preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৯
ধারাবাহিক

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৯

সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ নবম পর্ব।

সুরের জগতে স্থায়িত্ব এক মরীচিকা। যেখানে মুক্তি পাওয়ার সাত দিনে গান মিম হয়ে যায় আর সপ্তাহান্তে ফিকে হয়ে আসে স্মৃতির পর্দা থেকে, সেখানে কিছু সুর থেকে যায়—কেবল ট্রেন্ড হিসেবে নয়, বরং একটি যাপনচিত্রের দলিল হিসেবে। শান্তনু মৈত্র সেই বিরল ধারার সংগীতকার, যিনি বিজ্ঞাপন থেকে চলচ্চিত্রের ফ্রেম, সর্বত্রই এক ধরনের ‘টোনাল ট্রুথ’ বা ধ্বনিগত সত্যের সন্ধান করেছেন। তাঁর কাজের আলোচনা মানে কেবল মেলোডির মুগ্ধতা নয়, বরং শব্দের শরীর, মিক্সিংয়ের ম্যাপ আর সুরের সনিক সিগনেচারকে মেধার মাপকাঠিতে বিচার করা।

নব্বইয়ের শেষের দিকে ভারতীয় স্বাধীন সংগীত বা ইন্ডি-পপ যখন চটকদার ভিজ্যুয়াল আর দ্রুত লয়ের ড্যান্স ট্র্যাকের নেশায় বুঁদ, ঠিক তখনই ‘অব কে সাওয়ান’ (১৯৯৯) অ্যালবামের মাধ্যমে শান্তনু মৈত্র এক ভিন্নধর্মী সুরের স্থাপত্য নির্মাণ করেন। এখানে মেলোডিক মিনিমালিজম বা সুরের পরিমিতি ছিল তাঁর প্রধান হাতিয়ার। শুভ মুদগলের শাস্ত্রীয় কণ্ঠের গাম্ভীর্যকে তিনি পপ মিউজিকের লঘুত্বের সাথে মেশাননি, বরং তাকে এক ধরনের গ্রাউন্ডেড বা মাটির কাছাকাছি থাকা সুরের বিন্যাসে স্থাপন করেছেন।

সাংস্কৃতিক সঞ্চারের সূক্ষ্ম সংকেত হিসেবে এই অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাকটি লক্ষ করলে দেখা যায়, সেখানে হারমনিক হস্তক্ষেপ খুব সামান্য। সুরের স্কেলটি বর্ষার রাগাশ্রয়ী হলেও তার চলন ছিল অত্যন্ত আধুনিক। শান্তনু প্রমাণ করেছিলেন যে, উচ্চকিত অর্কেস্ট্রেশন ছাড়াও কেবল কণ্ঠের টেক্সচার আর রিদমিক প্যাটার্ন দিয়েও জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা বদলে দেওয়া যায়। এটি কেবল গান ছিল না, ছিল শব্দের স্তরবিন্যাস বা লিরিক্যাল লেয়ারিংয়ের এক অনন্য পাঠ।

সাংস্কৃতিক অবস্থানের দিক থেকে দেখলে, শান্তনু মৈত্র সেই সময়ে ইন্ডি-পপকে কেবল নাচের গান হিসেবে দেখেননি। তাঁর সুরের স্থাপত্যে শাস্ত্রীয় রাগ-রাগিণীর রেশ থাকলেও তা ছিল সমকালীন সনিক সিগনেচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ‘অব কে সাওয়ান’-এর ভিডিয়োতে পরিচালক প্রদীপ সরকারের যে মেটিকুলাস ডিটেইলিং ছিল, তা শান্তনুর সুরের স্তরবিন্যাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেখানে বৃষ্টি কেবল একটি রোমান্টিক আবহ নয়, বরং এক আদিম উল্লাসের প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছিল।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

সংগীত কি কেবল বিনোদন? না কি এটি মনের মানচিত্র আর মুহূর্তের মুদ্রা? ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মন কে মঞ্জিরে’ অ্যালবামে শান্তনু মৈত্র সংগীতকে সোশ্যাল কমিউনিকেশন বা সামাজিক বার্তার বাহক হিসেবে ব্যবহার করেন। নারীর স্বপ্ন, ক্ষমতায়ন আর অকথিত যন্ত্রণার সুর যখন শান্তনুর সংগীতায়োজনে ধরা দেয়, তখন তা মেলোডির গণ্ডি পেরিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক দলিলে পরিণত হয়।

এই অ্যালবামের প্রতিটি ট্র্যাকের সনিক সিগনেচার ছিল ভিন্ন। শান্তনু এখানে সুরের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন শব্দের ‘টোনাল টেক্সচার’কে। গানের প্রোডাকশন কি ব্যক্তিত্বের প্রতিধ্বনিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে? ‘মন কে মঞ্জিরে’-তে শান্তনু প্রমাণ করেন যে, প্রোডাকশন এখানে বন্দি নয়, বরং সহায়ক। এই প্রকল্পের সংগীতায়োজনে শান্তনু মৈত্র যে ধরনের শব্দের স্তরবিন্যাস বা লেয়ারিং ব্যবহার করেছিলেন, তা অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ। সুরের সনিক সিগনেচার এখানে রুক্ষ এবং বাস্তবানুগ। শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব থাকলেও শান্তনু এখানে ‘টোনাল টেক্সচার’-কে মাটির কাছাকাছি রেখেছিলেন। প্রসূন জোশীর লিরিক্যাল লেয়ারিং এবং শান্তনুর কম্পোজিশনাল কনস্ট্রাকশন মিলে এমন এক সুর তৈরি করেছিল যা নারীর অধিকার এবং আত্মপরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করে।

সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখলে প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের সামাজিক প্রজেক্টে সুর কি বাণীর ভারে চাপা পড়ে যায়? শান্তনু অবশ্য দক্ষতার সাথে সেই ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। তিনি ‘সাংস্কৃতিক সঞ্চারের সূক্ষ্ম সংকেত’ ব্যবহার করে প্রমাণ করেছেন যে, সিরিয়াস মেসেজ বা গভীর বার্তাও পপুলার কালচারের আধারে পরিবেশন করা সম্ভব ।

বিজ্ঞাপন জগতের ইতিহাসে শান্তনু মৈত্রর হ্যাপিডেন্ট হোয়াইট-এর জন্য বানানো জিঙ্গল (২০০৬) কেবল একটি জিঙ্গল নয়, সুরের এক ত্রিমাত্রিক পাঠ। কান চলচ্চিত্র উৎসবে ব্রোঞ্জ লায়ন জয়ী এই কাজের কম্পোজিশনাল কনস্ট্রাকশন নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

রাম মাধবানী পরিচালিত এই বিজ্ঞাপনে শান্তনু যে ধরনের সংগীত নির্মাণ করেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত জটিল এবং গাণিতিকভাবে নিখুঁত। এখানে শব্দের স্তরবিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছিল যে, মানুষের দাঁতের ঔজ্জ্বল্য যখন আলো ছড়াচ্ছে, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডের কোরাস আর ড্রাম-বিট এক ধরনের সনিক সারপ্রাইজ তৈরি করছে। এখানে সংগীত মেধার মাপকাঠিতে ধরা দিয়েছে। মিক্সিংয়ের মর্ম বুঝতে হলে এই জিঙ্গলটি বারবার শোনা দরকার—কীভাবে সাব-বেস আর ভোকাল হারমনি একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

এই কাজটির মূল ভিত্তি হল সুফি-কাওয়ালি আধার। কৈলাশ খেরের তীক্ষ্ণ ও দরাজ কণ্ঠ এখানে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে, যা বিজ্ঞাপনের অবাস্তব বা পরাবাস্তব ভিজ্যুয়ালের সাথে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে। ‘তেরা দিল রোশন, তেরা মন রোশন’—প্রসূন জোশীর এই বাণীর সাথে শান্তনুর সুরের স্থাপত্য এমনভাবে যুক্ত হয়েছিল যে, তা কেবল দাঁতের শুভ্রতা নয়, বরং এক ধরনের অভ্যন্তরীণ আলোর কথা বলে ।

সংগীতায়োজনের সংগঠনে আমরা দেখি এক বিশাল কয়্যার বা সমবেত কণ্ঠের ব্যবহার। এই কয়্যারটি যখন উচ্চগ্রামে পৌঁছায়, তখন তা অরকেস্ট্রেশনের সাথে মিশে এক ধরনের সনিক এক্সপ্লোশন বা শব্দের বিস্ফোরণ ঘটায়। এটি মূলত মানুষের হাসির শুভ্রতাকে শব্দের মাধ্যমে অনুবাদ করার চেষ্টা। শান্তনু এখানে মিক্সিংয়ের মর্ম এবং টোনাল টেক্সচার নিয়ে এমনভাবে খেলেছেন যে, প্রতিটি দৃশ্যের পরিবর্তনের সাথে সংগীতের টাইমিং বা লয় পরিবর্তিত হয়।

বিজ্ঞাপনটির প্রতিটি বাঁক—সাইকেল চালকের ব্রিজ পার হওয়া থেকে শুরু করে লাইটপোস্টে ঝুলে থাকা মানুষের হাসি—সবই শান্তনুর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের সাথে নিখুঁতভাবে সিঙ্ক করা। এই ‘সাউন্ড অ্যান্ড সাউন্ড’-এর ভিড়ে শান্তনু নৈঃশব্দ্যকেও ব্যবহার করেছেন এক বিশেষ হাতিয়ার হিসেবে। জিংগেলটির মাঝখানে যখন মুহূর্তের জন্য তাল কেটে যায়, সেই ‘হারমনিক হস্তক্ষেপ’ শ্রোতাকে পরবর্তী উচ্চকিত সুরের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

এটি কেবল একটি বিজ্ঞাপনের গান নয়, বরং এটি এক ধরনের ‘সনিক সিগনেচার’ যা প্রমাণ করে যে, ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরিতে সুরের স্থাপত্য কতটা কার্যকর হতে পারে।

এটি কেন ‘প্লেলিস্ট-প্রবণ’ নয়? কারণ এটি বিজ্ঞাপনের চাহিদায় তৈরি, অথচ এর অন্তর্লীন অন্তর্নিহিততা এতটাই গভীর যে আজও তা সংগীত গবেষকদের ভাবায়।

শান্তনু মৈত্রর কাজে প্রায়ই নৈঃশব্দ্য বা সাইলেন্স একটি বড়ো ভূমিকা পালন করে। ‘গুলজার ইন কনভারসেশন উইথ টেগোর’ প্রজেক্টে সুরের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে সাহিত্যের সুরকার। এখানে লিরিক্যাল লেয়ারিং ছিল প্রধান। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর গুলজারের অনুবাদ যখন শব্দের শরীরে মানুষের মুখ হয়ে ধরা দিচ্ছিল, শান্তনু তখন তার সুরের স্কেলকে খুব নিচে রেখেছিলেন। ২০১৬ সালে প্রকাশিত অ্যালবামটি শান্তনু মৈত্রের সংগীত জীবনের এক পরিণত অধ্যায়। এখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের সেইসব কবিতা নিয়ে কাজ করেছেন, যেগুলোকে কবি স্বয়ং সুরে বাঁধেননি। গুলজারের অনুবাদ এবং শান্তনুর সুরের এই সংলাপে নৈঃশব্দ্য বা সাইলেন্স একটি প্রধান চরিত্রের ভূমিকা পালন করে।

শান্তনু মৈত্র বিশ্বাস করেন যে, শ্রোতাকে সব কিছু বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; সুরের মধ্যে কিছু শূন্যস্থান বা ‘পজ’ রাখা উচিত যা শ্রোতার কল্পনাকে উসকে দেবে। এই অ্যালবামে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের সেই চিরন্তন গাম্ভীর্য বা ‘অস্টেরিটি’ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। ‘সিঙ্গার কো রেহনে দো’ বা ‘ম্যায় ওহি হুঁ’ গানগুলোতে আমরা দেখি যন্ত্রসংগীতের বাহুল্য নেই বললেই চলে। শান্তনু এখানে ‘মেলোডিক মিনিমালিজম’-এর চূড়ান্ত প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।

সুরের স্থাপত্যে তিনি এখানে সাত মাত্রার ছন্দের এক বিশেষ ব্যবহার করেছেন, যা হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত এবং রবীন্দ্রসংগীতের এক সাধারণ সংযোগস্থল। শান্তনু স্বীকার করেছেন যে, এই সাত মাত্রার চলন তাঁর কাছে অত্যন্ত ‘সেনসুয়াল’ বা ইন্দ্রিয়জ মনে হয়, তবে সমালোচকের দৃষ্টিতে এটি একটি ‘সনিক ট্র্যাপ’ হতে পারে; বারবার একই ছন্দের ব্যবহার সুরের বৈচিত্র্যকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে কি? শান্তনু অবশ্য বাণীর ওপর জোর দিয়ে এই সমালোচনাকে স্তিমিত করতে চান। তাঁর মতে, এখানে সুরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল বাণীর গভীরতা বা ‘লিরিক্যাল লেয়ারিং’।

গুলজারের দরাজ কণ্ঠের কবিতা পাঠ এখানে কেবল একটি ভূমিকা নয়, বরং তা সুরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি গানের শুরুতে গুলজারের পাঠ এক ধরনের ‘টোনাল প্রিপারেশন’ তৈরি করে। যেমন ‘ম্যায় গুমতা হুঁ’ গানটিতে গুলজার যখন মৃগনাভির সন্ধানে থাকা কস্তুরী মৃগের কথা বলেন, তখন শান্তনুর বাঁশি এবং অ্যাকর্ডিয়ন সেই অন্বেষণের ছন্দ তৈরি করে। এখানে সুর কেবল শব্দের অনুসারী নয়, বরং সুর নিজেই একটি সাহিত্যিক বয়ান তৈরি করে।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব হল এটি রবীন্দ্রসংগীতের পরিচিত সীমানা ভেঙে তাকে এক বৈশ্বিক এবং সমকালীন মাত্রা দিতে পেরেছে। দক্ষিণ ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র যেমন মৃদঙ্গম বা কঞ্জিরা-র ব্যবহার রবীন্দ্রসংগীতের নন্দনতত্ত্বে এক ধরনের ‘হারমনিক হস্তক্ষেপ’ ঘটিয়েছে, যা ইতিবাচক।

এটি সংগীতের টেক্সচার সংরক্ষণের এক আর্কাইভাল আকাঙ্ক্ষা। এখানে সুর কেবল মেলোডি নয়, বরং এক ধরনের ধ্যানী দর্শন। শব্দের শরীর থেকে কীভাবে এক বিষণ্ণ বিবরণ বের করে আনা যায়, শান্তনু তা জানতেন। এই প্রজেক্টটি অ্যালগরিদমের অন্ধত্বকে প্রশ্ন করে—কেন সহজ জনপ্রিয়তার বদলে এই ধরনের জটিল শিল্প তৈরি হয়?

শান্তনু মৈত্রের সাম্প্রতিকতম এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হল ‘সংস অফ দ্য রিভার গঙ্গা’। ৩০০০ কিলোমিটারের সাইকেল যাত্রায় তিনি গঙ্গার প্রবাহের সাথে সুরের এক নিবিড় মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। এই প্রকল্পে তিনি যে ধরনের ফিল্ড রেকর্ডিং বা মাঠ পর্যায়ের শব্দ ধারণের কৌশল ব্যবহার করেছেন, তা আধুনিক সংগীত উৎপাদন ব্যবস্থার এক ধরনের প্রতিবাদ বলা যেতে পারে।

‘সংস অফ দ্য রিভার গঙ্গা’ ( ২০২২ ) প্রজেক্টে শান্তনু মৈত্রকে একজন মিউজিক ডিরেক্টরের চেয়েও বেশি একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার বা শব্দ গবেষক হিসেবে মনে হয়। এখানে ফিল্ড রেকর্ডিং আর এথনোগ্রাফিক সাউন্ড ডিজাইন মিলেমিশে একাকার। গঙ্গার পাড়ের মানুষের শব্দ, বাতাসের হাহাকার আর স্থানীয় লোকসংগীতের সুর মিলে তৈরি হয়েছে এক আধুনিক যাপনচিত্র। আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিওগুলো অনেক সময় শিল্পীর সৃজনশীলতাকে বন্দি করে ফেলে। তাই তিনি এই অ্যালবামের অধিকাংশ গান গঙ্গার পাড়ে বসেই রেকর্ড করেছেন। সেখানে পাশে ছাগলের ডাক, পাখির কলকাকলি বা এমনকি দূর থেকে আসা ট্রাক্টরের শব্দকেও তিনি বাতিল করেননি। লাইভ লেয়ার কি এখানে লুপের কাছে লুপ্ত? না, বরং শান্তনু লাইভ রেকর্ডিংকে দিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতা। এআই-নির্মিত নির্ভুলতা যেখানে মানবিক ত্রুটিগুলোকে মুছে দিচ্ছে, শান্তনু সেখানে নদীর ভাঙনের শব্দকে সুরের মর্যাদা দিয়েছেন। এটি সংগীতের কেবল চিত্র নয়, বরং চার্ট-নিরপেক্ষ এক চূড়ান্ত সত্য।

শান্তনু যখন কৌশিকী চক্রবর্তী বা অম্বি সুব্রহ্মণ্যমকে নিয়ে মাঝরাতে গঙ্গার বুকে নৌকায় বসে গান রেকর্ড করেন, তখন সেখানে কেবল সুর তৈরি হয় না, তৈরি হয় এক ধরনের ‘সনিক মেমোরি’। এখানে সাব-বেস সুরকে সরিয়ে দেয় না, বরং গঙ্গার কলতান সুরের এক আবশ্যিক স্তর বা লেয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

গঙ্গার যাত্রাপথে শান্তনু মুর্শিদাবাদের মৌখিক ঐতিহ্য বা বাউস্কর সম্প্রদায়ের মতো প্রান্তিক সংগীত সংস্কৃতির মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি এই আঞ্চলিক সুরগুলোকে কেবল ব্যবহার করেননি, বরং সেগুলোর ‘টোনাল টেক্সচার’ অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বসংগীতের সাথে যুক্ত করেছেন। ‘ভাগীরথী’ গানটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে লোকসংগীতের সরলতা এবং অম্বির বেহালার শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্য কীভাবে একবিন্দুতে এসে মিলেছে ।

এই প্রকল্পটির মাধ্যমে শান্তনু প্রমাণ করেছেন যে, সংগীত কেবল স্টুডিওর চার দেয়ালে বন্দি কোনো কনটেন্ট নয়, এটি একটি জীবন্ত কালচারাল কনটেক্সট বা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। সুরের স্থাপত্য এখানে গঙ্গার গতিপথের মতোই সর্পিল এবং অনিশ্চিত, যা একে এক অনন্য নন্দনতাত্ত্বিক উচ্চতা দেয়।

চলচ্চিত্রে শান্তনু মৈত্র অনেক সময় পরিচালক বা প্রযোজকের মর্জিতে সুর দিতে বাধ্য হন, যা ট্রেন্ড ত্বরিত করার এক প্রচেষ্টা। কিন্তু তাঁর অ-চলচ্চিত্র বা নন-ফিল্‌ম কাজগুলোতে তিনি অনেক বেশি ধীর, ধ্যানী ও দৃঢ়। সিনেমার গানের ক্ষেত্রে সুর অনেক সময় মিম হওয়ার নেশায় থাকে, কিন্তু তাঁর এই ব্যক্তিগত প্রজেক্টগুলোতে সুরের সত্তা সংরক্ষণের এক স্বল্পায়ু অথচ সৎ চেষ্টা লক্ষ করা যায়। পরিশেষে বলা যায়, শান্তনু মৈত্র সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁরা সংগীতকে কেবল কনটেন্ট হিসেবে নয়, বরং কালচারের কনটেক্সটে বা সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে দেখেন।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা