রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তীর দীর্ঘ কবিতা উন্মাদবাহিত এক গভীর আত্মসমীক্ষার যাত্রা। মৃত্যু, উন্মাদনা, প্রেম, রাজনীতি ও ইতিহাসের জটিল অভিঘাতে কবির চেতনায় জন্ম নেয় ভাঙাচোরা কিন্তু তীব্র ভাষা। শ্মশান, স্বপ্ন, স্মৃতি ও বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে মানুষ, দেশ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন উঠে আসে। শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আর্তি ও প্রতিরোধের উন্মত্ত স্বর।
কেতাব-ই-র ব্লগজিনের পাতায় আজ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে এই ৭০ পর্বের দীর্ঘ কবিতাটি। তৃতীয় পর্বে থাকছে আরও সাতটি কবিতা।
১৫
যে মুহূর্তে নারী আমি, প্রসব করি,
সে-মুহূর্তে বুঝি আমি, পুরুষচোখের বিস্ময়।
মুদ্রণ করে রাখি অনুল্লেখিত অভিসম্পাত—
পরিভ্রমণে যাব—কলিঙ্গে? যাবে?
কত কত শিলালেখ জীবন্ত আজও, দেখে নিতে।
আসর বসছে দূরে, সম্মোহনের—কী আনন্দ
হবে তাতে নীড়হারা পরভৃতের? বলো দেখি—
বলো তো, হিসেব করে, তোমার উঠোন থেকে
সমুদ্র ঠিক কত কাছে। এই তোমাদের
আমি জানাব কখনও, পৃথিবীর
রাজা-রানি-রূপকথা আছে... পরিপ্লুত হয়
প্রমাদে, প্রকাশে; অবকাশ নেই তার বাস্তবিকই?
ভাঙতে ভাঙতে এই এখানে এসেছ; আরও যাবে;
মৃত যদি মনে হয়, জুড়ে যাবে, জেগে
উঠবে, সন্তানের ডাকে, চাবুকের ঘায়ে!
১৬
এখনই নিভে যাবে পরপর অসংখ্য আলো
এবং উঠবে জেগে, না, কোনো অন্ধকার
নয়, বরং আশ্চর্য আরেক আলো। পবিত্র
অতি, সে আমাকে মুগ্ধ করে দিয়ে,
দেখাবে আমাকে, আমারই ভাঁজ করে রাখা
আত্মাকে বাহিরে এনে। শুনতে পেলে কি
পেলে না, সাক্ষ্য দাও—অমন নিথর হয়ে
দাঁড়িয়ে থেকো না—আমাদেরও বহু কাজ
বাকি যেহেতু, এই আছি, এই নেই;
চলে যেতে হবে খুব দ্রুত—তোমাকে
ভোরের মতন কাছে ডাকি। কাছে আস।
কাছে টেনে নিই। অথচ নিজের বলে
দাবি করতে পারি না কেন আজও?
কী নিয়ম? কী দায়? কোন বাধ্যবাধকতা
দূরে সরায় এত অদৃশ্য হাত দিয়ে?
তোমার কী মনে হয় সহজ ছিল
খুব? অধিকার বুঝে নিতে গিয়ে বারেবারে,
অপমান সয়ে সয়ে নুয়ে পড়া ছিল না?
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
১৭
সে আছে, তবু তার সৌষ্ঠব নেই।
এই আলোর ভেতরে সে কীভাবে নিরীশ্বর
হয়ে ওঠে, দেখি—আজও দেখার চোখ
অন্ধ হয়নি বলে দেখে নিতে পারি
অন্ধকারের মাঝে আরেক অন্ধকারের নির্মম হত্যাদৃশ্য!
পাখিরা সজাগ ছিল কি তখন? কেউ
কি অবাক হয়ে গেয়ে উঠেছিল নাকি?
ওদেরও কি সন্দেহ করেছিল কেউ? অনেক
কথা হল, অতিকথনের মতো; প্রলম্বিত—
শ্মশানচারী—অভিযোগ নয়, বরং প্রবল
উৎসাহে, জানতে চেয়েছি: প্রতিস্থাপন, অঙ্গের,
কোনোভাবে সম্ভব কি না। এখানে যতি দাও—
হোমাগ্নি জ্বালো। আহ্বান করো যত বৈদিক
দেবদেবীদের; এবং নিজেদের মাঝে খোঁজো মনোযোগ
দিয়ে, যুদ্ধকালীন তৎপরতায়—নিরীশ্বর আছ কে...
১৮
তোমাকে দূর থেকে দেখে মনে হল নারী
কলাবতী, বা অন্য কেউ—এবং মুগ্ধ
হই; তাকাই না তবু; সামনে যাই না,
পাছে লিঙ্গের ধারণা মুছে গিয়ে, জেগে
ওঠে সমকাম! না, ভুল পথে যাচ্ছি না
আমি আর—হ্যাঁ, সঠিক পথের আমি
পান্থ হয়েছি। পাশে থেকো পরাৎপর; সাঁতরে
যেতে যেন পারি, যদি পারি,
সমুদ্রতট। ঊরুভগ্ন, পড়ে আছ? হে
বন্ধু আমার—ওঠো, যাই সৃজনের কাজে—
হেমন্ত, শিশির, ধান, মাঠ, কাজল, প্রতিভা,
লতাপাতা, খড়—কত কী পড়ে আছে
জীবনের মাঝে। কত কী আছে দু-চোখে আঙুল
দিয়ে জীবনকে দেখিয়ে দিতে; জীবনকে ভরিয়ে দিতে।
১৯
সম্পূর্ণতা পাবে কখন জানো না। আমন্ত্রিত,
তাই এসেছ ধুলোর সরণীতে। নিজের মুখ
আমি চিনে নিতে চাই নিজের ছায়া
দেখে। একটি অপূর্ব পূর্বপরিকল্পিত হত্যাদৃশ্যের কথা
মনে পড়ে। অনাবশ্যক—স্থানু হও; কখনও
উড্ডীন। অবশ্য, গণ্ডির ভেতর ছিল অন্তর্ভুক্ত
সেসব। কথায় কথায় প্যারাডক্স নেমে আসে—
লোকে কি বোঝে সেসব? না কি শুধুই
নিজের খেয়ালে-বেখেয়ালে, অজ্ঞতায় স্বাধীকার
ভেবে সমালোচনা শুরু করে? যা লেখো, পুণ্য
মনে হয় তা। যা লেখো, আশ্চর্য সেসবই—
মনে রেখো, এই কথাটি—-আঁখিজলে, অন্ধকারে,
লেখো, শুধু লেখো—যে-কোনো উর্ণে, জালে
জড়ালেও লেখো-—যেতে যেতে বলে যাই
তবে, শোনো: যদি-বা মৃত্যু আসে, ভয়
পেয়ে থেমে যেয়ো না; বরং শায়িত করে
তাকে, দাঁড়াও বুকের ওপর রক্তখেকো চামুণ্ডা,
ভৈরবী হয়ে! কিংবা, বিনীতভাবে প্রণাম জানিয়ে,
উপেক্ষা করো—এবং, লেখো... লেখো... লেখো...
২০
আমাদের স্বরগুলি প্লুত মনে হয়? আমাদের
শব্দগুলি মনে হয় নিষ্পাপ মেষশাবক? কেউ
কি কোথাও বসে সরকার ফেলে দেবার
চক্রান্ত করছে এখন? এখন বলতে, হ্যাঁ, এখনই—
বাইরে তাকাও—খবর পড়ো—দ্যাখো
তো, হেডলাইনে আজ ঠিক কী কী বিষয়
রয়েছে—দিন-রাত-গোধূলি মিলিয়ে
কতগুলি ধর্ষণ ঘটে গেল এই দেশে—কোথায়
না খেতে পেয়ে মরে গেল কত শিশু,
তা না-জানলেও চলে। কবে থেকে অনাবৃষ্টি,
খরা, ওয়েস্ট ল্যান্ড, এসব না জানলে,
শুনলে, পড়লে, দেখলে, বুঝলেও হয়—ষড়যন্ত্র
নিয়ে কথা হচ্ছিল—যেহেতু আমার ভালো
লাগে তা বরাবরই! কেউ কি অন্যরকম
ষড়যন্ত্র করে, আমার কন্ঠরোধ করে দিতে চাইছে?
২১
নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার বিপুল আনন্দ আমি
উপভোগ করব আমি সামান্য পর থেকে—নিজেকে
অনিয়ন্ত্রিত হত্যার গরিমায় লাল মদে নিরাসক্ত
হয়ে ডুবে যাওয়ার শুরু হবে যেন
আজ। তোমার গতি কি মন্থর হল?
আমি দেখি—কীভাবে ছলনার দেবী হয়ে
ওঠো তুমি। যদিও, গাথাটি পুরোনো। কার্পণ্য
হয়তো। কিংবা তা-ও নয়। ভাণ্ডার অসীম,
তবু, আমাকে বাঁচিয়ে দিতে চেয়ে, এমন অবাক
করা পথে ঠেলে দাও—সকল আপন
পর হল। উদ্বেগ নয়, বরং কারণ খুঁজে
যাই। অবলম্বন যা যা ছিল, তাতে ঘুণ
ধরেছে অজান্তে কখন—অনুভব জাগে তাই—
অথচ মুখের পর, বুকের পর অভিব্যক্তি
নেই কোনো। আছে, এবং আছে অনুপস্থিতি।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।