সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ ষষ্ঠ পর্ব।
নব্বই দশকের শুরুটা ছিল আসলে একটা কালচারাল গ্লিচ। আমরা এমন এক সময় বড়ো হচ্ছিলাম যখন পৃথিবীটা অ্যানালগ থেকে ডিজিটালের দিকে স্লাইড করছে, আর ইন্ডিয়ান পপ মিউজিক সিনটা ছিল ঠিক ওই ট্রানজিশনের এপিসেন্টার। চারদিকে একটা অদ্ভুত এনার্জি—না ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার ভ্যালিডেশন পাওয়ার তাড়া, না ছিল অ্যালগরিদমের দাসত্ব। ছিল শুধু ক্যাসেট প্লেয়ারের ভেতর ফিতের চক্কর আর রেডিয়োর স্ট্যাটিক নয়েজের মধ্যে প্রিয় গানটা খুঁজে পাওয়ার সেই পিওর থ্রিল।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে স্মৃতিরা কেবল করাপ্টেড ডেটা হয়ে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। মহাবিশ্বের কোনো প্রি-ডিজাইনড অর্থ নেই, ভবিষ্যৎ অন্ধকার—তবু এই অর্থহীনতার চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আমরা সুরের এক-একটা ‘মাখন-প্যাটার্ন’ খুঁজে নিই স্রেফ বেঁচে থাকার ড্রাইভ পাওয়ার জন্য। ‘টোনাল ট্রুথ’-এর এই পর্বে আমরা কোনো নতুন অ্যালবাম নয়, বরং একটি ‘সনিক ভাইরাস’-কে ব্যবচ্ছেদ করব, যা নব্বই দশকের ক্যাসেট জমানার ধোঁয়াশা থেকে আজকের সুপার-ফাস্ট রিলসের গোলকধাঁধা পর্যন্ত টিকে আছে। গানটির নাম—‘বিন তেরে সনম’।
১৯৯১ সালের ‘ইয়ারা দিলদারা’ ছবিতে যতিন-ললিত যখন এই সুরটি বাঁধলেন, তখন এটি ছিল মূলত ওয়েস্টার্ন পপ হারমনিক্স এবং ইন্ডিয়ান মেলোডির এক অনন্য সংমিশ্রণ। উদিত নারায়ণ এবং কবিতা কৃষ্ণমূর্তির কণ্ঠে গানটি তখন কেবল একটি ফিল্মি ট্র্যাক ছিল না, ছিল ক্যাসেট প্লেয়ারের ঘষামাজা আওয়াজের সাথে মিশে থাকা এক নাগরিক আর্তি। এর সুরের জ্যামিতি ছিল সরল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ধরনের মেলোডিক হুক, যা মানুষের নিউরাল সার্কিটে স্থায়ী স্ফুলিঙ্গ তৈরি করতে সক্ষম।
গানের মূল ছন্দটা দাঁড়িয়ে আছে একটা সলিড ফোর-বাই-ফোর বিটের ওপর, যেটাকে আমরা ‘কিক ড্রাম’ বা বেস ড্রামের আধিপত্য বলি। কিন্তু যতিন-ললিত এখানে একটা মাস্টারি দেখিয়েছেন। তাঁরা শুধু একটা সোজা বিট রাখেননি, বরং তার সাথে যোগ করেছেন সিঙ্কোপেশন—অর্থাৎ তালের ফাঁকে ফাঁকে এমন কিছু অফ-বিট পারকাশন ব্যবহার করেছেন যা গানটাকে একটা বাউন্সি ক্যারেক্টার দেয়।
সংগীত বিজ্ঞানের ভাষায়, একে বলা হয় পলি-রিদমিক টেক্সচার। একদিকে ড্রাম মেশিন একটা কনস্ট্যান্ট লুপ চালাচ্ছে, অন্যদিকে হাতের তালি বা স্ন্যাপের মতো সাউন্ডগুলো শ্রোতার অ্যাটেনশনকে ধরে রাখছে। মেটা-মডার্ন লেন্স দিয়ে দেখলে, এই রিদমটা হল আমাদের আরবান লাইফের মেকানিক্যাল রিপিটেশনের প্রতিফলন—যা একইসাথে বোরিং হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার ভেতরে থাকা ছোটো ছোটো গ্লিচ আর লুপগুলো তাকে অত্যন্ত এনার্জেটিক বানিয়ে তুলেছে।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
মিউজিক প্রোডাকশনে যত দামি প্লাগ-ইন আর কম্প্রেসর ব্যবহার করা হোক-না-কেন, মানুষের গলার ওই ‘র’ ইমোশনকে বিট করা ইমপসিবল। বিন তেরে সনমের সাকসেসের পেছনে বড়ো একটা হাত হল এর ভোক্যাল ডিএনএ। উদিত নারায়ণ আর কবিতা কৃষ্ণমূর্তি এখানে শুধু গাননি, তাঁরা আসলে একধরনের সনিক অ্যাক্টিং করেছেন। ভাষা অর্থহীন হতে পারে, কিন্তু কণ্ঠের কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সি কখনও মিথ্যে বলে না।
উদিত নারায়ণের কণ্ঠের গঠনটা লক্ষ করুন। তাঁর ভয়েসের মধ্যে একটা ন্যাচারাল অন-বোর্ড ইক্যুয়ালাইজার আছে। তাঁর সিল্কি এবং নাসিকা-ঘেঁষা টোনটা গানের মিড-রেঞ্জ ফ্রিকোয়েন্সিগুলোকে এমনভাবে দখল করে নেয় যে মনে হয় সুরটা সরাসরি তোমার কানের খুব কাছে এসে ফিশফিশ করছে। অন্যদিকে, কবিতা কৃষ্ণমূর্তির ভোক্যাল টেক্সচার হল পিওর ‘হাই-ফ্রিকোয়েন্সি শার্পনেস’। তাঁর গলার ওই ক্রিস্টাল ক্লিয়ার কোয়ালিটি গানের হাই-এন্ড ট্রিবল পার্টটাকে প্রাণ দেয়।
উদিত যখন ‘বিন তেরে সনম’ বলছেন, তাঁর গলার নমনীয়তা বা মেলিজমা (একই সিলেবলকে একাধিক নোটে ঘোরানো) শ্রোতার মনে একধরনের নির্ভরতা তৈরি করে। আবার কবিতা যখন ‘আনা হি পড়া সজনা’ গেয়ে ওঠেন, তাঁর ভোক্যাল প্রজেকশনটা আমাদের নিউরনকে সজাগ করে দেয়। এই কনট্রাস্টটাই ভোক্যাল ইমোশনকে ডাইনামিক রাখে।
এই গানের সবচেয়ে আন্ডার-রেটেড পার্ট হল এর ভোক্যাল ফ্রেজিং। শব্দগুলোকে তাঁরা যেভাবে ভেঙেছেন এবং যে জায়গায় শ্বাস নিয়েছেন, সেটাই বিরহের আর্তিটাকে জ্যান্ত করেছে। ‘আআআআআ হেহেহেহে’—আসলে একটা প্রোটো-ট্রান্স স্টেট তৈরি করে। এই ধরনের ফ্রেজিং শ্রোতার মস্তিষ্ককে একটা মেলোডিক ল্যুপের জন্য তৈরি করে দেয়।
আমরা জানি যে প্রেম আসলে একধরনের হরমোনাল ইলিউশন, কিন্তু যখন উদিত আর কবিতা ওই লাইনে তাঁদের ভোক্যাল টেকনিক দিয়ে আর্তিটা ফুটিয়ে তোলেন, তখন সেই ইলিউশনটাই আমাদের কাছে পরম সত্য মনে হয়। তাঁদের গলার ওই ভাইব্রেটো বা স্বরের কাঁপন সরাসরি আমাদের হার্ট-রেটকে সিঙ্ক্রোনাইজ করে ফেলে।
নব্বইয়ের সেই এনালগ রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে কণ্ঠের সূক্ষ্ম মডুলেশনগুলো ধরা পড়ত, যা আজকের ডিজিটাল স্মুথনিংয়ে হারিয়ে যায়। তাঁদের গলার টেক্সচারের মধ্যে একটা ওয়ার্মথ আছে যা আমাদের শৈশব বা মিলেনিয়াল মিউজিকাল নস্ট্যালজিয়াকে ট্রিগার করে।
বিন তেরে সনম যখন স্টুডিওতে শেপ নিচ্ছে, তখন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ছিল অ্যানালগ আর আর্লি-ডিজিটাল-এর এক অদ্ভুত হাইব্রিড স্টেটে। এই গানটা যখন রেকর্ড করা হয়েছিল, তখন ওটা সম্ভবত ২-ইঞ্চি ম্যাগনেটিক টেপে ধরা হয়েছিল। টেপে যখন শব্দ রেকর্ড হয়, তখন সেখানে একধরনের ন্যাচারাল কমপ্রেশন আর স্যাচুরেশন ঘটে। এটা গানের হারমোনিক্সগুলোকে এমনভাবে ব্লেন্ড করে দেয় যে সাউন্ডটা কানে খুব একটা কর্কশ লাগে না।
ওই টেপের ঘর্ষণ আর সূক্ষ্ম টেপ হিস বা নয়েজটাই ছিল জীবনের আসল প্রতিচ্ছবি—যেখানে ইমপারফেকশনই হল বিউটি। আজকের জিরো-নয়েজ ডিজিটাল এনভায়রনমেন্টে আমরা সেই হারানো আত্মাটা খুঁজি, যা ওই অ্যানালগ রেকর্ডিংয়ে ইনবিল্ট ছিল। উদিত আর কবিতার গলা যখন ওই টেপের ভেতর দিয়ে ট্রাভেল করত, তখন তাতে একধরনের অর্গানিক ফিল যোগ হত।
এই গানে যে সাউন্ডস্কেপ তৈরি করেছিলেন, তার মূলে ছিল নব্বইয়ের সেই স্পেসিফিক ইলেকট্রনিক ভাইব। তখনকার বিখ্যাত সব রোল্যান্ড বা ইয়ামাহা কি-বোর্ডের সিগনেচার প্যাচগুলো এখানে ডমিন্যান্ট।
গানের সেই আইকনিক রিফটা সম্ভবত কোনো ডিজিটাল সিন্থেসাইজার থেকে আসা, যা খুব শার্প এবং পাঞ্চি। এটা শ্রোতার অ্যাটেনশনকে এক নিমেষে লক করে দেয়। ড্রামসের প্যাটার্নটা খেয়াল করলে দেখবে, ওটা পিওর হিউম্যান প্লেয়িং নয়, বরং একটা ড্রাম মেশিনের লুপ। কিন্তু সাউন্ড ডিজাইনে চাতুরিটা ছিল এর লেয়ারিংয়ে। যান্ত্রিক বিটের তলায় একটা হালকা পারকাশন বা শেকার যোগ করা হয়েছিল, যা গানটাকে স্রেফ একটা রোবটিক লুপ হতে দেয়নি।
সময়ের চাকায় যখন ২০০০ সাল এল, তখন ‘বিন তেরে সনম’ তার দ্বিতীয় জীবন পেল ডিজে সুকেতুর হাত ধরে। এটি কেবল একটি রিমিক্স ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের সনিক আপসাইক্লিং। ড্রাম মেশিন, সিন্থ-পপ লেয়ার এবং ইকো-রিভার্বের ব্যবহারে গানটি ড্রয়িংরুম থেকে সোজা ক্লাবের ডান্স ফ্লোরে চলে এল।
এই সংস্করণে গানটির টোনাল টেক্সচার বদলে গেল। যেখানে মূল গানে ছিল এক ধরনের লিনিয়ার ইমোশন, রিমিক্স সংস্করণে সেখানে যুক্ত হল স্লো-বার্ন এডিটিং। আজকের ভাষায় যাকে আমরা বলি লো-ফাই বা অ্যাম্বিয়েন্ট মিউজিকের পূর্বসূরি। ডিজিটাল প্রোডাকশনের সেই ভারী বেস এবং লুপের ব্যবহার গানটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি হাই-এনার্জি অ্যান্টিডোট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। এটিই সেই মুহূর্ত যখন গানটি কেবল একটি সুর থেকে কালচারাল মিমে রূপান্তরিত হতে শুরু করে।
সুকেতু যখন গানটিকে রিমিক্স করলেন, তিনি মূল সুরকে ভাঙলেন না। বরং তাকে অন্য এক গতিতে চালালেন। গানের মূল মেলোডি রেখে তিনি তার নিচে বসালেন প্রায় ১২৮–১২৯ বিপিএম গতির ড্যান্স বিট। বেসলাইন একটু ভারী, সিন্থ প্যাড একটু ঝকঝকে, আর ভোকাল স্যাম্পলকে কেটে কেটে নতুন ফ্রেজ বানানো। এই ভারসাম্যটাই আসল ম্যাজিক।
এই সংস্করণে কণ্ঠ দেন জাভেদ আলি ও নিশা কাপাডিয়া। জাভেদের কণ্ঠে ছিল এক ধরনের নরম আবেগ, কিন্তু তার পিছনে চলছিল ক্লাবের এনার্জি। ফলে গানটা হয়ে গেল এক অদ্ভুত জিনিস—একসাথে প্রেমের গান এবং ড্যান্স ট্র্যাক।
এই রিমিক্স ক্লাবগুলোতে বিস্ফোরণ ঘটায়। গানটি টানা বিশ সপ্তাহ চার্টের শীর্ষে ছিল। পার্টি, কলেজ ফেস্ট, ড্যান্স বার—সব জায়গায় বাজতে লাগল।
মানুষের মস্তিষ্ক পরিচিত সুরের প্রতি খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। যখন সেই পরিচিত সুরের সাথে নতুন ছন্দ যোগ হয়, তখন মস্তিষ্ক একই সাথে দুইরকম আনন্দ পায়—পরিচিতির আর নতুনত্বের।
এই দ্বৈত আনন্দই রিমিক্সের আসল শক্তি।
আজকের ডিজিটাল আইসোলেশনের যুগে এই গানটি তার তৃতীয় জীবনে প্রবেশ করেছে। রিলস্ বা শর্টসের এই গোলকধাঁধায় ‘বিন তেরে সনম’ এখন স্রেফ গান নয়, একটি ‘ভাইবাল কারেন্সি’। আধুনিক সাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা গানটির পিচ কমিয়ে যে সংস্করণ তৈরি করেছেন, তা আমাদের ‘ম্যানেজেবল নোভেল্টি’ প্রদান করে। অর্থাৎ পরিচিত ফ্রেমের ভেতরে একটি ছোটো চমক।
এই ‘সনিক মেটামরফসিস’ আমাদের এক অদ্ভুত সত্যের মুখোমুখি করে। গানটি এখন আর কেবল গায়ক বা সুরকারের নয়, এটি এখন ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্টের অংশ। সুরের সেই পুরোনো জ্যামিতি আজকের প্রজন্মের কাছে রেট্রো-ফিউচারিজমের স্বাদ নিয়ে আসে। শূন্যতার ওপরে দাঁড়িয়েও যে আমরা গুনগুনিয়ে এই হুকলাইনটা গাই—এটাই হল আমাদের জীবনের আল্টিমেট সার্থকতা।
কেন এই গানটি সময়ের চেয়েও বেশি জেদি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এর সাইকো-অ্যাকুস্টিক ডিজাইনে। সংগীত আমাদের মনের ভেতরে এমন এক ধরনের অডিয়ো টাইম ক্যাপসুল তৈরি করে যা আমাদের সেই মানুষ বা জায়গাগুলোর সাথে যুক্ত করে যারা আজ আর নেই। এটি আমাদের ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক বা আত্মচিন্তার স্তরকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে আমরা বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ভেতরের শূন্যতার সাথে কথা বলতে পারি।
নব্বইয়ের সেই ক্যাসেট টেপ থেকে আজকের স্পটিফাই প্লে-লিস্ট—সবই আসলে একটা ইলিউশন। তবু ওই এক টুকরো সুরের মায়ায় আমরা অমর হতে চাই। স্মৃতিরা ধুলো হবে, নয়েজরা হার মানবে, কিন্তু ‘বিন তেরে সনম’-এর মতো সুরগুলো সময়ের লুপে বারবার ফিরে আসবে। কারণ টোনাল ট্রুথ এটাই যে—মানুষ মরণশীল, কিন্তু তার প্রিয় সুরের কম্পাঙ্ক মহাকাশে কোনো এক অজানা সিগন্যাল হয়ে অনন্তকাল রয়ে যায়।
দিনশেষে পৃথিবীটা গোল আর জীবনটা একটা লুপ। আর সেই লুপের সেরা সাউন্ডট্র্যাক হল এই গানটা।



