আবদুলকে মনে আছে তো? সেই যে গাজী বটতলার দানবের মত ছেলেটা, যে পকেটে গ্লক সিরিজের রিভলভার নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু আবার একটু সময় পেলেই ছুটে যায় দুগ্ধায়, অনাদি গোসাঁইয়ের কাছে! যে আজ সকালে খুন করতে গিয়েছিল বিশ্বামিত্র সেনকে, কিন্তু গিয়ে দেখে, অন্য কেউ একজন, তার আগেই বধ করেছে শিকার!
দেখে নেওয়া যাক কী ঘটছে সেই আবদুলের স্ব-ভূমে। সনাতন গাজির বটতলায়। এই গাজি বটতলা অবশ্যশুধু আবদুলের মাতৃভূমি নয়, এখানে বাস করে সালাউদ্দিন মোল্লার মত দুর্ধর্ষ দাঙ্গাবাজরাও...।
শুধু ফুলওয়ারিতোড় নয়। এই পর্বে স্বয়ং মহাপ্রভুর রহস্যজনক পরিণতি সম্পর্কে আরও দু’এক কথাও জানব আমরা।
বত্রিশ
ফুলওয়ারিতোড়। ঝাড়খণ্ড।
মানুষ যে এক আশ্চর্য প্রাণী তা আবদুলকে দেখলে টের পাওয়া যায়। পকেটে রিভলভার অথচ মসজিদের দুটো মাধবীলতার জন্য তার মন খারাপ। বছরের এই সময়টা খুব হাওয়া চলে। দামোদর পেরিয়ে, ছুটে আসে বাতাসের ঝাপট। লতানে গাছ দুটো এলোমেলো হয়ে যায় যখন তখন।
সকালে দুম করে দুগ্ধার দিকে চলে গিয়েছিল। প্রথমে অনাদি গোসাঁই তারপর সরস্বতী, দুজনের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেরি হয়ে গিয়েছিল অনেক। মসজিদের দিকে আর আসা হয়নি। তাই বিকেল হতে না হতেই চলে এসেছে।
লোহার একটা স্থায়ী মাচা করা আছে। এলিয়ে পড়া নরম গাছ দুটোকে আবার জায়গামত শুইয়ে দেবার জন্য কসরত করতে হচ্ছিল তাকে। মাটিতে পড়ে থাকা শেষ লতাটা কাঠামোর উপর তুলে দিতে দিতে নজর পড়ে রাক্ষস সালাউদ্দিনের দিকে। ইশারায় ডাকছে ওকে। হাতের কাজটা শেষ করে এগিয়ে যায়। “কী হয়েছে ?”
“বস এখানে। তোর সাথে কথা আছে একটু।”
বড় গাছটার নিচে বাড়তি দুটো চেয়ার পাতা হয়েছে এর মধ্যেই। অরবিন্দ আর অনন্ত আসছে। আপাতত, আবদুলকে ঐ খানেই বসতে বলে সাল্লু।
“কী বলছেন বলুন...”
“আরে বস না...”
বসে আবদুল। সালাউদ্দিনও বসে পড়ে একটা চেয়ার টেনে। বলে, “আজ সকাল থেকে তোকে দেখলাম না। ওই রকম একটা অঘটন ঘটল, অথচ তুই সেই থেকে বেপাত্তা !”
“আমি ভোর বেলাতেই সব ফোন করে জানিয়েছি আপনাকে।”
সালাউদ্দিন এক পা তুলে দেয় আর এক পায়ের উপর। কালো মিশমিশে বিরাট শরীরের উপর মাথাটা যেন সরাসরি বসানো। ঘাড়ে গর্দানে যাকে বলে। সাল্লুর চওড়া কাঁধ দেখলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারও লজ্জা পাবে। উচ্চতা প্রায় সাড়ে ছ’ফুট। যৌবন পেরিয়েছে, তাও এখনও চপারের এক কোপে বারো হাত অজগরকে দু’খানা করে ফেলতে পারে। দু’চোখে সব সময় পেশাদার কসাইয়ের মত নির্লিপ্ততা। যেখানে মৃত্যুই স্বাভাবিক, অনিবার্য। কোনও মার্ডারের আগে অথবা পরে, ওই চোখে কিঞ্চিৎ তরঙ্গমাত্র নেই।
এহেন সালাউদ্দিনেরও, আবদুলের ঠাণ্ডা কণ্ঠস্বরে নিজেকে গুছিয়ে নিতে দু’এক মুহূর্ত সময় লাগে। তারপর যায় পরের বাক্যে, “অত বড় একটা ঘটনা... শুধুমাত্র ফোন করে দিলেই কাজ শেষ! হ্যাঁ রে!”
‘হ্যাঁ রে’ শব্দ দুটো মস্তিষ্কে আগুন ধরিয়ে দিতে চায় আবদুলের। বলে,
“আবার কী করব ! ঐ ভোর রাতে তো এখানে এসে কাউকে আমার ‘ব্রিফ’ করার কথা ছিল না।”
‘ব্রিফ’ শব্দটা আগে জানত না আবদুল। শুনতে শুনতে শিখে গেছে।
“আঃ ...ভোর রাতে তোকে কে আসতে বলেছে। পরে তো আসতে পারতি। সারা বেলা তো আর এদিক পানেই এলিই না...।”
“ভাল লাগছিল না...।”
“তাই বুঝি দুগ্ধায় গিয়েছিলি হাওয়া খেতে?”
একটু অবাক হয় আবদুল। সে যে ওদিকপানে গিয়েছিল তা এই মক্কেলের জানার কথা নয়। তবে কী, মোহান্তি ঠাকুর বলেছে? “কে বলল? সদাশিব মোহান্তি বুঝি?”
“সে যেই বলুক না কেন, আগে বল গিয়েছিলি কিনা?”
“হ্যাঁ গিয়েছিলাম। তো?”
অধস্তনের সাথে অহেতুক তর্কে না গিয়ে অন্য কথা বলে সালাউদ্দিন,
“অনাদি গোসাঁইয়ের সাথে দেখা হল? বিশ্বামিত্রর কেসটা যখন ঘটে তখন শুনলাম ওই মক্কেল নাকি মন্দিরে ছিলই না। নৌটঙ্কির দল নিয়ে বৈগাপাড়ায় গিয়েছিল।”
“নৌটঙ্কির দল নিয়ে নয়। নাম কীর্তনের দল নিয়ে।”
“আরে থাম। ঐ হল...।” এরপর দু’এক মুহূর্ত সময় নিয়ে যে কথাগুলো বলে সাল্লুভাই, তার মধ্যে মিশে আছে সর্পিল এক হিংস্রতা, “ওর সাথে বেশি মায়ায় জড়াস না ভাইটি...।”
বাক্যটা আবদুলের বোধগম্য হয় না, “বুঝলাম না।”
সাল্লু বিরাট ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয় চারপাশটা। তারপর বলে, “ও তো আর বেশিদিন নেই রে। শালা চৈতন্য মহাপ্রভুর চামচা...”
বলা বাহুল্য, ‘চৈতন্য’ সম্পর্কে আদৌ কোনও বুৎপত্তি নেই সাল্লাউদ্দিনের। কিন্তু, চৈতন্যর ‘চামচা’-র বিষয়ে সে জানে। আবদুল বলে, “এই কথাটাও বুঝলাম না।”
“চেষ্টা করলেই বুঝতে পারবি।”
মুহূর্তটাক সময় নিয়ে আবার বলে, “ঐ হারামিটা এলাকায় আমাদের কাজ করতে দিচ্ছে না ঠিকমত। জানিস না!”
আবদুল ইচ্ছে করলেই এখন জিজ্ঞাসা করতে পারত যে, এমন কোন কাজের কথা বলা হচ্ছে যা ঠিকমত করতে দিচ্ছেন না অনাদি গোসাঁই। উনিও তবে বিশ্বামিত্র সেনের মত হয়ে গেলেন!
কিন্তু এখন আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করে না আবদুলের।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
তেত্রিশ
যাদবপুর। কলকাতা।
উপাখ্যানের খাতিরে অলকানন্দা এবং স্বপ্ননীলের সম্পর্কের শিকড় খুঁজতে হবে আমাদের। হ্যাঁ, চৈতন্য মহাপ্রভুকে জানবার খাতিরেও। কাজেই, তাদের কথোপকথনের যে বর্ণনা চলছিল তা একটা পর্যায় অব্দি শেষ করা প্রয়োজন।
প্রথমে না হলেও পরের দিকে, যৌনতা ছেয়ে যাচ্ছিল স্বপ্ননীলের মাথা। অলকানন্দার ঈষৎ ঝুঁকে থাকা দুই স্তনে ঠোঁট দিয়ে শুষে নিতে ইচ্ছে করছিল জীবনসুধা। কিন্তু অধিকাংশ সময় যা ভাবা যায় সেটা করে ওঠা যায় না। যৌনতার সেই তীব্র হাতছানি উপেক্ষা করার জন্য নীল চৈতন্য মহাপ্রভুতেই বেঁধে রাখতে চেয়েছিল সুর তাল। বলে চলেছিল সে, “...মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলন তখন সমসাময়িক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হয়ে সহজিয়া চেতনার পথে হাঁটছিল। সহজিয়া সাধনা তো সহজ নয় মোটেই। সেই কঠিন কাজ কত সহজে করা যায় তাই তখন শেখাচ্ছিলেন মহাপ্রভু। মেথর মুচি এদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা মুখে বলা, আর তাদের নিয়ে সত্যি সত্যিই পথ চলা, দুটো এক নয়।
প্রেমরসে তখন আত্মহারা রাজা প্রজা সবাই। ভেসে গেছে সব ভেদাভেদ। রাজা আর মেথর, একই পঙক্তিতে বসে পান করছে ভক্তি সুধা। প্রকৃতপক্ষে সেটাই ফাইনালি ট্রিগার করল পাণ্ডাদের।
একসময় কালাচাঁদ রায়, সাতদিন ধরে মন্দিরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকার পরও বিতাড়িত হয়েছিল।
তাড়িয়ে ছিল পাণ্ডার দল। পরে সেই কালাচাঁদই ফিরে আসে কালাপাহাড় রূপে। বিদ্বেষময়, গোঁড়া এবং তথাকথিত সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে নেমেসিস হয়ে। তাও পাণ্ডাদের শিক্ষা হয়নি।
আসলে কায়েমি স্বার্থ ওদের চোখে ঠুলি পরিয়ে রাখে। ‘জায়গিরদারি’ একটু টালমাটাল হবার সম্ভাবনা দেখলেই ঘটে যায় মস্তিষ্ক বিকার। তখন ভয়ংকর শ্বাপদের থেকেও অনেক বেশি হিংস্র তারা।
এছাড়া, গোবিন্দ বিদ্যাধর এবং জগন্নাথদাসের অন্য মোটিভ তো ছিলই।
যাই হোক, মূর্খের দল, মহাপ্রভুর ভাব আন্দোলনের মর্ম হয় তখন বুঝতে পারেনি অথবা বুঝতে পেরেও ভেবেছিল, এই জোয়ারকে বুঝি আটকে দেওয়া যাবে তাঁকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে!”
কথা শুনতে শুনতে আবার নীলের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল অলকা। দু’হাত দিয়ে নীলের কাঁধে মৃদু একটা চাপ দিতে দিতে বলেছিল, “নীল আর একটা কথাই আমার জানার আছে?”
“বল।”
“তুমি একবার বলছ তাঁকে গুম করা হয়েছিল, আবার একবার বলছ তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল পৃথিবী থেকে! ঠিক কী বলতে চাইছ আমি বুঝতে পারছি না।”
“পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া আর আজীবন গুম করার মধ্যে প্রকৃত তফাৎটা ঠিক কী অলকানন্দা! যে মৌলবাদীরা আগ্রাসী মুসলমানের সাথে, হরিদাসের ফারাক করতে পারে না, যে পাণ্ডারা কালাচাঁদ রায়কে কালা পাহাড় বানিয়ে ছেড়ে দেয়, যারা সব মানুষকে একই ভক্তি ধর্মে দীক্ষা দিতে চায় না, নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়ে যেতে পারে ভেবে, তারা মহাপ্রভুকে আজীবনের জন্য গুম করবে না তো কে করবে ! আর এই গুম, খুনের থেকে কম কী নন্দা! গুম অথবা খুন, কিংবা ‘গুমখুন’ কিছু তো একটা হয়েছিল নন্দা।”
কথা বলতে বলতেই স্বপ্ননীল ফের পাগলপারা হয়ে যায়, “আজকাল ঐ যে, ‘আমরা সবাই হিন্দু’ বলে গালভরা শ্লোগান দেওয়া হচ্ছে, বুকে টেনে নেওয়া হচ্ছে নাপিত অথবা মেথরকে, মুসলমানের সাথে দাঙ্গা লাগার উপক্রম হলেই বলা হচ্ছে, সব হিন্দু ভাই ভাই, সবাইকে একজোট হয়ে লড়তে হবে, এইগুলো আসলে কিছুই না, ‘আই ওয়াশ’ ছাড়া।”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে পূর্ণদৃষ্টি নিয়ে স্বপ্ননীল তাকিয়েছিল অলকানন্দার দিকে। ধীরে ধীরে বলেছিল, “এইবার নিশ্চয়ই অনেক কিছু পরিষ্কার হল।” উত্তরে আর কিছু সেদিন বলেনি নন্দা। বুকের মধ্যে পুষে রাখা ঘোড়া দুটোও তখন যেন নিঃস্পন্দ।
আজ সারাদিন ধরে চলছে পড়াশুনো। দিনভর ‘খননকার্য’ চালিয়ে এখন খানিক ক্লান্ত স্বপ্ননীল। উঠে ঝিলমুখী জানলাটায় গিয়ে দাঁড়ায়। জলের তিরতিরানি দেখতে দেখতেই একটা ফোন আসে। গ্রান্ডপাপা রত্নাকর মিশ্র, “কেমন আছো নীল?”
“ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“ঠিকই আছি…”
“কবে আসছো কলকাতায়?”
এখন বেশির ভাগ সময় নবদ্বীপের বাড়িতেই থাকেন অথবা এদিক-ওদিক তীর্থ করে বেড়ান রত্নাকর মিশ্র। ব্যবসাপত্র মূলত স্বপ্ননীলই সামলায়। নীলের জিজ্ঞাসার উত্তরে রত্নাকর বলেন, “দেখি...যাব...। তুমি নিজের খেয়াল রেখ।”
“কবে ফিরলে বাইরে থেকে…”
গত পরশুই কথা হয়েছে। রত্নাকর কবে ফিরবেন সে কথাও হয়েছিল। খেয়াল নেই স্বপ্নর। রত্নাকর বলেন, “ফিরিনি এখনও। আগামীকাল ফিরছি। দু’দিন আগেই তো কথা হল তোমার সাথে, মনে নেই? যাই হোক... তুমি এখন কোথায়?”
“আজ বাড়িতে।”
“আউটলেটে যাওনি?”
“না , একটু পড়াশুনো করছি।”
নীল ইদানীং কোন বিষয়ে বেশি উৎসাহিত জানেন রত্নাকর। তবে তিনি খুব কিছু আগ্রহ দেখাননি। উল্টে বলেছেন, এইসব ‘ডেথ সাবজেক্ট’ নিয়ে বেশি সময় নষ্ট না করাই ভালো।
ওদিকে ফের রত্নাকরের কণ্ঠস্বর, “বাঃ বেশ বেশ...তা কী নিয়ে পড়াশুনো করছ এখন?”
সরাসরি কোনও উত্তর দেয় না নীল, “সেরকম কিছু না।”
“ঠিক আছে। সাবধানে থেকো।”
চৌত্রিশ
চন্দ্রপুরা থানা। ঝাড়খণ্ড।
চন্দ্রপুরা থানা। দারোগা সুজয় মাহাতো ব্যস্ত এক অসুস্থ শালিকের পরিচর্যায়। এই পাখির পরিচর্যা করতে করতেই দারোগা সাহেবের মাথায় ফের ঢুকে পড়বে ‘বিশ্বামিত্র হত্যা রহস্য’। কীভাবে? সেটাই দেখা যাক।
এক শালিকের পরিত্রাহি ডাক শুনে সীমানার পিছন দিকে এসেছিলেন সুজয় মাহাতো। বিষয়টা সরেজমিনে দেখার জন্য। পিছু নিয়েছিল দ্বিগু সরেন এবং হাজিরা কনস্টেবল, সুরিন্দর।
ঘরের পিছনে এসে সকালবেলার মত পাখিটাকে একই ভাবে গাড়ির বনেটে পড়ে থাকতে দেখেন মাহাতো। দেখে মনে হয়েছিল একেই কি তবে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বলে? যে শব্দদুটো বিশ্বামিত্র সেন বলেছিলেন গোসাঁইজিকে। গোসাঁই আবার বলেছেন দারোগাকে।
প্রথম যখন পাখিটাকে বনেটের উপর ন্যাতানো অবস্থায় দেখেন, ভেবেছিলেন পাশের বৈদ্যুতিক লাইন থেকে ছিটকে এসে পড়েছে বুঝি। কিন্তু এখন হাতে নিয়ে বুঝতে পারেন, না সেটা নয়। তাই যদি হত তাহলে সারা শরীর পুড়ে ঝামা হয়ে যেত। এতক্ষণ ধরে প্রাণটা ধুকপুক করত না নরম পালকের ভিতর।
ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায়, ডান পায়ের উপরের দিকে চোট। নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে গিয়ে আঘাত পেয়ে থাকতে পারে। দাঁড় করাতে গেলে একদিকে কাত হয়ে যায় শালিক। ভালো করে খেয়াল করলে আরও দেখা যায়, ওই আঘাত ছাড়াও ঘাড়ের কাছটায় ঠোক্কর মেরেছে কাক। সে কারণেই অবস্থা এতটা সঙ্গিন। পাখিটাকে বাঁ হাতের চেটোর মধ্যে নিয়ে ডান হাতটা আলতো করে মাথায় বুলিয়ে দেন সুজয়।
“সাব মুঝে দিজিয়ে...”
সুরিন্দর বলল কথাটা।
“নেহি ঠিক হ্যায়। ম্যায় দেখ লেতা হু...”
দ্বিগু জল নিয়ে এসে ঝাপটা দেয়। দু’তিনবার এইরকম করার পর শালিকটা একটা ঝটকা মারে। মরণোন্মুখ অতি ক্ষুদ্র এক প্রাণীর বাঁচার এই চেষ্টায় সহসা হালকা লাগে মাহাতোর নিজেকে। সেই সকাল থেকে মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা রক্ত মাখা শরীরটা অল্প সময়ের জন্য হলেও অন্তর্হিত হয়। “মনে হয় বেঁচে যাবে...”
দারোগার কথার উত্তরে সাথে সাথে সুরিন্দর এইবার পরিষ্কার বাংলায় বলে, “হ্যাঁ স্যার... আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
ঘরে আসেন সুজয়। থানার সবাই দারোগার টেবিলের পাশে ভিড় জমায়। মহাদেব ছোট্টো একটা কাঠি আর নরম সুতলি যোগাড় করেন। বেঁধে দেন শালিকের ডান পা। একটা ড্রপারও নিয়ে এসেছিলেন । ড্রপারে জল নিয়ে পাখির ঠোঁটে ফেলতে থাকেন ফোঁটা ফোঁটা। প্রথম দু-একটা বিন্দু গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। তারপর দুটো ঠোঁট ফাঁক করে বাছাধন। মরুভূমির মত একটু একটু করে শুষে নিতে থাকে বারিধারা।
মৃত্যুপথযাত্রীর মধ্যে ক্রমে সঞ্চারিত হতে থাকে প্রাণ। দারোগা এবং আর সবাই লাফিয়ে ওঠেন। বোঝা যায়, এত বছর পুলিশে চাকরি করার পরও সুজয়ের মধ্যে একটা নরম মন লুকিয়ে আছে। যা ‘তুচ্ছ’ কারণেও উদ্বেল হয়ে উঠতে পারে। মহাদেব বলেন, “স্যার এটাকে আমি আমার ঘরে নিয়ে যাই। ঘাড়ে যে চোটটা লেগেছে সেটা সেরকম মারাত্মক কিছু নয়। খানিক বিশ্রামে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে একটু সময় লাগবে।”
সুজয় মাথা নেড়ে সায় দেন। মহাদেব মুর্মু চলে গেলে আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে যায় ঘর। পাখির সূত্র ধরে সুজয়ের মাথায় আসে আবার সেই বাক্য, “ভগবান জগন্নাথকে কবে থেকে ঠুঁটো জগন্নাথ বলা হয়?”
পাখিটার মূলত পায়ে আঘাত। আচ্ছা তাহলে কি ওকে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বলা যায়? না বলা যায় না। ভগবান জগন্নাথের পায়ে কোনও সমস্যা ছিল না। আরও দু’এক কথা মাথায় আসার পর, দারোগা সাহেব নিজেই ভাবেন এইসব কি ভাবছেন উনি! কার সাথে কী মেলাচ্ছেন! উঠে গিয়ে বিশ্বামিত্রের নীল ডাইরিটা বার করেন। নিয়ে বসেন আবার,
আনন্দ অন্তর্যামী তুমি অনাথবন্ধু হে
গিরিধারী গোকুলনাথ তুমি গোপালক হে...
সনাতন স্বয়ম্ভু তুমি সচ্চিদানন্দ হে
তপোময় ত্রিলোকনাথ তুমি ত্রিলোকপালক হে...
না, কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। পরের দুর্বোধ্য লাইনগুলোতেও ফের চোখ বোলান।
অচ্যুত-গদাধর-চিকনকালা-ত্রৈলোক্যনাথ কবে শেষ কথা-তাই এ আমার শেষের কবিতা...
ধুসস... এইসব দেখে এখন মাথা খারাপ না করাই ভালো। কিন্তু ডাইরিটা বন্ধ করতে গিয়েও করেন না। আচ্ছা এইগুলো বিশ্বামিত্র সেন কেন লিখেছিলেন ডাইরিতে? গূঢ় কোনও সংকেতই যদি ডাইরিতে লিখে থাকেন তবে সেই ডাইরি আবার প্রকাশ্যে ঐভাবে রেখেই বা যাবেন কেন!
বেশ খানিকক্ষণ চিন্তা করে সুজয়ের মনে হয়, নিজে যে খুন হতে পারেন এই আশঙ্কা মনে মনে করেছিলেন বিশ্বামিত্র। সেই জন্যই হয়ত সূত্র রেখে গেছেন। এবং সেই সূত্র প্রকাশ্যেই রেখে গেছেন। কারণ তিনি নিশ্চয়ই জানতেন যেখানেই তিনি আততায়ীর স্বীকার হন না কেন, পুলিশ একবার অন্তত তদন্তের স্বার্থে তার বাসভবনে যাবেই যাবে। এবং তখনই তাদের হাতে এসে যাবে এই ডাইরি।
যাই হোক একটা ফোন নাম্বার এই মুহূর্তে খুব দরকার দারোগা সাহেবের। অনাদি কি দিয়েছিলেন নাম্বারটা? ঠিক মনে পড়ে না। ডাইরিটা ওল্টাতে থাকেন। হ্যাঁ, পেয়েও যান। একেবারে শেষ পাতার আগের পাতায় লেখা স্বপ্ননীলের নাম্বারটা। লালকালিতে।
পঁয়ত্রিশ
ফুলওয়ারিতোড়। ঝাড়খণ্ড। দুই চৈতন্য কথা। আদি ও অনাদি।
কসাই সালাউদ্দিন আবদুলকে বলেছে, অনাদির জন্য এলাকায় নাকি কাজ করা যাচ্ছে না। সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আবদুল জানতে চায় সালাউদ্দিনের কাছে, “কেন উনি আবার কী করলেন!”
“বললাম তো একবার, এলাকায় আমাদের ঠিকমত কাজ করতে দিচ্ছে না।”
“বাব্বা… এত ক্ষমতা ওঁর?”
এই কথার কোনও উত্তর না দিয়ে দু’এক মুহূর্ত স্থির তাকিয়ে থাকে সালাউদ্দিন। তবে আবদুলও এখন বাঘা তেঁতুল। এই সব দৃষ্টিতে আগে চমকাত সে, এখন পাত্তা দেয় না। পায়ের উপর পা তুলে বসা ছিল মিঞা সাহেব। ঠ্যাং নামিয়ে সিধা হয়ে বসতে বসতে বলে, “আজকাল তুই মুখে মুখে বড্ড কথা বলিস রে...। জানিস... মোহান্তি ঠাকুর বৈগা পাড়ায় কী সব লিফলেট বিলি করছে?”
আজ সকালেই ওই কাগজ পেয়েছে আবদুল। সরস্বতীর কাছ থেকে। এখনও পকেটে রয়েছে ওটা। বার করে দেখায়, “এইটা বুঝি?”
“হ্যাঁ। তুই এটা কার কাছ থেকে পেলি?”
“সে কথা থাক।”
“পড়েছিস ওটা?”
প্রশ্নটা করে নিজেই পড়তে শুরু করে,
“এই দেশ আমাদের। এই পাহাড়-জল-জঙ্গল-মাটি সব আমাদের। আজ নিজেদের দেশেই আমরা নিরাপত্তাহীন। কর্মহীন। আমাদের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানে ভাগ বসাচ্ছে একদল বহিরাগত...।
জয় শ্রী শম্ভু...”
সালাউদ্দিনের পড়া শেষ হলে খুব ধীরে ধীরে আবদুল বলে,“আমি পড়েছি।”
“এর পরেও এত শান্ত হয়ে আছিস কী করে!”
“একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। এই লিফলেটের সাথে অনাদি গোসাঁইয়ের সম্পর্কটা কী? এটা তো উনি বিলি করেননি! বরঞ্চ আমার কাছে যা খবর আছে তাতে এটা বুঝতে পারছি যে গোসাঁইজি এর বিপক্ষেই কথা বলছেন।”
“আরে ওটা তোর মনে হচ্ছে। ওই শালা চৈতন্য মহাপ্রভুর চামচা এক নম্বরের হারামখোর। দু’দিকেই তাল দিচ্ছে। আমাদের একে তাকে ধরে বলছে এইসব কথায় কান না দিতে! আবার ওদের ওখানে গিয়ে বলছে মুসল্লিদের সাথে কোনোমতেই পিরীত না করতে। এই তো কালকেই আমাদের একজনকে ধরে ভুলভাল বুঝিয়েছে।”
“কিন্তু আমি যে অন্য কথা শুনছি...”
“কী শুনছিস?”
“উনি হিন্দু মহল্লাতে গিয়ে বলছেন এইসব লিফলেট নিয়ে মাথা না ঘামাতে। মুসলিমরা আমাদের শত্রু নয়। শত্রু আসলে অন্য। তাহলে…!”
“কী তাহলে?”
“উনি এলাকায় যাতে গোলমাল না বাঁধে তার জন্যই তো চেষ্টা করছেন! তাহলে!”
আবদুলের তীক্ষ্ণ প্রশ্নে সাল্লু খানিক টাল খায়, “দেখ এলাকায় গোলমাল হল কী হল না, সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা হল ‘জাস্টিস’। তার জন্য গোলমাল যদি হয় তো হবে।”
মনে মনে হাসে আবদুল, ‘গোলমাল যদি হয় তো হবে’ এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। হা হা হা...। একটা দুটো ইংরাজি শব্দ সেও এখন জানে। একটু চিবিয়ে বলে, “কীসের ‘জাস্টিস’ মিঞাভাই?”
“লিফলেটটা আরও একবার দেখ ভালো করে। তাহলেই বুঝতে পারবি, মুসলিমদের আসলে কী চোখে দেখা হচ্ছে। ঐ শালা মহাপ্রভুর চামচা এসে বড় বড় বুকনি দিল আর অমনি আমরা সব ভুলে গেলাম। এত সহজ নাকি রে!”
“মহাপ্রভু কে সাল্লুভাই?”
“মানে?”
“বলছি... ‘মহাপ্রভু’ কে? যার চামচা ঐ অনাদি গোসাঁই?”
“সে আমি কী করে জানব !”
“উনি কে সেটা না জানলে, এটা কী করে বোঝা যায় যে কে ওঁর চামচা?”
কথাটা বলে হো হো হাসতে থাকে আবদুল। ঐ হাসিতে সে যেন হেলায় উড়িয়ে দিচ্ছে বাঘের মত পরাক্রমশালী মোল্লা সাহেবকে। সত্যি আবদুলের স্পর্ধা আজকাল বেশ অবাক করার মত। মোল্লা কথা চেবায়, “এত হাসির কী হল রে? সবাই যে ‘মহাপ্রভুকে’ চিনবে তার কী মানে আছে?”
“হা হা হা... শুধু ঐ জন্য হাসছি নাকি?”
“আর কী জন্য হাসছিস!”
লিফলেটটা চোখের সামনে মেলে ধরে আবদুল। দেখিয়ে বলে, “আমার মনে হচ্ছে, এই বিষয়টা শুধুমাত্র সদাশিব মোহান্তির মাথা থেকে বেরোয়নি। এইটার পিছনে আরও অনেকে আছে। পুরো ব্যাপারটা আরও একটু ভালো করে বোঝার দরকার...।”
“এর পিছনে কে কে আছে বলে তোর মনে হয়?”
আবদুল এই প্রশ্নের কোনও উত্তর করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না। সে হাসতেই থাকে। সাল্লাউদ্দিন নেতা। মাথাও তার চলে হাতের মতই। আবদুলের অভব্য হাসি এবং কথার ইঙ্গিত বুঝতে সময় লাগে না। মনে মনে ভাবে, এটা অ্যাকশনের সময়। দলের একজন সিনিয়র মেম্বারকে এই সময় খালাস করে দিলে মুশকিল। কাজেই, এখনও কিছুদিন এই হারামাজাদার টালবাহানা হজম করে যেতে হবে।
তবে, এই ধানিপটকাটিকে এইবার থেকে আর ছেড়ে রাখা যাবে না। চোখে চোখে রাখতে হবে। আর তার আগে চুকিয়ে দিতে হবে অনাদির হিসাবটা। খানকির ছেলের চৈতন্য হওয়ার সাধ একেবারে ঘুচিয়ে দিতে হবে। আসছে অরবিন্দরা...হা হা হা...
বালুতট ধরিয়া রামানন্দ চলিতেছেন। তিনি এই বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত আছেন যে, যাঁহাদের আহ্বানে আজ চলিয়াছেন তাঁহাদের বিশ্বাস করিবার বিন্দুমাত্র অবকাশ নাই। কিন্তু অদৃষ্টের এমনই পরিহাস যে, তথাপি যাইতে হইবে। প্রভুর বিষয়ে কথা বলিবার আছে নাকি তাঁহাদের। শুনিতে হইবে বৈকি। না শুনিলে পরবর্তী কর্মপদ্ধতি স্থির হইবে কী রূপে!
রামানন্দের হৃদয় ভারাক্রান্ত এক অমঙ্গল আশঙ্কায়। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তপ্তবালুকার উপর দিয়া চলিয়াছেন তিনি। কোনোদিকে খেয়ালমাত্র নাহি। তাহার বর্তমান অবস্থান অপেক্ষা গুণ্ডিচা বাড়ি এখনও আধক্রোশটাক দূর।
এই অবসরে, গুণ্ডিচাবাড়ি হইতেও দুই জন বাহির হইয়া তাঁহার মতই অতিদ্রুত দক্ষিণ অভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। তাঁহারা দুইজনেই কূটবুদ্ধির শনিঠাকুর। অত্যন্ত জটিল কোনও উদ্দেশ্য ব্যতীত এই অসময়ে তাঁহারা যে বাহির হইবেন না তাহা নিশ্চিত।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই, ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
মন্তব্য করুন