রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তীর দীর্ঘ কবিতা উন্মাদবাহিত এক গভীর আত্মসমীক্ষার যাত্রা। মৃত্যু, উন্মাদনা, প্রেম, রাজনীতি ও ইতিহাসের জটিল অভিঘাতে কবির চেতনায় জন্ম নেয় ভাঙাচোরা কিন্তু তীব্র ভাষা। শ্মশান, স্বপ্ন, স্মৃতি ও বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে মানুষ, দেশ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন উঠে আসে। শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আর্তি ও প্রতিরোধের উন্মত্ত স্বর। কেতাব-ই-র ব্লগজিনের পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই ৭০ পর্বের দীর্ঘ কবিতাটি। দশম তথা শেষ পর্বে থাকছে আরও সাতটি কবিতা।
৬৪.
‘শৈশবের দিন আর কি রয়েছে?’, বলে
প্রশ্ন করেছি যখন দেবতাকে, কোনো মন্দিরে
নয়, শ্বাসরুদ্ধকর ঘরে, বলেছেন, সংক্ষেপে: ‘নেই’—
অতএব, সময় এসেছে, বাহিনী সাজানোর—তোমার
জন্মভূমি সশস্ত্র হোক—সামরিক হোক—
কার দিব্যবাণী ফলেছে এখন? অঘটন ঘটেছে
সর্বনাশী তোর ঘরে? ত্যাগের বাসনা জেগেছে
এখন; স্থৈর্যের দিকে যায় প্রাবল্য, অনুবর্তিতা।
অনুপ্রবেশ ঘটে কম্পনে, জীবদ্দশায়; তোমার জীবন
সেই, রজ্জুসর্পে বেঁধে রাখা। বিসর্পিণী তুমি
দেখো—ময়ূরের নাচ আর মানুষের হিমদগ্ধ হওয়া!
৬৫.
এখনও জানি না, এই ভাষা অপ্রকাশের
বলয়ে থেকে যাবে কি না। এখন দেখার
চেয়ে বড়ো কোনো অন্ধত্ব কিছুতে নেই
আর। চর্চায় বহুবার উঠে এসেছে যেহেতু,
তাই এসব আজ মজ্জাগত! নিজেকে বাঁচাতে
এই পাপ—সংঘটিত করেছি নিজেই আমি।
তাকে বৃদ্ধ করে অন্তরীণ করে দিই—
কাঁটা গিলে নিই নিজে; নিজের জন্য
নয় যেন—আহারাদি সব শেষ; উদরপূর্তি
তবুও ঘটেনি যেহেতু। কথাটির মাঝে শ্লেষ
তীব্র ছিল; আর ছিল ভোগ্যপণ্যবাদ, বস্তুত—
তোমার বোধের অগম্য হয়েছে? তবে তো,
তোমার ধূসর ঠোঁট ফসিল এবং মিরাকল্!
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৬৬.
অপরিহার্যতা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে, নগরী ঘুরেছ তুমি,
সাক্ষ্য দিয়েছ। অবিভাজ্য তার বাখানি এখন,
চিরাচরিত স্থান নিয়েছে অধিকারে—আমার অভেদ্য
শিরার ভেতর, কুলুকুলু বওয়া রক্তে,
বিষে, স্নান করে শুদ্ধ হয়েছেন জীবাত্মা
মম! এই ভেদ্বমি আর অস্বস্তির মাঝে
পথ খুঁজে নিয়ে এগোনো, হেঁটে চলা;
সন্দেহাতীত হতে পারোনি; কেবল, মুগ্ধ হয়ে
দেখি: আঁচলের খুঁট থেকে ঝুলে গিয়ে,
কারোর মহাপ্রয়াণ—লেখো—ধ্বংস হও, তবে,
প্রতিটি ধস দেবে প্রতীক, ধারণের অক্ষমতা;
আমাকে উন্মাদ করেছ হে দেবী, কাঙালিনী!
আমিও স্থানভেদে কখনও তোমাকে, ভেবেছি মা—দয়িতা—
৬৭.
বসে বসে পুরুষার্থ রচনা করো? শরীর
ঢেকেছ চামড়ার ক্ষতে আর অন্তর্বাসে?
কলহ জমানো আছে; অনেক যুগের; একদিন
হবেজানি সেসবও; হ্যাঁ, হবে—মিথ্যে
সত্যি আর সত্যি মিথ্যে স্বভাবত। মরণশীলতা
চোখের সামনে দেখেছি। একটি প্রেম, একটি
গ্রাস বিভোর করেছে যেন ঘোরে! তখন
শৈশব: শুকনো খড়ে আগুন লাগানো বা
অস্থায়ী মঞ্চে যাত্রাভিনয় দেখে, পোষিত ক্ষোভ
কান্নায় বহিঃপ্রকাশ করবার দিন। এখন রাত্রি;
অন্ধকার—আকাশ সারি সারি মৃত নক্ষত্রের
স্তূপ ধারণ করছে—ওই দ্যাখো—নিজের
ব্যর্থতার শাপান্ত করতে পারিনি এখনও। এখনও
পুরুষ আমি; অর্থ খুঁজে বেড়াই শৃঙ্খলতায়;
এখনও পুরুষ আমি এবং ভীষণ প্রেমিক;
নিষিদ্ধ কাজগুলি করি; অন্যথা, কিশোরী সাজাই...
৬৮.
তোমার শকট মানে পশুশক্তি, টান;
তোমার শকট মানে পথশ্রান্ত চক্রনেমি।
যতির ব্যবহার: প্রচ্ছন্ন উজ্জ্বল অনুপস্থিতি।
যেতে যেতে ধুলো মাখে, ধুলো ঝাড়ে,
ফিরে আসে, থেমে গিয়ে উদাসীন হতে
চেয়ে, শেষবার, আগত সময়ের দাবি মেনে,
অপলাপ, ছি-ছিক্কার করে; সুলুক পেতে চায়।
৬৯.
প্রতিদ্বন্দ্ব এবার শুরু হবে, যখন নিঃস্ব
তুমি, শিরস্ত্রাণ খুলে রেখে দিয়েছ। হাওয়ার
ক্ষেত্রগুলি তছনছ করে উড়ে যায়—ঝঞ্ঝার
ভেতর তুমি স্তব্ধতা, ঝংকার শোনো—আবৃত্ত
হচ্ছে সে, জন্মের মুহূর্ত থেকে মৃত্যু
অবধি—কী তাকে দিয়েছি আর কী
তার নিয়েছি, সেটুকু ইতিহাস মেপে রেখে
দেয়। কেবল ভাঙচুর, প্রত্যাশা, পরিগ্রহ পাঁজরের
মোহনায় স্নান শিখে চলে। কে বেশি
সচল, এই ছায়া নাকি আমার শরীর
জানি না; কে বেশি জীবন্ত, এই
মৃত্যু নাকি জানি না; আশ্চর্য
শূন্যতা, যার অধিকার আমি কীভাবে পেয়েছি
না-জেনে, নিজের মুণ্ডটি আজীবন আনত রেখেছি
৭০.
একদিন তুই ছিলি আমার শিরায়—একদিন
ধমনীর অন্তরে গাঢ় অভিমানে। ঘুমের অঞ্চল
কাঁপিয়ে দিয়ে, বলেছে কেউ: ‘জেগে ওঠো!’
আমি আর জাগতে পেরেছি কোথায়? স্বপ্নের
পিচ্ছিল তমসা ঠেলে, আরেক স্বপ্নের শ্মশানের
মড়া হয়ে গেছি! তবু কার হতভাগ্য
প্রেম আমারই কাছে আজও শব্দ হয়ে
রয়ে গেছে। এইসব শব্দকে এত কেন
আপন লাগে, জানি না। মা হয়ে
জন্ম দিয়েছিলি আমাকে যেদিন, বুঝিনি, আমার
মৃত্যু তোরই সম্মুখে হতে পারে পরে।
আজ তুই, সেই তুই, কন্যা হয়ে,
‘বাবা’ বলে ডেকে উঠছিস কদাচিৎ—যেন
আর তার কোনো ভাষা অথবা প্রতিশব্দের
জোগান ছিল না। ভেতরে ভেতরে তার
অন্তর্ঘাত—গণিকাবৃত্তি মাপা যায়নি। সবাই পুড়েছে
আর সবাই কেঁদেছে যদি, আমি কোন
তালিকায় ঠাঁই পেয়েছি? হারানো জাগৃতি আবার
পেয়েছি ফিরে; আবার স্মরণযোগ্য নিশাচর হয়ে
ওঠা কিংবা কাকভোর—অসংশয়ের কিছু সমকাম,
ইতিহাস, দর্শন পুনর্বার জাগরিত করে যায়—
উন্মাদবাহিত আমি, আমারই মৃতদেহ, চিতা নামিয়ে,
বলো হে পাঠককুল এবং আমার ঈশ্বর,
অচৈতন্য নিজেকে জাগাতে, কোন নামে ডাকব?
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।