দাঙ্গাবাজ সালাউদ্দিনের মুখে ক্রূর হাসি ফুটে ওঠে। হ্যাঁ। আমার হাতে হোমিসাইডের জন্য আবদুল ছাড়া সেরকম কেউ নেই। কিন্তু আমি সিওর যে অনাদি... হ্যাঁ অনাদির কাজটা ওকে দিয়ে হবে না। তাই আপনাদের আসতে বলেছি।
অযথা কথায় সময় নষ্ট করা অনন্তর ধাতে নেই, “আমরা যখন এসেছি তখন আমরাই কাজ শেষ করে ফিরব।”
এই পর্বে আরও একটা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত হবে অনন্ত মহাষুররা, তাদের নীল নকশা অনুযায়ী বিশ্বামিত্র সেন খুন হননি। তিনি খুন হয়েছেন অন্য একজনের হাতে! সবার মত হতবাক হবে তারাও, এটা ভেবে যে, কে সেই হত্যাকারী!
এইদিকে, বিশ্বামিত্র সেন হত্যা রহস্য নিয়ে টালমাটাল পুলিশ, এরই মধ্যে আবার চন্দ্রপুরার হাজির হয়েছে অনন্তরা। যাদের এখানে আসার উদ্দেশ্যই হল, অনাদি গোসাঁই ওরফে চন্দ্রপুরার চৈতন্যকে খুন করা। একটা হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আরও এক হত্যা ঢুকে পড়বে নাকি এই উপখ্যানে! দেখাই যাক...
ছত্রিশ
যাদবপুর। কলকাতা।
নীল এখনও মগ্ন পড়াশুনায়। তার যাদবপুরের বাড়িতে।
চৈতন্য মহাপ্রভু এক অদ্ভুত ‘ভার্টিকাল সোশ্যাল সিস্টেম’-এর মধ্যে দাঁড়িয়ে মহামন্ত্র দিয়েছিলেন সমাজকে। যে মন্ত্রে, খোলা বেচা হরিহর সোজা গিয়ে বসে পড়তে পারে রাজা প্রতাপরুদ্রের সাথে, একই পঙক্তিতে। এহেন মহান মানুষের আকস্মিক অন্তর্ধানকে দিব্যি গাঁজাখুরি দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হবে, এটা হতে পারে না।
বিশ্বামিত্রবাবু নীলকে বলেছিলেন, বি. এইচ. এম. ডি যত ষড়যন্ত্রই করুক না কেন, শেষ দেখে ছাড়বেন।
এই প্রসঙ্গ উঠলেই নীল বারে বারে জানতে চেয়েছে, বি. এইচ. এম. ডি-র সাথে তার কাজের বিরোধটা ঠিক কোথায়? তিনি ধৈর্য না হারিয়ে বারংবার যে উত্তর দিয়ে গেছেন নীলকে, তার সারমর্ম হল ঐরকম একটা সাম্প্রদায়িক দল কেন চাইবে হঠাৎ করে এমন কোনও রহস্যের সমাধান হয়ে যাক যা নিম্ন এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে যে মেকি ঐক্য বানানোর চেষ্টা চলছে, তার ভিতটাকে নতুন করে ফের একটা বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিক!
তাই যদি হয় তবে, বিশ্বামিত্রের এই কাজে যে কোনও মুহূর্তে জীবনহানির আশঙ্কা আছে, কিন্তু তার থেকেও বড় যে কথাটা এরপর স্বপ্ননীলের মাথায় এসে গোত্তা মেরেছে তা হল, বিশ্বামিত্র সেন যে চূড়ান্ত সত্যিটাতে পৌঁছবেন সেটা কি আদৌ দিনের আলো দেখবে? না সেই ‘ট্রুথ’-কেও গুম খুন করে দেওয়া হবে? যদি বি. এইচ. এম. ডি-র অস্তিত্বকেই প্রশ্ন করে তাঁর সেই ‘ট্রুথ’, তাহলে হিসাব তো বলছে সেই ‘সত্যি’-কেও ধ্বংস করার জন্য বি. এইচ. এম. ডি সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপাবে।
স্টাডি করতে করতে এখন লেগে আসতে চাইছে চোখদুটো । টেবিলের উপর ফ্লাস্কে কফি রাখা ছিল। ঢাউস কাপটায় ঢেলে নিয়ে যেই বসতে যাবে অমনি বালিশের কাছে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে। অচেনা নম্বর...
“হ্যালো...”
“আমি চন্দ্রপুরা থেকে বলছি...”
স্যারের বাড়িতে কয়েকবার গেছে স্বপ্ননীল। কিন্তু ওখানে এরকম কারোর সাথে আলাপ হয়নি যে ওকে ফোন করতে পারে। বেশ গম্ভীর এবং স্পষ্ট উচ্চারণ লোকটার। কে! স্বপ্ননীল জানতে চায়,
“আপনার নামটা...”
“আমি চন্দ্রপুরা থানার ওসি সুজয় মাহাতো...”
স্বপ্ননীলের বিস্ময় বাড়ে বৈ কমে না।
“হ্যাঁ স্যার বলুন...”
“আপনি কি জানেন আজ ভোরে বিশ্বামিত্র সেন খুন হয়েছেন।”
প্রথমটায় নীলের মনে হয় ভুল শুনল বুঝি।
“অ্যাঁ ! বুঝলাম না স্যার...।”
ঐ প্রান্তে পুলিশ সুলভ গলা সুজয়ের।
“না বোঝার মতো আমি কিছু বলিনি মিস্টার স্বপ্ননীল। বলছি যে বিশ্বামিত্র বাবু খুন হয়েছেন।”
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
সাঁইত্রিশ
ফুলওয়ারিতোড়। ঝাড়খণ্ড।
হোটেল পদ্মনাভর মিটিং শেষে অরবিন্দ প্রতিহারী এবং অনন্ত মহাষুর পাড়ি দিয়েছে চন্দ্রপুরা-ফুলওয়ারিতোড়ের পথে। সনাতন গাজীর বটতলা গন্তব্য তাদের।
অনন্ত এবং অরবিন্দ এই মুহূর্তে গন্তব্যের খুব কাছাকাছি। কাঁচা রাস্তায় সাইকেল ভ্যান চালানো সহজ কাজ নয় তাই সময় লাগছে খানিক। না হলে এতক্ষণে পৌঁছেই যেত। প্রাণপণে প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে চালক। আরও একটু এগোনোর পর একটা বাঁক নেয় ত্রিচক্র যান। এইবার মসজিদটা দেখা যায়। শিরিষ গাছটার নীচে অতিথিদের জন্য অপেক্ষারত সালাউদ্দিন মোল্লাকেও চোখে পড়ে। ওই বিরাট শরীর অনেক দূর থেকেও চোখে না পড়ার নয়। ভ্যান মসজিদের কাছাকাছি থামলে লাফ দিয়ে নেমে আসে প্রতিহারী এবং মহাষুর।
বিদায় নেয় ভ্যান চালক। অরবিন্দ এসে হাত মেলায় মোল্লার সাথে। পাশে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকে মহাষুর। সে লৌকিকতার খুব একটা ধার ধারে না। মোল্লা মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করে,
“আসতে কোনও অসুবিধা হয়নি তো?”
অনন্ত নিশ্চুপ। অরবিন্দ বলে, “না সেরকম কোনও অসুবিধা হয়নি। এইদিকের সব খবর কী?”
“এখনও অব্দি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে অনাদি থাকতে খুব বেশিদিন সেটা চলবে না।”
অনন্তর পাথুরে মুখে অভিব্যক্তি বোঝা যায় না। তাও যেন অনাদির কথায় মুখের দু-একটি রেখার পরিবর্তন হয়। মাত্র দু-খানা শব্দ উচ্চারণ করে সে,
“থাকবে না।”
অরবিন্দ বলে, “হ্যাঁ সেইজন্যই আমাদের আসা।”
দাঙ্গাবাজ সালাউদ্দিনের মুখে ক্রূর হাসি ফুটে ওঠে।
“হ্যাঁ। আমার হাতে হোমিসাইডের জন্য আবদুল ছাড়া সেরকম কেউ নেই। কিন্তু আমি সিওর যে অনাদি... হ্যাঁ অনাদির কাজটা ওকে দিয়ে হবে না। তাই আপনাদের আসতে বলেছি।”
অযথা কথায় সময় নষ্ট করা অনন্তর ধাতে নেই, “আমরা যখন এসেছি তখন আমরাই কাজ শেষ করে ফিরব। আপনি রাধামাধবপুরের বলরাম কিস্কুর সাথে টাইম ফিক্স করেছেন?”
“হ্যাঁ। সন্ধ্যা ছটা।”
তিনটে চেয়ার এবং একটা টেবিল পেতে রাখা হয়েছিল। অরবিন্দ এবং অনন্ত চেয়ারে বসেন। জলের বোতলও রাখা ছিল টেবিলে। অরবিন্দ তুলে নিয়ে জল খান। চা দিয়ে যাওয়া হয়। বোতল রেখে ছোটো ছোটো গোটা দুয়েক চুমুক দেন চায়ের কাপে। মহাষুরকে বলেন,
“তাহলে তো আমাদের এখনই বেরোতে হয়।”
“আমার কোনও অসুবিধা নেই।”
প্রতিহারী সালাউদ্দিনকে বলে,
“আপনি আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। মিটিং ছটা থেকেই হবে।”
“ঠিক আছে।”
পকেট থেকে মোবাইল বার করে ড্রাইভারকে একটা ফোন করে সালাউদ্দিন।
মসজিদটা অনেকখানি জমির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়। চারদিকের জমি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। লোহার গেট দিয়ে ঢুকেই সবুজ গালিচা। তার মধ্যে দিয়ে নুড়ি পাথর ফেলা রাস্তা। সাজানো বাগান, দু-ধারে। আগে এত চাকচিক্য ছিল না। হালে হয়েছে। যেমন হয়েছে বৈগা পাড়ার মন্দিরের।
“চলুন...।” শব্দটা ভাসিয়ে দিতে দিতে এগিয়ে যায় সালাউদ্দিন।
হাইওয়ে অব্ধি হেঁটে এলে একটা স্কর্পিও দেখতে পাওয়া যায়। আসার সময় অরবিন্দরা একটা ব্লু কালারের ইনোভায় এসেছিল। ওই গাড়ির চাকচিক্য অনেক বেশি। চোখে পড়ার মত। তাই অত আগে পরিত্যাগ করতে হয়েছিল বাহনটিকে। কিন্তু স্কর্পিও বা জিপ জাতীয় যানবাহন দেখে গাঁয়ের লোক চোখ টাটায় না।
কথা বলতে বলতে দ্রুত গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ে তিনজন।
আটত্রিশ
সোনারি। ঝাড়খণ্ড।
অরবিন্দদের মিটিং শরু হতে আরও খানিক বাকি। সেই অবসরে আবার খানিক সেই মেয়েটার কথা। নদীর নামে যার নাম। দো-মোহিনী ছটঘাটের থেকে বেশ খানিক দূরে বসেছিল অলকানন্দা। মুখ দিয়ে সাবানজল টেনে নিয়ে খেলছিল বুদবুদ ওড়ানোর খেলা। কিন্তু অন্ধকার নেমে আসছে ক্রমে, একটু দূরের ফেননিভ গোলাকার বুদবুদও অস্পষ্ট এখন।
সাইড ব্যাগটার মধ্যে পাইপটা রেখে পাহাড়ের দিকে তাকায় নন্দা। দলমার রেঞ্জটাকে বুঝতে পারা যাচ্ছে বেশ। পাহাড়ের একটা আলো আছে। অন্ধকারের আলো। ঐদিকে ছট ঘাটে গোটা দুয়েক সি এফ এল জ্বলে গেছে এতক্ষণে। জোরালো বাতি। কিন্তু পাহাড় তার কালো তরঙ্গ ছড়িয়ে দিয়ে গ্রাস করে নিতে চাইছে চরাচর। দলমা তার শরীরে আশ্চর্য এক অন্ধকারের আলো নিয়ে জেগে উঠছে ক্রমে।
মেরিন ড্রাইভ রোডে এমনিতেই গাড়ি চলাচল কম। অন্ধকার নামার সাথে সাথে তা যেন আরও কমেছে। ভেপারের নীচে ছটকাচ্ছে খাঁ খাঁ শূন্যতা।
কাছাকাছি বসতি বলতে তিলকা মাঝি বস্তি। তাও এখান থেকে অনেকটা। ওদিকে হঠাৎ করে চোখ গেলে কয়েকটা লেলিহান শিখা নজরে পড়ে অলকার। কয়েক মুহূর্ত ওই দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সে। অন্ধকার ক্যানভাস ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে যেন। আজও কি দাঙ্গা লাগলো নাকি? যা শুরু হয়েছিল চন্দ্রপুরার ডি-টাইপ ব্রিজের দাঙ্গার পর, তা সারা ঝাড়খণ্ড মুলুকে ছড়িয়ে পড়ছে একটু একটু করে। অলকানন্দা একবার ভাবে খানিক এগিয়ে বিষয়টা দেখলে হয় না। কিন্তু যেই সাইকেলটা নিয়ে ঐদিকে যাবে বেজে ওঠে দূরভাষ। বাবা। অগত্যা ঘরমুখো হতে হয় তাকে।
শাল গাছের মধ্যিখান দিয়ে সটান চলে গেছে রাস্তা। দু’ধারে বাতিস্তম্ভ। ঝরা পাতা ছড়িয়ে থাকা পথে আলোছায়ার আলপনা। বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় অলকানন্দা।
বেশি দিন এখানে থাকা যাবে না। চন্দ্রপুরা গিয়ে ‘মিট’ করার কথা অরবিন্দ এবং অনন্তর সাথে। ফুলওড়ারিতোড়ে আছে ওরা। ‘অপারেশন অনাদি’ শেষ হলেই যোগাযোগ করার কথা ওদের।
খুব জোরে সাইকেল চালিয়েছিল। দশ বারো মিনিটের পথ চলে আসে অর্ধেক সময়ে। ফ্ল্যাটে ঢুকেই সোজা চলে যায় স্টাডিতে। একটা বিষয়ে খুব ব্যস্ত সে। তা হল, মহাপ্রভুকে নিয়ে পড়াশুনো। ইতিহাসের ছাত্রী হয়েও হিন্দু ধর্মের এই ‘আইডল’ সম্পর্কে সে যে বেশ অজ্ঞ, তা নীলের সাথে তর্ক করতে গিয়ে বুঝতে পারে। নিজের বলা কথাগুলো সম্পর্কে নিজেই সন্দিহান হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে।
এরমধ্যে অনেকগুলো বই আনিয়েছে। সেগুলো নিয়ে বসে পড়ে। যত গভীরে ঢোকে অলকানন্দা ততই তার মনে হয় খুব একটা ভুল বলেনি স্বপ্ননীল। চৈতন্যের মহিমা মহামান্য বুদ্ধের থেকে একটুও কম নয়। সত্যই, তিনিও বুদ্ধের মতই ঘুচিয়ে দিতে চেয়েছিলেন মানুষে মানুষে সমস্ত অসূয়া। ভেদাভেদ। আধুনিক ভারতবর্ষের কথা উঠলে এটা বলতেই হবে যে, তিনি ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক চেতনার জনক।
এই পড়াশুনা করতে গিয়ে একটা ব্যাপার কিন্তু ঘটে যাচ্ছে অলকানন্দার অলক্ষ্যেই। যে অলকানন্দা ছিল ঘোর চৈতন্য বিরোধী সেও হয়ে উঠছে ভক্ত। নিজের অজান্তেই মহানামের নামাবলী জড়িয়ে নিচ্ছে গায়ে।
বৃষ্টি নামছে ধীরে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে। কতখানি উর্বর হচ্ছে মাটি, তা বোঝা যাবে এই উপাখ্যান চলতে চলতেই।
ঊনচল্লিশ
ফুলওয়ারিতোড়। ঝাড়খণ্ড।
দুগ্ধায় যখন পৌঁছাল স্কর্পিও, তখনও দিনের আলো ছিল সামান্য। পাকদণ্ডী পথ বেয়ে উপরে ওঠার সময় হঠাৎ হঠাৎ নজরে পড়ে যাচ্ছিল, ডিভিসি-র নতুন প্ল্যান্টের চিমনি অথবা অস্তরাগে রাঙা দামোদর। মন্দিরের বেশ খানিকটা আগে বাংলো। গেটের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াবার সাথে সাথে খুলে যায় ফটক। বাংলোর মালিক কোনো ট্রাস্টি বোর্ড না কর্পোরেট হাউস বোঝা মুশকিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলেই বিরাট হলঘর। কনফারেন্স রুম। কোণার দিকে একটা টেবিলে বসে আছে বলরাম কিস্কু। সাম্প্রতিক কালে তৈরি হওয়া ‘শান্তি কমিটি’-র প্রেসিডেন্ট। একটা বাহারি ঝাড়বাতি ঝোলানো আছে ঘরের মাঝামাঝি জায়গায়। ঐ আলোক উৎসে সারা ঘর আলোকিত।
বলরাম উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে স্বাগত জানায়। তার মাথার পিছনে প্রজেকশন স্ক্রিন। টেবিলে রাখা একটা প্রজেক্টর মেশিন।
অরবিন্দরা সবাই আসন গ্রহণ করেন। সালাউদ্দিন মোল্লা গিয়ে বসে বলরামের পাশে। উল্টোদিকে অরবিন্দ এবং অনন্ত।
“এক্সকিউজ মি...” শব্দ দুটো বলতে বলতে উঠে যায় বলরাম। জানলায় দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বাগানের দিকে। দুগ্ধা পাহাড় কেটে বানানো এই বাংলো। গবাক্ষ থেকে একশো হাত দূরেই উঠে গেছে পাহাড়। কালচে সবুজে ঝুলে আছে প্রাকসন্ধ্যার বিষন্নতা।
এইখানে কোনও গোপন মিটিং থাকলে, পাহাড়ায় থাকে শান্তি রক্ষীর দু-চারজন। তবে, আপাত দৃষ্টিতে কিছু বোঝার উপায় নেই। পাথরের খাঁজে মিশে থাকে তারা। এদিক ওদিক ঘাড় উঁচিয়ে হয়ত তাদেরই কাউকে দেখার চেষ্টা করল কিস্কু। যাই হোক, জানলা বন্ধ করে নিজের জায়গায় ফিরে আসে।
প্রতিহারী এবং মহাষুরের সাথে আজ প্রথম সাক্ষাৎ বলরামের। প্রাথমিক কথাবার্তা এবং নতুন অতিথিদের যথাযথ সম্ভাষণের পর সে চলে যায় প্রোজেক্টরের কাছে। কোনও রকম ভূমিকা ছাড়াই প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ে , “আমি চাই, সবার আগে আপনারা দেখুন, ঠিক কোন কোন এলাকায় আমাদের যৌথ পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখনও অব্দি কাজ করা গেছে।”
প্রজেক্টর মেশিন চালু করলে, ঝাড়খণ্ডের ম্যাপটা সবার আগে ভেসে ওঠে। তারপর কিছু বিশেষ জায়গার উপর কনসেনট্রেট করা হয়। বোঝা যায় চন্দ্রপুরা, ফুসরু, পিঁপড়াডিহি, ফুলওড়ারিতোড়কে ধরা হয়েছে।
এরপর স্ক্রিনে লাল লাল কতগুলো দাগ ফুটে ওঠে। ক্রমশ স্পষ্ট হলে বোঝা যায় ঐ গুলি বিভিন্ন ধর্মস্থান। হিন্দু, খ্রিষ্টান, মুসলিম নির্বিশেষে। শাহী মসজিদ, সেন্ট ক্যাথিড্রাল চার্চ, সোনা মসজিদ, হনুমানজি মন্দির ইত্যাদি। মোট একুশটি। আরও একটু ডিটেলিং এ যায় বলরাম, “মন্দির আছে এগারোটি, মসজিদ ছটি এবং চার্চ চারটি। হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত এই কটাই শান্তিরক্ষা কমিটির আওতায় আনা গেছে...”
বলরাম একবার সবার দিকে চোখে চালিয়ে নিয়ে বলে, “চাহিদা অনুযায়ী কমিটি পবিত্র স্থানগুলির মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, সে দিকে দৃষ্টি রাখছে এবং যে কোনও বিষয়ে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের পথকে করছে মসৃণ।”
এই ধরনের শব্দ বহুল প্রচলনে অর্থহীন। বলা বাহুল্য যে উদ্দেশ্যের কথা এখন বলা হল, আসলে বিষয়টা ঠিক তার উল্টো। এটা তৈরি হয়েছে, যে জাতিগত বিদ্বেষের আগুন ইতিমধ্যেই ধরানো হয়েছে, সেইটাকে অতি সহজে যাতে মুড়ো থেকে ল্যাজা অব্দি পৌঁছে দেওয়া যায় সেই কারণে। ‘সমন্বয় সাধন’ আসলে সেই আগুন ছড়ানোর জন্য।
এইদিকে, ছোটো চোখ আরও ছোটো হয় অরবিন্দর। হালকা করে কয়েকটা শব্দ বলে সে, “ওয়েল ডান মি. মোল্লা ...ওয়েল ডান মি. কিস্কু।”
কী একটা চিন্তা করে আবার বলে,“আশা করি, আমরা এনলিস্টেড মসজিদ-মন্দির এবং গির্জাগুলির জন্য যে অনুদান পাঠাই, সেটা পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রেও এই কমিটির ভূমিকা থাকবে বা আছে।”
বলরাম কিস্কু নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বলে, “অবশ্যই।”
যাকে অনুদান বলা হচ্ছে সেটা আসলে ‘টোপ’। যা বেশ কিছু মন্দির-মসজিদকে খাইয়ে দেয়া গেছে এতদিনে। এর জন্যই সালাউদ্দিনদের সোনা মসজিদ অথবা বৈগাপাড়ার মন্দিরের এত রমরমা। চার্চগুলিকে এখনও অতটা বাগে আনা যায়নি, কারণ তারা বিদেশি ‘গ্রান্ট’ পেয়ে আসছে বহুদিন ধরে। এখনই ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ তাদের না করলেও চলবে।
এই ‘টোপ’ কেন দেওয়া হচ্ছে? না, অশিক্ষিত এবং ধর্মভীরু মানুষগুলিকে যাতে নিজেদের আওতায় নিয়ে আসা যায় এবং ইচ্ছেমত ব্যবহার করা যায়।
“আচ্ছা এই কমিটি এবং তার কার্যকারিতা নিয়ে আমরা পরে আবার আলোচনা করব কিন্তু তার আগে অন্য একটা কথা জানার আছে আমার…”
প্রসঙ্গান্তর ঘটায় অনন্ত মহাষুর। সালাউদ্দিন বলে, “বলুন।”
“আজ রাধামাধব মন্দিরে অপারেশনটা করতে কোনও অসুবিধা হয়েছিল?”
এই কথাটা এখানে আসার পরই জানতে চেয়েছিল অরবিন্দরা। কিন্তু তখন এড়িয়ে গিয়েছিল সাল্লু। এখন বলে, “আসলে আবদুলের আগেই বিশ্বামিত্রকে খুন করেছে অন্য একজন।”
অরবিন্দর মত ঝানু পলিটিসিয়ানের মাথাও দপদপায় হঠাৎ করে এরকম একটা আলটপকা কথা শুনে, “কী বলছেন অ্যাঁ ! বুঝলাম না ...! তাহলে কে মারল ওঁকে !”
“সেটা জানি না। হ্যাঁ, আবদুল আমাকে ভোরবেলাই জানায়। কিন্তু আমি তখন কাউকে কিছু বলিনি। জানতাম বিকালেই দেখা হবে সবার সাথে। কাজেই...”
বলরাম কিস্কু হাউমাউ করে ওঠে, “অদ্ভুত ব্যাপার...! আবদুল মারেনি, কিন্তু যে মেরেছে সেও তাকে রাধামাধব মন্দিরেই খুন করল! অদ্ভুত...ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো...!”
বলরাম কিস্কু এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। এবং সেই কারণেই রাধামাধব মন্দির কমিটির সেক্রেটারি এবং শান্তি কমিটির প্রেডিডেন্ট। যে কোনো শান্তি কমিটির মতই এই কমিটিতেও হিন্দু এবং মুসলিম, উভয়পক্ষের প্রভাবশালী লোকজনই আছে।
সে যাই হোক, কথা হচ্ছিল বিশ্বামিত্রের খুন নিয়ে। কোনো এলাকা দখল নিতে হলে, এলাকার হোমরাচোমরাদের কিনে নিতে হয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অরবিন্দদের কাছে বলরাম বিক্রি হয়ে গেছে কিছুদিন হল। বিশ্বামিত্র খুনের পরিকল্পনা করার সময় তাকে নিয়েও বসা হয়েছিল। যাতে হঠাৎ করে ঐ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কোনও ঝামেলা হলে মিটিয়ে নিতে পারে। কাজেই, ওই খুনের নীল নকশাটা সে জানত আগের থেকেই।
হতবাক কিছু মুহূর্ত পেরিয়ে গেলে ফের নীরবতা ভাঙেন অরবিন্দ। দাঁতে দাঁত চেপে বলেন, “তবে, এমন কি কেউ ওঁকে খুন করল যে আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল? নাহলে সেও মন্দিরেই খুনটা করল কেন!”
“এখানেই প্রশ্নটা।”
শেষ শব্দ দুটো অনন্ত মহাষুরের। তার পাথুরে মুখে ভাব বোঝা দায়। কিন্তু উচ্চারিত বাক্যটায় বোঝা যায়, তার ভিতরেও ঝড় বইতে আরম্ভ করেছে।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই, ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
মন্তব্য করুন