preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স: পর্ব ৪
ধারাবাহিক

মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স: পর্ব ৪

চৈতন্যকে একক সাধক নয়, বরং বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক নির্মাণ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই এই লেখার মূল সুর। নিমাই থেকে মহাপ্রভু হয়ে ওঠার পথে লোকায়ত আবেগ, শাস্ত্রীয় বিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিকতা ও বিশ্বায়নের স্তরগুলি বিশ্লেষণ করে ‘মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স’-এর চতুর্থ পর্বে লেখক খুঁজেছেন মাটির মানুষের সেই চৈতন্যকে, যিনি এখনও সমবেত কণ্ঠে ও শরীরী অনুভবে বেঁচে আছেন, ইতিহাসের আড়াল ভেঙে।

এর আগের দুটি পর্বে চৈতন্যকে নিয়ে যে আলোচনা করেছি, এই পর্বে আপাতত সেই ভাবনারই সমাপ্তি টানছি বলতে পারেন। চৈতন্য-পর্বের আপাতত উপসংহারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। আর এই শেষ পর্বে আমি বোঝাতে চাইছি, চৈতন্যকে নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড়ো ভুল কোথায়। এই প্রসঙ্গে আমার মনে হয়, চৈতন্যকে নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড়ো ভুল হল—আমরা তাঁকে একটিমাত্র মানুষ হিসেবে ভাবি, একক সত্তা হিসেবে দেখি। আমরা ভাবি, নবদ্বীপের নিমাই একবার জন্মালেন; একবার কীর্তন করতে রাস্তায় নামলেন; একবার সন্ন্যাস নিলেন; একবার শেষে পুরীতে গিয়ে মিলিয়ে গেলেন; তারপর ইতিহাস তাঁকে আলো-আঁধারির এক মিথে পরিণত করল। কিন্তু ইতিহাস এত নিরীহ নয়। ইতিহাস শুধু মনে রাখে না; ইতিহাস বেছে নেয়, কেটে-ছেঁটে নেয়, প্রয়োজনমতো নতুন মুখ পরায়। কিন্তু আমাদের কাজ কী? আমাদের কাজ অনেকটা সেই রাজহাঁসের মতো—দুধ আর জল মেশানো থাকলে সে নাকি দুধটুকুই টেনে নেয়। ইতিহাসের কাজও বহু সময় তেমনই: গল্পের ঘনঘটা, মিথের আবরণ সরিয়ে ইতিহাসের নির্যাসকে বার করে নেওয়া, যদিও ভাবনাগুলো অনেকের কাছেই আপেক্ষিক বলে মনে হতে পারে। তবে ইতিহাসের কাজ আসলে নির্বাচন, বর্জন ও পুনর্নির্মাণ। তাই আমার চৈতন্যচর্চার উদ্দেশ্য—আবেগ আর পবিত্রতার মায়া ছেড়ে এক মুক্ত, বিশ্লেষণধর্মী চৈতন্যের দিকে যাত্রাপথের গান।

সেই কারণেই প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক: আমরা যে চৈতন্যকে দেখি বা চৈতন্যকে নিয়ে ভাবি, সেটা কোন চৈতন্য? চৈতন্যের পরের চৈতন্য কী করে নির্মিত হল? এবং প্রশ্ন জাগে, এতগুলো চৈতন্য কোথা থেকে এল? আর যদি এসে থাকে, তাহলে কোন চৈতন্যকে আমরা গ্রহণ করব, এবং কেন করব? পনেরো-ষোলো শতকের এক ভক্তিসাধককে ঘিরে আমরা দেখতে পাই বহুস্তরীয় নির্মাণ—শাস্ত্রের চৈতন্য, ভদ্রলোকের চৈতন্য, নবদ্বীপের চৈতন্য, মায়াপুরের চৈতন্য, মঠের চৈতন্য, বিশ্বমঞ্চের চৈতন্য। ফলে আমরা এক চৈতন্যের কথা ভাবতে গিয়ে অসংখ্য চৈতন্যের মুখোমুখি হই। একথা সকলেই মেনে নেন, চৈতন্য বঙ্গীয় বৈষ্ণব ধারার ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিলেন। কিন্তু তাঁর পরবর্তী রূপগুলি কি একাধিক স্তরে, একাধিক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে, বারবার নির্মাণ করা হয়েছে?

প্রথমেই এই বিষয়ে আলোচনা কালে একটা কথা পরিষ্কার করে বলে দেওয়া দরকার। ঐতিহাসিক চৈতন্য আর পরবর্তী কালের নির্মিত চৈতন্য কিন্তু এক জিনিস নয়। Britannica-র তথ্য অনুযায়ী, চৈতন্যের আন্দোলনের সুসংহত তাত্ত্বিক ভিত গড়ে ওঠে তাঁর শিষ্যদের হাত ধরে, বিশেষত বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের মাধ্যমে; তাঁরাই সংস্কৃত ভাষায় বিস্তৃত ভক্তিধর্মী ও তাত্ত্বিক সাহিত্য রচনা করে আন্দোলনের মত, আচার ও রীতিকে গুছিয়ে দেন। অর্থাৎ, যাঁকে আমরা আজ ‘মহাপ্রভু’ বলে চিনি, তাঁর বড়ো অংশই তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের নির্মাণ। এখানেই প্রথম পুনর্নির্মাণ। রাস্তার কীর্তন, শরীরের বহিঃপ্রকাশ, চোখের জলের আবেগ, সমবেত নামসংকীর্তন—এইসব থেকে একদিন তাঁকে তত্ত্ব, আচরণ, মতবাদ এবং শাস্ত্রের কেন্দ্রে বসানো হল। যে মানুষ প্রথমে ছিলেন দেহী, স্পন্দিত, অসংযত, তাঁকেই পরে করা হল ব্যাখ্যাত, সংহত, নিয়ন্ত্রিত। ইতিহাসের এই কৌশল নতুন নয়: জীবন্ত মানুষকে যদি টেক্সটে রূপান্তরিত করা না যায়, তাহলে রাষ্ট্রের অসুবিধে। কিন্তু কোনো প্রগতিশীল মানুষকে বা ঐতিহাসিক মানুষকে যদি কিংবদন্তিতে বা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, তবে তাকে আর তত সহজে ভয় পেতে হবে না। সেই পদ্ধতিতে আমরা বারবার দেখেছি, চৈতন্য থেকে রামকৃষ্ণ বা বিবেকানন্দ—কেউই এই মানুষের নির্মিত প্রাতিষ্ঠানিকতার হাত থেকে মুক্তি পাননি। এই যুক্তিতে মার্ক্স থেকে রবীন্দ্রনাথ কেউই বাদ যান না।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, তথ্য তো আর নিজে নিজে কথা বলতে পারে না। ঐতিহাসিকরা যখন যেমন তথ্য তুলে আনেন, তখন তার ব্যাখ্যাও করেন। এই ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েই ইতিহাসের কথা বলা শুরু। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়—তথ্যের আগে ঐতিহাসিককে, যে বিষয়ে কথা বলতে চান, সেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক বেশি জানতে হয়, পড়তে হয়, শিখতে হয়। আসলে ইতিহাস একটা পদ্ধতি, ঠিক যেভাবে আমরা যোগ, গুণ, ভাগ করি। আমাদের সবচেয়ে দুর্ভাগ্য, নিচের স্তরে বা আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাসচর্চা প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে নয় প্রশংসা, নয় অতিরঞ্জিত কথন; আল্টিমেটলি সেটা আর ইতিহাসচর্চা থাকে না, হয়ে যায় বাংলা রচনা। সুতরাং চৈতন্যচর্চাও এই বিরল ব্যাধি থেকে মুক্ত নয়। সেই কারণেই আমরা প্রায়শই ভাবি, ‘চৈতন্য’ যেন একটি প্রস্তুত সত্তা, সম্পূর্ণ, নির্দোষ—যাকে শুধু আবিষ্কার করলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তা নয়। চৈতন্য সম্পর্কে যা কিছু আমরা জানি, তার ভিতরেই ঝাড়াইবাছাই দরকার, যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যার প্রয়োজন। কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা অগ্রাধিকার পাবে, সেটা আমাদের ভাবতে হবে; এবং সেটা উদ্দেশ্যের কাজে লাগছে কি না, সেটাও আমাদের খুঁটিয়ে দেখতে হবে।

সেই কারণে এত সহজে চৈতন্যকে কোনো স্ট্রাকচারে বেঁধে ফেলা যায় না, এমনকি সহজসরলভাবে ফ্রেমিং করা ও যায় না। কিন্তু কেন চৈতন্যকে কোনো নির্দিষ্ট স্ট্রাকচারে ফ্রেম করা যায় না? এর উত্তর—চৈতন্যের সবচেয়ে বড়ো শক্তি ছিল বইয়ের ভিতরে নয়; বরং সেই শক্তি ছিল মাটির উপর দাঁড়িয়ে, ভাঙা পথের রাঙা ধুলায় পড়ে থাকা মানুষের পায়ের চিহ্নে। তিনি টোলের ভাষাকে উঠোনের ভাষায় নামিয়ে এনেছিলেন। তিনি দর্শনের ভাষাকে বাতিল করেননি; বরং দর্শনকে তিনি অন্তঃসারশূন্য মানুষের হৃদয়ের ভেতর কান্না-হাসির দোল দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালায় প্রবেশ করিয়েছিলেন। চৈতন্য খোল, করতাল, মৃদঙ্গ, কণ্ঠ, কান্না, নাচ—এইসবের ভিতর দিয়ে এমন এক সর্বজনীন আধ্যাত্মিক ভুবন তৈরি করেছিলেন, যার কেন্দ্রে ছিল না কোনো নিভৃত সাধনা; বরং ছিল সমবেত উচ্চারণ বা কোরাস। এই প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলব, চৈতন্যকে নিয়ে যে সমস্ত নির্ভরযোগ্য সংক্ষিপ্তসার আছে, সেই সমস্তকেই ঘিরে অন্তর্তদন্ত দরকার। আমরা যেন ভুলে না যাই, চৈতন্যকে এমন এক সাধক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে তাঁর ভক্তিচর্চার প্রধান লক্ষণ ছিল উচ্ছ্বাসভরা গান, নাচ এবং সমবেত ভক্তি। এখানেই আমার কাছে ‘মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স’ কথাটা জরুরি। কারণ এই মেটাফিজিক্স আকাশের নয়, শরীরের; এটি তত্ত্বের নয়, অংশগ্রহণের; এটি কোনো অলৌকিকের ভাষায় কথা বলে না, বরং সাধারণ মানুষের সামান্য জীবনের ভিতর হঠাৎ অসামান্য হয়ে ওঠার অনুভবকে সামনে আনে। তাই মাটির মানুষের দরকার সেই চৈতন্য, যিনি ধর্মকে দূরের পরমার্থ করেননি; বরং খালি পায়ের ভিড়ের ভিতর ঈশ্বরের স্পন্দনকে খুঁজে এনে মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন: কারা, কখন, কীভাবে পরবর্তীকালে চৈতন্যকে নিজেদের মতন করে গড়ে তুলল? এই প্রশ্নের সবচেয়ে বড়ো উত্তর ঔপনিবেশিক বাংলার ভদ্রলোক সমাজ। অনেক গবেষক মনে করেন, উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিশ শতকের গোড়ায় চৈতন্যকে নতুন করে ‘উদ্ধার’ করার এক প্রবল তাগিদ বেশ কিছু মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। সেখানে চৈতন্য আর শুধুই একজন সাধক নন; তিনি এক ‘cultural mediator’—অর্থাৎ শাস্ত্রবিদ্যা ও লোকায়ততা, ভদ্রতা ও আবেগ, সাহিত্যিক অতীত ও আধুনিক আত্মপরিচয়ের মধ্যে এক মধ্যবর্তী সেতু। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির দরকার ছিল এমনই এক প্রগতিশীল অতীত, যা একইসঙ্গে দেশীয়, উচ্চমার্গীয়, আবেগময় এবং গৌরবমণ্ডিত। চৈতন্য সেই প্রয়োজন মিটিয়েছিলেন। তাই আমি বলব, ভদ্রলোক সমাজ চৈতন্যকে আবিষ্কার করেনি; বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক অভাব পূরণ করতে তাঁকে নতুনভাবে সম্পাদনা করেছিল।

এই সম্পাদনার সবচেয়ে নাটকীয় রূপ মায়াপুরে। অক্সফোর্ডের গবেষণা বলছে, ১৮৮৮ সালে কেদারনাথ দত্ত, অর্থাৎ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, যেভাবে চৈতন্যের জন্মস্থান হিসেবে মায়াপুরকে চিহ্নিত করলেন, তা কেবল ভক্তিভাবের ফল ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ঔপনিবেশিক যুগের empiricism, sacred geography এবং মধ্যবিত্ত উপনিবেশিত সত্তার অস্থিরতা। এখানে চৈতন্যকে শুধু শ্রদ্ধা করা হচ্ছে না; তাঁকে মানচিত্রে বসানো হচ্ছে। বিশ্বাসকে ভূগোলে, স্মৃতিকে প্রমাণে, মিথকে স্থানে রূপান্তর করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বলব, অতীত বহু সময় বর্তমানকে বৈধতা দেয়। অর্থাৎ, বর্তমানের কাছে যদি নিজস্ব জ্যোতি বা আলো কম থাকে, তবে সে অতীতের আলো থেকে ধার করে। চৈতন্যকে নিয়ে মায়াপুর-পর্ব নির্মাণের ভিতরে সেই কথাই প্রযোজ্য—ভক্তির জন্য প্রয়োজন দৃশ্যমান কেন্দ্র, আর আধুনিকতার জন্য প্রমাণযোগ্য অতীত। আর এই দিক দিয়ে চৈতন্য এবং মায়াপুর একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল।

তারপর আসে প্রতিষ্ঠান। চৈতন্যকে যদি স্থায়ী করতে হয়, তাকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে; চৈতন্যকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে হবে সংগঠন। আসলে চৈতন্যকে বেঁধে ফেলতে হবে—এই আধুনিক বুদ্ধি থেকেই গৌড়ীয় মঠের উত্থান। Oxford Bibliographies-এর তথ্য অনুযায়ী, ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গৌড়ীয় মিশন (১৯১৯) এবং গৌড়ীয় মঠ (১৯২০)-এর মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন; আর এই পর্বে এসে চৈতন্য-উদ্ভূত ভক্তিধারার মুদ্রণ, প্রচার, নেটওয়ার্ক, নগরকেন্দ্রিক প্রসার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ভিতর চৈতন্যের এক নতুন মূর্তি আমরা দেখতে পাই। এই পর্যায়ে চৈতন্য আর শুধু রাস্তার সমবেত উচ্ছ্বাস নন; তিনি মঠের দেয়ালে টাঙানো নীতিতে পরিণত হলেন। এবার থেকে চৈতন্যকে পাওয়া গেল পত্রিকার সম্পাদকীয়তে, বিভিন্ন সভার ভাষণে, নতুন নতুন ব্যাখ্যায়, নতুন নতুন কিংবদন্তিতে; এমনকি সংস্থার শৃঙ্খলাতেও চৈতন্য বন্দি হলেন। এখানে অবশ্য তাঁর শক্তি কমেনি, কিন্তু তাঁর স্বরূপ বদলেছে। তিনি লোকায়ত থেকে সংগঠিত, শরীরী থেকে প্রাতিষ্ঠানিক, ভিড়ের ভিতর থেকে নেতৃত্বের ভিতরে সরে গেছেন।

এই প্রতিষ্ঠানেরও পরে এসেছে বিশ্বায়নের যুগ, আর সেখানেই তৈরি হয়েছে আর-এক চৈতন্য। ISKCON-এর সরকারি সাইট জানাচ্ছে, স্বামী প্রভুপাদ ১৯৬৬ সালে নিউ ইয়র্কে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন; আজ যার শত শত বড়ো বড়ো কেন্দ্র, মন্দির, গ্রামীণ সম্প্রদায়, হাজার হাজার নাম এবং বিশ্বজুড়ে বিপুল ভক্তসমাজ। ফলে চৈতন্য আর শুধু নদিয়ার, বা শুধু বাংলার, বা শুধু ভারতের নন; তিনি এক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় প্রতীক। এই রূপান্তরকে ছোটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এটাও সত্য, বিশ্বমঞ্চের জন্য দরকার হয় এমন এক চৈতন্য, যিনি অনুবাদযোগ্য, বহনযোগ্য, সংগঠিত, পুনরাবৃত্তিযোগ্য এবং সহজে প্রতীকে পরিণত হওয়ার মতো। ফলে নবদ্বীপের ধুলো মুছে সেখানে চৈতন্য আমাদের কাছে বৈশ্বিক আইকন হিসেবে রূপান্তরিত হন। এই চৈতন্যে ব্যাপ্তি আছে, বিস্তার আছে, কিন্তু মাটির ঘ্রাণ বা পথের ধুলো নেই। রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ উচ্চারণ মনে পড়ে—“সে মন্দিরে দেব নাই।”

তবু এত আলোচনা শেষে একটা প্রশ্ন আমাদের কাছে থেকেই যায়: আমরা তাহলে কোন চৈতন্যকে গ্রহণ করব? বা সাধারণ মানুষের দরকার কোন চৈতন্যকে? সেই চৈতন্য, যিনি কান্নাকে দুর্বলতা নয়, ভক্তির ভাষা করেছিলেন? সেই চৈতন্য, যিনি সমবেত কণ্ঠকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন? আমাদের দরকার কি সেই চৈতন্য, যিনি গ্রামীণ নামকীর্তন, উঠোনের দোল, গৃহস্থের সন্ধ্যার আসর, নারীদের স্মরণ, ভক্তের শরীরী উন্মাদনা—এসবের ভিতর বেঁচে আছেন? না কি সেই চৈতন্য, যিনি প্রতিষ্ঠানের কাছে নিরাপদ, ব্যবহারের জন্য সুবিধাজনক, প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত? ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এই দুই চৈতন্যের টানাপোড়েন এখনও শেষ হয়নি। একদিকে লোকায়ত নিমাই, অন্যদিকে সম্পাদিত মহাপ্রভু। একদিকে ভিড়ের শরীর, অন্যদিকে কর্তৃত্বের ভাষ্য। আর এই দ্বন্দ্ব না বুঝলে চৈতন্যকে বোঝা যায় না।

এই কারণেই ‘নিমাই থেকে মহাপ্রভু’ শুধু একটি নাম নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতি আমাদের শেখায়, কোনো সাধককে বা যে-কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর জীবনী জানাই যথেষ্ট নয়; আমাদের দেখতে হবে, তাঁর পরে কে তাঁকে কখন, কীভাবে, কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। কে তাঁকে শাস্ত্রে পরিণত করল, কে তাঁকে মানচিত্রে বসাল, কে তাঁকে প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করল, কে তাঁকে আন্তর্জাতিক প্রতীকে রূপ দিল। প্রকৃত প্রস্তাবে ইতিহাস কোনো বংশগত স্মৃতি নয়, কোনো সম্মিলিত পরম্পরাও নয়; ইতিহাস তৈরি হয় তার শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ, ব্যাখ্যা ও পুনরাবৃত্তিতে, এবং ক্ষমতার ওঠা-নামায়। তাই আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি সেই চৈতন্য, যিনি মতবাদের আগে মানুষের শরীর, প্রতিষ্ঠানের আগে সমবেত কণ্ঠস্বর, আর প্রমাণের আগে অনুভবকে জায়গা দিয়েছিলেন। মানুষ যখন নিজের ছোট্ট জগতে, ক্লান্ত, অনিশ্চিত জীবনের ভিতরেও অসীমের স্পর্শ খুঁজে পায়, তখনই তার চৈতন্য সত্যি হয়ে ওঠে। বাকিটা ইতিহাসের কাজ, প্রতিষ্ঠানের কাজ, যুগের কাজ। কিন্তু মাটির মানুষের চৈতন্য এখনও ভিড়ের ভেতরেই নিশ্বাস নেন। নিমাই থেকে মহাপ্রভু আসলে শুধু এক সাধকের ইতিহাস নয়; এটি এক নির্মাণেরও ইতিহাস বটে। মানুষ থেকে প্রতীকে রূপান্তরিত করে তাকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, সবশেষে বিশ্ব চিহ্নে চিহ্নিত করা—সেই প্রশ্ন না করলে চৈতন্য ‘কে?’ বোঝা যাবে না। আর সেই কারণেই সমস্ত সম্পাদিত মহিমার পরেও ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কাজ আজ একটাই—মহাপ্রভুর ভেতর থেকে নিমাইকে উদ্ধার করা। তার ভেতরেই আমাদের আদর্শ, তরুণ প্রতিরোধের প্রতিস্পর্ধী ঘোষণা। আজকের ভাষায় আজকের কণ্ঠস্বরে দৃপ্ত উচ্চারণে রূপম ইসলামের গানের কথায় ইতি টানছি—

যদি নিমেষে হারালে জীবনে পরিপাটি,
তবু হেরে যেতে দেব না।
যদি বেচে দিতে বলে শিকড়ে বাঁধা মাটি,
জেনো, আমি বেচতে দেব না।

এই কথাগুলির মধ্যেই লুকিয়ে থাক মহাপ্রভু থেকে নিমাইকে ফিরে পাওয়ার চরম আকুতি। এখানেই আমাদের মাটির মানুষের মেটাফিজিক্সের শঙ্কা সংকট ও প্রত্যয়।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অয়ন মুখোপাধ্যায় একজন কবি, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। পেশাগতভাবে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।

অন্যান্য লেখা