preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ২
ধারাবাহিক

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ২

সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই'র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

একজন শিল্পী যখন নিজের তৈরি করা সাউন্ড-সাম্রাজ্য থেকে সরে দাঁড়ান, তখন তাঁর কণ্ঠ কি বদলে যায়, না কি বদলে যায় আমাদের শোনার অভ্যাস?

কীভাবে সংযত সুরও সুনামির মতো স্থায়ী হতে পারে, কীভাবে নীরবতা শব্দের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হতে পারে, আর কীভাবে একজন সুপারস্টার নিজেকে সুস্থির শিল্পীতে পুনর্লিখন করেন?

ব়্যায়না গানটি সিনেমার সিচ্যুয়েশনাল সংযোজন নয়। এ এক আরবান আত্মকথন। অরিজিৎ সিং এক সময় ছিলেন প্রেমের প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিধ্বনি। বৃষ্টি মানেই তাঁর কন্ঠে ব্যথার গান, ব্রেকআপ মানেই তাঁর গানে বিলাপ, ব্যালকনিতে বসে থাকা রাত মানেই তাঁর রোমান্টিক রেশ। কিন্তু ‘ব়্যায়না’ মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সেই চেনা চিত্রগুলো যেন খানখান হয়ে গেল। প্লেব্যাক-পরবর্তী পরিসরে এই গান তাঁর নীরব কিন্তু নির্ভীক ঘোষণা—শৃঙ্খল ছিঁড়ে, শোরগোল সরিয়ে, স্বরকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার সংকল্প।

২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বলিউড সংগীত ধারার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, অধিকাংশ গানই রিলসের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। সেখানে সুরের গভীরতার চেয়ে হুক স্টেপ বা ক্যাচি লুপের প্রাধান্য বেশি। অরিজিৎ সিং নিজে বলিউডের এই ‘শোষক বেতন ব্যবস্থা’ এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার অভাব নিয়ে মুখ খুলেছেন। ‘ব়্যায়না’ এই বাণিজ্যিক ধারার বিপরীতে এক শান্ত, ধীরস্থির এবং অর্গানিক মেলোডির প্রতিফলন। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং একটি প্রতিবাদ—যা প্রমাণ করে যে শুদ্ধ সুরের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

বলিউডের বাণিজ্যিক বুলডোজারের ভেতর যেখানে শব্দই শক্তি, সেখানে ব়্যায়না শব্দের সংযম, সুরের স্বল্পতা, সাইলেন্সের স্বাক্ষর। না আছে হুক-হিস্টিরিয়া, না আছে রিল-রেটরিক; আছে শুধু রাত্রির রেশমি রুদ্ধতা। একশো ছিয়াত্তর সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত স্বীকারোক্তি—ছোটো, কিন্তু সঘন; মৃদু, কিন্তু মহার্ঘ।

গানটির লিরিক্যাল বুনন প্রিয়া সারাইয়ার, যিনি এর আগে অরিজিতের সাথে ‘কসম সে’(২০২৩) গানে কাজ করেছেন।

লিরিকে প্রিয়া সারাইয়ার শব্দশিল্প শীতল অথচ শাণিত। হাঁসতি রেশম সি, খুরদুরি বাতেঁ—মসৃণ মুখোশের নিচে মলিন মন। হাসির হালকা হাওয়ায় লুকোনো হাহাকার। এই দ্বৈততার দোলাচলই আধুনিক আরবান রিলেশনশিপের রূঢ় রূপরেখা।

হিন্দি সাহিত্যে এবং বলিউড সংগীতে ‘ব়্যায়না’ (রাত) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মোটিফ। লতা মঙ্গেশকরের ব়্যায়না বীতি যায়ে বা অমিতাভ বচ্চনের সিনেমায় তেরে মেরে মিলন কি ইয়ে ব়্যায়না-র মতো কালজয়ী গানগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলেও, অরিজিতের ব়্যায়না কিছুটা আলাদা। এখানে রাত কেবল বিরহের নয়, বরং এক ধরনের আধ্যাত্মিক একাকিত্বের প্রতীক।

বাওরি,খামোশি—শব্দগুলো শুধু শব্দ নয়, মানসিক মানচিত্র। রাত এখানে সময় নয়, স্বীকারোক্তির সঙ্গী; অন্ধকার নয়, অন্তরের আয়না। ডিজিটাল দিনযাপনের দমবন্ধ দৌড়ে যে নিঃসঙ্গ নিশ্বাস, ‘ব়্যায়না’ তাকে নাম দেয়, নরমে নাড়া দেয়।

প্রিয়া সারাইয়া এখানে ‘অক্সিমোরন’ বা বৈপরীত্যের চমৎকার ব্যবহার করেছেন। ‘হাঁসতি রেশম সি, খুরদুরি বাতেঁ’ পঙ্‌ক্তিটি আধুনিক সম্পর্কের এক গভীর সত্যকে তুলে ধরে—যেখানে বাইরের হাসিটা রেশমের মতো মসৃণ হলেও ভেতরের কথাগুলো কর্কশ এবং ক্ষতবিক্ষত। গানের ইমেজারিগুলো অত্যন্ত দৃশ্যমান।

সর্দ সি, ফর্শ পে সোয়ি সি: এই চিত্রকল্পটি এক আধুনিক একাকিত্বের ছবি আঁকে। শীতের রাতের মতো শীতল অনুভূতি এবং মেঝের ওপর শুয়ে থাকা—এ এক ধরনের নিরাশ্রয় মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে।

চাঁদ তেরা নয়না চুরায়ে: এখানে চাঁদ এবং চোখের মধ্যে একটি চুরির সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে, যা রোমান্টিক হলেও এক ধরনের রহস্যময়তার ইঙ্গিত দেয়।

সুরের স্থাপত্যে শেখর রাভজিয়ানির সংযত সংবেদনশীলতা স্পষ্ট। রাগ ইমন-কল্যাণের মৃদু মায়া মিশে আছে, কিন্তু তা কোনো প্রদর্শনী নয়; বরং এক প্রার্থনার প্রদীপশিখা। চার-চার তালের স্থিরতা, ধীর লয়ের ধ্যান—হার্টবিটের সঙ্গে হারমোনি মিশে যায়।

সংগীত প্রযোজক ঋষভ শর্মা গানটির শব্দ বিন্যাসে এক ধরনের ‘ইথারিয়াল’ আবহ তৈরি করেছেন। গানের শুরুতে পিয়ানোর ব্যবহার একাকিত্বের এক গম্ভীর সুর বেঁধে দেয়। পিয়ানোর নোটগুলোর মধ্যে যে নিস্তব্ধতা বা ‘পজ়’ আছে, তা গানের অর্থের সাথে মিলে যায়। গিটারের মৃদু স্ট্রামিং গানটিকে আধুনিক ‘ইনডি-ব্যালাড’-এর রূপ দেয়। অর্কেস্ট্রেশনে কোনো উচ্চকিত ড্রামস বা বেসের ব্যবহার এখানে নেই। স্ট্রিংস সেকশনটি অত্যন্ত মৃদুভাবে ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে, যা অরিজিতের কণ্ঠকে প্রধান্য পেতে সাহায্য করে। গানটিতে কিছু অ্যাম্বিয়েন্ট সাউন্ড ব্যবহার করা হয়েছে যা রাতের নিস্তব্ধতাকে মূর্ত করে তোলে।

অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠ এখানে কোলাহলহীন কাব্য। তাঁর সিগনেচার হাস্কি ভয়েসকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।গানটির অনেক জায়গায় তিনি প্রায় বাতাসের মতো ফিসফিস করে গেয়েছেন। এটি শ্রোতার মনে হয় যেন গায়ক ঠিক তাঁর কানের কাছে বসে গানটি গাইছেন। ব়্যায়না শব্দটির দীর্ঘ উচ্চারণের সময় তিনি যেভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তা তাঁর ধ্রুপদি তালিমের পরিচয় দেয়। শ্বাস ছাড়ার শব্দটিকে এখানে যান্ত্রিকভাবে মুছে ফেলা হয়নি, বরং একে আবেগের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। উঁচু পর্দায় ওঠার সময় তিনি ‘চেস্ট ভয়েস’ ব্যবহার না করে হেড ভয়েস বা ফলসেটোর আশ্রয় নিয়েছেন, যা গানটিকে আরও বেশি আধ্যাত্মিক করে তুলেছে।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

আধুনিক শহুরে জীবনের আবেগ-রাজনীতি
আজকের ডিজিটাল আইসোলেশনের যুগে ‘ব়্যায়না’ এক ধরনের কমিউনাল হিলিং বা যৌথ নিরাময়ের কাজ করে। মানুষ যখন তাঁর স্মার্টফোনের স্ক্রিনের আড়ালে একা হয়ে যায়, তখন এই ধরনের গান তাকে মনে করিয়ে দেয় যে এই একাকিত্ব কেবল তাঁর একার নয়। এটি আধুনিক জীবনের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’-এর বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক সংহতি।

সমালোচকদের সন্দেহও সংগত—এ কি ব়্যাডিক্যাল রূপান্তর, না মৃদু মাইগ্রেশন? সুরে বড়ো এক্সপেরিমেন্ট নেই; সোনিক জ়োন নিরাপদ। আরও কিছু ধ্রুপদি তান-তরঙ্গ থাকলে শাস্ত্রীয় শিকড়ের শক্তি স্পষ্ট হত। তবু, শিল্পীর স্বাধীনতার সাহস এখানে সর্বাগ্রে। বলিউডের বাণিজ্যিক বেড়াজাল ভেঙে নিজের নামে, নিজের নিয়মে, নিজের নিবিড় নিশ্বাসে গান করা—এ নিজেই এক পলিটিক্যাল পিভট।

ব়্যায়না লাউড ক্লাইম্যাক্স নয়, লং রেজোন্যান্স। ম্যাক্সিমালিজ্যমের মত্ততা থেকে মিনিমালিজ্যমের মাধুর্যে মসৃণ ম্যুভমেন্ট। অরিজিৎ সিংও এন্টারটেইনারের এনক্লোজার ছেড়ে আর্টিস্টের আকাশে।

এই গান কোলাহল-কালচারের বিপরীতে কোমল কনফেশন—নীরবতার নন্দন, স্বরের স্বাধিকার। এই গানটি প্রমাণ করে যে গান সুপারহিট হওয়ার জন্য কোটি টাকার চলচ্চিত্রের বিপণন প্রয়োজন নেই। শুদ্ধ শিল্পগুণ থাকলে তা নিজে থেকেই শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়।

এটা কেবল গান নয়, একজন শিল্পীর পুনর্জন্মের ইশতেহার, যা আগামী দিনের ভারতীয় সংগীতকে আরও সংবেদনশীল এবং মৌলিক হওয়ার প্রেরণা দেবে।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

Image Description

sukanta debnath

10 ঘন্টা আগে

সুন্দর


লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা