সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ পঞ্চম পর্ব।
টোনাল ট্রুথের এই বিশেষ পর্বে আমরা প্রবেশ করছি একবিংশ শতাব্দীর সংগীত-সভ্যতার এক জটিল জগতে—যেখানে সুর কেবল নান্দনিক অভিজ্ঞতা নয়, বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মনস্তত্ত্ব এবং বিপণনের সমবায়ে তৈরি এক বৈশ্বিক শক্তিক্ষেত্র। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল থেকে শুরু হওয়া এই সাউন্ডওয়েভ আজ কলকাতা কিংবা ঢাকার অলিগলিতেও প্রতিধ্বনিত হয়। স্কুলের ইউনিফর্ম পরা কিশোরীর কানে, মধ্যবিত্ত বাড়ির ড্রয়িংরুমে, কিংবা রাত জেগে স্ক্রল করা মোবাইল স্ক্রিনে—সবখানেই এক নামের অনুরণন শোনা যায়: বিটিএস। কিন্তু এই সংগীতীয় উন্মাদনার উৎস বুঝতে গেলে আমাদের প্রথমেই ফিরে যেতে হবে কে-পপ শিল্পের সেই আঁতুড়ঘরে, যেখানে সুর জন্মায় না স্বতঃস্ফূর্ততার বুনো বাগানে; বরং তৈরি হয় কঠোর শৃঙ্খলা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং বাজার-বান্ধব পরিকল্পনার দীর্ঘ পরীক্ষাগারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংগীত শিল্প গত তিন দশকে একটি অত্যন্ত সংগঠিত উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে ‘কোরিয়ান ঢেউ’ বা হ্যালিউ যখন পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে প্রথম আলোড়ন তোলে, তখন থেকেই সংগীত সংস্থাগুলো এক বিশেষ আইডল-প্রশিক্ষণ পদ্ধতি তৈরি করতে শুরু করে। তেরো চোদ্দো বছরের কিশোর-কিশোরীদের নির্বাচন করে তাদের বহু বছর ধরে গান, নাচ, ভাষা, অভিনয় এবং জনসমক্ষে আচরণের কঠোর অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে গড়ে তোলা হয়। এই প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনেক সময় সামরিক শৃঙ্খলার মতো কঠোর। কিন্তু এর লক্ষ্য সুস্পষ্ট—বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারে এমন এক ‘পারফেক্ট পারফর্মার’ তৈরি করা। এই সাংস্কৃতিক শিল্পকারখানার ভেতরেই জন্ম নেয় এক নতুন ধরনের সংগীত অর্থনীতি, যেখানে প্রতিভা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রোডাকশন, ভিজ্যুয়াল নির্মাণ এবং অ্যালগরিদমিক বিপণন।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
এই পটভূমিতেই দু-হাজার তেরো সালে বিগ হিট এন্টারটেইনমেন্ট নামের একটি তুলনামূলক ছোটো সংস্থা থেকে আত্মপ্রকাশ করে সাত সদস্যের একটি দল—বিটিএস। সে-সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সংগীত শিল্পে এসএম, ওয়াইজি এবং জেওয়াইপি—এই তিনটি বৃহৎ সংস্থার আধিপত্য ছিল প্রায় অদম্য। তাদের বিরুদ্ধে একটি ছোটো সংস্থার এই উদ্যোগ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বিটিএস-এর প্রথম দিককার সংগীত, বিশেষ করে তাদের হিপহপ-প্রভাবিত আত্মপ্রকাশ, দ্রুত তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাদের প্রাথমিক গানগুলোতে স্কুলজীবনের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশার ভার এবং আত্মপরিচয়ের সংকটের মতো বিষয় উঠে আসে। ফলে তারা কেবল একটি বয়-ব্যান্ড হিসেবে নয়, বরং যুবসমাজের এক প্রতীকী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে।
তবে বিটিএস-এর প্রকৃত সাফল্যের রহস্য লুকিয়ে আছে তাদের সংগীতের শব্দস্থাপত্যে। আধুনিক কে-পপ প্রোডাকশন মূলত এক বহুমাত্রিক সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়া। এখানে গান কেবল সুর ও তাল নয়; এটি এক জটিল ডিজিটাল নির্মাণ। বিটিএস-এর অধিকাংশ গানের ছন্দচক্র চার-চার মাত্রার পশ্চিমা পপ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও তার ভেতরে হিপহপের ট্র্যাপ বিট এবং ইলেকট্রনিক নৃত্যসংগীতের সাইডচেইন কম্প্রেশন ব্যবহার করা হয়। এই কম্প্রেশন প্রযুক্তিতে বেস ফ্রিকোয়েন্সি প্রতিটি ড্রাম আঘাতের সঙ্গে সামান্য নিচে নেমে আবার উঠে আসে। ফলে শ্রোতার শরীরে এক ধরনের ছন্দময় চাপ তৈরি হয়—যা নাচের সংগীতে অত্যন্ত কার্যকর।
বিটিএস-এর সংগীতে কণ্ঠের স্তরবিন্যাসও অত্যন্ত জটিল। একটি প্রধান কণ্ঠের ওপর একাধিক হারমোনি ট্র্যাক বসিয়ে এক ধরনের ধ্বনি-প্রাচীর তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একই লাইন ভিন্ন টোনে রেকর্ড করে ‘ডাবল ট্র্যাকিং’ করা হয়, যাতে কণ্ঠে ঘনত্ব আসে। অটো-টিউন প্রযুক্তি এখানে কেবল ত্রুটি সংশোধনের জন্য নয়; এটি কণ্ঠকে এক ধরনের ধাতব মসৃণতা দেয়। এই মসৃণতা কণ্ঠকে বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে এক প্রায় অতিমানবীয় টোনে পৌঁছে দেয়।
সিন্থেসাইজারের ব্যবহারও এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অধিকাংশ গানে একটি প্রধান মেলোডিক সিন্থ লাইন থাকে, যার নিচে বিস্তৃত প্যাড সাউন্ড গানের আবহ তৈরি করে। উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির আরপেজিও নোটগুলি শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখে। ফলে গানের প্রতিটি স্তরে একটি করে টেক্সচার যুক্ত হয়। এই টেক্সচারাল লেয়ারিং আধুনিক পপ সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সুরের দিক থেকে বিটিএস-এর গানগুলো প্রায়শই পশ্চিমা মেজর ও মাইনর স্কেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। উদাহরণ হিসেবে ‘স্প্রিং ডে’ গানটি ধরা যেতে পারে। এর মেলোডিক কাঠামো মূলত এ মাইনর স্কেলের ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে সুরের চলন ধীরে ধীরে উচ্চতর স্বরে ওঠে এবং কোরাসে এসে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটায়। অন্যদিকে ‘ডাইনামাইট’ গানটি সম্পূর্ণ মেজর স্কেলের উজ্জ্বল সুরে গড়া—এখানে ফাঙ্ক ও ডিস্কো সংগীতের ছাপ স্পষ্ট। এর কর্ড প্রগ্রেশন প্রায় ক্লাসিক পপ বিন্যাস অনুসরণ করে, যেখানে টনিক, সাবডমিন্যান্ট এবং ডমিন্যান্ট কর্ডের ঘূর্ণন একটি আনন্দময় গতি তৈরি করে।
‘ব্ল্যাক সোয়ান’ গানটির সুর কাঠামো আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ডোরিয়ান ঘরানার মাইনর স্কেল ব্যবহৃত হয়েছে, যা সুরে এক ধরনের রহস্যময়তা এনে দেয়। পিয়ানো এবং স্ট্রিংসের মৃদু বিন্যাস গানের আবহকে প্রায় ধ্রুপদি নাটকীয়তায় পৌঁছে দেয়। এই ধরনের স্কেল ব্যবহারে বোঝা যায় যে বিটিএস কেবল পপ সুরেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা বিভিন্ন সংগীত ঘরানার উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে।
তবে এখানেই সমালোচনার সূত্রপাত। এইসমস্ত সুর ও প্রযুক্তিগত নিখুঁততা সত্ত্বেও অনেক সমালোচক মনে করেন যে বিটিএস-এর সংগীতের ভেতরে ব্যক্তিগত স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব রয়েছে। প্রতিটি গান এমনভাবে পরিকল্পিত যেন তা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে। প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই হুক, তারপর দ্রুত কোরাস—এই কাঠামো আধুনিক ডিজিটাল বিপণনের উপযোগী। ফলে সংগীত অনেক সময় এক ধরনের অ্যালগরিদমিক পণ্য হয়ে ওঠে।
বিটিএস-এর গানের কথায় অবশ্য সামাজিক বার্তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। আত্মপরিচয়ের সংকট, মানসিক চাপ, আত্মপ্রেম—এই বিষয়গুলো তাদের লিরিক্সে বারবার ফিরে আসে। কিন্তু এই আবেগও কি বিশ্ববাজারের জন্য তৈরি এক সূক্ষ্ম বিপণন কৌশল নয়? যখন ব্যক্তিগত যন্ত্রণা কোটি কোটি কপির অ্যালবামে বিক্রি হয়, তখন সেই আবেগের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
তবু সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে বিটিএস একটি বিরল উদাহরণ। তারা কোরিয়ান ভাষার গানকে বৈশ্বিক প্লেলিস্টে পৌঁছে দিয়েছে। ইংরেজি ভাষার একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তারা দেখিয়েছে যে সংগীতের ভাষা সীমান্ত মানে না।
এই প্রভাবের প্রতিধ্বনি বাঙালি সমাজেও স্পষ্ট। কলকাতা থেকে ঢাকা—মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিটিএস নিয়ে যে উন্মাদনা দেখা যায়, তা অভূতপূর্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আর্মি’ নামে পরিচিত অনুরাগী গোষ্ঠী নিজেদের এক বৈশ্বিক সম্প্রদায় হিসেবে কল্পনা করে। অনেক তরুণ কোরিয়ান ভাষা শিখছে, তাদের ফ্যাশন অনুসরণ করছে, এমনকি কোরিয়ান খাবারের প্রতিও আকৃষ্ট হচ্ছে।
এই সাংস্কৃতিক বিনিময় একদিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়, অন্যদিকে তৈরি করে অন্ধ ভক্তির ঝুঁকি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিটিএস নিয়ে কোনো সমালোচনা করলেই অনুরাগীরা তা ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে গ্রহণ করে। সংগীত তখন আর বিশ্লেষণের বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসের বস্তু।
বিটিএস-এর সাফল্য তাই দ্বিমুখী। একদিকে তারা প্রমাণ করেছে যে সংগীত আজ এক বৈশ্বিক শক্তি। অন্যদিকে তারা দেখিয়েছে কীভাবে প্রযুক্তি, বিপণন এবং আবেগের সমন্বয়ে একটি সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যায়।
শেষপর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—বিটিএস কি কেবল ডিজিটাল যুগের এক সাময়িক ঝড়, না কি তারা সত্যিই সংগীত ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে? হয়তো উত্তরটি সময়ই দেবে। কিন্তু এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিটিএস আমাদের সময়ের সাংস্কৃতিক দর্পণ—যেখানে সুর, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং আবেগ একসাথে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই বৈপরীত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সংগীতের টোনাল ট্রুথ।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

.webp)
