preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ১০
ধারাবাহিক

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ১০

সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ দশম পর্ব।

সংগীত সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী এবং সর্বক্ষণিক হলেও আমাদের বর্তমান শ্রবণ প্রক্রিয়া প্রায়শই কেবল স্ক্রিনের স্ক্রল বা স্ট্রিমিংয়ের স্ট্যাটিস্টিকে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যেখানে আমরা শব্দ শুনি কিন্তু তার অন্তর্নিহিত সত্য বা স্থাপত্যকে অনুভব করি না। ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই স্থির, সন্দেহী এবং সচেতন প্রশ্নক্ষেত্র যা জনপ্রিয়তার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট না হয়েও শিল্পের নীরবতাকে সংখ্যার নেশা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। বর্তমান অধ্যায়ে আমাদের পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলেন সেতার মায়েস্ত্রো পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং তাঁর সংগীতে ফিউশন বা সাংগীতিক সংশ্লেষণের এক অনন্য ধারা, যা মূলত তাঁর দুটি ঐতিহাসিক অ্যালবাম ‘শঙ্কর ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ এবং ‘তন মন’-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে। সংগীতকে এখানে কেবল মুগ্ধতার মোড়কে নয়, বরং সংগীত মেধার মাপকাঠিতে মাপা হবে, যেখানে সুরের স্কেল, রাগের রেশ এবং হারমনিক হস্তক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। পণ্ডিত রবিশঙ্কর কেবল একজন সেতার বাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক কার্টোগ্রাফার যিনি সুর দিয়ে মানচিত্র আঁকতেন এবং ভৌগোলিক সীমানা অদৃশ্য করে দিতেন। তাঁর ফিউশন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কোনো সাময়িক হুজুগ ছিল না, বরং তা ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ব্যাকরণকে অক্ষুণ্ণ রেখে বৈশ্বিক ধ্বনি-বিজ্ঞানের সঙ্গে এক গভীর সংলাপ।

সত্তর দশকের শুরুতে যখন বিশ্বসংগীত এক বড়ো ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সুহৃদ জর্জ হ্যারিসন এক ঐতিহাসিক সাংগীতিক সন্ধিতে উপনীত হন। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শঙ্কর ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অ্যালবামটি ছিল হ্যারিসনের নবগঠিত ‘ডার্ক হর্স রেকর্ডস’-এর দ্বিতীয় নিবেদন, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের মেলবন্ধনে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছিল। এই অ্যালবামের প্রতিটি ট্র্যাক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রবিশঙ্কর এখানে তাঁর শাস্ত্রীয় শিকড় থেকে বিচ্যুত না হয়েও জ্যাজ, ফাঙ্ক এবং পশ্চিমা পপ ধারার উপাদানগুলিকে অত্যন্ত সুকৌশলে আত্মস্থ করেছেন। অ্যালবামের প্রথম দিকের গানগুলি মূলত কৃষ্ণভক্তি বা ভজনভিত্তিক হলেও সেগুলির সংগীতায়োজনে এক ধরনের ‘ওয়াল অফ সাউন্ড’ বা ধ্বনি-প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল, যা ফিল স্পেক্টরের সিগনেচার প্রোডাকশন স্টাইলকে মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে ‘আই অ্যাম মিসিং ইউ’ গানটি রবিশঙ্করের প্রথম ইংরেজি ভাষার পপ রচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যেখানে তিনি শাস্ত্রীয় ড্রোনের পরিবর্তে পশ্চিমা কর্ড প্রগ্রেসন ব্যবহার করেছেন। লক্ষ্মী শঙ্করের কণ্ঠ এই গানে তিন অষ্টক জুড়ে অবলীলায় বিচরণ করেছে, যা গানটিকে এক অপার্থিব উচ্চতা দিয়েছে এবং শ্রোতার মনে এক ধরনের ইথারিয়াল বা আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করেছে। লিরিক্যাল লেয়ারিংয়ের দিক থেকে দেখলে এই গানে কৃষ্ণের অনুপস্থিতির যে আর্তি ফুটে উঠেছে, তা মূলত আধুনিক একাকিত্ব এবং আধ্যাত্মিক সন্ধানের এক অপূর্ব মেটাফর।

অ্যালবামের দ্বিতীয় দিকটি ছিল আরও বেশি দুঃসাহসী এবং পরীক্ষামূলক, যেখানে রবিশঙ্কর ‘ড্রিম, নাইটমেয়ার অ্যান্ড ডন’ নামক একটি প্রস্তাবিত ব্যালের জন্য সুরারোপ করেছিলেন। এই ব্যালেটি মূলত তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল—স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন এবং ভোর, যার প্রতিটি মুভমেন্টে রবিশঙ্কর ভিন্ন ভিন্ন রাগের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ‘ওভারচার’ অংশের মাধ্যমে যে সাংগীতিক স্থাপত্যের সূচনা হয়, তাতে ক্যারিবিয়ান ফ্লেভারের ছোঁয়া থাকলেও তার ভিত্তি ছিল অত্যন্ত ধ্রুপদি। ‘ড্রিম’ বা স্বপ্ন অংশে ‘ফেস্টিভিটি অ্যান্ড জয়’ এবং ‘লাভ-ড্যান্স এক্সট্যাসি’ ট্র্যাকগুলি এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু ‘নাইটমেয়ার’ বা দুঃস্বপ্ন অংশে প্রবেশের সাথে সাথেই সাউন্ডস্কেপ বদলে যায়। এখানে ‘রাগা চন্দ্রকৌঁস’-এর আশ্রয়ে ‘লাস্ট’ এবং ‘রাগা মারোয়া’-র সাহায্যে ‘ডেসপেয়ার অ্যান্ড সরো’ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘ডিসপিউট অ্যান্ড ভায়োলেন্স’ ট্র্যাকটি ছিল একটি জ্যাজ-ফাঙ্ক ইন্সট্রুমেন্টাল, যেখানে টম স্কটের স্যাক্সোফোন এবং এমিল রিচার্ডসের মারিম্বা এক জটিল কল-অ্যান্ড-রেসপন্স কাঠামো তৈরি করেছে, যা শ্রোতার স্নায়ুকে টানটান করে রাখে। ব্যালের শেষ পর্যায়ে ‘রাগা ভাটিয়ার’-এর মাধ্যমে যে ‘পিস অ্যান্ড হোপ’ বা শান্তি ও আশার বাণী ধ্বনিত হয়েছে, তা এক ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এবং সহযোগিতামূলক সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। এই অ্যালবামের সনিক সিগনেচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে কোনো কৃত্রিম প্রোগ্রামিং ছাড়াই লাইভ ইনস্ট্রুমেন্টেশনের মাধ্যমে এক থ্রি-ডি সাউন্ডস্কেপ তৈরি করা হয়েছিল। আল্লারাখা, শিবকুমার শর্মা, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার মতো শাস্ত্রীয় মায়েস্ত্রোদের সাথে রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন এবং জিম কেল্টনারের মতো পশ্চিমা রক তারকাদের এই মিলন সংগীত ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

সাউন্ড ডিজাইনের টেকনিক্যাল দিক থেকে দেখলে ‘শঙ্কর ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অ্যালবামের রেকর্ডিং হয়েছিল মূলত লস অ্যাঞ্জেলেসের এঅ্যান্ডএম স্টুডিওসে, যা এনালগ রেকর্ডিংয়ের এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক পুনর্সংস্করণে এই অ্যালবামটিকে যখন ১/৪ ইঞ্চি ১৫ আইপিএস অ্যানালগ মাস্টার থেকে ডিএসডি ২৫৬ ফরম্যাটে রূপান্তর করা হয়, তখন তার মধ্যে এক ধরনের এয়ারিনেস বা বায়বীয় স্বচ্ছতা অনুভূত হয়, যা মূল রেকর্ডিংয়ের টেক্সচারকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই অ্যালবামের মিক্সিংয়ে ডায়নামিক রেঞ্জের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল, যাতে প্রতিটি যন্ত্রের শব্দ আলাদাভাবে শোনা যায়। রবিশঙ্কর এই অ্যালবামের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ব্যাকরণকে পশ্চিমা হারমনির ছাঁচে ঢাললেও তার আত্মার কোনো বিচ্যুতি ঘটে না, যদি সুরকারের হাতে সেই শিল্পের নিয়ন্ত্রণ থাকে। তাঁর এই পরীক্ষা ছিল মূলত অডিয়ো-ভিজ্যুয়াল সিনার্জি তৈরি করা, যেখানে শব্দ নিজেই একটি দৃশ্যকল্প নির্মাণ করে।

সময়ের বিবর্তনে উনিশশো আশির দশকের মধ্যভাগে রবিশঙ্কর যখন তাঁর পরবর্তী বড়ো প্রজেক্ট ‘তন মন’ (Tana Mana)-এর কাজ শুরু করেন, তখন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এনালগ থেকে ডিজিটালের দিকে স্লাইড করছে। ১৯৮৭ সালে ‘প্রাইভেট মিউজিক’ লেবেল থেকে মুক্তি পাওয়া এই অ্যালবামটি ছিল পণ্ডিতজির এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ, যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো ডিজিটাল স্যাম্পলিং এবং সিন্থেসাইজার প্রযুক্তির সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটান। ফ্রাঙ্ক সেরাফিনের স্টুডিওতে রবিশঙ্কর যখন ‘ফেয়ারলাইট সিএমআই’-এর মতো তৎকালীন আধুনিক প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসেন, তখন তিনি একজন শিশুর মতো নতুন শব্দের গোলক নিয়ে খেলতে শুরু করেন। ‘তন মন’ শব্দের অর্থ দেহ ও মন, যা এই অ্যালবামের সাংগীতিক দর্শনের মূলে রয়েছে—যেখানে প্রযুক্তি (দেহ) এবং আবেগ (মন) একাকার হয়ে গেছে। সিন্থেসাইজারের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও রবিশঙ্কর নিশ্চিত করেছিলেন যে, এটি যেন সেতারের স্বাভাবিক অনুরণনকে ঢেকে না দেয়, বরং তাকে এক নতুন ধরনের রেজোন্যান্স প্রদান করে।

‘তন মন’ অ্যালবামের ট্র্যাকগুলি বিশ্লেষণ করলে রবিশঙ্করের সৃজনশীল সাহসের এক অভূতপূর্ব চিত্র ফুটে ওঠে। শিরোনাম ট্র্যাক ‘তন মন’ ছিল পণ্ডিতজির মায়ের স্মৃতির প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি, যেখানে তাঁর মায়ের শৈশবে গাওয়া গানের রেশ ডিজিটাল সাউন্ডস্কেপের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ‘ফ্রায়ার পার্ক’ ট্র্যাকটি তাঁর বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের বাড়ির নামে নামকরণ করা হয়েছিল, যা মূলত ‘রাগা চারুকেশী’-র ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে রবিশঙ্কর সেতারের পাশাপাশি সুরবাহার বা বেস-সেতারও বাজিয়েছেন, এবং তার সাথে রে কুপারের মারিম্বা এক ধরনের মিনিমালিস্ট বা স্টিভ রাইখ-ধাঁচের সুরের জ্যামিতি তৈরি করেছে। এই গানে শব্দের স্তরবিন্যাস এতটাই ঘন যে তা শ্রোতাকে এক ধরনের ট্রান্স-লাইক স্টেটে নিয়ে যায়। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্র্যাক হল ‘ওয়েস্ট ইটস মিট’ (West Eats Meat), যার নামকরণ করা হয়েছিল রবিশঙ্করের আগের প্রজেক্ট ‘ওয়েস্ট মিটস ইস্ট’-এর ওপর একটি কৌতুকপূর্ণ স্যাটায়ার হিসেবে। এটি দক্ষিণ ভারতীয় ‘রাগা হেমবতী’-র স্কেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এই সেশনে রবিশঙ্কর প্রথমবারের মতো একজন জ্যাজ বেসিস্ট প্যাট্রিক ও’হার্নের সঙ্গে বাজিয়েছিলেন। এই ট্র্যাকে রবিশঙ্কর সেতার বাজানোর সময় অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু বাংলা শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন—যেমন ‘আরশোলা’, ‘চিটে গুড়’, ‘চট্টগ্রাম’—যা গানটিতে এক ধরনের নাগরিক রূঢ়তা এবং পরাবাস্তব আবহ যোগ করে।

সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আধুনিক লেন্স দিয়ে দেখলে ‘তন মন’ অ্যালবামটি ছিল ‘নিউ এজ’ সংগীতের এক আদি রূপরেখা। এখানে শব্দের ক্লিনলিনেস বা পরিচ্ছন্নতা ছিল বিস্ময়কর, যেখানে প্রতিটি সিন্থ প্যাড এবং স্যাম্পলড বিট গাণিতিক নির্ভুলতায় প্লেস করা হয়েছে। রবিশঙ্কর এই অ্যালবামের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রাচীন সুরকেও ল্যাবে তৈরি সনিক হুকের মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর শ্রোতাদের উপযোগী করে তোলা সম্ভব, যদিও এই ধরনের ‘ইঞ্জিনিয়ারড পারফেকশন’ অনেক সময় আবেগকেও যান্ত্রিক করে তোলার ঝুঁকি রাখে। তবুও সমালোচকদের মতে, রবিশঙ্কর তাঁর ‘সাংগীতিক আত্মা’ বিসর্জন না দিয়েই এই পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন। তাঁর এই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, সংগীত কেবল রিলস বা শর্টসের গোলকধাঁধায় টিকে থাকার জন্য নয়, বরং তা এক মহাজাগতিক ছন্দের অংশ যা সময়কে জয় করতে পারে।

পণ্ডিত রবিশঙ্করের এই ফিউশন প্রজেক্টগুলো নিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের পুরোহিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলেও, তিনি সবসময়ই তাঁর ‘ইন্ডিয়ান অ্যাঙ্কর’ বা ভারতীয় শিকড়ের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সংগীতের কোনো নির্দিষ্ট সীমান্ত নেই এবং সুরের মাধ্যমে বিশ্ব নাগরিকত্বের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। ‘শঙ্কর ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ এবং ‘তন মন’—এই দুটি অ্যালবামই সংগীতের দুটি ভিন্ন মেরুকে প্রতিনিধিত্ব করে—একটি এনালগ উষ্ণতা ও সহযোগিতার এবং অন্যটি ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের। এই দুটি অ্যালবামের তুলনামূলক পাঠ আমাদের সমকালীন সংগীতের বহুমুখী গতিপ্রকৃতি এবং নন্দনতাত্ত্বিক বিবর্তন বুঝতে সাহায্য করে। রবিশঙ্কর এখানে কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি একজন গবেষক এবং স্রষ্টা যিনি জানতেন কীভাবে নীরবতাকেও শব্দের চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে তোলা যায়।

পণ্ডিত রবিশঙ্করের ফিউশন প্রজেক্টগুলো আজ কেবল আর্কাইভাল আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের সংগীতকারদের জন্য এক অনিবার্য অনুপ্রেরণা। তাঁর সেতারের অনুরণন এবং সিন্থেসাইজারের শব্দের সেই মেলবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ মরণশীল হলেও তার প্রিয় সুরের কম্পাঙ্ক মহাকাশে কোনো এক অজানা সিগন্যাল হয়ে অনন্তকাল রয়ে যায়। সংগীতের এই বিবর্তনীয় যাত্রায় এই দুটি অ্যালবামই মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে, কারণ তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠ এবং সৃজনশীলভাবে আপসহীন ছিল। রবিশঙ্করের এই সুর-সংলাপ ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ের মতো অবিরাম, চিরগতিময় এবং চিরবর্তমান যা যুগের পর যুগ ধরে নতুনের সন্ধানে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা