রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তীর দীর্ঘ কবিতা উন্মাদবাহিত এক গভীর আত্মসমীক্ষার যাত্রা। মৃত্যু, উন্মাদনা, প্রেম, রাজনীতি ও ইতিহাসের জটিল অভিঘাতে কবির চেতনায় জন্ম নেয় ভাঙাচোরা কিন্তু তীব্র ভাষা। শ্মশান, স্বপ্ন, স্মৃতি ও বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে মানুষ, দেশ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন উঠে আসে। শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আর্তি ও প্রতিরোধের উন্মত্ত স্বর। কেতাব-ই-র ব্লগজিনের পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই ৭০ পর্বের দীর্ঘ কবিতাটি। সপ্তম পর্বে থাকছে আরও সাতটি কবিতা।
৪৩.
শাকান্নে সবল থাকা। শাকান্নে জীবনধারণ—
প্রবল শব্দঢেউ আছড়ে পড়ে ভেঙে দেয়:
মুক্তির বাসনা, মুখ, বক্তব্য ও বন্ধুতা।
আরক্ত দুটি হাতে কার, দ্রিমি দ্রিমি
দামামা বেজেছে? এমন হেমন্তকালে সে কোন
কৈশোরে ফিরে যাবে? ভিড়ের ভিতর থেকে
গিলোটিনে কাটা মুণ্ডগুলি একযোগে নিরাকার
হা-হা-হো-হো শব্দে হেসে ওঠে—অকাল্ট
কিছুই নয়, অকালবেলায়—নিজেই মুগ্ধ যদি,
নিজে কেন যুযুধান হও? মাৎসন্যায় হয়ে
ছড়িয়ে পড়েছে—দৃক্পাতও করোনি; পক্ষপাতদোষে...
৪৪.
আবার নাটকীয়তায় ভরে যাবে এই মাঠ
দেখতে পাচ্ছ না, আমার দু-চোখ দিয়ে?
যে-মাঠে এখনও কাকপক্ষী ভিড় করেনি,
কিন্তু, অপরিমেয় উচ্ছিষ্ট পড়ে আছে—
একক মঞ্চ: তুমি রং মেখে ওঠো—
একাকী তোমার কোনো দর্শক নেই। নিজেই
অভিনয় করো, আর, হাততালি দাও—অকৃতজ্ঞতা
ভেবে ভেঙেও পড়েছ। এই অন্ধকার যেন
ফলকের মতো; প্রশ্নগুলি কি শাশ্বত? কে
বা কারা যেন আগেই লিখে গেছে—
শান্ত হচ্ছি; জানি, শীতল হব। সাপিনীর
দেবী ঠিকই আমায় বুকে টেনে নেবে।
৪৫.
এবার, বাস্তবিকতায় ফিরে আসা যাক—
লুপ্ত হচ্ছে মুখ; প্লুত হচ্ছে স্বর, ধ্বনি।
শরীরের পরিমাপে পোশাক তো নয়ই, বরং,
পোশাকের পরিমাপে দর্জিরা প্রস্তুত করতে
হল উদ্যত, কয়েকটি শরীর—যুদ্ধ নেই,
ঘোড়া নেই, কয়েকটি চাবুক ও অস্ত্র শুধু;
পিতলের মতো হেমকান্তি নারীটি, রূপের আগুনে
পুড়ে, ছিন্নভিন্ন ও অসংবৃতা; এ-ও যদি
আমারই ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত হয়, তবে,
হোক—সহজ চাইনি হতে; চাইলে হব
কি? হব না। এরূপভাবেই হবে স্ফুরিত, ক্ষরণ!
৪৬.
যেহেতু হতোদ্যম হয়নি কেউই, সকল জটিলতা
ত্যাগ করে, দাঁড়াই জীবনের একটি মাত্র জানালা:
সত্যের কাছে। কষ্ট হয়, দুঃখ হয়,
ত্যাগের বাসনা ভুলে যাই; আলিঙ্গনগুলি হারাতে
চাইনি আমি কখনও এভাবে। তবুও, হারিয়ে
ফেলেছি যেহেতু, ডাকিনীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।
কৃপণতা, তোমার কথা বলা, অভ্যাসে পরিলক্ষিত।
লভ্যাংশ মানে আজ স্মৃতি! স্মৃতি! স্মৃতি!
তোমার প্রশ্ন মানেই সমাধান। প্রত্যুত্তর, আমার,
বস্তুত অবিমৃশ্যকারী। চেতনা জাগাবে বলে ঘুম
পাড়িয়ে দিলে; আমিও কী অবাক করে
বশীভূত হই—কোলে রক্তাক্ত মাথা রাখি!
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৪৭.
নিজের করোটি নিয়ে ম্যাজিক দেখানো—ভুলে
গেছি। অসহায় লাগে। সন্তর্পণে জাগে অবৈধতা।
পাথরের উদ্ধত স্তনের নিকট, হাহাকার, শিশুদের
লোভনীয় মুখ—এবং, এভাবে, একটি ক্ষুধার্ত
ইমেজারি তৈরি হল; এভাবে আমার আয়ু
পরাৎপরা; এভাবে আমার আয়ু পর্দাআসীন।
অন্বয় ঘটে যদি তাহাদের, তুমি, কোন
পরাবাস্তবে সন্ন্যাস নেবে? অঙ্গ এখনও
তবে তেমন নিশুতি? স্পর্শে ভয় করে:
গা-ছমছম—কার বীণা? নূপুরের নিক্কন
শুনি। গোধূলির আলো ফেরে পর্ণকুটিরে।
সভ্যতার কিছু দায় থাকে, তাই, সবুজ
অরণ্য ধ্বংস করে, নতুন বর্ণমালা, পরিভাষা
সৃষ্টি করে, তোমার অস্তমিত গৈরিক সন্ন্যাসে।
৪৮.
সাদৃশ্যগুলি অঙ্কন করো অকপটে। সীবনী দিয়ে
হাড়ের ওপর ফুল আঁকো। এই যজ্ঞে,
কুণ্ডের আগুনে, নিজেকে আহুতি দেবে? কারণ
ছাড়াই? জানো, কত হতাহত পৃথিবীর ইতিহাসে
অতীত-বর্তমান মিলিয়ে? চিৎকার পৃথিবীর প্রিয়তম
গান? সুড়ঙ্গ, যেন চাপা পড়ে আছে
ফসলের দ্বীপে। এমন ত্রুটি তুমিও ঘটাতে
যদি প্রিয়, অন্য জগতের বাস্তবতা হয়ে
থেকে যেতে না। পরিত্যক্ত হতে নয়; ভাবি,
যদি নিজেই পরিত্যাগ শিখে ফেলতাম, দু-চোখ
ধন্য হত; দু-চোখ লোনা। আমি তা পারিনি।
আমিও মানুষ ভালোবাসি। মানুষের কাছে যেতে
চাই—কিন্তু, এভাবে না, অন্যভাবে।
সে-পথ হয়তো এখনও জানি না। অবলম্বন
আমি চেয়েছি অন্য উপায়ে। বৃথা এ-জন্মে
শুধু ব্যর্থ হওয়া—অথচ, অঙ্গীকারে চ্যুতি
ঘটেনি। গোপনে এখনও দেখা হয়। কথা
হয়। সংলাপ—অভিজ্ঞতার এই সঞ্চয়ে
আজও, পরিত্রাণ, পরিত্রাণ খুঁজে গেছি শুধু।
৪৯.
বিবিধ স্থানে তাকে ছোবল দিয়েছ, দেখে
নিতে: কীভাবে আর্তি জাগে, কীভাবে দেয়
সে সাড়া। কপর্দক নেই, মাসোহারা নেই;
সংবেদ আছে, বুঝি, ঘটনাক্রমে। সেসব
অন্ধকারে চেতাবনি শুধু; হাতের নাগালে
অবশ্যম্ভাবী প্রতিকার; কিন্তু, ভাটার টানে
দূরে দূরে দূরে চলে যাই—পরিজন দাঁড়িয়ে
আছে তারও দূরে... মানুষ মানুষকে কি ভেবেছে
দেবতা? অশ্রুকে ভেবেছে চরণামৃত? সামান্য
দ্বিধা নেই; জেনে নেয় শূন্যতা; চেতনা
জাগেনি তবু! অসুখবিসুখের ধারণা কিন্তু
ছিলই—উন্মাদ হল কার দোষে? কার
প্রেমে? প্রশ্ন করতে হয়; প্রশ্ন করো—
সপুষ্পক হাত দিয়ে সে এখনও মহীরুহ
ছোঁয়। ভালো-র পালক যত, ঝরে পড়ে, হায়!
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।