রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তীর দীর্ঘ কবিতা উন্মাদবাহিত এক গভীর আত্মসমীক্ষার যাত্রা। মৃত্যু, উন্মাদনা, প্রেম, রাজনীতি ও ইতিহাসের জটিল অভিঘাতে কবির চেতনায় জন্ম নেয় ভাঙাচোরা কিন্তু তীব্র ভাষা। শ্মশান, স্বপ্ন, স্মৃতি ও বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে মানুষ, দেশ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন উঠে আসে। শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আর্তি ও প্রতিরোধের উন্মত্ত স্বর।
কেতাব-ই-র ব্লগজিনের পাতায় আজ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে এই ৭০ পর্বের দীর্ঘ কবিতাটি। ষষ্ঠ পর্বে থাকছে আরও সাতটি কবিতা।
৩৬
অপরাহ্ন আসে ওই—পূজ্য নয় সে কোনো
অজানা কারণে—বৈধব্য আনে কি সে?
শরীর বাঁচানোর খেলা শুরু হয়: অভ্যাগতের
মতো স্নান সেরে দ্রুত, শাকান্ন আহার
জোটে যা, তা গ্রাসে ভরে নাও। এরপর
কৈবল্য? বিশ্রাম শুধু? চরম মুহূর্তে এসে
হঠাৎ স্খলন! সাড়া জাগে: কম্পন, ঝাঁকুনি
ইত্যাদি ইত্যাদি... লব্ধ হচ্ছ তুমি তবু
তারই মাঝে—বিহার হয়েছে শেষ, আঘাত
মিটেছে। প্রহরণ ছিল যদি, কার দুঃসাহসিকতা
দ্রাঘিমা সকল ছিঁড়ে, অশ্রুর টলমল
দীঘিতে নেমেছে? হয়তো সত্য এসবই—
যুদ্ধের পরিভাষা বদলে গিয়েছে। আনমনা নও;
বরং, মগ্নচিত্তে, ধ্যানে বিন্দুগুলি যোগ করো;
নীরব সাক্ষী তুমি—নিজে পরীক্ষা করে
চলো—হয়তো বলতে পারো; সন্দেহাতীত কোনো
মূর্তি তুমিও তো নও! ‘এসব রক্তপাত অনুশীলনের...’
৩৭
তার বেশি বিকল্প অভিধানও দিতে পারেনি
শিশু আর কতদিন শিশু হয়ে থাকবে
এবং পৃথিবী আর কত লুকোবে তোমার
হাড়গোড়? সংক্ষিপ্ত করে যদি বলি, শোনো
তবে—দ্বিধা রেখো না; সংশপ্তক যারা,
পাকেচক্রে বেঁচে আছে, তাদের করেছে চক্ষুষ্মান,
এহেন ঘটনা: বিধাতা আঁতুড়ঘরে এসে, জন্ম
বিলি করে গেছে—উঁহুহুঁ! অমনভাবে
উতলা হোয়ো না এখনই; সমাধান, স্পষ্টত,
প্রতিভাত হবে ঠিকই আজ। তোমার বিশ্বাস
সশব্দে ভেঙে দিতে চাই না যেহেতু,
নিজে আজ নিজেকেই প্রশ্ন করি। নির্বংশ
কোনো কূলের আঁধার, এই আলোর দিনে
আরও বেশি করে মনে পড়ে। রক্তের
আত্মীয়তা ছিল? অধিবাসে, বিদায়ের মন্ত্র পড়েছি।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৩৮
বার্ষিকী ঘটে এই দিনে। পদচিহ্ন, সমাহার
নিয়ে এই সেতু ঝুলন্ত, মৃত্যুমুখী। পরতে
পরতে তার জীবনকাহিনি—উগরে দিতে পারে,
কিংবা, সময়ের বিশাল ডানার উড়ে যাওয়ার
কারণে, হাওয়া লেগে শরীরের উদ্বৃত্ত লবণ,
মাংস, ধুলো ঝরে যায়—মায়ের সংসারে,
মায়ের নিকটে এসে আমরা জড়ো হয়েছি।
আমরা অবিশ্বাসী স্বভাবত, একে অপরের প্রতি;
আমরা, এবং বাকিরা, ক্রমাগত শাক্ত হয়েছি।
৩৯
প্রতিকূলতার কোনো সাহচর্য নেই। বালকগন্ধ কাটেনি
এখনও আমার? সামুদ্রিক জলে অতি তীক্ষ্ণভাবে
বেঁচে আছি; সন্তরণ ভুলে যাই অনভ্যাসে—
চ্যালেঞ্জ বলতে পারো—অক্ষমতা—কিংবা
ভাবতে পারো কৃচ্ছ্রসাধন। হাস্যস্পদ হলে পীড়িত
হই না, বরং, ভাবি: সার্থক হল তবে
নির্বাসনও... অবিকল্প তুমি; কোনো বিকল্প নেই—
আমার ফ্রেস্কো পাবে, হেথা-হোথা তল্লাটে—
ধনাঢ্য দেবতার কান্নায় বিহ্বল প্রাণ, বিকশিত
হতে আরও বিলম্ব হবে? বস্তুত, হবে।
৪০
এ জীবন ক্যাটাস্ট্রফির মতো লাগে; কেউ
নেই, তবু কেউ কেউ নিয়ামক হয়;
একইভাবে মনে হয়, শিশুর দুধেদাঁতে, আমিষগন্ধ
কী ক্ষতিকর, মায়াময়—শিশুরা এখন শিশু
নয় তত আর; আমরাও নই খুব
শুদ্ধচেতা। সারাদিন কেটে যায় ক্লান্ত শরীরে
সম্ভোগে; বাড়ি ফিরে শুনি, দেশে ধর্ষণ
অনিয়মিত! অবাক করেছ গো, প্রভু হে
আমার: নিজহাতে প্রতিবাদ জ্বালিয়ে দিয়েছ!
প্রশ্ন, তা বলে করব, ভেবো না—অনুমান
ঠিকই আমি সাজিয়ে নেব নিজে নিজে।
৪১
প্রধানত, পুংদণ্ড ভেঙেচুরে যায়—অসামাজিক কিছু
চাহিদা জেগেছে! নিজের স্বদেশ, তাকে বিক্রয়
করা; কেটেকুটে, ছিঁড়েখুঁড়ে নিজের রক্তে স্নান
করা! হরর কিংবা ভায়োলেন্স হল কি?
উৎকণ্ঠাও যেন দ্বৈতকন্ঠে শোনা যায়—
সে কি তবে তোমার শরীরে লেগে
আমি? চাঁদের গায়ে চাঁদ যেভাবে শুনেছি—
এখন নগ্নছবি হাটে-বাজারে; সরলমতি
আমি, তাকেও ভেবেছি, বিজ্ঞাপিত হওয়া—
উন্মাদ যদি আমি এভাবে না হই,
বলো তবে—কার হলাহল পান করে
আমি নামব জলে, উন্মাদকাহিনিতে লিখিত হতে?
৪২
এই পাওয়া, বিশুদ্ধমতে পাওয়া নয়। তোমার
নীরব শবে বসে, কিছু জ্যামিতিক চিত্র,
চিহ্ন এঁকে যাওয়া। ভাষা কে প্রোথিত
করে? নিজ হতে সম্ভূত হয়? সে
ভাষায় নির্জনতা, প্রেত; সে-ভাষার আজ্ঞাবাহক
একা আমি। তাকে জন্মাতে দেখি, অল্প
অল্প করে নিয়মিত বিকশিত হতে দেখি;
অবশেষে, কষ্ট-যন্ত্রণা পেয়ে, মলমূত্র
ঘেঁটে মরে যায়—আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে
সে চলে যায়—যেতে যেতে তবু সে
আমায় দ্যুতি দিয়ে গেছে; আমায় নির্ভার
আলো দিয়ে গেছে। তার এই না-থাকাও
ধন্য করেছে। আশীর্বাদ করে বলে: ‘সুখী হও’...
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
sukanta debnath
1 ঘন্টা আগেভালো