preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স: পর্ব ৮
ধারাবাহিক

মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স: পর্ব ৮

সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’-এর বিশ্বম্ভর রায় শুধু এক পতনশীল জমিদার নন, তিনি মহাকাল, অহংকার ও নিয়তির অনিবার্য সংঘর্ষের প্রতীক। ঝাড়বাতি, দর্পণ, পদ্মা, সুর ও নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়ে মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স-এর এই পর্ব অনুসন্ধান করে আভিজাত্যের অন্তিম ক্ষয় এবং মানুষের মাটিতে ফিরে যাওয়ার চিরন্তন মেটাফিজিক্স। কলমে অয়ন মুখোপাধ্যায়।

মহাকালের দহন এবং ছায়ার মেটাফিজিক্স: বিশ্বম্ভর রায়ের অন্তিম জলসা

প্রাক-কথন: মাটির টান বনাম আভিজাত্যের আকাশ
অপুর যাত্রা যদি হয় শেকড় থেকে মুক্তির দিকে, তবে সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ সিনেমার বিশ্বম্ভর রায়ের যাত্রা ছিল এক অনিবার্য পতনের দিকে। অপুর মেটাফিজিক্স ছিল উন্মুক্ত আকাশের মতো বিস্তৃত, অন্যদিকে বিশ্বম্ভর রায়ের মেটাফিজিক্স ছিল এক বদ্ধ প্রাসাদের অলিন্দে ধুঁকতে থাকা আভিজাত্যের আর্তনাদ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আখ্যানকে যখন সত্যজিৎ রুপালি পর্দায় নিয়ে এলেন, তখন তা কেবল এক জমিদারের সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়ার গল্প হিসেবে আর থাকল না; তা হয়ে উঠল মহাকাল (Time) এবং মানুষের অহংকারের (Ego) এক অমোঘ সংঘর্ষের দলিল। গ্রিক ট্র্যাজেডির সেই আদিম ‘Hubris’ বা অন্ধ অহংকার যখন নিয়তির অমোঘ বিধান ‘Nemesis’ এর মুখোমুখি দাঁড়ায়, ঠিক সেই মহাজাগতিক সংঘর্ষেরই এক সেলুলয়েড রূপান্তর আমরা দেখতে পাই বিশ্বম্ভরের চরিত্রের মধ্যে। প্রবাদ বলে, ‘Pride goeth before destruction, and an haughty spirit before a fall’—বিশ্বম্ভর রায়ের এই রাজকীয় পতন যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই এক মূর্ত প্রতীক। এই দ্বিতীয় পর্বে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে মেটাফিজিক্স কেবল মানুষের অস্তিত্বে নয়, বরং তার চারপাশের বস্তুজগৎ—প্রাসাদের ঝাড়বাতি, মদমত্ত দম্ভ আর দিগন্ত বিস্তৃত পদ্মার বালুচরের মধ্যেও মিশে থাকে।

ঝাড়বাতি ও দর্পণের পরাবিদ্যা
‘জলসাঘর’ সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে সত্যজিৎ এক অতীন্দ্রিয় পরিবেশ তৈরি করেছেন। তাই এখানে বস্তু কেবল জড় পদার্থ হিসেবে নয়, বরং তারা মেটা ফিজিক্যাল সংকেত হিসেবে আমাদের বার্তা দেয়। জলসাঘরের সেই বিশাল ঝাড়বাতিটি যখন স্থির থাকে, তখন তা দর্শকের কাছে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন তার আলোগুলো কাঁপতে শুরু করে কিংবা একে একে বাতিগুলো নিভে যায়, তখন সেটা আমাদের কাছে সময়ের ঐতিহাসিক ক্ষয়িষ্ণুত হিসেবে আমাদের কাছে ধরা দেয়। শেকসপিয়রের সেই অমোঘ উচ্চারণ ‘Out, out, brief candle!’—যেন জলসাঘরের প্রতিটি নিভে যাওয়া বাতির স্ফুলিঙ্গে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। বিশ্বম্ভর রায় যখন আয়নার সামনে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু কেবল নিজের বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার মুখটাই যেন দেখছেন না, বরং দেখেন এক ক্ষয়ে যাওয়া যুগের ছায়া। দর্পণে প্রতিফলিত এই প্রতিচ্ছবি আসলে তার সেই সত্তা, যে মাটির বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে চায়। মেটাফিজিক্সের ভাষায় একে বলা যায় ‘The Illusion of Permanence’ বা স্থায়িত্বের মায়া। বিশ্বম্ভর বিশ্বাস করতে চান যে তার জমিদারি আজও অক্ষয়, কিন্তু মহাকালের অমোঘ নিয়মে তার আয়নার প্রতিচ্ছবি ততদিনে ধুলোবালিতে ধূসর হয়ে গেছে। মনে পড়ে যায় ল্যাটিন ভাষার সেই ধ্রুপদি প্রবাদ—‘Sic transit gloria mundi’ অর্থাৎ ‘Thus passes the glory of the world’—দর্পণের সেই ধূসরতার সমান্তরালে যেন ফিশফিশিয়ে আভিজাত্যের অসারতাকেই মনে করিয়ে দেয়।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

প্রকৃতির রুদ্ররূপ: পদ্মা ও মহাকালের গ্রাস
নিশ্চিন্দিপুরের প্রকৃতি ছিল অপুর আশ্রয়, কিন্তু ‘জলসাঘর’-এর প্রকৃতি হল বিনাশের প্রতীক। দিগন্তবিস্তৃত বালুচর আর রুদ্র পদ্মা এখানে বিশ্বম্ভর রায়ের একাকিত্বের সমান্তরাল। নদী যখন পাড় ভাঙে, তখন সে কেবল মাটি কে গ্রাস করে না, পরম সে গ্রাস করে শত শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। চিরন্তন সেই প্রবাদ ‘Time and tide wait for no man’ যেন এখানে জল আর সময়ের একাকার হয়ে যাওয়া সংহারী রূপ ধারণ করে। বিশ্বম্ভর রায়ের পুত্র ও তার স্ত্রীর জলে ডুবে মৃত্যু এক বিশাল মেটাফিজিক্যাল মোড়। যে নদীকে তিনি নিজের সাম্রাজ্যের অংশ বলে মনে করতেন, সেই নদীই তার উত্তরাধিকারীকে কেড়ে নেয়। এই ট্র্যাজেডি তাকে বাস্তব জগৎ থেকে শুধু বিচ্ছিন্ন করেই ক্ষান্ত হয়নি তাকে ঠেলে দিয়েছিল এক অতীন্দ্রিয় জগতের দিকে। নিয়তির এই নিষ্ঠুর খেলায় তিনি নিজেকে এক ‘Tragic onlooker’ বা অসহায় অথচ মহৎ দর্শক ছাড়া আর কিছুই আবিষ্কার করতে পারেন না। এরপর থেকে তার প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে এক অবাস্তব ঘোরের অংশ। তিনি প্রাসাদের ভেতরে বন্দি হয়েও আসলে মহাকালের সেই শূন্যতাকে আলিঙ্গন করতে থাকেন, যেখানে অর্জিত আভিজাত্য আর মাটির বাস্তবতা একাকার হয়ে যায়।

সুর ও নৈশব্দ্যের আধ্যাত্মিকতা
সত্যজিৎ রায় এই ছবিতে সংগীতকে কেবল অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং সুরকে ব্যবহার করেছেন মেটাফিজিক্যাল উত্তরণের অংশ হিসেবে। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ কিংবা বেগম আখতারের সুর যখন জলসা ঘরের দেওয়ালের গায়ে ধাক্কা খায়, তখন তা হয়ে ওঠে এক মরণাপন্ন যুগের শেষনিশ্বাস, যাকে অনায়াসে বলা যায় এক অভিজাত ‘Swan song’ বা রাজহংসের অন্তিম গীতি। বিশ্বম্ভর রায়ের কাছে সংগীত ছিল তার আভিজাত্যের শেষ দুর্গ। যখন বাইরের পৃথিবীতে নতুন ধনিক শ্রেণির (যেমন মহিম গাঙ্গুলি) উত্থান ঘটছে, তখন বিশ্বম্ভর সুরের আশ্রয়ে নিজের মেটাফিজিক্যাল শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করতে চান। এখানে সামাজিক ইতিহাসের সেই অমোঘ নিয়মটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—‘The old order changeth, yielding place to new’—যেখানে পুরোনো ব্যবস্থা বাধ্য হয় নতুনের কাছে নিজের জমি ছেড়ে দিতে। কিন্তু সেই সুরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক করুণ বিষাদ। নাচের আসরে নর্তকীর ঘুঙুর যখন স্তব্ধ হয়, সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে দিয়ে বিশ্বম্ভর রায় শুনতে পান তার নিজের ধ্বংসের পদধ্বনি। সুর এখানে জীবনের উল্লাস নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী বিদায়ের সুর হয়ে দাঁড়ায়।

অন্তিম যাত্রা: অহংকারের লয় ও মাটির মুক্তি
ছবির শেষ দৃশ্যে বিশ্বম্ভর রায়ের ঘোড়ায় চড়ে সেই পাগলামি বা উন্মত্ততা মনে পড়ে? আমার মনে হয়েছে এও এক চরম মেটাফিজিক্যাল মুহূর্ত। তিনি চেয়েছিলেন তার রক্তে লেগে থাকা আভিজাত্যকে শেষবারের মতো মহাকালের সামনে মেলে ধরতে, যেন এতদিনের অভ্যস্ত ‘Gilded cage’ বা সোনার খাঁচাটিকে ভেঙে তিনি এক কাল্পনিক স্বাধীনতার খোঁজে ছুটে চলেছেন। কিন্তু যে মাটির মায়া তিনি ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, সেই মাটিতে আছাড় খেয়েই তার যাত্রা শেষ হয়। তার মৃত্যু কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়; তা হল এক ব্যক্তিগত পরাবিদ্যার অবসান। ধুলোমাখা মাটিতে পড়ে থাকা বিশ্বম্ভর রায় যেন শেষপর্যন্ত বাইবেলের সেই প্রাচীন ও চরম ধ্রুব সত্যটিই প্রমাণ করেন—‘Dust thou art, and unto dust shalt thou return’—অর্থাৎ তুমি ধুলা থেকে এসেছ, এবং ধুলাতেই তোমাকে মিলিয়ে যেতে হবে। বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্রে ছবি বিশ্বাসের চোখের শেষ চাউনিতে যে শূন্যতা ফুটে ওঠে, তা হল জাগতিক সমস্ত পাওয়ার ঊর্ধ্বে এক পরম মুক্তির স্বাদ।

ছায়া ও কায়ার খেলা
আমার মতে বিশ্বম্ভর রায় এক ট্র্যাজিক হিরো, যিনি ছায়া আর কায়ার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত। সত্যজিৎ রায় তাঁর ক্যামেরার কারুকার্যে দেখিয়েছেন যে, মানুষের মেটাফিজিক্স কেবল তার চিন্তায় নয়, বরং তার চারপাশের পতনের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। ‘জলসাঘর’ আমাদের শেখায় যে, সময় হল একমাত্র ধ্রুব সত্য, আর মানুষের অহংকার হল সেই সময়ের সমুদ্রে ভেসে যাওয়া এক তরী। মাটির মানুষের মেটাফিজিক্স এখানে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছায়—যেখানে মানুষ মাটিকে অস্বীকার করেও শেষপর্যন্ত মাটির কাছেই তার সমস্ত দেনা-পাওনা মিটিয়ে দিয়ে চিরকালের মতো শান্ত হয়ে যায়। তাই সত্যজিতের এই সৃষ্টি শুধুমাত্র আভিজাত্যের পতন নয়, বরং মহাকালের মহাকাব্যে মানুষের এক ছোট্ট অথচ গভীর উপস্থিতির আখ্যান।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অয়ন মুখোপাধ্যায় একজন কবি, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। পেশাগতভাবে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।

অন্যান্য লেখা