preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৭
প্রবন্ধ

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৭

সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ সপ্তম পর্ব।

আমরা কি সত্যিই গান শুনি, না কি কেবল এক ধরনের সনিক কন্ডিশনিংয়ের শিকার হই? আজকের ডিজিটাল গোলকধাঁধায় ভাইরালিটি যখনই গুণমানের বিকল্প হিসেবে হাজির হয়, তখনই বুঝতে হবে আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয় আসলে এক সুপরিকল্পিত কারসাজির হাতে বন্দি। জনপ্রিয়তা আজ আর কোনো শৈল্পিক স্বীকৃতির মাপকাঠি নয়, বরং তা ডেটা সায়েন্সের এক চূড়ান্ত বিজয়। যখন লক্ষ লক্ষ কান একইসাথে একই ল্যুপে দুলছে, তখন প্রশ্ন জাগে—এটি কি শিল্পের আবেদন, না কি মস্তিষ্কের ডোপামিন রিসেপ্টরগুলোকে ট্রিগার করার এক সস্তা কৌশল? সংখ্যাতত্ত্ব যেখানে সত্যের ছদ্মবেশ ধরে, সেখানে টোনাল ট্রুথ খোঁজা মানেই সেই মিথ্যে মহিমাটাকে স্ক্যালপেল দিয়ে চিরে দেখা। আজকের ব্যবচ্ছেদ দুটি বিপরীত মেরুর সুর নিয়ে: একটি বৈশ্বিক উৎপাদনের নিখুঁত নীল নকশা, অন্যটি বলিউডি নস্টালজিয়ার পরিচিত দীর্ঘশ্বাস।

বিটিএসের পুনরুত্থান এবং তাদের অ্যরিয়াং (ARIRANG) অ্যালবামের শীর্ষ ট্র্যাক সুইম (SWIM) আজ সারা বিশ্বের প্লে-লিস্টের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে। কিন্তু এই সুরের পরতে পরতে যা লুকিয়ে আছে, তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতা নয়, বরং এক ইঞ্জিনিয়ারড পারফেকশন। গানটি শুরু হওয়ার প্রথম পাঁচ সেকেন্ডেই আপনার মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য যে হাই-ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থ প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে, তা আসলে এক ধরনের ‘সনিক হুক’—যা অ্যালগরিদমের নিউরাল নেটওয়ার্ককে খুশি করার জন্য তৈরি। এর বিট স্ট্রাকচারের দিকে তাকালে দেখা যায় এক গাণিতিক নির্ভুলতা; প্রতিটি কিক ড্রাম এবং স্নেয়ার এমনভাবে প্লেস করা হয়েছে যেন তা শোনার সময় আপনার মস্তিষ্কে কোনো ঘর্ষণ তৈরি না হয়।

ভোকাল প্রসেসিংয়ে অটো-টিউনের এমন এক প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, যা সাতজন ভিন্ন মানুষের কণ্ঠকে এক অতিপ্রাকৃত, মসৃণ ডিজিটাল টেক্সচারে রূপান্তরিত করে। এখানে কোনো ভুল নেই, কোনো বাড়তি নিশ্বাস নেই, নেই কোনো মানবিক হেঁচকি। ‘সুইম’-এর লিরিক্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে জল বা ‘সাঁতার’-কে রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই হিসেবে। “Diving into the static, losing the shore / I don’t find the surface anymore”—এই শব্দগুলোর মধ্যে এক ধরনের মহাজাগতিক বিচ্ছিন্নতা আছে ঠিকই, কিন্তু সেই হাহাকার বড্ড বেশি পরিচ্ছন্ন। এটি এক ধরনের ‘সেফ সলিটিউড’ বা নিরাপদ একাকিত্ব। মিক্সিং এবং মাস্টারিংয়ে লো-এন্ড বা বেসকে এমনভাবে কম্প্রেস করা হয়েছে যাতে স্মার্টফোনের স্পিকার থেকে শুরু করে হাই-এন্ড হেডফোন—সব জায়গাতেই তা সমানভাবে ‘সুইট’ শোনায়। এই নিখুঁত প্রোডাকশন আসলে এক ধরনের ‘সনিক ডিস্টোপিয়া’। যখন আবেগকেও ল্যাবে তৈরি করা হয়, তখন তা আর অনুভূতি থাকে না, হয়ে ওঠে এক ধরনের সিম্যুলেটেড এক্সপেরিয়েন্স।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

ডিজিটাল এই শীতলতার বিপরীতে যখন আমরা ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ সিনেমার ‘ফির সে’ গানটির মুখোমুখি হই, তখন দৃশ্যপট বদলে যায়। লিরিক্সের শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়ে এক পরিচিত মাটির গন্ধ। ইরশাদ কামিলের কলম এখানে প্রচলিত বিরহগাথা লিখছে না, তিনি লিখছেন রিপিটেশন ট্রমা বা একই যন্ত্রণার বৃত্তে বারবার ফিরে আসার গল্প। “ফির সে ওহি রাস্তা, ওহি মোড় / কুছ খিলোনা টুট গয়ে, কুছ খ্যায়াল ছোড়”—কামিল এখানে খিলোনা (খেলনা) শব্দটিকে ব্যবহার করছেন আমাদের ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে। বিটিএস-এর লিরিক্সে যেখানে এক ধরনের ডিজিটাল অপটিমিজম বা কৃত্রিম আশাবাদ থাকে, কামিল সেখানে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন এক আয়নার সামনে, যার পারদ চটে গেছে। তাঁর শব্দচয়ন—যেমন খামখাহ (অকারণে) বা সজি’ (ষড়যন্ত্র)—প্রমাণ করে যে এই গানটি কেবল বিচ্ছেদের নয়, বরং নিয়তির এক নিষ্ঠুর ল্যুপের।

সাউন্ড ডিজাইনের ক্ষেত্রে ‘ফির সে’ অনেক বেশি অর্গানিক এবং অগোছালো। সুরের স্থাপত্য এখানে অনেকটা পুরোনো বাড়ির মতো—যিনি এর নির্মাতা, তিনি জানেন কোথায় ফাটল ধরলে তার সৌন্দর্য বাড়ে। সুরকার শাশ্বত সচদেব এখানে প্রথাগত বলিউডি অর্কেস্ট্রেশন এড়িয়ে গেছেন। গানটির মেরুদণ্ড হল একটি অ্যাক্যুস্টিক গিটার ল্যুপ, যা বাজিয়েছেন পরেশ কামত। এই ল্যুপটি বারবার ফিরে আসে, যা শ্রোতার অবচেতন মনে এক ধরনের অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারের মতো কাজ করে। গায়ক অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠকে এখানে কোনো গ্লসি প্রোডাকশনের ভেতর রাখা হয়নি। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় একে বলা হয় ড্রাই মিক্স। কণ্ঠের প্রতিটি কম্পন, এমনকি শ্বাস নেওয়ার সেই অতি-মানবিক মুহূর্তগুলোকেও এখানে অক্ষত রাখা হয়েছে। মিক্সিং ইঞ্জিনিয়ার শাদাব রায়িন এই ট্র্যাকে হেডরুম বা শব্দের অবকাশ রেখেছেন প্রচুর। ড্রামসের কিক এখানে বুকের ভেতর ধাক্কা মারে না, বরং এক ধরনের ‘ডাল থাড’ বা ভোঁতা যন্ত্রণার মতো অনুরণিত হয়।

এই দুই মেরুর তুলনামূলক পাঠ আমাদের এক অদ্ভুত সংকটের মুখে ফেলে দেয়। একদিকে আছে ‘সুইম’-এর সনিক প্রিসিশন বা যান্ত্রিক সূক্ষ্মতা, অন্যদিকে ‘ফির সে’-র ইমোশনাল ভালনারেবিলিটি বা আবেগীয় ভঙ্গুরতা। একটি গান আপনাকে ভবিষ্যতের এক বর্ণিল কিন্তু প্রাণহীন উচ্চতায় নিয়ে যায়, অন্যটি আপনাকে অতীতে টেনে নিয়ে যায়—যেখানে স্মৃতিরা চাবুকের মতো কাজ করে। ‘সুইম’ যদি হয় এক চকমকে গ্লাস ফিনিশ বিল্ডিং, তবে ‘ফির সে’ হল বর্ষার দিনে ভিজে যাওয়া এক প্রাচীন দেওয়াল।

নিউরোসায়েন্স বলছে, ল্যুপ বা পুনরাবৃত্তি আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের সম্মোহন তৈরি করে। যখন আমরা বারবার একই ধাঁচের প্রোডাকশন শুনি, তখন আমাদের নিউরাল সার্কিট সেই প্যাটার্নটাকেই একমাত্র ধ্রুবক বলে ধরে নেয়। আধুনিক পপ মিউজিক আজ এই বৈজ্ঞানিক সত্যটাকেই ব্যবহার করছে। তারা আপনাকে গান শোনাচ্ছে না, তারা আপনার অভ্যেস তৈরি করে দিচ্ছে। ‘সুইম’-এর সেই হাই-টেক সাউন্ড এবং ‘ফির সে’-র সেই চিরাচরিত হাহাকার—দুটোই শেষপর্যন্ত আপনার শোনার ক্ষমতাকে একমুখী করে তোলে।

সংগীত কি তাহলে কেবলই এক ধরনের বিপণনযোগ্য উদ্দীপক? সুরের সেই প্রাচীন শক্তি কি আজ ডিজিটাল আর মেমোরি ল্যুপের ভিড়ে ল্যুপ্ত হতে বসেছে? আমরা যখন হেডফোন কানে দিয়ে এই শব্দতরঙ্গের সমুদ্রে ঝাঁপ দিই, তখন আমরা কি কিছু খুঁজে পাই, না কি স্রেফ নিজেদের হারিয়ে ফেলি? অ্যালগরিদমের সেই নির্ভুল জ্যামিতি আর স্মৃতির সেই ক্ষয়ে যাওয়া আর্কিটেকচার—এই দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার শ্রবণ কি আজও স্বাধীন? না কি আমরা সবাই এক অমোঘ সনিক ভাইরাসের বাহক হয়ে বেঁচে আছি, যেখানে মুক্তি কেবল পরবর্তী স্কিপ বাটনে?

উত্তরটা অ্যালগরিদমের কাছে নেই, আছে আপনার হেডফোনের সেই নিঃসঙ্গ নীরবতায়। প্রশ্নটা সুরের নয়, প্রশ্নটা আমাদের অস্তিত্বের কম্পাঙ্কের। সেই কম্পাঙ্ক কি আজও আমাদের নিজস্ব, না কি তা অন্য কেউ টিউন করে দিচ্ছে?


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা