয় নিয়মমাফিকই। অনন্ত স্রোতে ভেসে যাওয়া। কোথাও কোনো বিচ্যুতি নেই, নেই ভুল পথে চলা, পথ হারানো। তবু প্রতিমুহূর্তে নৌকোর গতি খুব ধীরে হলেও বাড়তে থাকে। নদী যত এগোয়, স্রোতের গতি তত বাড়ে! সময় কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, প্রতি পলে, অনুপলে। চারপাশে ঘেরা জলাশয়ের কোনো পরিণতি নেই, সে হল স্থির, স্থবির। সমুদ্র উচ্ছ্বাসপ্রবণ হয়েও বাঁধা থাকে তার বিশালত্বে। সীমাহীন এক বিশাল জলাধার। অমৃত, গরল সব উঠে আসে। চলমান কেবল নদী, শুরু থেকেই পরিণতির দিকে যাত্রা।
২
গভীর রাতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় অনি। ঘুমোচ্ছে শহর। গরম কমে হালকা হিমেল হাওয়া। স্রোতের গতি বাড়তেই ঘুম ভেঙে যায়। শরীর বেয়ে ঘাম, জবজব করছে শরীর। অনি জানে এই সময়, এইসব অস্ত্বিত্বহীনতার বিপজ্জনক সময় ঘুম ভেঙে যায়, স্বপ্ন ভেঙে যায়। বাইরের ব্যালকনিতে এসে সিগারেট ধরায়, ধোঁয়ার রিং ছাড়ে, বৃত্ত হয়, বৃত্ত ভাঙে। বৃত্ত ভাঙতে না চাইলেও ভাঙে বাইরের হাওয়ায়। তবু বৃত্ত থেকে বৃত্তান্তরের অনন্ত যাত্রায় অনি থেকে যায়।
ক-দিন ধরেই বিদঘুটে সব স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। আজও তাই। প্রথমে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙা, তারপর স্বপ্নের হ্যাংওভারে খানিক শুয়ে থাকা, সাত-পাঁচ ভাবা এবং উঠে পড়া। এই মাঝরাতের ঘুমন্ত শহরকে ছুঁয়ে থাকে অনি, চিরকালের ভীরু, মধ্যবিত্ত অনির্বাণ বসু। হ্যাঁ, অনি, অর্থাৎ অনির্বাণ বসু এ গল্পের মুখ্য চরিত্র, যার জীবনের একমাত্র অভ্যাস দুশ্চিন্তা, আরেকটু নিখুঁতভাবে বললে ওভার থিংকিং, অতিরিক্ত ভাবা আর এই ভাবতে ভাবতেই জীবনের আটত্রিশটা বছর পেরিয়ে গেল। তবে এ নিয়ে দিব্য রয়ে যায়, আক্ষেপ নেই কোনো। ওর এই অতিরিক্ত ভাবনা, দুশ্চিন্তা যা-ই বলি-না-কেন, এসব ছাড়া থাকতে পারে না অনি। এই দুশ্চিন্তার মধ্যে প্রাত্যহিকতা কম, বিস্তৃত পরিসরের বিস্তর কিছু ওর মাথায় খেলা করে নিয়ত। গতরাতের ভাবনাগুলোর পর বেশ কিছুটা সময় ব্যালকনিতে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ঘুমন্ত শহরকে দেখতে দেখতে শেষরাতে বিছানায় ফিরে গিয়েছিল, খানিক এপাশ-ওপাশ করে ঘুমিয়েও পড়েছিল। আজ একটু দেরি করে ওঠা। আজ ছুটি। কিছু একটা পরব-টরবের সরকারি ছুটি।
বিছানায় শুয়ে জানালার দিকে তাকায়। পর্দার সামান্য ফাঁক দিয়ে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে। রাতের হালকা হিমেল হাওয়া শেষরাতে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। রোগী-ভোগী-যোগী শেষরাতে সবাই ঘুমোয়। এখন বাইরে ফের গত ক-দিনের গরম, ঘুম ভেঙে যখন শুতে এসেছিল, এসিটা বন্ধ করে শুয়েছিল। ঘরে হালকা ফ্যান, ঘর এখনও ঠান্ডা, আর সেই হালকা ঠান্ডা ঘরের আয়েসি বিছানা থেকে বাইরেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে আজ দাবদাহ ফের। ঘরের ভেতর আর বাইরে দুটো আলাদা জগৎ। এ জগতে অনি একা, ব্যক্তিগত। এই ঘর অনির এক নিজস্ব জগৎ। এখানে কেউ প্রশ্ন করার নেই। কেউ জানতে চায় না অনি কেন সংসারে জড়ায়নি। কাউকে কৈফিয়ত দিতে হয় না কেন কোনো পিছুটান রাখতে চায় না। জবাবদিহি নেই কোনো। বাইরেটা ভিন্ন এক জগৎ, প্রতিনিয়ত এক ইন্টারভিউ বোর্ডের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। দূর থেকে বাইরের পৃথিবীটাকে দেখতে ভালো লাগে, নদীর স্রোতে নৌকোয় বসে যেভাবে কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছিল জনবহুল শহরকে।
বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না ছুটির দিনে। দেরি করে সব কিছু তবে বাইরের চড়া রোদটা আসন্ন বৈশাখ নিয়ে রীতিমতো সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ভয়াবহ গরম পড়বে এবার। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে অনি। স্লাইডিং জানালাটা খুলে সিগারেট ধরায়। রাতের ঘুমন্ত শহর ফের জেগে উঠছে, তবে কিঞ্চিৎ ঢিমেতালে। আজ ছুটির মেজাজ। আবারও সিগারেটের ধোঁয়া দিয়ে রিং ছাড়ে অনি আর গতরাতের রিং ছাড়ার সঙ্গে পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ঘুমন্ত শহরের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়ার রিংগুলো কিছুটা গিয়ে বৃত্ত ভেঙে মিশে গিয়েছিল রহস্যময় শহরের হাওয়ায় হাওয়ায়। রাতের শহর ছিল ঘুমন্ত, রহস্যময়। রোদেলা শহরটার দিকে তাকায় অনি, আজ অন্যরকম লাগে অন্যদিনের থেকে, ঘুমন্ত শহর জেগে উঠছে, বেলা যত বাড়বে, শহর ততো বারোয়ারি হবে। রাতের স্নিগ্ধ হাওয়ায় ধোঁয়ার বৃত্ত ভেঙে বৃত্তান্তরে যাওয়ার মধ্যে কোথাও এক রহস্যময়তা ছিল, আজ এই ঝলমলে পৃথিবীতে তেমন কোনো রহস্যময়তা খুঁজে পায় না অনি। খানিক দূরের ফ্ল্যাটবাড়িটার ব্যালকনিতে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে, দুর্বল হাতদুটো দিয়ে ব্যালকনির রেলিংটা শক্ত করে ধরে। অসহায় নির্ভরতা। বৃদ্ধ মানুষটা যেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক তার ওপরের তলায় একই জায়গায় ব্যালকনিতে অল্পবয়েসি একটি মেয়ে, বউও হতে পারে। দূর থেকে নিশ্চিত হতে পারে না অনি। একই পাড়ার বাসিন্দা। চলাচলের পথে হয়তো মুখোমুখিও হয়েছে কিন্তু আজ জানালায় দাঁড়িয়ে যেভাবে দেখছে, সেভাবে আগে দেখেনি কখনও, যেভাবে লক্ষ করে দেখেনি প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া কত কিছু আমাদের প্রাত্যহিকতায়। বারোয়ারি সকালের হাওয়ায় হাওয়ায় কুন্ডুলী পাকানো সিগারেটের ধোঁয়ার মতোই ভাবনাগুলোও ডালপালা মেলে, কুন্ডলী পাকায়, তারপর মিলিয়ে যায় দূরে দূরে। মাথার ভেতরে ভাবনাগুলো সব ঘুরপাক খেতে থাকে। রাতের স্বপ্নের সেই নদীটার কথা মনে পরে। নৌকোর ওপর থেকে নাগরিক জীবনকে দেখাটা কেমন পালটে যায় এ মানুষ থেকে সে মানুষে। যেভাবে ব্যালকনি থেকে বৃদ্ধ মানুষটি নিচের ব্যস্ত প্রাত্যহিক জীবনকে দেখছে, ওপরের ব্যালকনি থেকে মেয়েটি কি একইভাবে দেখছে…! ভাবতে থাকে অনি কিংবা ও নিজেই বা দেখছে কীভাবে…! মাথার ভেতর সব ঘোঁট পাকাতে থাকে, নদীর স্রোতে দাঁড়িয়ে আছে সবাই—বৃদ্ধ, মেয়েটি, অনি নিজেও। সময়টা কেবল আলাদা আলাদা। যে যার সময়ে দাঁড়িয়ে। নৌকো চলছে সেই স্রোতে, নিজস্ব গতিতে। দূরের, অদূরের পৃথিবীটা ব্যস্ত, কোলাহলমুখর। অনি বুঝতে পারে না প্রাণের স্পন্দন কোথায়…! ওই ব্যস্ত পৃথিবীতে, না কি ওর নিজস্ব ব্যক্তিগত এই নির্জন পরিসরে।
ঘরের নির্জনতাকে ভেঙে টেবিলে রাখা মোবাইলটা বেজে ওঠে। চিন্তায় ছেদ পড়ে, চেতনাপ্রবাহে অনুপ্রবেশ ঘটে। বিরক্ত হয় না অনি, এই অনুপ্রবেশ ওকে সম্পূর্ণ একা হতে দেয় না। শেষ ট্রাম জীবনের সব কোলাহলকে পিছনে ফেলে নির্জন ডিপোতে ফিরে যাওয়ার আগে তো জেনে যায় সকালের ট্রিপ।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৩
বেশ ক-দিন পর আজ পলাশদার সঙ্গে আপনজন ক্যাফেতে বসা। এখানে ঢুকলেই সেই চিরকালীন ভালোবাসার বাঘ-ভালুক সব বেরিয়ে পড়ে। চেনা মুখ, অচেনা মানুষ সব মিলিয়েই এই আপনজন ক্যাফে। আগে নাম ছিল ‘আপনজন কেবিন’, মালিক ছিলেন পরিমলদা। প্রয়াত হয়েছেন বেশ কয়েকবছর আগে। দোকান বড়ো হয়েছে আয়তনে, বেড়েছে পরিসর। ছেলে সময়ের সঙ্গে মিলিয়েছে নিজের ভাবনা, কেবিন থেকে ক্যাফে হয়েছে, পালটেছে টেবিল-চেয়ার, মেঝেতে টাইলস, দেওয়ালের ঠাকুর-দেবতা সরেছে, এসেছে সত্যজিৎ-রবীন্দ্রনাথ-ডিলান-জন বায়েজ…! সম্ভবত কারও পরামর্শেই ছবিগুলো, পরিমলদার ছেলের নিজস্ব বুদ্ধি নয়। তবে ছেলেটি ভালো, পুরোনো দিন ভোলেনি, পরিমলদার পরম্পরা মেনেই পুরোনো যারা আসে নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত, তাদের জন্য অন্যরকম ট্রিটমেন্ট। উঠে যাবার জন্য তাড়ার ব্যাপার নেই। বেশ আন্তরিক ছেলে, পরিমলদার মতোই।
সকালেই ফোনটা পাবার পর ছুটির দিনের যাবতীয় আলসেমি ঝেড়ে সময়মতো রেডি হয়ে অনি পৌঁছে গিয়েছিল আপনজন ক্যাফেতে। পলাশদার ডাক। ওর সঙ্গে আড্ডা চিরকাল প্রিয়, নতুন করে যেন সব ফিরে পায়। পলাশদা সম্ভবত সেই হাতেগোনাদের মধ্যে পড়ে যারা অনিকে বোঝে। অনির আগেই পৌঁছে গিয়েছে পলাশ, চা নিয়ে বসে, অনিকে দেখেই বলে ওঠে—টোস্ট-ওমলেট অর্ডার করিনি এখনও, তোমার অপেক্ষায় ছিলাম একসঙ্গে খাব, তাই চা নিয়ে সময় কাটাচ্ছি।
মুচকি হাসে অনি। অনেকদিন পর আজ একটু অন্যরকম। সকাল থেকেই অন্যরকম। আপনজন ক্যাফেতে পলাশদার মুখোমুখি বসে আজ যেন ঘর আর বাইরের জগতের মধ্যে একটা যোগসূত্র নতুন করে খুঁজে পায়। ক্যাফেতে যারা বসে আছে, পরিচিত মুখ নেই তেমন আজ। কেবল এক-দু-জনের মুখ চেনা চেনা।
—কেমন আছ অনির্বাণ…!
চায়ের কাপটা টেবিলে রেখেই প্রশ্নটা করে পলাশদা। এমনিতে অনি বলেই ডাকে পলাশ, মাঝে মাঝে অনির্বাণ।
মাথা নাড়ে অনি,
—দিব্য আছি গো, শুধু ভাবনাগুলো কেমন সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
—কী এত ভাবো অনির্বাণ…! ভাবার এত কিছু নেই। সব কিছু যেমন চলার চলবে, যেমন হবার হবে অনি, তুমি ভেবে কী করবে…!
—আমি আমার ভাবনাকে, দেখাকে মেলাতে পারি না সবার সঙ্গে। কারও সঙ্গে আমার ভাবনা মেলে না পলাশদা, তাহলে কি আমি ভুল…
ওমলেটের সঙ্গে একটুকরো টোস্ট মুখে চালান করে চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে পলাশ,
—হ্যান্ড টু মাউথ অনি, এর বাইরে সব অকিঞ্চিৎকর…! ওহ হ্যাঁ, যৌনতা একটা জরুরি বিষয়, অনিবার্যও বলতে পারো…!
কথাগুলো বলে মুচকি হাসে পলাশ। এ শহরে সন্ধে নামছে। আলো জ্বলে উঠছে শহর জুড়ে। দু-জনে অনেকদিন পর মুখোমুখি। কথা হয়, গল্প হয়, পুরোনো প্রসঙ্গ আসে তারপর একটা সময় উঠে পড়ে দু-জনে। সন্ধে নেমেছে। হালকা হাওয়া শহরজুড়ে। কিছুটা পথ একসঙ্গে হাঁটে ওরা। এবার মেট্রো স্টেশনের মুখে এসে দাঁড়ায়। পলাশ আর অনি পাশাপাশি, ফুটপাথে একটা সিগারেটের দোকানে। সিগারেট ধরায় দু-জনে। আর খানিক পর দু-জনের আলাদা আলাদা গন্তব্য। মহানগরীর ছুটন্ত জীবনের দিকে তাকায় স্থির ফুটপাথ থেকে, গতরাতে দেখা সেই স্বপ্নের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে। চলন্ত নদীস্রোত থেকে নাগরিক জীবনকে ছুঁয়ে থাকতে চেয়েছিল অনি। সকালে ঠান্ডা ঘরের জানালা দিয়ে শহরকে, মানুষকে বুঝতে চেয়েছিল। মহানগরীর চিরচেনা এই ব্যস্ত জীবনকে আজ নতুন করে আবিষ্কার করে অনি, এভাবে কেন তাকায়নি এতকাল…!
—কী ভাবছ অনি?
—কত কত মানুষ পলাশদা, সবাই সবার থেকে আলাদা, সবার জীবন, ক্রাইসিস, আনন্দ আলাদা আলাদা…!
—সেজন্যই তো জীবন এত সুন্দর, এত ইন্টারেস্টিং…! নিজেকে মিশিয়ে দিতে হয় নিজের মধ্যে থেকেও, নইলে জীবনকে জানা যায় না অনি…
—কিন্তু প্রাত্যহিক জীবন যে বড়ো লাউড পলাশদা, আমার বিরক্ত লাগে যে…
এবার একটু হাসে পলাশ,
—অতিমারির দিনগুলো মনে আছে অনি? সেই অসহ্য স্তব্ধতা মনে পড়ে?
—আমি পাখির আওয়াজ শুনতাম, অন্য সময় তো শব্দ শোনাই যায় না, ওই সময় মন দিয়ে শুনতাম।
—তা ঠিক কিন্তু মানুষের কন্ঠ, হকারের চিৎকার, বাজারের দরাদরি, বাস-কন্ডাক্টরের হাঁকডাক এসব যে হারিয়ে গিয়েছিল…! সব নিয়েই তো জীবন। মন দিয়ে শোনো, ভালো লাগবে সে-সবও।
উত্তর দেয় না অনি, চুপ করে থাকে, সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে।
—অনি, তুমি কাশীপুর, বরানগর গণহত্যার ঘটনা জানো?
—শুনেছি কিছুটা, ভাসা ভাসা জানি।
—যে মানুষগুলোর জন্য লড়াই করেছিল ছেলেগুলো, সেই মানুষগুলো কিন্তু জানলার ফাঁক দিয়ে সেই গণহত্যা দেখেছিল দিন-দুপুরে, তারপর জানালা বন্ধ করে দিয়েছিল।
অবাক হয়ে তাকায় অনি।
—আমি চলি অনি, তোমার তো উলটোদিকের মেট্রো…! সিগারেটের শেষ টুকরোটা ফেলে মেট্রো-গহ্বরে নেমে যায় পলাশ।
কাশীপুর—বরানগর—গণহত্যা…! কী সব বলে গেল পলাশদা। সব ভাবনাগুলো ফের কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
মেট্রো থেকে নেমে আজ আর অটোর জন্য লাইনে দাঁড়ায় না অনি। মাত্র দুটো স্টপেজ। হাঁটতে থাকে আর অনেকদিন পর হাঁটতে হাঁটতে এই মহানগরীর সঙ্গে, জনজীবনের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেয়। শহরজুড়ে হাওয়া বইছে, নদীটা হাওয়া ছাড়ে এই সময়। বুক ভরে নিশ্বাস নেয় অনি, অনির্বাণ বসু।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।